মোহাম্মদ আলম ফরিদ: মানচিত্র কেবল কাগজে আঁকা রেখা নয়; এটি ক্ষমতার জবরদস্তি, মিথ্যার ছুরি এবং সত্যের রক্তাক্ত সাক্ষ্য। প্রতিটি রেখা এক অহংকারের দাবিদার, এক দখলদারের নির্দেশ—যাকে কখনো কিতাবের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে, কখনো পুরাতন কাহিনীর অংশ কেটে মিলে বৈধতার লেবাস দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত “গ্রেটার ইসরাইল” এবং সিন্ধু থেকে লঙ্কা পর্যন্ত “অখণ্ড ভারত”—দুটি আলাদা ভূখণ্ডের দুটি ভিন্ন ভ্রান্ত কল্পনা, কিন্তু লক্ষ্য একই: দখল, আধিপত্য, এবং মুসলিম উম্মাহর মানচিত্রকে টুকরো টুকরো করা। এই ধরণের ফিতনা শুধু ভূ-রাজনীতি নয়; এটি এক বাস্তবতার বাইরে চলে যাওয়া বিভ্রান্তি, যেখানে ইতিহাস বিকৃত করা হয়, ধর্মীয় সত্য বদলে দেখানো হয় এবং ক্ষমতার মোহ বাস্তবতাকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
“গ্রেটার ইসরাইল” বা Eretz Yisrael HaShlema–র ধারণা আসে তাওরাতের নির্বাচিত অংশের ভুল রাজনৈতিক ব্যাখ্যা থেকে, যেখানে নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত একটি কথিত “প্রতিশ্রুত ভূমি” আঁকা হয়, কিন্তু ন্যায়, সততা এবং প্রতিবেশীর অধিকারকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়। আধুনিক যুগে জায়োনিস্টরা এই বিকৃত ব্যাখ্যাকে রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ব্যবহার করে। ১৯৬৭ সালের দখল–যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব আল-কুদস এবং গোলান দখল করে তারা এই ভুয়া ইতিহাসকে পুনর্জন্মের গল্প বানায়। বাস্তবে এটি ছিল সামরিক শক্তি, পশ্চিমা কূটনীতি এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার এক মিশ্রণ—যা আন্তর্জাতিক আইনের ওপরে নিজেকে দাঁড় করাতে চেয়েছিল।
আজকের ইসরাইলি ডানপন্থী রাজনীতিতে “সমুদ্র থেকে নদী পর্যন্ত”–স্লোগান আর প্রান্তিক নয়; এটি মূলধারার ভাবনা। লিকুদসহ ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তার হুমকি বা “বিদেশি” হিসেবে ছোট করে দেখায়; প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই দখলকে “ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব” হিসেবে উপস্থাপন করতে চান, যেন বালফোরের ছায়া এখনও জীবন্ত। ফলে আল-কুদসে অবরোধ, গাজায় নৃশংস বোমা বর্ষণ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে “গ্রেটার ইসরাইল” প্রকল্প বাস্তবে মজলুমদের রক্তের ওপর দাঁড়ানো এক সাম্রাজ্যবাদী কল্পমানচিত্র।
হিন্দুত্ববাদী “অখণ্ড ভারত”ও এই একই ধরনের উপমহাদেশীয় ধারণা। হিন্দুত্ববাদী তাত্ত্বিক বিনায়ক দামোদর সাভারকার এবং আরএসএস-এর লেখা অনুযায়ী ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি অবিভক্ত “হিন্দু সভ্যতা” হিসেবে দেখানো হয়, যেখানে বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, কখনো আফগানিস্তান ও মিয়ানমারও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২৩ সালে নয়াদিল্লির নতুন সংসদ ভবনের ভেতরের মানচিত্রে পাকিস্তান–বাংলাদেশকে “এক সভ্যতার ভূখণ্ড” হিসেবে দেখানো হয়েছিল—এটি কল্পনার প্রতীকী ঘোষণা মাত্র। কিন্তু এই “অখণ্ডতা”-র ভেতর অ-হিন্দু, বিশেষত মুসলিমদের জন্য থাকে সীমিত নিরাপত্তা এবং বিশাল অনিশ্চয়তা; নাগরিকত্বের সন্দেহ, কাশ্মীরে অধিকার অবরুদ্ধ থাকা, এবং “ঘর-ফিরতি”র চাপ—সব মিলিয়ে এটি বাস্তবে এক রাজনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার উৎস।
এই দুই প্রকল্পে মিল স্পষ্ট:
- নির্বাচিত অতীতকে ব্যবহার করে বর্তমান দখলদারী লক্ষ্যকে বৈধতা দেওয়া,
- ভূখণ্ডের প্রশ্নকে “সভ্যতা” বা ধর্মের ভাষায় সাজানো,
- মুসলিম উপস্থিতিকে নিরাপত্তা-হুমকি, ষষ্ঠ কলাম বা “বাহিরের অন্য” হিসেবে উপস্থাপন করা
অর্থাৎ, গ্রেটার ইসরাইল এবং অখণ্ড ভারত—উভয়ই আধুনিক অজ্ঞতার মানচিত্র, যেখানে অহংকারের সীমানা মাপা হয় ট্যাঙ্ক, মিসাইল এবং মিডিয়ার গল্প দিয়ে।
এর মাঝেই এসে পড়েছে বর্তমান ইসরাইল–আমেরিকা বনাম ইরান যুদ্ধ, যা পুরো সমীকরণকে নতুন দিক দিয়েছে। ইরান বহু দশক ধরে ইস্তিকামাহর সঙ্গে এক ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে (war of attrition) অভ্যস্ত; পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, গেরিলা–ধর্মী প্রতিরক্ষা, এবং ড্রোন–মিসাইল প্রযুক্তিতে অপ্রত্যাশিত অগ্রগতি – সব মিলে সে এখন আর ২০০৩ সালের ইরাক নয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ও সামরিক কৌশলবিদ ডগলাস ম্যাকগ্রেগরসহ বহু পশ্চিমা বিশ্লেষক স্বীকার করছেন, ইরান আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামোতে এমন আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে যা দীর্ঘমেয়াদী স্থল–হস্তক্ষেপকে প্রায় আত্মঘাতী করে তোলে। একইভাবে চীনা পণ্ডিত ও গেম–থিওরি বিশ্লেষক প্রফেসর জিয়াং শুয়েকিন এবং বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর জেফরি স্যাক্স দেখাচ্ছেন—এই যুদ্ধ আর ক্ল্যাসিক “রেজিম চেঞ্জ”–এর খেলা নয়; এটি এক বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার পতনের লক্ষণ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যিক হেজিমনি নিজেই নিজের ওজনের নিচে ধ্বসে পড়ছে।
ইসরাইল এই অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে “গ্রেটার ইসরাইল” বা Pax Judaica প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে—নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত প্রযুক্তি ও সামরিক কেন্দ্র, যেখানে সৌদি, মিসর ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্র হবে নির্ভরশীল। কিন্তু এই স্বপ্ন দাঁড়ানো আছে মজলুম ফিলিস্তিনির রক্তের ওপর, লেবাননের প্রতিরোধের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনায়, এবং সিরিয়ায় ধারাবাহিক আগ্রাসনের মাধ্যমে। যুদ্ধ যদি ইরানকে সাময়িক দুর্বল করে, ফিলিস্তিন–লেবানন–ইরাক–ইয়েমেনের নেটওয়ার্ক ভিত্তিক প্রতিরোধ গ্রেটার ইসরাইলের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা দেয় না; বরং এক চিরস্থায়ী অনিশ্চয়তার মানচিত্র তৈরি করে।
প্রফেসর জিয়াং শুয়েকিন–এর বিশ্লেষণ এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, গ্রেটার ইসরাইল বা আমেরিকান হেজেমনি—দু’টিই শেষ পর্যন্ত ভুলভাবে খেলা এক কৌশলগত ‘গেম’, যেখানে শক্তি–প্রদর্শন যত বাড়ে, কৌশলগত নিরাপত্তা তত কমে। গেম থিওরির ভাষায় যুক্তরাষ্ট্র আজ এমন এক এসকেলেশন ল্যাডারে দাঁড়িয়ে, যেখানে ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়াতে বাড়াতে এক পর্যায়ে ‘মিশন ক্রিপ’–এর ফাঁদে আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার এখনো এক সভ্যতাগত ট্যাবু—যা ভাঙা মানে কৌশলগত আত্মহত্যা। এই প্রেক্ষাপটে আল–আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রশ্ন সবচেয়ে স্পর্শকাতর: সেখানে কোনো আঘাত মানে আর শুধু এক দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, বরং উম্মাহ–ব্যাপী আবেগের বিস্ফোরণ, যা বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্যই বদলে দিতে পারে।
এই পটভূমিতে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধকে আলাদা করে দেখা যায় না। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তাত্ত্বিক প্রফেসর জন মিয়ারশাইমার থেকে শুরু করে প্রফেসর জেফরি স্যাক্স—অনেকেই বলেছেন, ইউক্রেন সংকটে ন্যাটোর বিস্তারের জেদ এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা–আতঙ্ক উপেক্ষা করাই যুদ্ধের মূল সূত্রপাত। এখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ফ্রন্ট খোলায় যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ছড়িয়ে পড়েছে; ইউক্রেন ফ্রন্টে রাশিয়া কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে। অর্থাৎ এক সাম্রাজ্যের হঠকারীতা অন্য সাম্রাজ্য–বিরোধী শক্তিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে শক্তিশালী করছে। ইউরোপ এই পুরো খেলায় প্রায় “অসহায় দাহ্য কুণ্ড”—নিজের কৌশলগত চিন্তাশক্তি না রেখে ওয়াশিংটনের আনুগত্যে আবদ্ধ, যার মাশুল দিচ্ছে জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মাধ্যমে।
চীনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে “বেল্ট অ্যান্ড রোড”–এর মাধ্যমে অর্থনির্ভর নরম প্রভাব তৈরি করেছে, যেখানে স্থিতিশীলতা প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু মার্কিন চাপ যখন একসঙ্গে ইরান–তাইওয়ান–দক্ষিণ চীন সাগরে বাড়ছে, চীন বাধ্য হচ্ছে রাশিয়া ও ইরানের দিকে ঝুঁকতে, যদিও সে পুরনো বিশ্বব্যবস্থাকে ধরে রাখতে চায়।
মুসলিম উম্মাহর দৃষ্টিতে মানচিত্রের অর্থ হলো ন্যায়, সততা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা। কুরআন মানুষকে পৃথিবীর দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়; এই দায়িত্ব কোনো সাম্রাজ্য তৈরি করার অধিকার নয়, বরং জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ব। ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপে শিশুদের “আমরা অটল” ঘোষণা, কাশ্মীরের তরুণের পরিচয় রক্ষার সংগ্রাম, ইয়েমেনে খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা—এসব কোনো সাম্রাজ্যের নকশা নয়; এগুলো অস্তিত্বের মৌলিক অধিকার আদায়ের লড়াই।
আজ বিশ্ব যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের দিনগুলোর মতো এক অদৃশ্য সীমানায় দাঁড়িয়েছে। প্রফেসর জেফরি স্যাক্স বলেছেন, ইরান–ইসরাইল সংকট ও ইউক্রেন যুদ্ধ আলাদা করে দেখলে বাস্তবতা থেকে পালানো হয়। কর্নেল ডগলাস ম্যাকগ্রেগর বারবার বলেছেন, রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো যুদ্ধ এড়িয়ে চলা, যুদ্ধ খুঁজে নেয়া নয়—তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের রাজনৈতিক এলিট যেন উল্টো দিকে ছুটছে।
ইসলামি এশকাটোলজির বা আখিরোজ্জামান দর্শনের আলোকে সমসাময়িক বিশ্লেষণে পরিচিত আলেম শায়খ ইমরান নাজির হোসেন এই পুরো সংকটকে “Pax Britannica → Pax Americana → Pax Judaica”–র ধারাবাহিক ছায়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশ ও মার্কিন সাম্রাজ্য কেবল দাজ্জালীয় বিশ্বব্যবস্থার পূর্ব প্রস্তুতির ধাপ, যার চূড়ান্ত রূপ হবে জেরুসালেম–কেন্দ্রিক এক অস্থায়ী Pax Judaica। তবে তিনি সতর্ক করেন—এই সাম্রাজ্য স্থায়ী নয়; বরং ইসলামী আখিরযামান বর্ণনামতে এটি ইমাম মাহদী, খুরাসানের বাহিনী এবং অবশেষে ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)–এর নুযূলের পূর্ববর্তী শেষ অন্ধকার পর্ব।
সময়ের স্রোতে এই গল্পের শেষ অধ্যায় এখনো লেখা হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের নিয়ম বলে: যখন অহংকারী সাম্রাজ্য নিজেদেরই তৈরি ফাঁদে আটকে যায়, তখন ন্যায়ের ছোট ছোট পদক্ষেপ—দোয়া, তাওহিদ প্রচার, সঠিক জীবনধারা ও রাজনৈতিক সচেতনতা—মিলেই পৃথিবীর মানচিত্র বদলে যায়। আজকের ফিতনার যুগে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব হলো—গ্রেটার ইসরাইল বা অখণ্ড ভারতের মতো ভ্রান্ত মানচিত্র নয়, বরং দুঃখী ও নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের মানচিত্র কল্পনা করা এবং তা বাস্তবে রূপ দেওয়া।