
ডা. সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ: আসসালামু আলাইকুম প্রিয় বন্ধু,
আমার মনে আছে একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ইসলামী কোনো একটি বিষয়ের ওপর লেকচার শুনতে গিয়েছিলাম। বক্তা ছিলেন গণিত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রমজান আলী। তিনি বলেছিলেন, মানুষ দুই প্রকার: একদল যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ইবাদত করে এবং তাঁর আদেশ মেনে চলে, আর অন্য দলটি শয়তানের প্ররোচনা ও নির্দেশ অনুসরণ করে।
আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে যৌক্তিক চিন্তাধারা দিয়ে আমার ধর্মকে দেখি। মনোরোগবিদ্যা (Psychiatry) চর্চা করতে গিয়ে আমি দেখেছি (আপনিও হয়তো একমত হবেন) যে, পশ্চিমা বিশ্বের মানুষদের চিন্তাধারা অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর। সেখানে সবকিছুই তথ্য-প্রমাণ ভিত্তিক। যখন পশ্চিমা পরিসংখ্যান দেখায় যে তরুণ শ্বেতাঙ্গ নারীদের মাঝে ইসলাম গ্রহণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, তখন আমাদের একটু থেমে বিষয়টি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। ইসলামের সমালোচকদের বহুল চর্চিত মূল মন্ত্র হলো, মুসলিমরা নারীবিদ্বেষী এবং সন্ত্রাসী। অথচ আপনি যদি কোনো শ্বেতাঙ্গ নওমুসলিম নারীর গল্প পড়েন, তবে দেখবেন তারা সকল ধর্ম নিয়ে গবেষণা করার পর অনুধাবন করেছেন যে, একমাত্র ইসলামই নারীকে তাদের প্রাপ্য অধিকার ও মানবিক সম্মান দিয়েছে। আপনি জানেন, এমনকি ১৯ শতকের ইউরোপেও নারীদেরকে স্থাবর সম্পত্তি বা পণ্যের মতো বিবেচনা করা হতো। বিখ্যাত বৃটিশ সাংবাদিক ইভন রিডলি’র কথাই ধরা যাক, তাঁর ডকুমেন্টারিগুলো দেখার মতো। তিনি কীভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তা সবারই জানা দরকার।
এবার আসি সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে। পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা মানে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করা এবং একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণ বাঁচানো মানে সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করা। একজন মুসলিম কেবল আত্মরক্ষার্থেই যুদ্ধ বা কাউকে হত্যা করতে পারে। মুষ্টিমেয় কিছু বিপথগামী অপরাধীর জন্য ইসলামকে দোষারোপ করা হয়; মূলত মুসলিমরা এখানে মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যমের অপপ্রচারের শিকার। আপনার নিশ্চয়ই ওকলাহোমা বোমারু টিমোথি ম্যাকভেই-এর কথা মনে আছে? সংবাদমাধ্যম তাঁকে খ্রিস্টান হিসেবে পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। আমি কখনো মিডিয়াকে হিটলার বা মুসোলিনিকে খ্রিস্টান বলতে দেখিনি। মজার ব্যাপার হলো, একজন ইহুদি রাব্বি বলেছিলেন, ইউরোপে যদি মুসলিমরা ক্ষমতায় থাকতো তাহলে হয়তো ইহুদিরা রক্ষা পেত। স্পেনে যখন ইহুদিরা নির্যাতিত হয়েছিল, তখন তারা তৎকালীন অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল।
আরেকটি প্রচলিত মিথ বা ধারণা হলো যে, ইসলাম তলোয়ারের মাধ্যমে ছড়িয়েছে। টমাস আর্নল্ড তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য প্রিচিং অফ ইসলাম’-এ বলেছেন যে, মুসলিমরা কখনোই জোরপূর্বক ধর্ম প্রচার করেনি; যদি তা-ই হতো তবে স্পেন ও ভারতে তারা আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকত। আমাদের এম.এন. রায়ের লেখা বিখ্যাত বই ‘দ্য হিস্টোরিক্যাল রোল অফ ইসলাম’ পড়া উচিত; রায় ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা।
আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না। কয়েক সংস্করণ আগে ‘ক্যাপলান অ্যান্ড স্যাডক’ তাদের মনোরোগবিদ্যার পাঠ্যপুস্তকে চিকিৎসার ইতিহাস লিখতে গিয়ে আবু সিনার (যাঁকে তারা অ্যাভিসেনা বলে) কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ক্যানন অফ মেডিসিন’ প্রায় ৫০০ বছর ধরে ইউরোপে চিকিৎসার একমাত্র পাঠ্যবই ছিল। ইসলামি ইতিহাসে আমাদের কোনো ‘মধ্যযুগ’ বা অন্ধকার সময় নেই। ইউরোপের সেই অন্ধকার যুগে মুসলিমরাই বাগদাদ ও স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রিক দার্শনিকদের জ্ঞান ও বইসমূহ সংরক্ষণ করে রেখেছিল।
মুসলিম হিসেবে আমাদের ইতিহাস জানা খুব জরুরি। একইসাথে আমাদের কোরআনের অর্থ শেখাও গুরুত্বপূর্ণ; অনেক মুসলিম সূরা ফাতিহার অর্থ পর্যন্ত জানেন না। একজন মুসলিমের জন্য একমাত্র মনের প্রশান্তি তখনই সম্ভব যখন তারা ইসলাম চর্চা করবে, যার শুরু হয় সালাত বা নামাযের মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, যখনই আমরা নতুন জীবন শুরু করতে চাই বা মসজিদে যাওয়া ও কোরআন পড়া শুরু করতে চাই, তখনই আমাদের নফস এবং শয়তান বাধা সৃষ্টি করবে ও গড়িমসি করতে প্ররোচনা দেবে। সূরা আরাফে শয়তানের প্রতিজ্ঞার কথা উল্লেখ আছে যেখানে জানা যায় সে ওয়াদা করেছে যে, সে আমাদের ডান, বাম, সামনে এবং পেছন, সব দিক থেকে আক্রমণ করবে।
আলহামদুলিল্লাহ, এখন ইসলামের এক নবজাগরণ চলছে। আপনি দেখবেন আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় হাজার হাজার মুসলিম চিকিৎসক ইসলামের জন্য কাজ করছেন। ইসলামের বাণী প্রচার করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
পরিশেষে বলব, আমাদের উচিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-কে অনুসরণ করা এবং হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি, প্রকৃতিবাদী ও নাস্তিকসহ সকল ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আমরা কেবল আমাদের ধর্মের দাওয়াত দিতে পারি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই’। যদি আমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মেনে চলি, তবে তা আমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই হবে।
দয়া করে আমার এ কথাগুলোর মাধ্যমে কেউ উপকৃত হবে মনে হলে, তাদের কাছে কথাগুলো পৌঁছে দেবেন। সব ভুলত্রুটি আমার একান্তই নিজস্ব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবজাতিকে রক্ষা ও সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।