আয়শা সাথী : বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে গেলে আর কেবল হতাশা নয়—এক ধরনের নৈতিক আতঙ্ক অনুভূত হয়। গণমাধ্যমের শিরোনাম, টেলিভিশন টকশোর বিতর্ক, সংসদের ভাষা এবং রাজপথের চিত্র—সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আদৌ একটি সত্যনিষ্ঠ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, নাকি পরিকল্পিতভাবে মিথ্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছি?
আজ সত্য আর নীতির মূল্য নির্ধারিত হয় ক্ষমতার নৈকট্যতা দিয়ে। যে সত্য ক্ষমতার পক্ষে, তা গ্রহণযোগ্য; আর যে সত্য প্রশ্ন তোলে, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রবিরোধী, ষড়যন্ত্র কিংবা গুজব। ফলে সত্য বলার সাহস যেমন কমছে, তেমনি মিথ্যা বলার ভয়ও বিলুপ্ত হচ্ছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক কোনো সংশোধন ঘটেনি। গণতন্ত্র বারবার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। পরপর কয়েকটি নাটকীয় নির্বাচন, নির্বাচন নিয়ে অনাস্থা, বিরোধী কণ্ঠের প্রতি অসহিষ্ণুতা, প্রশাসনের দলীয়করণ এবং মতপ্রকাশের সংকোচন—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র যেন নিয়ম নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালিত এক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে ভুল স্বীকার নয়, বরং ভুল আড়াল করাই এখন কৌশল। ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় ভুল পথেই হাঁটা হচ্ছে বছরের পর বছর—আর দিশা খোঁজার ভান করে সেই পথকেই আরও পোক্ত করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—যে পথে রাষ্ট্র নিজেই বিশ্বাস হারিয়েছে, সে পথেই কেন নাগরিককে হাঁটতে বাধ্য করা হচ্ছে? নীতির কথা, কিন্তু নীতিহীনতার শাসন, দূর্নীতির আতুরঘর তৈরি করে দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রোপাগাণ্ডার বাধ্যতামূলক অনুষঙ্গ। এখন দুর্নীতিই যেন রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচেয়ে কার্যকর অনানুষ্ঠানিক কাঠামো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতা থাকলে অভিযোগ গুরুত্বহীন, আর ক্ষমতার বাইরে থাকলেই অভিযোগ রাষ্ট্রীয় অপরাধে রূপ নেয়। বিচারব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় এখানে অপরাধ নয় বরং রাজনৈতিক পরিচয়ই বিচার নির্ধারণ করে। ন্যায়বিচার ব্যক্তি নয়, রাজনৈতিক অবস্থান দেখে। ফলে আইনের শাসন নয়, শাসনের আইনই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে যে দল যখনই ক্ষমতায় এসেছে মুখে ছিল তাদের দলীয় অনুকূলে শান্তির বুলি, অথচ সর্বত্র চর্চা চলেছে সংঘাতের রাজনীতির। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন—এই শব্দগুলো আজ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেই শান্তি ভিন্নমত দমন করে, বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করে এবং নাগরিক প্রশ্ন নিষিদ্ধ করে প্রতিষ্ঠিত হলে তা শান্তি নয়—নীরবতা মাত্র। আমাদের মনে রাখতে হবে যে নীরব সমাজ কখনোই শান্ত সমাজ নয়; বরং তা বিস্ফোরণের পূর্বলক্ষণ।
নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রাণ। অথচ আজ সেই নির্বাচনই নাগরিক আস্থার সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গা। নির্বাচন এখন উৎসব থেকে অনাস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি ভিন্নমত, অথচ ভিন্নমত এখানে অপরাধ। ভিন্নমত মানেই সন্দেহ, শত্রুতা কিংবা রাজনৈতিক অসততা। মতের অমিলকে প্রতিপক্ষতা নয়—রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু প্রশ্ন সহ্য করতে পারি না। মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে সংবিধানের উদ্ধৃতি দিই, অথচ সেই অধিকার চর্চা হলেই তা ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা’ বলে আখ্যায়িত হয়।
রাজনীতি এখন আর জনগণের কণ্ঠ শোনার জায়গা নয়—বরং জনগণকে নীরব রাখার কৌশলে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দীর্ঘস্থায়ী অসততা সমাজকেও সংক্রমিত করেছে। আজ নাগরিক আর রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না, রাষ্ট্রও নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখে। বাংলাদেশে এখন সাহায্যকে সন্দেহ, মানবিকতাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রতিবাদকে ষড়যন্ত্র ভাবার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
এই অবিশ্বাস রাষ্ট্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক অর্জন—কারণ বিশ্বাস ভাঙলে আইন দিয়ে রাষ্ট্র টেকে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই পরিস্থিতিকে আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি। ক্ষমতাধর দলগুলো থেকে প্রশ্ন না করাকে দেশপ্রেম, নীরবতাকে দায়িত্ববোধ এবং আপসহীনতাকে অপরাধ হিসেবে শেখানো হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো অন্যের ক্ষেত্রে নৈতিকতার কঠোর পাহারাদার, কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুবিধাবাদে অন্ধ। বাইরে রাষ্ট্রনীতি, ভেতরে ব্যক্তিস্বার্থ—এই দ্বিচারিতাই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে গভীর অসুখ। এই সংকট কোনো একক সরকার বা বিরোধী দলের নয়। এটি রাষ্ট্রচিন্তার সংকট, রাজনৈতিক নৈতিকতার বিপর্যয় এবং নাগরিক সাহসের ক্রমাবনতির প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন এখন কে ক্ষমতায়—তা নয়, প্রশ্ন হলো—
এই রাষ্ট্র কি সত্য সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে? গণতন্ত্রের কাঠামো কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে?
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা মূল্যায়ন করতে গেলে আর আবেগ নয়—প্রয়োজন নির্মম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস। রাজনৈতিক স্বার্থপরতার বেড়াজালে বর্তমানে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র চলছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। নির্বাচন, সংসদ, প্রশাসন ও গণমাধ্যম—যে চার স্তম্ভের ওপর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেই স্তম্ভগুলোর কার্যকারিতা নিয়েই আজ যে প্রশ্ন উঠে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল ও গণকল্যাণমুখী করতে যতো দ্রুত সম্ভব রাজনৈতিক দলগুলোকে এর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। পরবর্তী সরকারকে সফল ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে গনতান্ত্রিক শর্তসমূহের প্রতি হতে হবে আরো সহনশীল।