মক্কা কড়চা

সামসুল ইসলাম টুকু:  সবুজায়ন

সৌদি আরবের পশ্চিম তীর ঘেষে লোহিত সাগর । এর একপাশে সৌদি আরবের বৃহত্তম নৌবন্দর ও বিমান বন্দর জেদ্দা । সেখান থেকে ৯০ কিঃমিঃ পুর্বে মুসলমানদের পবিত্র তীর্থভূমি ও পুণ্যভূমি  মক্কা শহর । মক্কাকে পাহাড়ের শহর বলা হয় । যেদিকে দেখা যায় শুধু অগনিত পাহাড় গোচরিভূত হয় । পাহাড়গুলোতে কোনো উদ্ভিদ বা গাছ গাছালি দেখা যায়না । যেমনটা দার্জিলিং ,কাশ্মীর , শিমলার পাহাড়গুলোতে দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদসহ সরলবর্গীয় বৃক্ষ। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে সমতলভূমি । শহরের অদুরে রয়েছে মরুভুমি , বালুর পাহাড় । ফলে সৌদি আরবের আবহাওয়া সবসময় রুক্ষ্ণ থাকে । এই রুক্ষ্ণভূমির কোনো কোনো স্থানে সবুজ শ্যামল করার চেষ্টা চলছে ঘাষসহ কিছু উদ্ভিদ রোপণ করে।  কিন্তু নিয়মিত পানি না দিলে সবুজায়ন স্থায়ী হবেনা । সেই পানির বড়ই অভাব এ দেশে।

পাহাড় কাটা

এদিকে শহরের ছোট বড় পাহাড়গুলোকে কেটে ফেলা হচ্ছে আবাসনের জন্য । এমনকি যেসব পাহাড়ে আগে থেকে  ঘর বাড়ী ছিল সেগুলোকেও ভেঙ্গে ও কেটে সমতল করা হচ্ছে নির্মমভাবে । মক্কার প্রকৃতি ও ঐতিহ্য সেই পাহাড়গুলো হয়তো আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে । পাহাড়গুলোর নিরব কান্না কারো কর্নগোচর হবেনা । কারণ উন্নয়ন মানেই আলিসান ভবন ও অবকাঠামো । প্রকৃতি নয় । এমনকি তাদের গৌরব , ঐতিহ্য , ইতিহাস , মর্যাদা হারালেও তা উন্নয়নের কাছে তুচ্ছ ।

প্রাচীন ঐতিহ্যকে ঢেকে ফেলা  মক্কা নগরের সবচেয়ে প্রাচীন , সম্মানিত , গৌরবান্বিত ও ঐতিহ্য মক্কার কাবা শরীফ বা মসজিদুল হারাম । যার অস্তিত্ব পাওয়া যায় মুসলমানদের জাতির পিতা  হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর আমল থেকে ।কোনো এক  সময়ে এই কাবা শরীফে পুতুল পূজা শুরু হলো। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ঐ পুতলগূলোকে অপ্রয়োজনীয়  ভেবে কিছু পুতুলকে নিজ হাতে ভেঙ্গে দেন । এই অপরাধে আরবের তৎকালিন বাদশাহ নমরুদ হযরত ইব্রাহিম (আঃ)কে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে হত্যা করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু আল্লাহর আসীম রহমতে তিনি বেঁচে যান । এরপর তিনি দেশ ত্যাগ করে সিরিয়ায় এবং তারপরে মিশরে চলে যান । তারই বংশধর হযরত মুহাম্মদ (দঃ) আরববাসীদের কাছে ইসলাম প্রচার শুরু করেন । কিন্তু মক্কার কাফেরদের ভয়ঙ্কর অত্যাচারে সেখানে ইসলাম প্রচারে বাধা প্রাপ্ত হলে মহান রবের আদেশে তিনি মক্কা ছেড়ে  মদিনা হিজরত করেন । মদিনাবাসী ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে । সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি পূনরায় মক্কায় ফিরে আসেন ও মক্কা বিজয় করেন । কাবা ঘরে রক্ষিত ৩৬০টি পুতুল তিনি ভেঙ্গে চুরমার করেন । কাবা শরীফকে মুসলমানদের প্রার্থনালয় হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেন । পরবর্তীতে গড়ে উঠে সুউচ্চ মিনারসহ মসজিদুল হারাম । এক সময় সেখানে হজ্বের প্রচলন শুরু হয় । সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ  মুসলমান হজ্ব ও ওমরাহ উপলক্ষে সমবেত হন । বিশ্বের মুসলমানদের সম্মিলন ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এই মক্কা শরীফ । এক সময় পর্যন্ত সুউচ্চ  মিনারগূলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল । বহুদুর হতে সেগুলো গোচরিভুত হতো । কিন্তু সেই  ঐতিহ্যকে ঢেকে দিয়েছে মক্কা শরীফের চারপশে মাত্র ২০ থেকে ৩০  গজের মধ্যে নির্মিত বিশাল বিশাল ভবনগুলো । বিশেষত বিশাল আকাশচুম্বি  ঘড়ি ভবনটি পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী মিনারগুলোকে ।   মক্কা শরীফের একেবারে কাছে না এলে মসজিদুল হারামকে দেখতে পায়না হাজিরা । এসব সুউচ্চ ভবন নির্মানের যারা অনুমতি দিয়েছে তারা একবারও ভাবলোনা কয়েক হাজার বছরের মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য ও মর্যাদার কথা । এ ভবনগুলো তো মক্কা শরীফের ১০০/২০০ গজ দূরেও নির্মান করা যেতো ।

সাফা মারওয়া পাহাড় ও জম জমের পানি

মসজিদুল হারামের পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক সাফা ও মারওয়া পাহাড় । সেখানেই রয়েছে বিখ্যাত জম জমের পানির ফোয়ারা । যা শিশু হযরত ইসমাইলের পায়ের ঘষায় সেই পবিত্র পানির ফোয়ারা সৃষ্টি হয় । যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি মানুষ এ পানি ব্যবহার করলেও তা শেষ হয়না । পাইপ লাইনের মাধ্যমে মক্কা শহরের সীমিত স্থানে সরবরাহ করা হয় । এই পানি প্লাষ্টিকে বোতলে ভরে হাজ্জীদেরকে বিতরণ করা হয় । ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা  খুব আগ্রহভরে সংগ্রহ  করে সেগুলো দেশে নিয়ে যাবার জন্য ।  সৌদি আরবে এ পানির ব্যবসা না হলেও তা কুয়েত সরকারের মাধ্যমে করা হয় । বিশেষ গুণ সম্পন্ন এ পানি সমগ্র দুনিয়ার মুসলমানদের জন্য খুবই আকর্ষনীয় । হাজ্জীদের সেই সংগৃহিত পানির বোতল  জেদ্দা বিমাম বন্দরে কেড়ে নেয়া হয় বিমানের বিশেষ নিয়ম কানুনের কারনে বা ঠিক মতো প্যাকেট করা না হলে। তবে কিছু যাত্রী লাগেজের মধ্যে চুপিসারে নিতে পারে । জেদ্দার পর ট্রঞ্জিট হচ্ছে কুয়েত বিমান বন্দর  । সেখানে জনপ্রতি একটি করে ৫ লিটারের বোতল (কার্টুনে প্যাকেট করা ) পানি নেবার অনুমতি দেয়। তবে প্রতি ৫ লিটার বোতল পানির জন্য সাড়ে ১২ রিয়াল মুল্য দিতে হয় । যা বাংলাদেশী ৪০০ টাকার সমান । সেই কার্টুনে লেবেল দেয়া আছে জম জম এর পানি । কিন্তু তা কী সত্যই জমজমের পানি? যদি সত্যি হয় তবে মক্কা থেকে নিয়ে আনার অনুমতি দেয়া হয়না কেন ? কেন জেদ্দা বিমান বন্দরে কেড়ে নেয়া হয় ?

আবু জেহেলের বাড়ী টয়লেট

মসজিদুল হারামের কাছেই প্রায় ১০০ গজের ব্যবধানে অবস্থিত স্বল্পোচ্চ সাফা ও মারোয়া  পাহাড় দুটি স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায়না । হাজ্জীদের  তাওয়াফ করার সুবিধার জন্য সেখানে আপ-ডাউন রাস্তাসহ কঙ্ক্রীট দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে । ফলে রীতিমত এর ঐতিহ্য নষ্ট হয়েছে । পাহাড় দুটি প্রদক্ষিন শেষে বাইরে বের হলে দেখা যাবে প্রিয় নবী মুহম্মদ(সাঃ) এর বড় শত্রু আবু জেহেলের বাড়ী । সেটাকে রূপান্তর করা হয়েছে গনশৌচাগারে ।  যেমনটা বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের কবরকে ইতিহাসের ঘৃন্য স্বাক্ষী হিসেবে রাখা হয়েছে বা পৃথিবীর বহু নিষ্ঠুর শাসকদের স্মৃতি চিহ্নকে রাখা হয়েছে ।

বানিজ্যিক শহর মক্কা

মক্কা একটি বানিজ্যিক শহর । হাজ্জীদের জন্যই এটি বানিজ্যিক শহর হিসেবে গড়ে উঠেছে । হজ্ব ও ওমরাহ এর উদ্দেশ্যে এবং ভিসায় মক্কায় প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ লক্ষ মানুষ মক্কা শহরে প্রবেশ করে এবং ১৫ দিন থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত অবস্থান করে । পৃথিবীতে এত বিশাল জনবহুল পর্যটন শহর কোথাও নেই । ফলে মক্কায় কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয় । এখানকার মূল ব্যবসা আবাসিক ও খাবার হোটেল এবং পরিবহন । পুরো শহরটি হোটেলে ঠাঁসা । আগে থেকে হোটেল বুক না করলে আসন পাওয়া যায়না । হোটেলগুলো কখনই খালি থাকেনা । ব্যবসা করে খাবার হোটেলগুলো । প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ লক্ষ মানুষের ৩ বেলা খাবার সরবরাহ করা সত্যই কঠিন । পরিবহন ব্যবসাটাও কম নয় । সেখানে রয়েছে অত্যাধুনিক ও বিশাল আকৃতির বাস । সেগুলো হাজ্জীদের  ও বাসের তলদেশে বিপুল পরিমান লাগেজ পরিবহনে সক্ষম । বাসে ভ্রমন বেশ আরামদায়ক ।  কারণ বিশেষ কোনো ঝাকুনি অনুভব করা  যায়না । এছাড়া  সেখানে হাজ্বী চাদর , টুপি ,  জায়নামাজ , তাবিজ ,কাপড় চোপড় এবং খেজুরের ব্যবসা অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ন ।

 

বাঙ্গালীদের অবস্থান

সৌদি আরবের যত্রতত্র বাংলাদেশিদের দেখা যায় । সেখানকার বড় বড় শহর ও ধর্মীয় স্থানগুলোতে তাদের অবস্থান । তাদের ৯৫ ভাগই সুইপার , পাহারাদার , হোটেল বয় , ড্রাইভার , হেলপার , দোকান কর্মচারী , রাজমিস্ত্রিসহ বিভিন্ন কাজের  সাথে যুক্ত । সেখানে বেতন খুবই কম অন্য যে কোনো দেশের চাইতে । তারা খুবই কায়ক্লেশে জীবন যাপন করে । তাদের চাকরীর নিশ্চয়তাও নেই । এদের  কিছু অংশ অবৈধ পথে দালালের মাধ্যমে ভূয়া ভিসায় আরবে এসেছে । তারপরেও তারাই দেশে রেমিট্যান্স পাঠায় । যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে । অথচ দেশে বিদেশে এদের মর্যাদা দেয়া হয়না । অবহেলা করা হয় নিচু শ্রেণির কাজ করে বলে । এরা বাংলাদেশী হাজ্জীদের দেখলে সালাম দেয় । হয়তো কিছু পাবার আসায় । সেটাও যেন পুলিশের চোখে না পড়ে। এরা সার্বক্ষনিক ভীতির মধ্যে থাকে কখন সৌদি পুলিশ তাদের ধরে দেশে পাঠিয়ে দেয় ।

পর্দা ও আরব

ইসলামের মাতৃভূমি সৌদি আরবে নেকাব বাধ্যতামুলক নয়। আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে নারীদের মুখ খোলা রাখার অধিক স্বাধীনতা দেয়া আছে । পরীক্ষা বা অফিস আদালতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মুখমন্ডল খোলা রাখার নির্দেশ আছে । এ কাজে মহিলা কর্মীদের নিয়োজিত করা আছে । শরীর ঢেকে রাখার মত শালীন পোষাক পরলেই হবে । সেখানে মহিলারা গাড়ী চালানো সহ ষ্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার অনুমতি পেয়েছে । এক পরিসঙ্খ্যানে বলা হয়েছে বিশ্বের ৯০ শতাংশ ধার্মিক মুসলিম মহিলা বোরকা পরেনা । তাওয়াফ করার সময় হাজরে আসওয়াদ পাথরকে একটু স্পর্শ করার জন্য মৌমাছির মত হাজ্জীরা  কিলবিল করে । নারী পুরুষদের সংযম শিক্ষায় শিক্ষিত করা জরুরী । এছাড়া বাচ্চাসহ নাবালক নাবালিকা ছেলে মেয়েসহ শিশু সন্তানদের  নিয়ে হজ্ব ও ওমারাহ করতে যায় অনেক মানুষ শুধু পূন্য অর্জনের আশায় ।

জ্বিন পাহাড়

কিছু তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে শোনা যায় জ্বিন পাহাড়ের কাছাকাছি এলে বাসের গতি বেড়ে যায় এবং বর্ধিত গতিতে বাস চলতে থাকে । এমনকি পানিও উপরের দিকে প্রবাহিত হয় । আর বিষয়টি এমনভাবে বর্ণনা করা হয় ও এর অলৌকিকতাকে তুলে ধরা হয় যে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে । অনেক শিক্ষিত মানুষকেও এ ধরনের  গল্প বলতে শোনা যায় । অনেকে মনে করে জ্বিন পাহাড়ের চৌম্বক শক্তি আছে । কিন্তু  বিষয়টি সর্বৈব মিথ্যা । কিন্তু মুহম্মদ(সাঃ)তার জীবদ্দশায় এমন ধরনের কেরামতির কথা বলেননি । বেশ কিছু  হাজ্জী ওমরাহ করতে এসে বলেন ,  ভ্রমন করে  বেশ কিছু ধর্মীয় স্থান ও নিদর্শন দেখা হলো ।

কবুতর চক

সৌদি আরবে বিভিন্ন জাতির পাখি থাকলেও কবুতর চোখে পড়ার মত । এ থেকে বোঝা যায় পাখিটি গরম সহ্য করতে সক্ষম । অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত , রাজকীয় চালচলন ও দাম্ভিক প্রকৃতির হয় এ পাখিটি । সুখী পরিবারের বাড়ীতেই এরা বাসা বাধে সেখানে খাবার পায় বলে । আবার অনেক পরিবার তাদের জন্য খোপ তৈরী করে যেন ঝড় বৃষ্টিতে নিরাপদে থাকতে পারে । মসজিদুল হারামের কাছেই ইব্রাহিম খলিল সড়কের পাশেই রয়েছে কবুতর চক বা চত্বর। সেখানে তারা সারাদিন ওড়াউড়ি করে । খুব জনপ্রিয়  পাখি বলে হাজ্জীরা তাদের খাবার দেয় । এত মানুষের ভীড়েও তারা মানুষকে ভয় পায়না । সেখানে তাদের কেউ বিরক্ত করেনা । এ চিত্র শুধু মক্কা শরীফের নয় । আরবের যে সকল স্থানে  হাজ্জীদের ঘোরানো হয় সেখানেই রয়েছে হাজার হাজার কবুতর । কারণ হাজ্জী তাদের খাবার দিয়ে আনন্দ পায় । সেইসাথে নবীজীর প্রিয় পাখির বা প্রাণী সেবা করে কিছু পূণ্য তো হয়ই । অন্যদিকে কবুতরের খাবার বিক্রি করে এক শ্রেণির খেটে খাওয়া অভাবী মানুষ । কবুতরের খাবার বিক্রি করেই সংসার চালায় তারা । কবুতরের খাবারের মধ্যে রয়েছে চাল, গম ,ভুট্টার ভাঙ্গা ও শরিষাসহ কিচু শষ্য  বীজ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *