ডা. সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ: বর্তমান সময়ে পুরো বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা এক ধরনের ‘মিডিয়া টেররিজম’ এর শিকারে পরিণত হয়েছে। একে বাংলায় বলায় যায় সংবাদ-সন্ত্রাস কিংবা গণমাধ্যম-সন্ত্রাস। এটি মূলত এক ধরণের অন্যায় আক্রমন। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, অতীতে এ ধরণের ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অথচ এখন এর চর্চা শুরু হয়েছে পুরো পৃথিবীব্যাপী, আগের যে কোন সময়ের চাইতে বড় পরিসরে ব্যাপ্তি নিয়ে।
শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, মুসলিমরা কোনোভাবেই কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা সমর্থন করে না, তা তিনি যে কোনো ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি বা বিশ্বাসের মানুষই হোন না কেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইরশাদ করেছেন যে, একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার অর্থ হলো সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করা, আর একজন মানুষের প্রাণ বাঁচানো অর্থ হলো সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করা (সূরা মায়িদা, আয়াত ৩২ ও ৩৩)।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট নিয়ে তথাকথিত মুক্ত বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা আজ অনেকেরই নজরে এসেছে। যে কোন সচেতন পাঠক খেয়াল করলেই দেখবেন, এই সংকটের মূল কারণ এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে নিয়ে কেউ কোনো আন্তরিক আলোচনা করছে না। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, মূলধারার পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে ডজন ডজন সাংবাদিকের প্রাণহানির খবরও ঠিকমতো আসছে না। সম্ভবত সাংবাদিকরা তাদের চাকরি হারানোর ভয়ে ভীত। সেই পুরনো প্রবাদটিই আজ সত্যি মনে হয়, ‘টাকা যখন কথা বলে, সত্য তখন নিশ্চুপ হয়ে যায়।’
ভার্চুয়াল কারসাজির এই যুগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের এবং তথাকথিত মুক্ত বিশ্বের প্রধান ব্যাক্তিটি পর্যন্ত বিশ্বাস করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, শিশুদের শিরশ্ছেদ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে তথ্যটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। এটি মূলত হলুদ সাংবাদিকতারই একটি কুফল।
অপরদিকে বেশিরভাগ মুসলিম নেতার মেরুদণ্ডহীন অবস্থানের মাঝে তুরস্কের নেতা এরদোয়ানের মতো হাতেগোনা অল্প কয়েকজন বিশ্বনেতা এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে সত্য কথা বলছেন। বাস্তবে মুসলিমরা হচ্ছে গণহত্যার শিকার, কিন্তু গণমাধ্যম ও নানা মিডিয়াতে তাদেরকেই অপরাধী হিসেবে তুলে ধরা হয়। একটি জরিপে দেখা গেছে, হলিউডে শত শত সিনেমা তৈরি করা হয়েছে যেখানে মুসলিমদের খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এ প্রেক্ষিতে ধন্যবাদ জানাতেই হয় মিশরের প্রেসিডেন্ট সিসি-কে। জানা গেছে যে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মুসলিমরা কখনো ইহুদিদের ওপর জুলুম করেনি। ইউরোপে ইহুদিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তার জন্য কারা দায়ী? বিশেষ করে একজন জার্মান নেতার সেই ভয়াবহ গণহত্যার কথা তো বলাই বাহুল্য। আমি ক্রুসেড নিয়ে একটি ঐতিহাসিক তথ্যচিত্র দেখেছিলাম, যেখানে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখানো হয়েছিলো কিভাবে ইউরোপ থেকে জেরুজালেমের পথে আসার সময় ক্রুসেডাররা নিরপরাধ ইহুদিদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল।
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বের অনেক ইহুদি মানুষ ফিলিস্তিনের আদিবাসীদের অধিকারকে সম্মান জানিয়ে একটি ন্যায়সঙ্গত শান্তি চান। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো কদাচিৎ এই দিকটি তুলে ধরে। আমি কেবল আশা ও প্রার্থনা করি যে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের মাঝে একদিন সত্য কথা বলার মতো নৈতিক সাহস তৈরি হবে।
* লেখক সিডনি, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত একজন চিকিৎসক ও ধর্মতাত্ত্বিক।