দ্বিতীয় স্বাধীনতা-পরবর্তী ঐতিহাসিক মোড়: সম্ভাবনা ও সতর্কতা

শিবলী সোহায়েল: বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় স্বাধীনতা-পরবর্তী এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, শ্রাবণ মাসের এক বর্ষণমুখর দিন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বা ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে লেখা হয়ে গেলো। এই বিপ্লব দেড় দশকের এক ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা কি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন? নাকি এই বিপ্লবের প্রাণসত্তা বা স্পিরিট আমাদের শত শত বছরের সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ?

আজকের আলোচনায় প্রথমেই আমরা দেখব জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট কীভাবে আমাদের ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। এই লড়াই আমাদের ভূখণ্ডের হারানো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারেরই লড়াই। আমরা আরও আলোচনা করব এই স্পিরিট ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিপ্লব-পরবর্তী অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য কী প্রত্যাশা বা সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

জুলাই বিপ্লবের মূল সুর (স্পিরিট):

  • বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্য (Equity)
  • ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র (Democracy)
  • আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব (Sovereignty)
  • অবিচারের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার (Justice)
  • সকলের জন্য মানবিক মর্যাদা (Human Dignity)

অনেকেই এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা করেন যে, চব্বিশের এই লড়াই একাত্তরের স্পিরিটকে মুছে ফেলার চেষ্টা। এটি মূলত ফ্যাসিবাদেরই পুরোনো বয়ান। প্রকৃতপক্ষে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা একই বিন্দুতে মিলিত। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও স্পষ্টভাবে তিনটি মৌলিক অঙ্গীকার করা হয়েছিল: সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। আজকের বিপ্লব সেই দীর্ঘ সংগ্রামেরই এক অনিবার্য ধারাবাহিকতা।

এই স্পিরিট ও আকাঙ্ক্ষার লড়াই বাংলাদেশের মাটিতে নতুন নয়, বরং এটি শত শত বছর ধরে চলে আসা সংগ্রামেরই এক জোরালো প্রতিধ্বনি। জুলাই বিপ্লবকে আমরা যখন ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বলি, তখন তা কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক দলিল।

১৮১৮ সালের হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন ছিল মূলত ঔপনিবেশিক শক্তির মদতপুষ্ট শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক সাহসী সংগ্রাম। এটি কেবল ধর্মীয় সংস্কার ছিল না। বরং জমিদার ও নীলকরদের অন্যায় কর (আবওয়াব) এবং শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ। ঠিক একইভাবে, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল কোটা বৈষম্য এবং দীর্ঘদিনের চরম অর্থনৈতিক লুটপাটের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। দুই শতকের ব্যবধানে ঘটা এই দুই আন্দোলনের মূল সুরটি একই। অর্থাৎ দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার (Economic Justice) প্রতিষ্ঠা করা।

একইভাবে, ১৮৩১ সালে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার লড়াই ছিল স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশদের সম্মিলিত শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রতিরোধ। জুলাই বিপ্লবের স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অংশগ্রহণ সেই একই ঐতিহাসিক সাহস এবং নিপীড়কের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতিফলন। এই সংগ্রাম আরও বৃহত্তর রূপ নেয় ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে, যা ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক ও বেসামরিক মানুষের প্রথম বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। জুলাই বিপ্লবের মতো এটিও ছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের এক সম্মিলিত বিস্ফোরণ।

এর পরের সংগ্রামগুলো, যেমন ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনও ছিল  সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অধিকার, বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও মানবিক মর্যাদার দাবিতেই। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি মোড়ে এই ভুখন্ডের মানুষের মূল দাবি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র। জুলাই বিপ্লব মূলত এই সব আকাঙ্ক্ষার এক নতুন যোগফল। এটি প্রমাণ করে যে, এ দেশের মানুষ বারবার রক্ত দিলেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সাম্য ও ন্যায়বিচার ছাড়া আর কিছু মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।

এই ভূখণ্ডের আজকের লড়াই মূলত তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। আজ আমরা তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র একটি দেশ। কিন্তু ১৩৪৫ সালে বিশ্বভ্রমণকারী ইবনে বতুতা যখন এই বাংলায় পা রাখেন, তিনি এখানকার অভূতপূর্ব প্রাচুর্য দেখে বিমোহিত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাকে বর্ণনা করেছিলেন ‘দোজখ-ই-পুর নিয়ামত’ (প্রাচুর্যপূর্ণ দোযখ) হিসেবে। মরক্কোর শুষ্ক জলবায়ু থেকে আসা বতুতার কাছে বাংলার আর্দ্র গরম ‘দোজখ’ মনে হলেও এখানকার উন্নত মানের ও স্বল্পমূল্যের খাদ্যপণ্য দেখে তিনি একে আল্লাহর অপার নেয়ামত মনে করেছিলেন।

বাংলার এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির শুরুটা হয়েছিল মূলত সুলতানি আমলে এবং তা বৃটিশ দখলের আগ পর্যন্ত  অক্ষুণ্ণ ছিল। সম্রাট আওরঙ্গজেব সুবাহ বাংলাকে বলতেন ‘জন্নাতুল বিলাদ’ বা দেশসমূহের স্বর্গ। বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদ ইউভাল নোয়াহ হারিরি তাঁর ‘সেপিয়েন্স’ বইয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগের ঊষালগ্নেও বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৮০ শতাংশ উৎপাদন হতো এশিয়ায়, যার প্রধান উৎস ছিল এই বাংলা। ইতিহাসবিদ সুরজিৎ দাশগুপ্ত ও জয়া চ্যাটার্জি দেখিয়েছেন, বাংলা কীভাবে কেবল একটি অঞ্চল নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী ধমনী হিসেবে কাজ করত।  বাংলার এই সমৃদ্ধির মূলে ছিল তার অভ্যন্তরীণ কৃষি ও শিল্পের এক অনন্য ভারসাম্য এবং কেন্দ্রীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত থাকার সক্ষমতা। যখনই বাংলা তার নিজস্ব শক্তিতে পরিচালিত হয়েছে, তখনই সে বিশ্বের সমৃদ্ধতম অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।।

কিন্তু ১৭৫৭ সালের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লুণ্ঠন এই সমৃদ্ধির চাকা থামিয়ে দেয়। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পল তাঁর ‘দ্য অ্যানার্কি’ বইয়ে প্রমাণ করেছেন, বাংলা থেকে লুণ্ঠিত সম্পদই ছিল ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবের প্রধান জ্বালানি। অর্থাৎ, আমাদের দারিদ্র্যের ওপরেই দাঁড়িয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিক ঐশ্বর্য। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়, যখনই বাংলা কোনো বহিঃশক্তির আধিপত্যবাদের (Hegemony) শিকার হয়েছে, তখনই তার সম্ভাবনা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

আমাদের আজকের লড়াই তাই এই লুট হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সক্ষমতাকে পুনরুদ্ধারের লড়াই।  আজ আমাদের সামনে এক অভূতপূর্ব সুযোগ। এটি কাজে লাগাতে তিনটি বৈশ্বিক মডেল আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:

১. প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও মেরিটোক্রেসি (সিঙ্গাপুর মডেল): সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ যখন ক্ষমতা নেন, দেশটি ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, সম্পদ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সততাই উন্নয়নের চাবিকাঠি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিমুক্ত করা ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। জুলাই বিপ্লবের শিক্ষার্থীরা যে ‘মেধাভিত্তিক’ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে, সিঙ্গাপুর মডেলটি তারই সফল বাস্তবায়ন।

২. জাতীয় পুনর্মিলন ও দায়বদ্ধতা (দক্ষিণ আফ্রিকা মডেল): রাষ্ট্র পুনর্গঠনে আমাদের দ্বিতীয় মডেল হতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকার Truth and Reconciliation Commission (TRC)। অনেকে মনে করেন, পুনর্মিলন মানেই অপরাধীদের ক্ষমা করে দেওয়া—কিন্তু বাস্তবতা এর উল্টো। ম্যান্ডেলার এই মডেলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়বিচারের সাথে সত্যের মেলবন্ধন ঘটানো। বাংলাদেশে গত ১৫ বছরের গুম, খুন এবং ‘আয়নাঘরে’র যে লোমহর্ষক ইতিহাস তৈরি হয়েছে, তার প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে TRC-এর মতো একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম অপরিহার্য। এর কার্যকারিতা দুটি প্রধান জায়গায়: আসল অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও সত্যের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ইনসাফ কায়েম করা। বিচার যেন কেবল রাজনৈতিক প্রতিশোধ না হয়, বরং তা যেন হয় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ—যাতে অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে।

৩. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (জার্মানি ও তিউনিসিয়ার শিক্ষা): বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই ‘উইনার টেকস অল’ (Winner Takes All) ব্যবস্থার কারণে বড় দলগুলো স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। এখানে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি, যাতে সব দলের ভোটের প্রতিফলন সংসদে থাকে। এটি ছোট দলগুলোকে জাতীয় রাজনীতিতে অংশীদার করবে এবং একক দলের আধিপত্য কমাবে।

তবে এখানে ঝুঁকিও আছে। তিউনিসিয়ার উদাহরণ থেকে আমাদের শিখতে হবে। ২০১১-র বিপ্লবের পর তিউনিসিয়ায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু হলেও দলগুলোর মধ্যে কোন্দল এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। অর্থনৈতিক দুর্দশা না কমলে এই PR ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আবারও কোনো কর্তৃত্ববাদী নেতার উত্থান ঘটতে পারে। যেমনটি ২০২১ সালে তিউনিসিয়ায় ঘটেছে। তাই PR ব্যবস্থার পাশাপাশি মজবুত সাংবিধানিক রক্ষা কবচ এবং দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার অপরিহার্য।

সুযোগ যেমন আছে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে কিছু গভীর বিপদের সংকেতও আজ স্পষ্ট। বাংলাদেশের জন্য তিউনিসিয়া ও সার্বিয়ার ইতিহাস এখন এক বড় সতর্কবার্তা।

১. অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও স্বৈরাচারের উত্থান (তিউনিসিয়া):

২০১১ সালে আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। তারা একটি সফল বিপ্লবের পর অত্যন্ত প্রগতিশীল সংবিধান গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাদের বড় ভুল ছিল, বিপ্লব-পরবর্তী সরকারগুলো রাজনৈতিক সংস্কারে মগ্ন থাকলেও দেশের অর্থনৈতিক সংকট (মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও দুর্নীতি) সমাধানে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।

এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। এই জনঅসন্তোষের সুযোগ নিয়ে ২০২১ সালে কাইস সাঈদ নামক একজন ‘পপুলিস্ট’ নেতা ক্ষমতায় এসে সংসদ ভেঙে দেন এবং বিচার বিভাগকে কবজা করে পুনরায় একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা: যদি আমাদের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্রুত সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক কষ্টের (দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান) সমাধান করতে না পারে, তবে মানুষ আবারও কোনো ‘শক্তিশালী একনায়ক’-এর অপেক্ষায় থাকবে, যা গণতন্ত্রকে চিরতরে সমাহিত করতে পারে।

২. পারস্পরিক কোন্দল ও ডিপ ষ্টেটের প্রত্যাবর্তন (সার্বিয়া):

২০০০ সালে সার্বিয়ার ছাত্র-জনতা আন্দোলনের মাধ্যমে কুখ্যাত স্বৈরাচার স্লোবোদান মিলোশেভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। কিন্তু বিপ্লবের পরপরই বিজয়ী জোটের দলগুলোর মধ্যে চরম ক্ষমতার দ্বন্দ ও আদর্শিক বিভাজন দেখা দেয়।

উদারপন্থী প্রধানমন্ত্রী জোরান জিনজিচ যখন রাষ্ট্রকে আমূল সংস্কার ও ইউরোপীয় ধারায় পুনর্গঠন করতে চাইলেন, তখন প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা পুরোনো ডিপ ষ্টেট এবং উগ্রপন্থীরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয়। এর ফলে সার্বিয়ার সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে যায় এবং দেশটি দীর্ঘকাল রাজনৈতিক অস্থিরতার কবলে পড়ে।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা: জুলাই বিপ্লবের পর যদি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের চেয়ে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়ি এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদী শক্তি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। জাতীয় ঐক্যের অভাব বিপ্লবের অর্জনকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, বিপ্লব রক্ষা করা বিপ্লব করার চেয়েও কঠিন। তিউনিসিয়া আমাদের শেখায় যে গণতন্ত্রের পেট ভরতে হয় রুটি-রুজি দিয়ে। আর সার্বিয়া আমাদের শেখায় যে বিপ্লবী শক্তির অনৈক্যই প্রতিবিপ্লবের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

বাংলাদেশকেও আজ ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে এই খাদের কিনারা দিয়ে হাঁটতে হবে। একদিকে নিশ্চিত করতে হবে দ্রুত অর্থনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে বজায় রাখতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নূন্যতম জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতা।

(লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী একাডেমিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, সাউথ এশিয়ান পলিসি ইনিশিয়েটিভ)    

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *