সুনামগঞ্জের মাটির নীচের নীরব ক্রন্দন

মোহাম্মদ আলম ফরিদ: প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর আগে, যখন ভারতীয় প্লেট ছিল এক ভাসমান ভূখণ্ড, তখন তার উত্তরমুখী ধাক্কা শুরু হলো ইউরেশিয়ান প্লেটের দিকে। সেই সংঘর্ষ থেকেই জন্ম নিল হিমালয়, আর তার দক্ষিণ–পশ্চিম প্রান্তে উঠে এলো মেঘালয় পাহাড়। একসময় যেগুলো সমুদ্রতল ছিল, ধীরে ধীরে তারা রূপ নিলো পাহাড়ি মালভূমিতে। এই প্লেট টেকটোনিক নাচ এখনো শেষ হয়নি—ভারতীয় প্লেট আজও উত্তরে চাপ দিয়ে যাচ্ছে, ফলে হিমালয় বছরে কয়েক মিলিমিটার উঁচু হচ্ছে আর মেঘালয়ও নিজের অবস্থান বদলে নিচ্ছে।
এই চাপের ছায়ায় আছে সুনামগঞ্জ। ভূতাত্ত্বিকভাবে সুনামগঞ্জ অবস্থিত একটি সক্রিয় বেসিনে, যাকে মেঘালয় পাহাড়ের টেকটোনিক ক্রাস্ট প্রভাবিত করে। প্রতি বছর পাহাড়ের ভর ও চাপ নিচের দিকে ঠেলে দিচ্ছে হাওরের মাটি। একে বলে সাবজাকশন–ধরনের সাবসিডেন্স, যেখানে নরম পলিমাটি ধীরে ধীরে নিচে চেপে বসে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় মানুষের চোখে প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে—“মাটি দেবে যাচ্ছে।”
কিন্তু সুনামগঞ্জের কাহিনি কেবল ভারতীয় ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়। পূর্বদিকে সক্রিয় আরেকটি শক্তি কাজ করছে—বার্মিজ প্লেট (বা ইন্দো–বার্মা আর্ক)। এই প্লেটটি আসলে ভারতীয় প্লেটের পূর্ব প্রান্তকে ভেঙে তৈরি হয়েছে। ভারতীয় প্লেট যখন উত্তর–পূর্ব দিকে ধাক্কা দিতে থাকে, তার কিছু অংশ বার্মিজ প্লেটের নিচে ঢুকে যায়। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে আসাম ও মিজোরামের ভাঁজ পাহাড়, এবং শক্তিশালী ভূমিকম্পের অঞ্চল।
সুনামগঞ্জ এই দুই চাপের মাঝামাঝি অবস্থান করছে—উত্তরে হিমালয়–মেঘালয় উত্তোলন, আর পূর্বে বার্মিজ প্লেটের ভাঁজ আর স্লিপ। এই ডাবল–প্রেশার এর কারণে হাওর বেসিন ধীরে ধীরে বসে যাচ্ছে, ভূমিকম্পের ঝুঁকিও বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেট ও সুনামগঞ্জের ভূগর্ভস্থ স্তরগুলো এখনো টেকটোনিক স্ট্রেসে আছে, এবং ভবিষ্যতে একটি বড় ভূমিকম্প এখানে ঘটতে পারে।
অতএব, সুনামগঞ্জের জল–মাটি–মানুষের কাহিনি শুধু পাহাড়ি ঢল বা উজানের বাঁধবন্দি নদীর গল্প নয়। এটি কোটি বছরের প্লেট টেকটোনিক সংঘর্ষের কাহিনি, যেখানে ভারতীয় প্লেটের উত্তরমুখী ধাক্কা, ইউরেশিয়ান প্লেটের প্রতিরোধ, আর বার্মিজ প্লেটের পূর্বমুখী চাপ মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এক ভূতাত্ত্বিক নাট্যমঞ্চ। আর সেই নাটকের নীরব দর্শক হলো হাওর—যা প্রতি বর্ষায় জেগে ওঠে, আর প্রতি শুষ্ক মৌসুমে নিজের ভেতরে একটু একটু করে ডুবে যায়।
কিন্তু প্রাকৃতিক চক্রের ভেতর ঢুকে পড়েছে মানুষের খেলা। উজান ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয় নদী–উপনদী প্রায় সব ক’টিই বাঁধে বাঁধা। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদী শুকিয়ে কাঠ, কৃষক চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে ফাঁকা খালে। বর্ষা এলেই হঠাৎ করে তারা গেট খুলে দেয়, পাহাড়ি ঢল নামিয়ে আনে অবিশ্বাস্য তীব্রতায়। এই অনিয়মিত পানি–ছাড়া সুনামগঞ্জের জন্য এক অভিশাপ—মুহূর্তে কৃষিজমি ডুবে যায়, ফসল ভেসে যায়, ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়।
২০২২ সালের বন্যায় এই বাস্তবতা আরও নগ্ন হয়ে উঠেছিল। গবেষণা বলছে, পাহাড়ি অতিবৃষ্টি, উজানের অনিয়ন্ত্রিত পানি ছেড়ে দেওয়া আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই বন্যা ছিল এক “পারফেক্ট স্টর্ম”। স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়েছে কেবল পানির প্রবাহ নয়, মাটির দেবে যাওয়া ভূপ্রকৃতিও। ২০২৪–এর বন্যা আবারও প্রমাণ করেছে—সুনামগঞ্জ এখন শুধু নদী আর বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং বহুজাতিক পানি–রাজনীতির বলির পাঁঠা।
তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দিরাই—সব জায়গাতেই হাওরের এই দেহে ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। একদিকে টেকটনিক বেসিনের প্রাকৃতিক বসে যাওয়া, অন্যদিকে জলবায়ুর অস্থিরতা, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উজান থেকে বাঁধবন্দি করা নদীর কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ। ফলে সুনামগঞ্জের ভূমি যেন ক্রমশ নিজের ভেতর গিলে নিচ্ছে নিজেকেই।
তবুও হাওর এক বিস্ময়। শুকনো মৌসুমে এটি ধানক্ষেত, বর্ষায় পরিণত হয় সমুদ্রের মতো হ্রদ। টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ জলরাশি মানুষের খাদ্য, মাছ, পাখি আর প্রাণবৈচিত্র্যকে লালন করছে হাজার বছর ধরে। কিন্তু প্রকৃতি ও রাজনীতির এই দ্বৈরথে তার ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
সুনামগঞ্জ যেন প্রকৃতির এক স্বপ্নময় থিয়েটার। ভোরের আলো ফুঁটে ওঠার সাথে সাথে হাওরের বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি নিঃশব্দ আয়নায় পরিণত হয়। সেই আয়নায় ভেসে ওঠে মেঘালয়ের পাহাড়—সবুজের স্তরে স্তরে নীলাভ ছায়া। দূর থেকে মনে হয় পাহাড় যেন পানির উপর ভেসে আছে, আর হাওরের জল মিলেমিশে এক মহাসাগরের আবহ তৈরি করছে।
কখনো হাওরের বুক জুড়ে হাওয়া বয়ে গেলে পানির ঢেউ ভেঙে ফেলে আকাশের প্রতিচ্ছবি। তবুও মুহূর্তেই আবার আকাশ নেমে আসে জলে। এখানে আকাশ ও পানি একে অপরের রূপে বিলীন হয়ে যায়। পাহাড়ের গা ঘেঁষে নীল জলরাশি এমনভাবে মিশে থাকে যে বোঝা যায় না কোথায় শেষ হলো ভূমি, আর কোথা থেকে শুরু হলো অনন্তের আভাস।
বর্ষায় এই দৃশ্য আরও রহস্যময় হয়। পাহাড়ের বুক ছিঁড়ে নেমে আসে স্রোত, ঢেউ খেলানো জলে ঢুকে পড়ে। মনে হয় পাহাড় নিজেই গলে গিয়ে পানির ভেতর মিশে যাচ্ছে। হাওরের উপর দিয়ে ভেসে বেড়ানো নৌকা তখন সমুদ্রযাত্রার ভ্রম তৈরি করে, যেখানে দিগন্ত কেবলই জল আর আকাশে মিলেমিশে যায়।
শীতকালে, যখন ভোরের কুয়াশা হাওরের বুক ঢেকে রাখে, তখন পাহাড়গুলো যেন ভেসে থাকা দ্বীপ। কুয়াশার সাগরে এই দ্বীপগুলো সুনামগঞ্জকে এক স্বপ্নিল দ্বীপমালায় পরিণত করে। সূর্যোদয়ের প্রথম আলো যখন কুয়াশার ভেতর ছড়িয়ে পড়ে, মনে হয় হাওরের জলরাশি থেকে আলো ফুঁটে উঠছে, আর পাহাড়গুলো সেই আলো ধরে আকাশে পাঠাচ্ছে।
সুনামগঞ্জের প্রকৃতি তাই কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়। এটি এক মহাজাগতিক মিলনমঞ্চ—যেখানে পানি, পাহাড়, আকাশ আর সময় মিলে সৃষ্টি করেছে এক নীলাভ স্বপ্নের দেশ। এখানে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝতে পারে, ভূগোল কেবল মাটির গল্প নয়; এটি এক অনন্ত কাব্য, যা প্রতিটি ঢেউ আর প্রতিটি মেঘে লেখা হয়ে আছে।
সুনামগঞ্জ কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি এক ধীরগতি চক্রের সাক্ষী। কোটি বছরের প্লেট টেকটোনিক, মেঘালয় ও বার্মিজ প্লেটের চাপ, নদীর স্রোত আর হাওরের নরম মাটির মিলনে এখানে প্রতিটি মুহূর্ত হচ্ছে সৃষ্টি ও ধ্বংসের একান্ত দর্শন। হাওরের নীল আয়নায় প্রতিফলিত পাহাড়, আকাশ ও পানি শুধু দৃশ্য নয়—এটি সময়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস, প্রকৃতির বিবর্তন, আর মানুষের অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি।
এই স্থানের নীরবতা আমাদের শেখায়—ভূমি কখনও স্থির নয়, পানি কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না, আর মানুষ নিজের ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বর্ষার ঢল বা শুষ্ক মৌসুম, পাহাড়ের চাপ বা নদীর বাঁধ—সবই শুধু এক চক্রের অংশ। প্রকৃতি আমাদের সামনে বসে আছে ধীরে ধীরে চলা, নিঃশব্দ পাঠদান করে—ধৈর্য, সহনশীলতা আর অমরত্বের পাঠ।
সুনামগঞ্জ ধীরে ধীরে ডুবছে, আবার ভেসে উঠছে। আমাদের কাজ হলো এই প্রক্রিয়াকে বোঝা, শ্রদ্ধা করা, আর তার সঙ্গে মিলিয়ে জীবন গড়ার চেষ্টা করা। হাওরের নীরবতা একসময় কেবল গল্প নয়—এটি এক দার্শনিক সতর্কবার্তা: মানুষের অজ্ঞতা ও হঠাৎ পদক্ষেপ প্রাকৃতিক চক্রের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না, কিন্তু মন দিয়ে দেখা, শোনা ও শেখার শক্তি আমাদের পথ দেখাতে পারে।
সত্যিই, সুনামগঞ্জ কেবল জলের ভেতর একটি হাওর নয়; এটি এক নিঃশব্দ বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ভূগোল, সময়, এবং মানুষ একত্র হয়ে শিখছে জীবনের গভীরতম পাঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *