
অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বন্যার পানি বেশি এসেছে ছিলুমবাড়িয়ায়। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। মাটির কোন চিহ্ন দু’দশ গ্রামে খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু ইউনিয়ন পরিষদ ভবন অপেক্ষাকৃত উঁচু বলে সেখানে পানি ওঠেনি। চারাগাছগুলো পানির মধ্য থেকে গলা বাড়িয়ে দেখছে রূপসী বাংলাকে। সাপ, আরশোলা, ব্যাঙ জীবন বাঁচানোর তাগিদে আশ্রয় নিয়েছে গাছের ডালে, নৌকার ওপর, মানুষের ভীড়ের মধ্যে। গৃহপালিত পশুরা না খেয়ে মরছে। বানের জলে ভাসতে দেখা যায় প্রতিনিয়ত অনেক পশুর পঁচনধরা দেহ।
শকুন আর কাক তার ওপর বসে ঠুকরে ঠুকরে গ্রহণ করে মাংসের স্বাদ। কখনও কখনও সাহসী কুকুরদের ভেলা হিসাবে ব্যবহার করে মাংস ছিঁড়ে খেতে দেখা যায় মৃতদেহের। সে পশু হোক আর মানুষই হোক। এলাকার মানুষের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তারা আশ্রয় নিয়েছে ডিঙ্গি নৌকা, কলার ভেলা, গাছের ডাল, স্কুল ভবনের ছাদ- আর কেউ কেউ আশ্রয় কেন্দ্রে। খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছে। সবার চোখে হতাশার চিহ্ন। সরকার প্রচার মাধ্যমগুলোতে ঘোষণা দিচ্ছে বারবার, “দেশে রিলিফের খাদ্য মজুদ আছে প্রচুর। কেউ না খেয়ে মরবে না।” সরকারী দল, বিরোধী দল রিলিফ দিচ্ছে ঠিকই তবে তা খুবই সামান্য। মাথাপিছু একশো পঞ্চাশ গ্রাম চাল। প্রতি শনি- মঙ্গলবারে রিলিফ কেন্দ্রে জড়ো হয় বানভাসী মানুষেরা সামান্য ক’টা চালের আশায়। অপেক্ষাকৃত যেখানে পানি কম সেই জায়গাটা রিলিফ কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রিলিফ কেন্দ্রে যে আসবে সে চাল পাবে, যে আসবে না সে পাবে না। যার কারণে শনি- মঙ্গলবার আসলে গলা পানি মাড়িয়ে সবাই ছোটে রিলিফ কেন্দ্রের দিকে। মায়েরা তাদের ক্ষুধার্ত সন্তানদের পিঠের সাথে শাড়ি দিয়ে বেঁধে নেয় জব্দ করে। তারপর পানির সাথে যুদ্ধ করে চলা আর চলা।
যাদের নৌকা আছে তারা নৌকায়, যাদের কলার ভেলার ওপর সংসার তাদেরতো কথায় নেই। ভেলা ঠেলতে ঠেলতে বাড়ি সুদ্ধ উপস্থিত হয় রিলিফ কেন্দ্রে!
আশ্রয় কেন্দ্রে তিল ধারণের জায়গা নেই। রাতে ঘুমানো হয় না কারো। বসে বসে কাটাতে হয় সমস্ত রাত। বসে ঘুমানোর অভ্যাস যাদের আছে তারা বসেই ঘুমায়। তবে ভূখা পেট অস্থির করে তোলে সর্বক্ষণ। বাচ্চাগুলো ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে বারবার।
নৌকা বোঝায় করে ইউনিয়ন পরিষদ গোডাউনে খাদ্য আসছে সপ্তাহে একদিন। অথচ ক্ষুধার জ্বালায় মরতে বসেছে ইউনিয়ন সুদ্ধ। এসব খাদ্য কোথায় যায় তা ছিলুমবাড়িয়াবাসী জানে না।
বন্যার পানি নেমে গেলেও হাহাকার কমেনি একটুও। পানি সরে যাবার সাথে সাথে কপালের সুখও ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছে। সরকার বার বার ঘোষণা দিচ্ছে, “দুর্গতদের পুনবার্সনের ব্যবস্থা করা হবে। কেউ না খেয়ে মরবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।”
সরকারের গলাবাজিকে বিশ্বাস হয় না ছিলুমবাড়িয়াবাসীর। তাদের অভিজ্ঞতায় একথা স্পষ্ট- ভোটের জন্যে এমন কথা বলে হরদম। গ্রামবাসী না খেয়ে থাকলে সরকারের কিচ্ছু আসে যায় না। সরকার এত দিচ্ছে, অত দিচ্ছে প্রচার মাধ্যমে বলা সর্ত্বেও না খেয়ে হাড্ডিসার হয়েছে সবাই এবং হচ্ছে।
যে যার কাজে ব্যস্ত। পেটে দানা নেই তবুও যেন বসে থাকা চলবে না। ভাঙ্গা ঘর ঠিক করতে হবে, যেটুকু জমি আছে তাতে চাষ দিয়ে কিছু একটা লাগাতে হবে।
আজ সকালে ইউনিয়ন পরিষদের দিকে দশ- বারোটা বোঝাই ট্রাক যেতে দেখেছে সবাই। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের ভয়াবহ দুর্দশা কাটিয়ে ওঠার জন্যে সরকার পাঠিয়েছে এই খাদ্য। ট্রাকগুলো দেখে সবার মনে একবার আনন্দের ঝলক বয়ে গেলেও তা নিমেষেই ম্নান হয়ে যায় যখন মনে পড়ে গতদিনের কথা।
ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত খাদ্য আসে, তার কতটা পায় দুর্গত মানুষগুলো? সবইতো রাতের আঁধারে হাওয়া হয়ে যায়। প্রভাবশালী চেয়ারম্যান মানু গোলদার স্থানীয় রাজনৈতিক পাতি নেতাদের হাত করে নিজস্ব বাহিনী দিয়ে সরিয়ে ফেলে সব। তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস এ অঞ্চলের কারো নেই। যে প্রতিবাদ করে তাকে হতে হয় গ্রাম ছাড়া নতুবা পৃথিবী ছাড়া।
গত দু’দিন মোজাম উদ্দিনের পরিবারের কারো মুখে দানা পানি পড়েনি। ছেলে-মেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকাতেই চোখে জল এসে যায় মোজাম উদ্দিনের। চার বছরের ছোট্ট মেয়েটা খিদের জ্বালায় কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে। বারো বছরের ছেলে অনন্ত খাটের কোনায় বসে খাবারের জন্যে মাকে জ্বালাতন করছে- “মা ভাত দেও, না খায়ে মরে গেলাম।”
রহিমা বেগম আঁচল দিয়ে বার বার চোখ মোছে। সন্তান দুটোর কথা ভাবলেই কলিজাটা চৌচির হয়ে যায় যেন। বেশ ক’দিন ধরে উপোষ আছে সেও। রিলিফের চাল যা দেয় তাতে ছেলে-মেয়ে দুটোর-ই একবেলা হয় না, নিজেরা খাবে কি? তাওতো সপ্তাহে দুইদিন।
ঘুমিয়ে থাকা মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে রহিমা বেগম বললো, “অনন্ত; বাপ আমার, দেখ দিঠি কেমন ঘ্বুমোচ্ছে। তুই এটটু ঘুমোতে চেষ্টা এর।”
“ঘুম যে আসে না মা। খিদে প্যাটে ঘুম আসে কহনও?”
আঁচল দিয়ে আবারো চোখ মোছে রহিমা বেগম। “চুপ এর বাপ।” বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে ছেলেকে।
“অনন্তর বাপ, তুমি এটটা কিছু এরো।” কান্নাজড়িত কণ্ঠে অসহায়ের মত স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলে রহিমা বেগম।
কখন থেকে মোজাম উদ্দিনের চোখের জল টপ টপ করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে তা সে নিজেও জানে না। প্রিয় বউটাকে কাঁদতে দেখে আরো বেশি কান্না পায় মোজাম উদ্দিনের।
“আমি কী এরবো কও? কেউ কাজে নিতি চায়না। গ্রামের সবারতো একই অবস্থা। রিলিফির চাল- গম যা আসতেছে তা এ শয়তান চেয়ারম্যান চড়া দামে বেচে দেচ্ছে।”
“কিডা প্রতিবাদ এরবে কও? যে প্রতিবাদ এরতি যায় তারেই চেয়ারম্যান চিরতরে দুনিয়ারতে সরায়ে দেয়।”
“তাই বলে চেয়ারম্যানের অত্যাচার এভাবে মুখ বুজে সহ্য এরলি গ্রাম সুদ্ধ না খায়ে মরতি হবে। তুমি এটটা কিছু এরো। ছুয়াল- মায়েতো না খায়ে মরে গ্যালো।”
“দেহি কী এরা যায়। রাতটা এটটু কষ্ট এরে থাহো।”
ভোর থেকে ছেলে- মেয়ে দুটো খিদের জ্বালায় কান্নাকাটি করছে। মোজাম উদ্দিন ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে, “অনন্ত এটটু সহ্য এর বাপ। আমি ইউনিয়ন পরিষদেরতে দেহি কিছু আনতি পারি কিনা।”
“একটু তাড়াতাড়ি আইসো।” রহিমা বেগম বললো।
“আমি যাবো আর আসপো।” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় মোজাম উদ্দিন।
বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তার পরে উঠতেই সামনে উপস্থিত হয় গ্রামের জনা পঞ্চাশেক ক্ষুধার্ত মানুষ।
“কিছু এটটা এরো মোজাম ভাই। আমরা যে না খায়ে মরে গ্যালাম।”
“শুধু কি তোমরা মরতিছো জব্বার, আমার ছুয়াল- মায়ে দুটোর মুহির দিক আমি তাকাতিই পারিনে।”
“মানু গোলদারের গুদোমে চাল- গম ভর্তি আর আমরা মরতিছি না খায়ে? এর এটটা বিহীত না এরলিতো না খায়ে মরে যাবো।” আবেদ মৃধার গলা থেকে বের হয় করুণসুরে কথাটি। তার কথার সাথে একমত পোষণ করে সবাই।
“তুমরা কী এরতি চাও?” মোজাম উদ্দিনের প্রশ্ন।
“আপনি যদি সাথে থাহেন তাহলি এই দুষ্টু চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এরতি পারি।”
মোজাম উদ্দিন গ্রামবাসীকে নিয়ে রওনা দেয় ইউনিয়ন পরিষদের দিকে। ক্ষুধায় কাতর সবাই। তারপরও চেয়ারম্যানের অবিচারের প্রতিবাদ করার জন্য ছুটছে উর্ধ্বগতিতে।
ইউনিয়ন পরিষদের দোর গোড়ায় আসতেই গ্রাম পুলিশ বাধা দেয়। বাধা উপেক্ষা করে সবাই ঢুকে পড়ে বাউণ্ডারীর মধ্যে।
সেই সকাল থেকে ট্রাকের চাল নামিয়ে গোডাউনে রাখা হচ্ছে। চেয়ারম্যান গোডাউনের সামনে চেয়ার পেতে বসে আছে।
মোজাম উদ্দিন দলবল নিয়ে এভাবে ইউনিয়ন পরিষদে ঢুকতেই চমকে ওঠে চেয়ারম্যান মানু গোলদার। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে।
“চেয়ারম্যান সাহেব, গ্রামের সবাই না খায়ে মরতি বয়ছে। আপনি যদি এটটু দয়া এরেন….।” মোজাম উদ্দিন বললো কথাটি।
“আমি কী এরতি পারি?”
“আপনি আমাগের কর্তা। আপনার হাতে এই ছিলুমবাড়িয়াবাসীর জীবন মরণ। আপনি চালি অনেক কিছুই এরতি পারেন। সরকারের দেওয়া চাল- গমেরতে আমাগের কিছু না দিলি আমরা যে মরে যাবো না খায়ে। ছোট ছোট ছুয়াল- মায়েরাতো মরতি বয়ছে।”
“সরকার দেচ্ছে!” খিচিয়ে ওঠে চেয়ারম্যান। “কোন চাল- গম হবে না। যা তোরা এখানেরতে, বিরক্ত এরিস না। যার টাহা আছে তারা বাড়িরতে টাহা নিয়ে আয়; চাল দিবানে।”
“টাহা পাবো কনে?”
“টাহা পাবি কনে তার আমি কি জানি? টাহা না থাকলি দাতে দড়ি দিয়ে মরগে।”
উপস্থিত গ্রামবাসীর মধ্য থেকে একজন বলে ওঠে, “আমাগের ন্যায্য অধিকার চাই। আমরা আর এ অত্যাচার সহ্য এরবো না। আমাগের জন্যি যে চাল- গম আসে তা চেয়ারম্যানরে কিছুতিই বেচতি দেবো না।”
কথাটি কে বললো সেকথা না ভেবে সবাই সমস্বরে চিল্লিয়ে ওঠে, “হ্যা, হ্যা; আমাগের অধিকার চাই। দিতি হবে।”
“কী বললি শয়তানের বাচ্চারা? ছুঁচোর দল। পাখা গজায়ছে তাই না? জুতো মারে সোজা এরে দেবো একদম।”
এতক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল মোজাম উদ্দিন। এমনিতে নিরীহ প্রকৃতির মানুষ সে। জুতা পেটা করার কথায় আর মুখ বুজে থাকতে পারে না। দু’পা এগিয়ে যায় চেয়ারম্যানের দিকে।
“চেয়ারম্যান সাহেব, মুখ সামলে কথা কন। আমরা গরীব বলে যা খুশি তাই কতি পারেন না।”
“যতবড় মুখ না তত বড় কথা!” মোজাম উদ্দিনের গালে কষে চড় বসিয়ে দেয় চেয়ারম্যান।
মোজাম উদ্দিনের গায়ে হাত তোলাতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে সবাই। চেয়ারম্যানকে মারতে উদ্যত হলে মোজাম উদ্দিন বলে ওঠে, “না; চেয়ারম্যানরে কিছু কওয়ার দরকার নেই। আমাগের প্রাপ্য আমাগেরই আদায় করে নিতি হবে।”
চেয়ারম্যান তার লাঠিয়াল বাহিনীকে নির্দেশ দিলে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষিপ্ত গ্রামবাসীর ওপর। দুই পক্ষের আহত হয় অনেকে। একপর্যায়ে চেয়ারম্যান দলবল নিয়ে পালিয়ে যায়।
রেহেনার সাথে একই স্কুলে পড়ে অনন্ত। বন্যার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুল গতকাল থেকে আবারো শুরু হয়েছে। স্কুলে যাবার পথে বেশ ক’দিন পরে দেখা দু’জনার।
“এই অনন্ত কেমন আছো?” রেহেনার জিজ্ঞাসা।
“এইতো বেশ আছি। তুমি?”
“ভাল। তোমারেতো অনেকদিন দেহিনা। এই কয়দিনে তুমি যে একদম শুকোয়ে গেছো।”
“আর শুকোয়ে যাওয়া। বন্যায় আমাগের সব শেষ হয়ে গেছে রেহেনা। খায়ে না খায়ে চলতেছে দিন। এ কষ্ট তুমি বুঝবা কি এরে? তুমরা বড়লোক। তাছাড়া শুনিছি তোমার বাপের সাথে আমাগের মারামারি হয়ছে। তোমার সাথে এভাবে কথা কতি দেখলি তোমার বাপ আর আস্ত রাখফেন নানে আমারে।” দু’জনে কথা বলতে বলতে স্কুলের দিকে যেতে থাকে। হঠাৎ সামনে উপস্থিত হয় চেয়ারম্যান।
চেয়ারম্যান অনন্তর মাথার চুল ধরে বলে, “এই ছোট লোকের বাচ্চা, আমার মায়ের সাথে কথা কওয়ার সাহস কনে পালি?” চেয়ারম্যান চড়- লাথি মারতে থাকে অনন্তর গায়ে। চেয়ারম্যানের সাথে থাকা একজন রেহেনাকে ধরে রাখে। রেহেনা নিজেকে মুক্ত করে অনন্তকে বাঁচাবার জন্যে অনেক চেষ্টা করেও পারে না।
“শোন ছোট লোকের বাচ্চা; আমার মায়ের সাথে কথা কওয়াতো দূরের কথা, এই পথ দিয়ে যদি আর কোনদিন স্কুলে যাস তালি একদম কবর দিয়ে দেবো।” রেহেনাকে টানতে টানতে বাড়ির দিকে নিয়ে যায় চেয়ারম্যান। অনন্ত আহত অবস্থায় পড়ে থাকে ধূলার ওপর।
সকালের অপমানের কথা ভোলেনি চেয়ারম্যান। মনে মনে পরিকল্পনা করে, মোজাম উদ্দিনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারলে গ্রামের কেউ তার বিরুদ্ধে আর কথা বলতে সাহস পাবে না। যে ভাবা, সেই কাজ। রাতে তার দলবল নিয়ে উপস্থিত হয় মোজাম উদ্দিনের বাড়িতে। ঘুম থেকে ডেকে তোলে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই চেয়ারম্যান নিজেই কুড়াল দিয়ে কোপ বসিয়ে দেয় মোজাম উদ্দিনের ঘাড়ে। পর পর বেশ কয়েকটি কোপ দেয় শরীরের বিভিন্ন স্থানে। রহিমা বেগম বাধা দিতে গেলে তাকেও অনুরূপ কোপ দেয়। দু’জনের মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে চেয়ারম্যান দলবল নিয়ে স্থান ত্যাগ করে।
অনন্ত এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল। বাবা- মায়ের গোঙানিতে জেগে দেখে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে মা- বাবা দু’জনেই। কেঁদে ওঠে অনন্ত। রক্তাক্ত দেহ দু’টির কাছে এগিয়ে যায়। মা রক্তাক্ত দেহ নিয়ে ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে।
“অনন্ত বাপ আমার।” মোজাম উদ্দিন ছেলেকে ডেকে ওঠে।
কথাটি অস্পষ্ট হলেও কানে যেন সাউণ্ড বক্স হয়ে বাজে অনন্তর।
“বাবা।” অনন্তর কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বাবার মাথার কাছে এগিয়ে যায়। বাবার গলার অর্ধেকটা কাটা। দেখলে গা শিউরে ওঠে।
“কিডা তুমাগের মারেছে?” কান্নাজড়িত কণ্ঠে অনন্তর জিজ্ঞাসা।
মোজাম উদ্দিন অনেক কষ্টে শুধু বললো, “চেয়ারম্যান।” তারপর সব শেষ। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মোজাম উদ্দিন।
বাবা- মায়ের অবস্থা দেখে খুকু কাঁদছে গলা ছেড়ে। ঘুমন্ত গ্রামবাসীর ঘুম ভেঙ্গে যায় এই নারকীয় তাগুবে। তারা এসে জড়ো হয় ঘটনাস্থলে। কেউ কেউ শান্ত্বনা দেয় এই এতিম ভাই- বোনকে।
অনন্ত উঠে দাঁড়ায়। চালের বাতায় গোজা দা পেড়ে শক্ত করে ধরে হাতের মুঠোয়। ঘর থেকে বের হয়ে দৌঁড়াতে থাকে চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে। আজ সকালে চেয়ারম্যান তাকে খুব মেরেছে। গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। এই শরীরের ব্যথা-ই তাকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। জেগে থাকলে তখনই চেয়ারম্যানকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিত; মনে মনে ভাবে।
বাবা- মায়ের মৃত্যুতে নিজের শরীরের কথা ভুলে গেছে অনন্ত। চেয়ারম্যানকে হত্যা করা তার চাই-ই চাই।
দা হাতে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই চেয়ারম্যানের লোকজন অনন্তকে ধরে চড়- লাথি মারতে থাকে। দশ-বারো বছরের ছেলে পারবে কেন হাতির মতো এই মানুষগুলোর সাথে।
পুলিশের হাতে তুলে দেয় অনন্তকে। চেয়ারম্যান পুলিশের কাছে বলে, “এইটুকু ছেলে তার বাবা-মাকে হত্যা করেছে! আমি প্রতিবাদ করাতে আমাকেও খুন করতে চেয়েছে!”
পিতা- মাতাকে হত্যা করার অপরাধে অনন্তর জেল হয় বারো বছর। জেলের ভেতরে দিন মোটেও কাটতে চায়না। মনে পড়ে বাবা- মায়ের মৃত্যুর সেই বিভৎস দৃশ্যগুলি। মনে পড়ে ছোট বোন দিঠি আর খেলার সাথী রেহেনার কথা।
ছোট বোনটা এখন কেমন আছে, কী খাচ্ছে কিছুই জানেনা সে। তার এই পরিণতির জন্যে মানু গোলদারই দায়ী। ওকে খুন করতে যেয়েও পারেনি সে। জেল থেকে বের হয়ে আগে চেয়ারম্যানকে খুন করবে তারপর অন্য কাজ। মনে মনে সংকল্প করে অনন্ত।
জেলখানায় পরিচয় হয় হাত কাটা মালেকের সাথে অনন্তর। হাত কাটা মালেক চরমপন্থী দলের অঞ্চল প্রধান। অনন্তর সব কথা শুনে তাদের দলে নেবার আশ্বাস দেয়। তার বাবা- মাকে হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্যে সার্বিক সহযোগিতার করবে তারা।
একে একে বারো বছর জেল খেটে বের হয় অনন্ত, প্রথমে দেখা করে হাত কাটা মালেকের সাথে। কী ভয়ংকর ব্যাপার! চরমপন্থীদের আস্তানায় শুধু অস্ত্র আর অস্ত্র। অনন্ত ভয়ে ভয়ে চারিদিকে তাকায়। গা শিউরে ওঠে তার। এত অস্ত্র সে আগে কখনও দ্যাখেনি।
হাত কাটা মালেক পরম স্নেহভরে কাছে ডেকে নেয় অনন্তকে। একটি অস্ত্র তুলে দেয় তার হাতে। যেখানে অন্যায় দেখবে সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়। ক’দিন প্রশিক্ষণ নিতে হয় এই দলে।
রণ সাজে সজ্জিত হয়ে দীর্ঘদিন পরে ছিলুমবাড়িয়া গ্রামে পা রাখে অনন্ত। ঘন অন্ধকারে ঢাকা রাত। ঝিঁঝিঁ পোকারা উৎসবে মেতেছে যেন। শেয়ালগুলোর করুণ আর্তি কানে আসে দূর থেকে।
প্রথমে নিজেদের বাড়িতে আসে। ছোট বোনকে ডাকে- দিঠি। কোন উত্তর আসে না। আবারো ডাক দেয়- দিঠি। একবার- দুইবার- তিনবার। কোন সাড়া শব্দ নেই। বেশ কিছুক্ষণ পরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে একজন বয়স্ক মহিলা।
“কেগো বাপ তুমি?” অনন্তকে জিজ্ঞাসা করে সে।
“দিঠি কোথায়?”
“মোজামের মায়ের কথা কচ্ছো?”
“হ্যা, হ্যা; মোজামের মেয়ের কথা বলছি। কোথায় ও?”
“তুমি কিছু শোননাই?”
“কি হয়েছে আমার দিঠির?”
“মানু গোলদারের লোকেরা দিঠিরে নষ্ট এরিছিলো। সেই লজ্জায় মাইয়াটা আত্মহত্যা এরিছিল; সেতো কবের কথা।”
চোখ ছল ছল করে ওঠে অনন্তর। “আমি মানু গোলদারকে ছাড়বো না।” চিৎকার করে ওঠে অনন্ত।
“তুমি কিডা বাপ?” অনন্তর দিকে কৌতুহল চোখে এগিয়ে আসে মহিলা।
চোখ মুছতে মুছতে বলে, “আমি অনন্ত।”
“অনন্ত! তুই আমারে চিন্তি পারলিনে বাপ? আমি তোর কাজল ফুপু।”
“কাজল ফুপু!” আরো জোরে কেঁদে ওঠে অনন্ত। চোখের অব্যহত জল মুছতে মুছতে বলে, “তুমি অপেক্ষা করো ফুপু, আমি মানু গোলদারকে খুন না করে তোমার সাথে আর কোন কথা বলছিনা।”
“তারে পাবি কনে? সেতো ম্যালাদিন হয়ে গ্যালো শহরে চলে গেছে।”
“শহরের কোথায় থাকবে সে, আমি তাকে খুঁজে বের করবোই।”
অল্প ক’দিনেই চরমপন্থী অনন্তর নাম সারা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে সাধারণ সন্ত্রাসীরা। শহরে যেখানেই অন্যায়-অপরাধ, সেখানেই অনন্তর উপস্থিতি। খুন করতে তার একটুও হাত কাঁপে না। মানুষ খুন করা তার মামুলী ব্যাপার। সংবাদপত্রগুলো অনন্তর বিরুদ্ধে লিখছে প্রতিনিয়ত- “এমন ভয়ংকর সন্ত্রাসী দেশে এর আগে আর জন্মায়নি। সাধারণ সন্ত্রাসীরা তার ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছে” ইত্যাদি ইত্যাদি।
দেশের অবস্থা আসলে এরকমই। মায়েরা তাদের বাচ্চাদের ঘুম পড়ানোর জন্যে ঘুম পড়ানির গান না শুনিয়ে বলে- “ঐ যে অনন্ত আসছে!” ব্যাস চুপ। বাচ্চাটির ঘুম না আসলেও অনন্তর ভয়ে চোখ বুজে ঘুমের ভান করে। টেলিভিশন- রেডিওতে বার বার ঘোষণা দিচ্ছে- সন্ত্রাসী অনন্তকে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে অনন্তকে। আর সে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে একের পর খুন করে চলেছে।
কারওয়ান বাজারের দোকানীরা হঠাৎ দোকানের ষাটার বন্ধ করার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা মাসিক চাঁদা আদায় করার জন্যে এসেছে। ভীত সন্ত্রস্ত সবাই দিক- বিদিক ছুটাছুটি করছে।
বাজারের ভেতর দিয়ে যাবার সময় একটি মেয়ের গতিরোধ করে সন্ত্রাসীরা। হাতে থাকা ব্যাগ আর গলার চেইন ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করে। মেয়েটি চিৎকার করতে থাকে অথচ তার চিত্কার যেন কেউ শুনছেই না।
সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি করছে শুনে ছুটে আসে অনন্ত। দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সন্ত্রাসীদের ওপর। ঠিক যেন ফ্লিমের মত।
চরমপন্থীদের সবার হাতে অস্ত্র। সন্ত্রাসীদের দলের তিনজন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে মাটিতে। বাকী দু’জন বন্ধী হয় চরমপন্থীদের হাতে। অনন্ত ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তাদের দিকে।
“তোরা ভাল করেই জানিস, জোর করে কিছু করা আমি একদম পছন্দ করি না। তারপরও মেয়ে মানুষের গায়ে হাত। তোদের মৃত্যু অনিবার্য।” অনন্তর দৃঢ় বক্তব্য।
“আমাদের এবারের মতো ক্ষমা করে দেন, আর কোনদিন এ কাজ করবো না।”
“কোন ক্ষমা নেই।” এক এক করে দু’জনের মাথায় গুলি করে স্থান ত্যাগ করার জন্যে পা বাড়ায় চরমপন্থী দলের কমাণ্ডার অনন্ত আর তার সঙ্গীরা।
মেয়েটি এতক্ষণ পাশের একটি দোকানের কোনায় লুকিয়ে ছিল। নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না তার। নিজের বিপদের সময় এমন একজন মানুষরূপী ভয়ঙ্কর দেবতার আবির্ভাব ঘটবে সেকথা কল্পনাও করেনি কোনদিন। পাঁচ পাঁচটি জলজ্যান্ত মানুষকে এভাবে হত্যা করতে একটুও হাত কাঁপেনি মানুষটার। নিজের মনে বলে ওঠে, “এও কী সম্ভব! কে এই মানুষটা?” ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে আসে মেয়েটা।
“শুনুন।” অনন্তকে উদ্দেশ্য করে বলে মেয়েটি। ভয়ে ভয়ে কথাটি বললেও মনে প্রচণ্ড জোর তার।
অনন্ত ফিরে দাঁড়িয়ে বললো, “আপনার আর কোন ভয় নেই। যান বাড়ি যান।”
“আপনার হাত দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।”
হাত ঘুরিয়ে জখম স্থান দেখে অনন্ত।
“আপনার হাতে ওটা কিসের দাগ?” বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে মেয়েটা।
“আপনার জেনে কোন লাভ নেই।” গম্ভীর উত্তর অনন্তর।
“এই যে আপনি আমার ইজ্জত রক্ষা করলেন, এখানে আপনার কী লাভ হয়েছে?”
স্কুলে যাবার পথে রেহেনার সাথে কথা না বলায় হাতে কামড় দিয়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছিল রেহেনা। ব্যথায় অনন্ত কেঁদে উঠলেও পরোক্ষণে রেহেনাকে বলেছিল, “আমি যদি কোনদিন তোমার থেকে দূরে হারিয়ে যাই তখন আমার হাতে তোমার কামড়ের দাগ দেখে চিনে নিও।” সে দাগ এখনও ওঠেনি।
মেয়েটার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললো, “আপনি যান; আমাকে আমার কাজ করতে দিন। একজন কুখ্যাত খুনীর সাথে কোন ভদ্র মহিলার কথা বলা মানায় না। আর হ্যা; যদি আবার বিপদে পড়েন তবে এই অনন্তকে স্বরণ করবেন। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো আপনার বিপদে এগিয়ে আসতে।”
“অনন্ত!” বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে মেয়েটার। যে অনন্তর নাম সারা মানুষের মুখে মুখে, যার নাম শুনলে ভয়ে কেপে ওঠে আত্মা- সমস্ত দেশ, সেই চরমপন্থী অনন্ত! নিজেকে কেন যেন বিশ্বাস হতে চায় না। একি স্বপ্ন না সত্যি?
ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে মেয়েটার। গ্রামের এক সহজ সরল ছেলে ছিল তার বন্ধু। নাম অনন্ত। রাগ করে একদিন গায়ের জোরে তার হাতে কামড় দিয়েছিল। চরমপন্থী অনন্তর হাতের সেই একই স্থানে কামড়ের দাগ। তবে কি সেই গ্রামের সহজ-সরল অনন্ত আজকের চরমপন্থী- খুনী অনন্ত? যাকে সে ছেলেবেলায় মন প্রাণ সব দিয়েছিল, যাকে আজও মনে মনে খুঁজে বেড়ায়, সেই অনন্ত কি আজকের এই অনন্ত? মনের মাঝে হাজার প্রশ্নের উদয় হয় মেয়েটার।
অনন্ত স্থান ত্যাগ করার জন্যে পা বাড়ায়।
“দাঁড়াও অনন্ত।” মেয়েটার স্বাভাবিক কণ্ঠ।
পেছন ফিরে দাঁড়ায় অনন্ত। চোখে মুখে বিস্ময়ের ছাপ তার। অনেকদিন পরে যেন আপন কেউ ডাক দিলো পেছন থেকে।
অনন্ত কোন কথা বলে না। নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে, ”মেয়েটার সাহসতো কম নয়, অনন্তর সাথে আপন জনের মতো কথা বলছে একদম তুমি আমিতে!”
“কেমন আছো অনন্ত?” আবারো মেয়েটার প্রশ্ন।
“এইতো বেশ আছি।”
আসলেই চরমপন্থী অনন্তই তার খেলার সাথী মেয়েটির বুঝতে বাকী থাকে না। আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে সে।
“আমাকে চিনতে পারছো না অনন্ত?”
“আমি কিচ্ছু চিনি না, কাউকেই চিনি না।”
“আমি রেহেনা। তোমার খেলার সাথী রেহেনা। সেই ছিলুমবাড়িয়ার রেহেনা।”
এই নিষিদ্ধ জীবন নিয়ে রেহেনাকে তার পরিচয় দেওয়া ঠিক হবে না ভেবে বললো, “রেহেনা! আমি কোন রেহেনাকে চিনিনা।” অথচ রেহেনার কথা- সেই ছেলেবেলার দিনগুলি মনের মাঝে উঁকি দেয় যখন তখন। নিজেকে অনেক কষ্টে সংবরণ করে বললো, “আপনি ভুল করছেন। আমি আপনার খেলার সাথী অনন্ত নই। আমি খুনী- চরমপন্থী অনন্ত।”
“যদি তাই হয় তবে তোমার হাতের…………।” কথাটা শেষ না হতেই স্থান ত্যাগ করে অনন্ত আর তার দল।
রেহেনা বুঝতে পারে না কেন অনন্ত তার সাথে এমন করলো। কেন তাকে চিনেও না চেনার ভান করলো। তবে কি অনন্ত তাকে ভুলে গেছে? ভাবতেই চোখে জল এসে যায় তার। ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ মোছে। অনেক খোঁজাখুজির পরে পেয়েও সে চলে গেল, চিনলোনা তার রেহেনাকে। অনন্ত তার রেহেনাকে একদিন না একদিন চিনবেই। দৃঢ় বিশ্বাস রেহেনার।
অন্ধকার জীবনের জন্যে যে দায়ী সেই মানু গোলদারকে আজ সন্ধ্যায় খুন করেছে নিজের হাতেই অনন্ত। এই মানু গোলদারকে খুঁজে পেতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়েছে তাকে। তবুও সান্ত্বনা- সমস্ত পরিশ্রম সার্থক আজ। এখন আর নিজের মৃত্যুতে ভয় নেই কোন।
নিজের জীবনের ওপর থেকে মায়া উঠে গেছে অনেক আগেই। তারপরও আজ নিজেকে হালকা মনে হয় খুব। ইচ্ছে হয় খোলা আকাশের নিচে একা একা কিছু সময় হাঁটতে। মনের বিরুদ্ধে কিছু করে না অনন্ত। হাঁটতে বের হয়। এ গলি সে গলি পার হয়ে খোলা একখণ্ড জমিনের ওপর দাঁড়িয়ে আকাশের তারা গুনতে থাকে আপন মনে। কী নিশ্চিন্তে দিন কাটে তারাদের। মনে মনে ভাবে অনন্ত।
গভীর রাত। নিস্তব্ধ চারিদিক। ঘুমে অচেতন পুরো ঢাকা শহর। সকল নিস্তব্ধতা ভেদ করে পরপর তিনটি শব্দ হয় গুডুম- গুড়ুম -গুডুম। ঘুমন্ত শহরটা জেগে ওঠে মুহূর্তে। সবার ধারণা কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে, কেন হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারে না কেউ।
কাকডাকা ভোরে শহরটা আবারো জেগে ওঠে পুরোনো নিয়মে। শুধু খোলা আকাশের নিচে রক্তাক্ত দেহ নিয়ে ঘুমিয়ে থাকা চরমপন্থী অনন্ত জাগে না। আর কোনদিন জাগবে কিনা সে কথা ইতিহাস জানে কি?