
মেশকাতুন নাহার : একটি শহরকে বোঝার জন্য আকাশছোঁয়া অট্টালিকার দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়; বরং তাকাতে হয় তার নীচের অদৃশ্য স্তরে—যেখানে মাটির বুক চিরে প্রবাহিত হয় নগরের নীরব স্রোতধারা। সেই স্রোতধারার নাম ড্রেন। এটি কেবল বর্জ্য বহন করে না; এটি বহন করে আমাদের মানসিকতা, দায়িত্ববোধ, আর সভ্যতার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।২০২৬ সালের এই দ্রুতগামী সময়ে, যখন উন্নয়নের পরিসংখ্যান কাগজে-কলমে ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন ড্রেনের মুখে জমে থাকা পলিথিন যেন নিঃশব্দে প্রশ্ন তোলে—“আমরা কি সত্যিই এগোচ্ছি, নাকি শুধু উঁচুতে উঠছি?” কারণ উন্নয়ন যদি হয় শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্যের অলংকার, তবে তা ভেতরের পচন ঢাকার এক প্রলেপমাত্র।
ড্রেন আসলে শহরের শ্বাসনালী। মানুষের যেমন শ্বাস বন্ধ হলে জীবন থমকে যায়, তেমনি ড্রেন বন্ধ হলে শহরও ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়। একটু বৃষ্টি হলেই যখন রাস্তা ডুবে যায়, তখন সেটা কেবল পানি জমা নয়—সেটা এক অচল সময়ের প্রতীক। জলাবদ্ধ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন সময়ের কাছে বন্দি, তাদের গন্তব্য থেমে থাকে এক অদৃশ্য বাধার সামনে।এই জলাবদ্ধতা শুধু ভৌত দুর্ভোগ নয়; এটি এক অস্তিত্বগত সংকট। কারণ প্রতিটি জমে থাকা পানির স্তর যেন আমাদের ভুলে যাওয়া দায়িত্বের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি পলিথিনের টুকরো যেন একেকটি অবহেলার দলিল। আমরা যখন অচেতনভাবে ময়লা ফেলি, তখন আসলে আমরা নিজের পথেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করি।অদ্ভুত এক দ্বন্দ্বে আমরা বাস করি—একদিকে আমরা চাই আধুনিক শহর, অন্যদিকে আমাদের আচরণ রয়ে যায় অচেতন ও অনিয়ন্ত্রিত। এই দ্বৈততা থেকেই জন্ম নেয় নগরের অসুস্থতা। ড্রেনগুলো তখন আর কেবল নালা থাকে না; তারা হয়ে ওঠে আমাদের নৈতিক ব্যর্থতার দলিলপত্র।বর্তমান সময়ে নগরজীবনে প্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়েছে—স্মার্ট সিটি, ডিজিটাল নজরদারি, আধুনিক অবকাঠামো। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—মানুষ কি স্মার্ট হয়েছে? যদি স্মার্টফোন হাতে নিয়েও আমরা ড্রেনে আবর্জনা ফেলি, তবে সেই প্রযুক্তি কেবল বাহ্যিক এক অলংকার ছাড়া আর কিছুই নয়।
ড্রেনের ভেতরে জমে থাকা ময়লা আসলে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। এটি বলে—“তোমরা আমাকে অবহেলা করেছ, তাই আমি তোমাদের পথ রুদ্ধ করব।” এই প্রতিবাদ কখনও বৃষ্টির পানিতে, কখনও দুর্গন্ধে, কখনও রোগের বিস্তারে প্রকাশ পায়।জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে ড্রেনের ভূমিকা আরও গভীর। একটি অপরিষ্কার ড্রেন শুধু পানি আটকে রাখে না; এটি জীবাণুর জন্মভূমি হয়ে ওঠে। মশার ডানায় ভর করে ছড়িয়ে পড়ে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া—অদৃশ্য এক আতঙ্ক। তখন শহর শুধু অসুস্থ হয় না; মানুষের মনেও জন্ম নেয় এক অস্থিরতা, এক অনিরাপত্তা।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ড্রেন হয়ে ওঠে এক দার্শনিক প্রতীক—এটি আমাদের শেখায়, যা আমরা নিচে ফেলে দিই, তা একদিন উপরে ফিরে আসে। আমরা যে অবহেলা মাটির নিচে চাপা দিই, তা একসময় আমাদের জীবনযাত্রার ওপর ভেসে ওঠে। সমাধানের প্রশ্নে আমরা প্রায়ই অন্যের দিকে তাকাই—কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, প্রশাসন। নিঃসন্দেহে তাদের দায়িত্ব আছে, এবং সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা জরুরি। নিয়মিত পরিষ্কার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন—এসবই সময়ের দাবি। কিন্তু এই সমাধান একপাক্ষিক হতে পারে না। কারণ শহর কেবল প্রশাসনের নয়; এটি নাগরিকদেরও। প্রতিটি নাগরিক যখন নিজের দায়িত্ব ভুলে যায়, তখন শহরও তার ভারসাম্য হারায়। একটি পলিথিন ফেলার মুহূর্তে আমরা হয়তো ভাবি না, কিন্তু সেই ছোট কাজই বড় সমস্যার বীজ বপন করে।
তাই প্রয়োজন এক ধরনের সম্মিলিত জাগরণ—একটি নৈতিক পুনর্জন্ম। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে গণমাধ্যম, সামাজিক উদ্যোগ—সব জায়গায় এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে, ড্রেন কেবল নালা নয়; এটি শহরের জীবনরেখা।একটি পরিষ্কার ড্রেন মানে শুধু পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নয়; এটি একটি সুস্থ মানসিকতার প্রতিফলন। এটি দেখায়, একটি সমাজ কতটা দায়িত্বশীল, কতটা সচেতন। বর্তমান এই প্রেক্ষাপটে, যখন আমরা টেকসই উন্নয়নের কথা বলি, তখন ড্রেনের কথাও বলতে হবে। কারণ টেকসই উন্নয়ন মানে শুধু বড় প্রকল্প নয়; এটি ছোট ছোট দায়িত্বের সমষ্টি।শেষ পর্যন্ত, একটি শহরের সৌন্দর্য তার আলোয় নয়, তার প্রবাহে। যেখানে পানি থেমে থাকে না, যেখানে পথ আটকে যায় না, যেখানে মানুষের জীবন স্বাভাবিক ছন্দে চলতে পারে—সেই শহরই প্রকৃত অর্থে উন্নত।
ড্রেনের দিকে তাকানো মানে নিজের দিকে তাকানো। সেখানে আমরা দেখতে পাই আমাদের অবহেলা, আমাদের সীমাবদ্ধতা, আবার সম্ভাবনাও।তাই সময় এসেছে—শহরের শ্বাসনালীকে মুক্ত করার। কারণ একটি মুক্ত প্রবাহ মানেই একটি মুক্ত জীবন, আর একটি সচল ড্রেনই হতে পারে একটি সভ্য নগরের সবচেয়ে নিঃশব্দ অথচ শক্তিশালী পরিচয়।
প্রভাষক সমাজকর্, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ -চাঁদপুর