হাফেজ মাওলানা ডা.মো. ইমাম হোসাইন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকা তুহু। আমাদের জীবনের সিংহভাগ সময় আমরা অবহেলা ও অযত্নে পার করি। প্রতি বছর সিয়াম সাধনা এবং ঈদের আনন্দ অনুভব আমাদের জীবনের পথচলা গতিময় ও প্রাঞ্জল করে তোলে। এটা আমাদের জন্য মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ। কিন্তু জীবন পরিচালনার পথ পরিক্রমা পরিচালনা করতে আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা এবং প্রতিপালকের পক্ষ থেকে জীবনবিধান এ মাসেই অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, রোযার মাস (এমন একটি মাস)- যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এই কোরআন (হচ্ছে) মানব জাতির জন্যে পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন, (মানুষদের জন্যে হক বাতিলের) পার্থক্যকারী, অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে এতে রোযা রাখবে; (তবে) যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে, সে পরবর্তী (কোনো সময়ে) গুনে গুনে সেই পরিমাণ দিন পূরণ করে নেবে; (এ সুযোগ দিয়ে) আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদের (জীবন) আসান করে দিতে চান, আল্লাহ তায়ালা কখনোই তোমাদের (জীবন) কঠোর করে দিতে চান না। আল্লাহর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা যেন গুনে গুনে (রোযার) সংখ্যাগুলো পূরণ করতে পারো, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের (কোরআনের মাধ্যমে জীবন যাপনের) যে পদ্ধতি শিখিয়েছেন তাঁর জন্যে তোমরা তার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারো । (সূরা বাক্বারা,আয়াত:১৮৫)
আমরা যারা প্রবাসী বা গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি ভাড়ার বাহনে আরোহনের টিকিট ক্রয় করি, তখন অতিরিক্ত সাবধানতা ও সতর্কতা অবলম্বন করি টিকিটে প্রদত্ত সময়ের ব্যাপারে! অথচ আমাদের অনন্ত চিরস্থায়ী জীবনের বন্দোবস্তের সুখ,শান্তি ও সফলতা অর্জনের নির্ভরযোগ্য পথনির্দেশ এবং একমাত্র সংবিধান আল- কুরআন জানা সত্ত্বেও নগন্য টিকিটের মতোও আমরা সতর্কতা অবলম্বন করিনা নিজের জীবন পরিচালনায়,যে মহা জীবনের শুরু আছে শেষ নেই এবং পরকালের জীবন থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসা মোটেই সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেন, কাফিরগণ কি এই কিতাবে বর্ণিত শেষ পরিণামেরই অপেক্ষা করছে? (অথচ) এই কিতাবের বর্ণিত শেষ পরিণাম যে দিন আসবে সে দিন, যারা পূর্বে সে পরিণামের কথা ভুলে গিয়েছিল তারা বলবে, বাস্তবিকই আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্যবাণী নিয়েই এসেছিলেন। এখন আমাদের কি এমন কোন সুপারিশকারী লাভ হবে, যারা আমাদের পক্ষে সুপারিশ করবে? অথবা আমাদেরকে কি পুনরায় (দুনিয়ায়) ফেরত পাঠানো হবে, যাতে আমরা যে (মন্দ) কাজ করতাম তার বিপরীত কাজ করতে পারি? বস্তুত তারা নিজেরাই নিজেদের লোকসানে ফেলেছে এবং তারা যা-কিছু গড়ে রেখেছিল (অর্থাৎ তাদের দেবতাগণ), তারা তাদের থেকে অন্তর্হিত হয়েছে। (সূরা আ’রাফ:৫৩) তখন এরা ওসিয়াত করতে সমর্থ হবে না এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে আসতেও পারবে না। (সূরা ইয়াসিন: আয়াত,৫০)
সম্মানিত পাঠক একটু চোখ বন্ধ করে আমরা বিভীষিকাময় পরিস্থিতি অনুধাবণ করতে চেষ্টা করি যেদিন কেউ কারো কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে বলেন, তোমরা সেই দিনকে ভয় কর যেদিন কেউ কারও কোন কাজে আসবে না, কারও সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না, কারও নিকট হতে বিনিময় গৃহীত হবে না এবং তারা কোন প্রকার সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না। (সূরা বাকারা,আয়াত:৪৮)
যারা নিজেদের দীনকে ক্রীড়া-কৌতুকের বিষয় বানিয়েছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে ধোঁকার মধ্যে ফেলেছে, তুমি তাদেরকে পরিত্যাগ কর এবং এর (অর্থাৎ কুরআনের) মাধ্যমে (মানুষকে) উপদেশ দিতে থাক, যাতে কেউ নিজ কৃতকর্মের কারণে গ্রেফতার না হয় যখন আল্লাহ (-এর শাস্তি) হতে বাঁচানোর জন্য তার কোনও অভিভাবক ও সুপারিশকারী থাকবে না। আর সে যদি (নিজ মুক্তির জন্য) সব রকমের মুক্তিপণও পেশ করতে চায়, তবে তার পক্ষ হতে তা গৃহীত হবে না। এরাই (অর্থাৎ যারা দীনকে ক্রীড়া-কৌতুকের বিষয় বানিয়েছে, তারা) নিজেদের কৃতকর্মের কারণে ধরা পড়ে গেছে। কুফরে রত থাকার কারণে তাদের জন্য রয়েছে অতি গরম পানীয় ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আনআম:৭০)
আর এক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরিতে প্রতি বছর মাহে রমাদান এসে তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অর্জনের প্রশিক্ষণ আমাদের উদাসীনতাকে উজ্জীবিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
হে মানুষ, তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের ওপর রোযা ফরয করে দেয়া হয়েছে, যেমনি করে ফরয করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা (এর মাধ্যমে আল্লাহকে) ভয় করতে পারো; (আল-বাক্বারা:১৮৩)
আমাদের কারুর যেকোনো ধরনের বড়ো ব্যাধি বা রোগ হলে আমরা কি করি! সাধারণত: তা আরোগ্যকল্পে ডাক্তার মহোদয়গণের নির্দেশনা পালনে একান্ত সক্রিয় হয়ে পড়ি, অনুরূপ কেউ যখন তাকওয়ার গুন অর্জনে ধন্য হয় তখনই সে ব্যাক্তি আল্লাহর বিধান জেনেবুঝে যথাযথ মর্যাদায় তা পালনে সক্রিয় ও প্রতিমূহুর্তে অনুপ্রাণিত হয়ে তা বাস্তবায়নের শতভাগ প্রচেষ্টায় নিবেদিতপ্রান হয়। আর এভাবেই একজন মানুষ আল্লাহর বিধান পালনে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে প্রকৃত মুসলিম ও আল্লাহর প্রিয় বান্দা-বান্দীতে পরিণত হয় এবং জান্নাতের উপযোগী হয় ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার এবং প্রতিজ্ঞা সামান্য মুল্যে বিক্রয় করে, আখেরাতে তাদের কোন অংশ নেই। আর তাদের সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না। তাদের প্রতি (করুণার) দৃষ্টিও দেবেন না। আর তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না। বস্তুতঃ তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। (সূরা ইমরান :৭৭)
যখন সব কাজের ফায়সলা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবেঃ নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছি, অতঃপর তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের উপর তো আমার কোন ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু এতটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছি, অতঃপর তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছ। অতএব তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করো না এবং নিজেদেরকেই ভৎর্সনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্যকারী নই। এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্যকারী নও। ইতোপূর্বে তোমরা আমাকে যে আল্লাহর শরীক করেছিলে, আমি তা অস্বীকার করি। নিশ্চয় যারা জালেম তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা ইব্রাহীম, আয়াত:২২)
সিয়াম সাধনার মৌলিক লক্ষ ও উদ্দেশ্য হলো তাকওয়ার গুনে গুণান্বিত হওয়া। আমাদের যাদের আকাশ পথে বিমানে জানালার পাশে বসে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে তারা নিশ্চয়ই পাহাড়সম মেঘমালার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে বেগবান গতিময়তা প্রত্যক্ষ করে অভিভূত হয়েছি, মনে হয় মহাপরাক্রমশালী মালিকের ভয়ে প্রকম্পিত হয়ে সৃষ্টি জগতের প্রতিটি অনু-পরমাণুর অবস্থা ঠিক চোখে দেখা মেঘ মালার মতোই আল্লাহর আদেশ পালনে স্ব স্ব অবস্থানে সবাই বদ্ধপরিকর। একমাত্র মানুষকে আল্লাহ তায়ালা চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন তাদের পরীক্ষা করার জন্য এবং জীবন পরিচালনার জন্য আল্লাহর সংবিধান মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল করেছেন। তাকওয়া অর্জন মূলত কুরআনের যথাযথ অনুশীলন ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ নিষেধ বাস্তবায়নের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অন্তরে অবস্থান করে। তাকওয়া যার যতো মজবুত আল্লাহর নিকটে তিনি ততো সম্মানিত, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
তোমরা তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে ক্ষমা পাওয়ার কাজে প্রতিযোগিতা করো, আর সেই জান্নাতের জন্যেও (প্রতিযোগিতা করো) যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবী সমান, আর এই (বিশাল) জান্নাত প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে সে সব (ভাগ্যবান) লোকদের জন্যে, যারা আল্লাহ্কে ভয় করে,(৩-আলে-ইমরান:১৩৩,) (এর বিপরীত) যারা (আল্লাহ তায়ালাকে) ভয় করে তারা অবশ্যই (সেদিন) জান্নাত ও ঝর্ণাধারায় (বহুমুখী নেয়ামতে) অবস্থান করবে; (১৫-আল-হিজর:৪৫,)
হে মানব সম্প্রদায়, আমি তােমাদের একটি পুরুষ ও একটি নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর আমি তােমাদের জন্যে জাতি ও গােত্র বানিয়েছি, যাতে করে (এর মাধ্যমে) তােমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারাে, কিন্তু আল্লাহর কাছে তােমাদের মাঝে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে (আল্লাহ তায়ালাকে) বেশী ভয় করে, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সব কিছু জানেন এবং সব কিছুর (পুংখানুপুংখ) খবর রাখেন।
(৪৯-আল-হুজুরাত:১৩) সিয়াম সাধনার মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ হলো তাকওয়া অর্জন। আর একজন মুত্তাকী মুসলিম সদাসর্বদা আল্লাহর হুকুম পালনে অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে মুত্তাকী ও মুমিন হওয়ার তাওফিক দান করুন।