সুপ্রভাত সিডনি রিপোর্ট: গত ২৬শে মার্চ, ২০২৬ ছিল অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণ কর্মদিবস। কোনো সরকারি ছুটি না থাকা সত্ত্বেও ক্যানবেরার বাংলাদেশ দূতাবাস এবং সিডনি কনসুলেটে অত্যন্ত রাজকীয়ভাবে পালিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। ক্যানবেরার আয়োজনটি সম্পন্ন হয় পাঁচতারা হোটেল ‘হায়াত হোটেল ক্যানবেরা’-র বলরুমে এবং সিডনির অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয় নিউ সাউথ ওয়েলস পার্লামেন্ট হাউসের একটি ভাড়া করা কক্ষে। একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষ থেকে বিদেশের মাটিতে এমন বিলাসিতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আয়োজনে প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানের নেপথ্যে:
সুপ্রভাত সিডনির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল অর্থ ব্যয়ের এই মহোৎসবের পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি। বিগত দিনগুলোতে ক্যানবেরা ও সিডনি কনসুলেটকে কার্যত আওয়ামী লীগের স্থানীয় কার্যালয়ে রূপান্তর করা হয়েছিল এবং পালিয়ে আসা নেতা-কর্মীদের আশ্রয়স্থলে পরিণত করা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই বিতর্কিত অতীত ঢাকতে এবং নবনির্বাচিত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই জনহিতৈষী কাজের পরিবর্তে রাজকীয় অপচয়ের পথ বেছে নিয়েছে এই দুই কূটনৈতিক দপ্তর।
তহবিলের উৎস ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড:
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ধরনের রাজকীয় আয়োজনের অর্থের উৎস নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, পুরো অনুষ্ঠানের অর্থায়ন করেছে অধুনালুপ্ত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতদের সিংহভাগই ছিল উক্ত নিষিদ্ধ সংগঠনের অনুসারী। এমনকি একজন অস্ট্রেলীয় সংসদ সদস্যকে ব্যবহার করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে শেখ মুজিবের স্তুতি গাওয়া এবং অপ্রাসঙ্গিকভাবে আওয়ামী লীগের আসন্ন বৈশাখী মেলার প্রচার চালানো হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান বা ভূমিকা, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ‘জুলাই বিপ্লবের’ যোদ্ধাদের অবদানকে উপেক্ষা করে কেবল শেখ মুজিবুর রহমানের গুণগান করায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার উপস্থিত সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে কনসাল জেনারেলের কাছে এই ঔদ্ধত্যের ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় যখন বিএনপির পরিচয়ধারী একজন বিতর্কিত ব্যক্তি (তৌহিদ-রাশেদ গ্রুপ) প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠরোধ করতে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই দৃশ্য ছিল অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং দৃষ্টিকটু।
ঘাপটি মেরে থাকা ‘আওয়ামী দোসর’:
দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে আওয়ামী লীগ প্রতিটি স্তরে নিজস্ব অনুসারীদের বসিয়ে দিয়ে গেছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যানবেরা ও সিডনিতে ঘাপটি মেরে থাকা এই সুবিধাভোগীরা আসলে কারা? অভিজ্ঞ মহলের মতে, তারা দিনে বিএনপির ভেক ধরলেও রাতে আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক অনুদান ছাড়া এই ধরনের আয়োজন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দেশের অর্থ অপচয় করে এই তথাকথিত ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ প্রদর্শনের যৌক্তিকতা কোথায়?
রাষ্ট্রনায়কের প্রচেষ্টা ও প্রবাসে ষড়যন্ত্র:
যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ভেঙে পড়া রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনে দিনরাত পরিশ্রম করছেন, সেখানে প্রবাসে বসে কিছু কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত ব্যক্তি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একজন সংসদ সদস্যকে দিয়ে দলীয় প্রচারণা চালানো কি প্রবাসে আওয়ামী দুঃশাসনের প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত?
জবাবদিহিতার দাবি:
কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, ভুল তথ্য প্রদান ও দলীয় বৈশাখী মেলার প্রচারের দায়ে উক্ত অস্ট্রেলীয় সংসদ সদস্যকে শোকজ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ মহলে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করা হবে। দূতাবাস বা কনসুলেটের কর্মকর্তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই—এই সংস্কৃতি আর চলতে দেওয়া যায় না। এদের প্রকৃত উপদেষ্টা কারা? কেন বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা আওয়ামী দোসরদের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারছে না?
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক। এখানে অন্যায় করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। ধারণা করা হচ্ছে, এই গর্হিত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে তার পদ হারাতে হতে পারে। সুপ্রভাত সিডনি প্রবাসী শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের পক্ষ থেকে এই বিতর্কিত অনুষ্ঠানের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং দূতাবাস ও কনসুলেটের এই কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছে।