মোহাম্মদ আলম ফরিদ: “হাজারো খোয়াহিশ এমন যে, প্রতিটি খোয়াহিশে প্রাণ যায়; অনেক আরমান পূর্ণ হলো, তবু মনে হয় কমই রইল।”
জুলাই বিপ্লবে আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছি, তার একটা দুইটা স্বপ্ন পূরণেই আমাদের দম বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি সেই রকম কিছু আরমান ও তামান্নার বয়ান করতে চাই।
রাজনীতি, ভাষা ও ধর্ম—এই তিনটি ক্ষেত্রকে আমরা প্রায়ই আলাদা আলাদা খোপে ভরে দেখি। অথচ গভীরে গেলে বোঝা যায়, এরা পরস্পর সংযুক্ত—চরিত্র, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার সুতোয় গাঁথা। একটি সমাজ কেমন হবে, তার রাষ্ট্র কেমন হবে, তার ভাষা কীভাবে বাঁচবে, তার ধর্মীয় চর্চা কতটা পরিশীলিত হবে—সব কিছুর শুরু সংগঠনের ভেতর থেকে, মানুষের মন থেকে, এবং নৈতিকতার ভিত্তি থেকে।
রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের খেলা নয়; এটি এক নৈতিক-দার্শনিক অনুশীলন। ক্ষমতার ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং সামাজিক আস্থার নির্মাণই এর কেন্দ্রবিন্দু। কোনো রাজনৈতিক দলকে বিচার করতে হলে তার নির্বাচনী সাফল্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার অভ্যন্তরীণ কাঠামো—কীভাবে সিদ্ধান্ত হয়, কীভাবে নেতৃত্ব তৈরি হয়, ভিন্নমত কীভাবে গ্রহণ করা হয়। দলই গণতন্ত্রের প্রথম বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়ে যদি মতের বহুমাত্রিকতা, সহনশীলতা ও নিয়মভিত্তিক প্রতিযোগিতা না থাকে, তবে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে সে দল কেবল আধিপত্যের সংস্কৃতিই পুনরুৎপাদন করবে।
আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা ঘোষিত সমর্থক নই। কিন্তু দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে দেখেছি, তাদের সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার চর্চা রয়েছে—যা আলোচনার দাবি রাখে। একইভাবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র ক্ষেত্রেও একটি ঐতিহ্যগত কাঠামোগত নিয়মানুবর্তিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এখানে প্রশ্নটি সমর্থন বা বিরোধিতার নয়; প্রশ্নটি রাজনৈতিক নৈতিকতার—দল নিজের ভেতরে কী চর্চা করছে?
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টির মতো বড় দলগুলোর ক্ষেত্রে প্রায়ই সমালোচনা ওঠে নেতৃত্বের কেন্দ্রীভবন, পারিবারিক উত্তরাধিকার বা অর্থবলনির্ভর কাঠামো নিয়ে। নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) যদি নিজেদের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তবে তারাও একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটাবে—নাম পাল্টাবে, চরিত্র পাল্টাবে না।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান আমাদের শেখায়—নিয়মভিত্তিক প্রতিযোগিতা সংগঠনকে শক্তিশালী করে, আর অনিয়ন্ত্রিত আধিপত্য ভাঙন ডেকে আনে। একটি দলের ভেতরে কাউন্সিল হলেও যদি কমিটি চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি পাশাপাশি নয়, বিপরীতে দাঁড়ান। মতভেদ তখন নীতিগত বিতর্কে নয়, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। এখানেই বোঝা যায়—সংগঠনই চরিত্র নির্মাণ করে, আর চরিত্রই রাষ্ট্রে বিস্তৃত হয়।
এই প্রসঙ্গে আমি একটি উপমা প্রায়ই ব্যবহার করি—সুগন্ধ ও দুর্গন্ধের উপমা। একটি ঘরে যদি সুগন্ধি রাখা হয়, তার সুবাস ধীরে ধীরে সমগ্র ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সংগঠনও তেমন। অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এক ধরনের সাংস্কৃতিক সুগন্ধ—যা সময়ের সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। আর ক্ষমতাকেন্দ্রিক, বংশানুক্রমিক ও পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর সংস্কৃতি এক ধরনের দুর্গন্ধ—যা নাগরিক আস্থাকে ক্ষয় করে।
কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্ন কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; ভাষার ভেতরেও তার প্রতিফলন ঘটে। বাংলা ভাষার আকাশে কিছু শব্দ আছে—যাদের দেখলেই কেউ কেউ ভ্রু কুঁচকান। “দালাল” তেমন একটি শব্দ। আরবের বালুকাবেলা পেরিয়ে, ফারসির পথ ধরে, বাংলার উঠোনে এসে আজ সে আপন হয়ে বসে আছে। প্রশ্ন ওঠে—এর “আসল বাংলা” কী? যেন ভাষা কোনো বংশতালিকার খাতা!
কেউ যদি বলেন—এই শব্দ ব্যবহার করে আপনি বাংলা ভাষার সৌন্দর্য নষ্ট করছেন—তখন যুক্তি সরে যায়, আবেগ এগিয়ে আসে। ভাষার সৌন্দর্য কি উৎসে, নাকি ব্যবহারে? শব্দ কি তার জন্মভূমি দিয়ে বিচার হবে, নাকি অর্থ ও প্রয়োগ দিয়ে? যারা শব্দের রক্তপরীক্ষা করেন, তারা প্রায়ই ভাষার হৃদস্পন্দন শুনতে পান না। তারা অর্থ শোনেন না, উৎস খোঁজেন। তারা ভুলে যান—বাংলা কোনো একক বংশের সন্তান নয়; সে বহু স্রোতের মিলনে জন্ম নেওয়া এক জীবন্ত নদী। নদীকে জিজ্ঞেস করা যায় না—তুমি কোন পাহাড় থেকে এসেছ। নদীকে শুধু দেখা যায়, অনুভব করা যায়, ভালোবাসা যায়।
একইভাবে ইনকিলাব, ইনসাফ, ফয়সালা, আজাদি, মোকাবিলা ইত্যাদি শব্দ নিয়ে ইদানীং যে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা চলছে—তার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য।
এই সংকীর্ণতার একটি নাম আমি দিয়েছি—“বাঙালীর গেরুয়া রোগ।” এটি ব্যাকরণের অসুখ নয়; এটি মানসিকতার অসুখ। যে মন ভাষাকে ভালোবাসার বদলে শুদ্ধতার তলোয়ার দিয়ে কেটে কেটে দেখতে চায়, সে শেষ পর্যন্ত ভাষাকেই ক্ষতবিক্ষত করে।
এটি আমার ব্যক্তিগত ধারণা ও মতামত। কেউ একমত নাও হতে পারেন—সেটিই স্বাভাবিক।
আমাদের দেশে ইসলাম নিয়ে সাহিত্য করার চেষ্টা করলেই অনেককে মৌলবাদী তকমা দেওয়া হয়েছে। কবি আল মাহমুদের কবিতা বাংলায় আমার পড়া শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। অথচ এই গুণী কবি সারা জীবন তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের কটূক্তি সহ্য করেছেন। তেমনি কাশেম বিন আবু বকরের লেখনী কোনোভাবেই ইমদাদুল হক মিলনের স্টাইলের চেয়ে কম নয়। গল্প বলার ভঙ্গি, নাটকীয়তা, ছন্দ, ভারসাম্য, ট্র্যাজেডির আবহ—সবই কাশেমের সাহিত্যে উপস্থিত। এ কারণেই তিনি এত জনপ্রিয়।
সালভাদোর দালি, পাবলো পিকাসো, এস এম সুলতান—তাঁরা তাঁদের সময়ের তুলনায় ভিন্নধর্মী শিল্প আমাদের দিয়েছেন। কিন্তু যখন একজন ক্বারী ওবায়েদ উল্লাহ আমাদের কানে আজানের সুমধুর শিল্প পৌঁছে দেন, আমরা কি সেই শিল্পকে একইভাবে মূল্যায়ন করি?
ধরা যাক, কেউ লেখে—“অরিন্দম বাড়ি আছো, তোমার জন্য পৃথিবী থেমে আছে, বেরিয়ে আসো।” আমরা বলি—শিল্প। কিন্তু যদি লেখা হতো—“সেলিম বাড়ি আছো, তোমার জন্য পৃথিবী থেমে আছে, বেরিয়ে আসো”—তখন কেমন যেন একটু ভোঁতা লাগে। কেন?
আবার যদি বলি—
“এখনো কি সন্ধ্যা বেলায় আমার বাড়ি ফেরার সময় পেরিয়ে গেলে… পূজার ছলে আমারই কথা ভাবো, বসে ঠাকুরতলে?”
শিল্প মনে হয়।
কিন্তু যদি বলি—
“এখনো কি মাগরিব বেলায় আমার বাড়ি ফেরার সময় পেরিয়ে গেলে… নামাজের ছলে আমারই কথা ভাবো, বসে জায়নামাজে?”
তখন কি সেটাও শিল্প থাকে না?
এই প্রশ্নটাই তুলতে চাই। আমাদের মানসিকতায় একটি রঙ বদ্ধমূল হয়ে আছে। ইসলামকে আমরা অনেক সময় ‘বাইরের’ সংস্কৃতি বলে ভাবি। যেন এটি আমাদের নিজস্ব নয়।
এই বাংলাদেশে মানুষ যেদিন ইসলামকে নিজের বলে ভাববে—নিজের ইতিহাস, নিজের পরিচয়, নিজের আত্মার অংশ হিসেবে চিনবে—সেদিনই আমরা সত্যিকার অর্থে আত্মমর্যাদায় দাঁড়াতে পারবো।
রাজনীতি ও ভাষার এই আলোচনার সঙ্গে ধর্মীয় নৈতিকতার প্রশ্নটিও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কিন্তু ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো কেন্দ্রীয়, সর্বজনস্বীকৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। ফলে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন ভিন্ন ফতোয়া উচ্চারিত হয়—কখনো আবেগে, কখনো রাজনীতির ছায়ায়, কখনো অজ্ঞতার তাড়নায়। এতে ধর্মের মর্যাদা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের মনেও বিভ্রান্তি জন্মায়।
এই বাস্তবতায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক গ্র্যান্ড মুফতি পদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অযৌক্তিক নয়। বিশ্বের বহু দেশে এ ধরনের কাঠামো আছে। যেমন মিশরে রাষ্ট্র-স্বীকৃত গ্র্যান্ড মুফতি ও ফতোয়া বোর্ড সম্মিলিত গবেষণা ও ইজতিহাদের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত প্রদান করে। এতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা প্রাধান্য পায়। বাংলাদেশেও যদি যোগ্য আলেম, বিভিন্ন ধারার প্রতিনিধিত্ব এবং গবেষণাভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক বোর্ড গঠিত হয়, তবে ধর্মীয় সিদ্ধান্তের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
অবশ্যই এই প্রস্তাব কোনো দলীয় নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র হওয়া চলবে না; বরং হতে হবে স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও নৈতিকভাবে স্বাধীন। যেমন একটি রাজনৈতিক দল নিজের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা না করলে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, তেমনি ধর্মীয় সিদ্ধান্তও যদি প্রজ্ঞা ও জবাবদিহিতার আলোকে না হয়, তবে তা সমাজে ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
অতএব প্রশ্নটি একই সূত্রে গাঁথা—সংগঠন কেমন, সংস্কৃতি কেমন, নৈতিকতা কতটা গভীর। রাজনীতি, ভাষা, ধর্ম—সব ক্ষেত্রেই ভেতরের চর্চাই বাইরের বাস্তবতাকে গড়ে তোলে। সুগন্ধ ভেতর থেকে ছড়ায়; দুর্গন্ধও তাই। আমরা যদি নৈতিক রাষ্ট্র চাই, তবে নৈতিক সংগঠন চাই। আমরা যদি উদার ভাষা চাই, তবে উদার মন চাই। আমরা যদি ভারসাম্যপূর্ণ ধর্মীয় সংস্কৃতি চাই, তবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা চাই।
রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়; এটি মানুষের চরিত্রের সম্প্রসারণ। আর চরিত্রের নির্মাণ শুরু হয় ভেতর থেকে—দলের ভেতর, ভাষার ভেতর, বিবেকের ভেতর। সেখানেই ভবিষ্যতের বীজ রোপিত হয়