মোহাম্মদ আলম ফরিদ: অস্ট্রেলিয়া দিবসের আয়োজনগুলো প্রায়ই আমাদের অতীতের পরিচয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আমরা কী হয়ে উঠছি—সেটিও স্পষ্ট করে তোলে। এ বছরের রকডেলের রেড রোজ কমিউনিটি সেন্টারের অনুষ্ঠানটি কোনো একক বক্তৃতা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল কণ্ঠস্বরের এক বোনা নকশা, প্রবীণ, শিশু, শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ, সাংসদ ও একজন সিনেটর, যাঁদের প্রত্যেকেই অন্তর্ভুক্তি, দায়িত্ববোধ ও আশার বৃহত্তর গল্পে নিজেদের একটি সুতো জুড়ে দিয়েছেন।


সন্ধ্যার সূচনা হয় আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক এক ভিত্তির মাধ্যমে। মাওলানা ড. শাহ ফায়জুল্লাহ এর কুরআন তিলাওয়াতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় নবী ইবরাহিম (আ.)-এর মক্কার জন্য দোয়া এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনার জন্য প্রার্থনার কথা, যা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আমরা বাস করি, সেই স্থানের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করা ইসলামী ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত। এটি একটি যৌথ দায়িত্ববোধের সুর স্থাপন করে: যে ভূমি ও সমাজ আমাদের আশ্রয় দেয়, তার যত্ন নেওয়া।
সেই অনুভূতিই পরে প্রতিধ্বনিত হয় আঙ্কেল ডেভিড বেলের ‘ওয়েলকাম টু কান্ট্রি’-তে, যেখানে তিনি শান্ত মর্যাদার সঙ্গে সবাইকে স্বাগত জানান। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আবরিজিনাল জনগোষ্ঠী এই ভূমির প্রথম অভিভাবক হলেও, এই ভূমি কোনো একচেটিয়া দাবিতে আবদ্ধ নয়; এটি সবার জন্য, যারা একে নিজেদের ঘর বলে মনে করে।
এই স্বাগত বক্তব্যের পর পরিবেশ আরও গভীরতা পায় এক শক্তিশালী আবরিজিনাল সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে। ঐতিহ্যবাহী আচার ও ডিডজেরিডুর গভীর, অনুরণিত সুর ইতিহাস, ভূমি ও জীবন্ত সংস্কৃতিকে বর্তমান মুহূর্তে এনে দাঁড় করায়। এটি শুধু দেখার মতো কোনো পরিবেশনা ছিল না; বরং অনুভব করার মতো এক অভিজ্ঞতা যা মনে করিয়ে দেয়, এই দেশের গল্প প্রাচীন, চলমান এবং জীবন্ত।



নাচ ,গান বা অহেতুক মুরিব্বায়না ঢংয়ে বক্তব্য ছাড়াও যে একটি অনুষ্ঠান শতভাগ সফল ও সাফল্য মন্ডিত হতে পারে , সেটা গত ২৬ জানুয়ারি সোমবার ২০২৬ কমিউনিটি ইয়ুথ এন্ড সিটিজেন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ইনকের অনুষ্ঠান না দেখলে বুঝা যেত না। অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম ও বেড়ে উঠা ছোট্ট অস্ট্রেলিয়ানদের বক্তব্যে সকলেই বিমোহিত। নিচে সংক্ষিপ্ত ছোট্ট অস্ট্রেলিয়ানদের বক্তব্যের কিয়দাংশ তুলে ধরা হলো।
অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের চিন্তা, অনুভব ও বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে উঠেছে উপস্থিত অতিথি, অভিভাবক ও বিশিষ্টজনেরা। বয়সে তারা ছোট হলেও তাদের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে ইতিহাসবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্ন। অস্ট্রেলিয়া ডে উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিশু, কিশোর ও তরুণ বক্তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশ, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ও প্রাঞ্জল বক্তব্য তুলে ধরেন।

অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের চিন্তা, অনুভব ও বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে উঠেছে উপস্থিত অতিথি, অভিভাবক ও বিশিষ্টজনেরা। বয়সে তারা ছোট হলেও তাদের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে ইতিহাসবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্ন। অস্ট্রেলিয়া ডে উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিশু, কিশোর ও তরুণ বক্তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশ, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ও প্রাঞ্জল বক্তব্য তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই মোহাম্মদ আইমান শিহাদ মোল্লা (Year 6, বয়স ১২) তার বক্তব্যের সূচনা করেন দৃঢ় কন্ঠে- তিনি বলেন, “অস্ট্রেলিয়া তার কাছে কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি তার ঘর।” এখানেই তিনি নিজেকে নিরাপদ বোধ করেন, এখানেই তিনি গ্রহণযোগ্য, এবং এখানেই তার ভবিষ্যৎ অর্থপূর্ণ।
তিনি ফার্স্ট নেশনস জনগণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, এই ভূমির প্রকৃত ইতিহাস ও উত্তরাধিকারকে সম্মান করাই একজন দায়িত্বশীল অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকের প্রথম কর্তব্য। ভবিষ্যতের অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে তিনি সততা, সাহস, সহমর্মিতা ও ঐক্য বজায় রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একজন কিশোরের পরিণত মানসিকতা ও নেতৃত্বের সম্ভাবনা। সিনেটর ডেভ শর্মা বক্তব্য শেষে আইমানের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, আইমানের বক্তৃতা ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী । তিনি বলেন, তার বক্তব্যে তিনি একজন ভবিষ্যৎ অস্ট্রেলিয়ান নেতার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন।




এদিকে, আদিবাসী পারফরম্যান্স শিল্পী ডেভিডও আইমানের বক্তব্যে এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন যে তিনি নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। বক্তৃতা শেষে তিনি নিজেই এসে আয়মানের টেবিলে বসেন এবং বলেন, আয়মানের আত্মবিশ্বাসী অথচ হৃদয়ছোঁয়া বক্তব্যে তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক যত্নের প্রকাশ অনুভব করেছেন। তিনি আরও যোগ করেন, এত অল্প বয়সে একজন শিশুর পক্ষে একজন পরিণত মানুষের মতো এত গভীর ও অর্থবহ কথা বলা সত্যিই বিস্ময়কর।
এরপর মঞ্চে আসে সাফরিন জাহান সোহানা (Year 2, বয়স ৮)। শিশুসুলভ সরলতা ও নিষ্পাপ আবেগে সে বলে, অস্ট্রেলিয়ার নীল আকাশ, সবুজ উদ্যান আর সুন্দর সমুদ্রের জন্য সে কৃতজ্ঞ। ছোট্ট কণ্ঠে বড় স্বপ্ন নিয়ে সাফরিন জানায়—একদিন সে এই দেশটির জন্য কিছু ফিরিয়ে দিতে চায়। তার বক্তব্য উপস্থিত দর্শকদের আবেগতাড়িত করে তোলে।




অপরদিকে, এমপি অ্যাশ আম্বিহাইপাহার নৈশভোজ শেষে অনুষ্ঠানের কনিষ্ঠ বক্তা সাফরিন–এর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সাফরিনের বক্তব্যের ধারণচিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং অস্ট্রেলিয়া ডে উপলক্ষে আঁকা তার চিত্রকর্ম দেখে বিশেষভাবে মুগ্ধ হন। এ সময় তিনি সাফরিনের আকাঁ ছবির একটি ছবি তোলেন তার মুঠোফোনে এবং জানান, তিনি এই ছবিটি তরুণ অস্ট্রেলিয়ানদের সাফল্য তুলে ধরে একটি নোট সংযুক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাবেন।
মাদিয়া নোমান (Year 4) তার বক্তব্যে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ইতিহাসের প্রতি গভীর মনোযোগ দেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, আদিবাসী জনগণ ৬৫ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে গান, নাচ ও শিল্পকলার মাধ্যমে তাদের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণ করে আসছেন। তার বক্তব্য শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—এই ভূখণ্ডের ইতিহাস কতটা প্রাচীন, গভীর ও সমৃদ্ধ।




একজন সিনিয়র শিক্ষার্থী নাবিহা রাব্বী তার বক্তব্যে অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে জাতির অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সততা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা ছাড়া একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তার বক্তব্যে সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে সচেতন একজন তরুণ নাগরিকের পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
অনুষ্ঠানে ইতিহাসের সংবেদনশীল অধ্যায় তুলে ধরেন আদি করিম (Wongi Heritage, Western Sydney University)। তিনি বলেন, ১৭৮৮ সালে ফার্স্ট ফ্লিটের আগমন নতুন রাষ্ট্রের সূচনা হলেও আদিবাসী জনগণের জন্য তা ছিল ভূমি, সংস্কৃতি ও জীবনের ক্ষতির সূচনা। তার ভাষায়, ইতিহাসকে অস্বীকার নয়—বরং সত্যকে স্বীকার করাই প্রকৃত ঐক্য, পুনর্মিলন ও ন্যায়ের পথে প্রথম পদক্ষেপ।
সামাহ আবদুল্লাহ (Macquarie University) তার বক্তব্যে অস্ট্রেলিয়ার ভূ-প্রকৃতি ও মানুষের বৈচিত্র্যের মধ্যে গভীর সাদৃশ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যেমন এই দেশের ভূমি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়, তেমনি এখানকার মানুষও নানা সংস্কৃতি, ভাষা ও বিশ্বাসে সমৃদ্ধ। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ান সমাজের প্রকৃত শক্তি ও একাত্মতা নিহিত।



অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এনএসডব্লিউ-এর সিনেটর ডেভিড শর্মা। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রতি প্রতিশ্রুতি মানে মানুষের নিজস্ব পরিচয়, সংস্কৃতি বা বিশ্বাস মুছে ফেলা নয়। যারা এ দেশে আসে, তারা তাদের সম্পূর্ণ সত্তা নিয়েই আসে এবং অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। তরুণ বক্তাদের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, এই শিশু ও তরুণদের কণ্ঠে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানজুড়ে ছোট্ট অস্ট্রেলিয়ানদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তারা ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন, বৈচিত্র্যকে সম্মান করে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ, সহমর্মী ও ন্যায়ভিত্তিক অস্ট্রেলিয়া গড়ার স্বপ্ন লালন করে। উপস্থিত অতিথিদের মতে, এই প্রজন্মই আগামী দিনে অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক ও নৈতিক নেতৃত্বের মূল শক্তি হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানজুড়ে ছোট্ট অস্ট্রেলিয়ানদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারা ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন, বৈচিত্র্যকে সম্মান করে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ, সহমর্মী ও ন্যায়ভিত্তিক অস্ট্রেলিয়া গড়ার স্বপ্ন লালন করে। উপস্থিত অতিথিদের মতে, এই প্রজন্মই আগামী দিনে অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক ও নৈতিক নেতৃত্বের মূল শক্তি হয়ে উঠবে।

সমাপনী মন্তব্যে আবদুল্লাহ ইউসুফ (President, CYCDO) বলেন, সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, সবাইকে ধন্যবাদ। আমরা একত্রিত হয়েছি অস্ট্রেলিয়াকে উদযাপন, প্রতিফলন এবং সম্মান জানাতে। আমাদের পটভূমি বা ধর্ম যাই হোক না কেন, আমরা সবাই এক ছাতার তলে অস্ট্রেলিয়ান। আমি আন্তরিকভাবে National Australia Day Council, আমাদের অংশীদার, স্বেচ্ছাসেবক, এমসি, বক্তা এবং কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে ধন্যবাদ জানাই, যারা এই অনুষ্ঠান সফল করেছেন। আপনারা আজ এখানে উপস্থিত হয়ে ঐক্য এবং অন্তর্ভুক্তির ভাবকে সম্মান করেছেন। ধন্যবাদ, এবং শুভ অস্ট্রেলিয়া দিবস।
যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কেড়েছে, তা হলো তরুণ বক্তাদের আত্মবিশ্বাস, স্পষ্টতা ও নৈতিক দৃঢ়তা। এক ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়াকে কোনো বিমূর্ত স্লোগানে নয়, বরং নিরাপত্তা, গ্রহণযোগ্যতা ও সুযোগের বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরে। তার কথায় ছিল বয়সের চেয়েও বেশি পরিণত ভাব, বিশেষ করে যখন সে কৃতজ্ঞতাকে অহংকার নয়, বরং দায়িত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করে: দুর্বলদের রক্ষা করা, ফার্স্ট নেশনস জনগণের প্রতি সম্মান দেখানো, এবং সততা ও সহমর্মিতার সঙ্গে দেশের সেবা করা। এমন এক সময়ে, যখন জনপরিসরের আলোচনায় প্রায়ই পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়, তার বক্তৃতা নীরবে সেই সংশয় ভেঙে দেয়।




এরপর ছোটরা আসে তাদের সরল অথচ আন্তরিক ভাবনাগুলো নিয়ে: নীল আকাশ, সবুজ পার্ক, আর একদিন কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন। এই ছোট মুহূর্তগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এগুলো দেখিয়েছে, জাতীয় পরিচয় প্রথমে গড়ে ওঠে না রাজনীতি বা মতাদর্শ দিয়ে, বরং স্থান ও মানুষের প্রতি দৈনন্দিন ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। আরেক তরুণ বক্তা আদিবাসী ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরান, স্মরণ করিয়ে দেন, লিখিত ইতিহাসের অনেক আগেই গল্প বেঁচে ছিল গান, নাচ ও শিল্পের মাধ্যমে, পাথর, গাছের ছাল ও স্মৃতিতে খোদাই হয়ে। এটি ছিল নরম কিন্তু দৃঢ় এক ঘোষণা, অস্ট্রেলিয়ার গল্প ১৭৮৮ সালে শুরু হয়নি।
বক্তারা যত পরিণত হয়েছে, ভাবনাগুলো তত গভীর স্তর পেয়েছে। সিনিয়র শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা অস্ট্রেলিয়ার মূল শক্তি হিসেবে বৈচিত্র্যের কথা বলেছেন, এবং অস্ট্রেলিয়া দিবসকে একসঙ্গে উদযাপন ও আত্মসমালোচনার দিন হিসেবে তুলে ধরেছেন। একজন বক্তা সরাসরি জটিল বাস্তবতাটি তুলে ধরেন: আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের জন্য ফার্স্ট ফ্লিটের আগমন এক নতুন জাতির সূচনার পাশাপাশি ছিল গভীর ক্ষতির সূচনা। অন্যায়, নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া ভাষা ও ভূমি হারানোর স্বীকৃতি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে নয়, বরং প্রকৃত ঐক্যের জন্য প্রয়োজনীয় সততা হিসেবে উপস্থাপিত হয়।




রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি আলোচনায় আরেকটি মাত্রা যোগ করে। সিনেটরের বক্তব্যটি লক্ষণীয় ছিল তিনি কী দাবি করেননি, বরং কী নিশ্চিত করেছেন তার জন্য। তার যুক্তি ছিল, অস্ট্রেলিয়া মানুষকে এখানে অন্তর্ভুক্ত হতে তাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস বা পরিচয় মুছে ফেলতে বলে না। বরং দেশটি সমৃদ্ধ হয়েছে কারণ মানুষকে তাদের পূর্ণ সত্তা নিয়ে জাতীয় গল্পে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমন এক সময়ে, যখন বহুসংস্কৃতিবাদ প্রায়ই আত্মরক্ষামূলক ভঙ্গিতে আলোচিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গি আত্মবিশ্বাসী, উদার এবং নীরব আশাবাদে ভরপুর মনে হয়েছে।
সন্ধ্যার সমাপ্তি হয় কৃতজ্ঞতার ভাষায়—আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটি সদস্যদের প্রতি। তবে গভীর কৃতজ্ঞতা ছিল অস্ট্রেলিয়ার ধারণাটির প্রতিই, একটি যৌথ প্রকল্প হিসেবে। ধর্ম, বয়স ও পটভূমির পার্থক্য সত্ত্বেও একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল: অন্তর্ভুক্তি কোনো নিষ্ক্রিয় অবস্থা নয়। এটি বেঁচে থাকে সেবার মাধ্যমে, সম্মানের মাধ্যমে, এবং গর্ব ও বেদনা, উভয়কে একসঙ্গে ধারণ করার মানসিকতার মাধ্যমে।




অনুষ্ঠান শেষে যে অনুভূতিটি রয়ে যায়, তা কোনো একটি উদ্ধৃতি নয়; বরং একটি বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ গড়ে উঠছে স্কুল হল, কমিউনিটি সেন্টার ও যুব মঞ্চগুলোতে, যেখানে তরুণ অস্ট্রেলিয়ানরা দেশ ও পরিচয় নিয়ে সততা ও যত্নের সঙ্গে কথা বলতে শিখছে। এই কণ্ঠগুলো যদি কোনো ইঙ্গিত দেয়, তবে বলা যায়, এই জাতির গল্প, জটিল, অসম্পূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় হলেও, এখনো চিন্তাশীল হাতে রয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিদের জন্য খাবার পরিবেশন করার সময় কিছুটা সুযোগ হয়েছিল আংকেল ডেভিডের সঙ্গে কথা বলার। কথাবার্তাটি শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি যে ইতিহাসের কথা বললেন, তা কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, অস্ট্রেলিয়ার উপনিবেশিক ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষ্য।
ডেভিড বললেন, ইউরোপীয় সেটেলারদের আগমনের পর আদিবাসীদের সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ছিল না; এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ও কাঠামোগত গণহত্যা। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিংশ শতকের শুরু পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াজুড়ে হাজার হাজার আদিবাসী মানুষ হত্যা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ওপর “ভার্মিন” বা বন্য প্রাণীর মতো শিকারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বন্দুক, বিষ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো রোগ, সবই ব্যবহৃত হয়েছে জনসংখ্যা কমিয়ে আনার অস্ত্র হিসেবে।




ডেভিড বললেন, বহু এলাকায় সেটেলাররা আদিবাসীদের খাবার ও পানির উৎসে বিষ মিশিয়ে দিত। গবেষণায় দেখা যায়, ইউরোপীয়রা গুটিবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য রোগ ছড়িয়ে দিয়েছিল, ইচ্ছাকৃত হোক বা অবহেলায়, যার বিরুদ্ধে আদিবাসীদের কোনো প্রতিরোধক্ষমতা ছিল না। এর ফলে বহু এলাকায় সম্পূর্ণ জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু শারীরিক হত্যার চেয়েও ভয়ংকর ছিল সাংস্কৃতিক ও মানসিক ধ্বংস—যার সবচেয়ে নির্মম অধ্যায় হলো স্টোলেন জেনারেশন।
প্রায় ১৯১০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে সরকারী নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার আদিবাসী শিশুকে জোর করে তাদের পরিবার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল “অ্যাসিমিলেশন” অর্থাৎ কালো পরিচয় মুছে ফেলে তাদের সাদা সমাজে বিলীন করে দেওয়া। শিশুদের পাঠানো হতো তথাকথিত মিশনারি বা চিলড্রেনস হোম-এ, যা বাস্তবে ছিল শাসন, শাস্তি ও পরিচয়হীনতার ক্যাম্প।
ডেভিডের কথা শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ে যায় স্টোলেন জেনারেশন-এর তিন বোনের একটি বহুল আলোচিত গল্পের কথা—যা আজ আদিবাসী ইতিহাসে প্রতীক হয়ে আছে।




এক সকালে খুব অল্প বয়সে তাদের মায়ের কাছ থেকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়। মা চিৎকার করেছিলেন, কেঁদেছিলেন—কিন্তু আইন তার পক্ষে ছিল না। তিন বোনকে তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়, যেন তারা একে অপরের ভাষা, স্মৃতি এমনকি অস্তিত্বও ভুলে যায়।
তাদের একজনকে পাঠানো হয় গৃহকর্ম শেখাতে, আরেকজনকে কৃষিশ্রমে, আর তৃতীয়জনকে ধর্মীয় প্রশিক্ষণের নামে কঠোর শৃঙ্খলায় বড় করা হয়। বছরের পর বছর তারা জানতই না, তাদের বোনেরা বেঁচে আছে কি না। প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে বহু সংগ্রামের পর তারা আবার একে অপরকে খুঁজে পায় কিন্তু তখন ভাষা হারিয়েছে, পরিবার হারিয়েছে, শৈশব হারিয়েছে। ইতিহাসবিদরা বলেন, এই গল্পটি ব্যতিক্রম নয় এটি ছিল নিয়ম।
ডেভিডের কথা শুনতে শুনতে আমার মনে বারবার ফিলিস্তিনের কথা আসছিল। ইতিহাস যেন ভয়ংকরভাবে পুনরাবৃত্তি হয়। অস্ট্রেলিয়ায় কয়েকশ বছর আগে যা ঘটেছিল, আজ ফিলিস্তিনে তারই আধুনিক সংস্করণ চলছে। সেখানেও সেটেলাররা ভূমি দখল করছে, মানুষকে পশুপাখির মতো হত্যা করছে—নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে। ঘরবাড়ি ধ্বংস, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, গণহত্যা—সবই রাষ্ট্রীয় শক্তির ছত্রছায়ায়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি অস্বস্তিকর ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
আমেরিকার আদিবাসীদের গণহত্যা।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের নিশ্চিহ্নকরণ।
এবং আজ ফিলিস্তিনে চলমান দখল ও নিধন।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায়—শক্তিশালীরা বিচার এড়িয়ে গেছে, আর ভুক্তভোগীরা ইতিহাসের পাদটীকায় ঠাঁই পেয়েছে। সবচেয়ে নির্মম বিদ্রূপ হলো, যারা ভূমি দখল ও গণহত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে, তারাই আবার মানবাধিকার ও সভ্যতার পাঠ বিশ্বকে দিতে চায়।
২০০৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাডের ঐতিহাসিক ক্ষমা প্রার্থনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করেছিল যে স্টোলেন জেনারেশন ছিল একটি ভুল—বরং একটি অপরাধ। কিন্তু ক্ষমা নিজেই ন্যায় নয়। আজও আদিবাসীরা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয়ু ও কারাবন্দিত্বের সূচকে সবচেয়ে পিছিয়ে। কাঠামোগত বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা এখনো তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা।




এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—আমরা যারা নতুন অভিবাসী, এই ভূমিতে এসে বসবাস করছি, আমাদের ভূমিকা কী?
আমরা এই ইতিহাসের নির্মাতা নই, কিন্তু আমরা এর উত্তরাধিকারভোগী সমাজের অংশ। এই সত্য আমাদের ওপর নৈতিক দায়িত্ব আরোপ করে। প্রথমত, আমাদের শোনা শিখতে হবে—আদিবাসীদের হয়ে কথা বলার আগে তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের ইতিহাসকে “অতীত” নয়, চলমান বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় আদিবাসী কমিউনিটি ইভেন্ট, Welcome to Country, স্মরণ অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ এই বোঝাপড়াকে গভীর করে।
দ্বিতীয়ত, অস্বীকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। যখন কেউ বলে “সব তো অনেক আগের কথা”, তখন নীরব না থেকে ভদ্র কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলতে হবে—এর প্রভাব আজও রয়ে গেছে। সত্য বলা কোনো উসকানি নয়; এটি ন্যায়ের প্রথম ধাপ।




তৃতীয়ত, প্রতীকী সহানুভূতির বাইরে গিয়ে বাস্তব সমর্থন গড়ে তুলতে হবে। আদিবাসী মালিকানাধীন ব্যবসা, শিল্প, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চাকে সমর্থন করা মানে কেবল সহানুভূতি নয়—এটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ন্যায়ের অংশ।
চতুর্থত, নিপীড়নের বৈশ্বিক কাঠামোকে বুঝতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ইতিহাস ও ফিলিস্তিনের বর্তমান বাস্তবতা আলাদা ঘটনা নয়; এটি একই উপনিবেশিক মানসিকতার ধারাবাহিক রূপ। এই সংযোগ বোঝা মানে ন্যায়ের পক্ষে একটি সচেতন অবস্থান নেওয়া।
আমাদের কৃতজ্ঞতার নৈতিকতা চর্চা করতে হবে। এই ভূমি আমাদের আশ্রয়, নিরাপত্তা ও সুযোগ দিয়েছে—এটি স্বীকার করা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং বিনয়ের প্রকাশ। আর বিনয় থেকেই ন্যায়বোধ জন্ম নেয়।
ইতিহাস শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়—ইতিহাস ন্যায় দাবি করে।
আর সেই ন্যায় এখনো অসম্পূর্ণ।
কিন্তু ন্যায় শুরু হয়—সঠিক পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে।




উপস্থিত অতিথিবৃন্দের মুহু মুহু করতালিতে মুখরিত এক সফল ও স্মরণীয় সন্ধ্যা আয়োজনের পেছনে কমিউনিটি ইয়ুথ অ্যান্ড সিটিজেন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ইনক (cycdo.com.au) এর স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান ছিল অনন্য। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: সুপ্রভাত সিডনির উপদেষ্টা শিবলী আব্দুল্লাহ, সম্পাদক ড. ফারুক আমিন, এসএস টিভির লাইভ স্ট্রিমার এ এন এম মাসুম, সুপ্রভাত সিডনির রিপোর্টার এমডি জামিলুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ সাদ, কমিউনিটি লিডার ইরফান খান, BATIC লিডার সোহেল রানা, স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ নাসির আহমেদ, BSCA লিডার ড. ফজলে রাব্বী এবং ইয়াং অস্ট্রেলিয়ান এমসি রাইমা ইলাহী ও মাখদুম ইউসুফ।



উপস্থিত অতিথিবৃন্দের মুহু মুহু করতালিতে মুখরিত এক সফল ও স্মরণীয় সন্ধ্যা আয়োজনের পেছনে কমিউনিটি ইয়ুথ অ্যান্ড সিটিজেন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ইনক (cycdo.com.au) এর স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান ছিল অনন্য। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: সুপ্রভাত সিডনির উপদেষ্টা শিবলী আব্দুল্লাহ, সম্পাদক ড. ফারুক আমিন, এসএস টিভির লাইভ স্ট্রিমার এ এন এম মাসুম, সুপ্রভাত সিডনির রিপোর্টার এমডি জামিলুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ সাদ, কমিউনিটি লিডার ইরফান খান, BATIC লিডার সোহেল রানা, স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ নাসির আহমেদ, BSCA লিডার ড. ফজলে রাব্বী, সেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ ইসমাইল এবং ইয়াং অস্ট্রেলিয়ান এমসি রাইমা ইলাহী ও মাখদুম ইউসুফ।
মনোমুগ্ধকর ও হৃদয়ছোঁয়া এক অপূর্ব সন্ধ্যা উপহার দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।







