বাংলাদেশ থেকে টেক্সাস: আমেরিকার বিদ্যুৎ গ্রিড বিপর্যয় রুখে দেওয়া এক বাংলাদেশির গল্প

শেখ আলী হায়দার এবং নাজিম মাহমুদ: ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি। প্রবল তুষারঝড় ইউ ‘উইন্টার স্টর্ম ইউরি-র আঘাতে মুহূর্তের মধ্যেই স্থবির হয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্য। বিশ্বের অন্যতম উন্নত এই অর্থনীতির চাকা থেমে যায়। জমে অচল হয়ে পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো, স্তব্ধ হয়ে পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। তীব্র শীতে বিদ্যুৎ, তাপ ও পানিহীন হয়ে পড়েন লাখো মানুষ। প্রাণ হারান ২১০ জনেরও বেশি। আমেরিকার মতো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এমন ধস জনমনে বড় প্রশ্ন তোলে-কীভাবে ঘটল এই বিপর্যয়, আর কার নেতৃত্বে ফিরবে মানুষের আস্থা?

পরবর্তী বছরগুলোতে টেক্সাসের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে এবং এমন ট্র্যাজেডি যেন আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে যিনি নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তিনি একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী। নাম রায়হান খন্দকার। বাড়ি বাংলাদেশের খুলনায়।

প্রায় তিন দশক আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে কানাডায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানে পারমাণবিক শক্তি খাতে গড়ে তোলেন সফল ক্যারিয়ার। তবে যে মূল্যবোধ তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে, তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল এই বাংলাদেশেই। তাঁর মা রিনা গুলশান একজন সমাদৃত লেখিকা এবং বাবা ড: কে, এ, কাজিম একজন বিশিষ্ট প্রকৌশলী, কুয়েটের (কুয়েট)- যন্ত্রকৌশল বিভাগের সাবেক ডিন ও যুক্তরাজ্যের সম্মানজনক ‘আর্থার চার্লস অ্যাওয়ার্ড’-প্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব। এমন পরিবেশে বড় হয়ে রায়হান শিখেছিলেন-প্রকৌশল কেবল দক্ষতার প্রয়োগ নয়; এটি জনসেবার এক গভীর দায়িত্ব।  এমন পরিবারেই রায়হানের মূল্যবোধের ভিত্তি গঠিত হয়-প্রকৌশল শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি জননিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধের পেশা।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিশেষজ্ঞ হিসেবে পারমাণবিক শক্তিতে সনদ অর্জন করেন-যে দায়িত্বের জন্য প্রয়োজন হয় নিখুঁত মনোযোগ ও উচ্চমানের দক্ষতা।

তবে ‘উইন্টার স্টর্ম ইউরি’ পরবর্তী সংকটই তাঁকে নিয়ে আসে আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ পুনর্গঠন উদ্যোগের কেন্দ্রে।

বিপর্যয়ের পর টেক্সাস কর্তৃপক্ষ তাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়। এর আওতায় ছিল শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিশাল অবকাঠামো-যার মধ্যে রয়েছে ১৪৫০টিরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ৬৭০০টিরও বেশি গ্রিড সাবস্টেশন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছিল না; এর জন্য প্রয়োজন ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেন রায়হান খন্দকার।

তিনি গড়ে তোলেন বিশ্বের প্রথম পেশাদার ‘ওয়েদারাইজেশন ইন্সপেক্টর ট্রেনিং একাডেমি’, প্রবর্তন করেন মানসম্মত পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি শনাক্তকরণে রিয়েল-টাইম অ্যানালিটিক্স সিস্টেম। তাঁর নেতৃত্বে গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা আর কাগুজে পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি-বাস্তবে রূপ নেয়, পরিমাপযোগ্য হয়। এর প্রমাণ মেলে পরবর্তী শীতগুলোতে।

এর প্রভাব পরবর্তী শীতকালগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২১ সালের বিপর্যয়ের সময় টেক্সাস প্রায় ৩৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়েছিল যখন চাহিদা ৬৯ হাজার মেগাওয়াটেরও  বেশি ছিল। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে এলিয়ট, হেদার, কোরা এবং এনজো-র মতো চারটি বড় তুষারঝড় আঘাত হানলেও টেক্সাসের গ্রিড ছিল অবিচল। অথচ এই ঝড়গুলোর তীব্রতা ছিল ২০২১ সালের মতোই। এই ধারাবাহিক সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তুষারঝড় কিংস্টন ‘উইন্টার স্টর্ম কিংস্টন’-এর সময়। তখন টেক্সাসে বিদ্যুতের শীতকালীন চাহিদা ৮০,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়ে এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ৯৬ থেকে ৯৯ শতাংশই সচল ছিল।

এই স্থিতিশীলতা টেক্সাসের অর্থনীতিতেও বড় জোয়ার এনেছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা পেয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং হাইপারস্কেল এআই (অও) ডেটা সেন্টারগুলো এখন টেক্সাসে তাদের কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। বিনিয়োগকারীদের ফিরে আসা আস্থার চিত্র ফুটে ওঠে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেই। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টেক্সাসের গ্রিডে যুক্ত হওয়ার জন্য ২০০০-এরও বেশি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবেদন জমা পড়েছে, যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৪৩৫০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।

রায়হান খন্দকার বর্তমানে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (ওঅঊঅ)-সহ বিভিন্ন বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবুও তিনি ভুলে যাননি তাঁর শেকড়। বাংলাদেশের পারিবারিক আবহ থেকে পাওয়া সততা, বিনয় এবং জনসেবার মানসিকতাই তাঁর চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের জন্য রায়হানের এই যাত্রা এক অসামান্য গর্বের। তিনি কেবল প্রবাসে সফল একজন প্রকৌশলী নন। বেড়ে ওঠার সঠিক পরিবেশ এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়ন পেলে বাংলাদেশিরা যে বিশ্বমঞ্চে কত বিশাল ও যুগান্তকারী অবদান রাখতে পারে, তিনি তারই জীবন্ত প্রমাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *