ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন: আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন, বিশ্বশান্তির জন্য ভয়ংকর সতর্কবার্তা

মো: সোহেল রানা: ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের ঘটনা একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে এক ভয়াবহ ও বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক হামলা চালিয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করার অভিযোগ আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন। এই অভিযানের রাজনৈতিক দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই—এর নেতৃত্বে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই পদক্ষেপ শুধু অবৈধই নয়, নৈতিকতাবিরোধী ও বিশ্বশান্তির জন্য গভীরভাবে হুমকিস্বরূপ।

বিশ্বনেতা, রাষ্ট্র ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম একযোগে এই আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে—নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন, বোস্টন থেকে মিনেপোলিস—রাজপথে ধ্বনিত হয়েছে একটাই দাবি: যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। এটি স্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষ এই ধরনের সামরিক দম্ভ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি যথার্থভাবেই বলেছেন—একটি সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে আটক করা কার্যত যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। একই সুরে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সম্পাদকীয় বোর্ড এই অভিযানে ‘অবৈধ ও অপরিণামদর্শী’ তকমা দিয়েছে এবং সতর্ক করেছে—এতে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে, লাতিন আমেরিকায় অস্থিতিশীলতা ছড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া তীব্র। চীন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে—এটি আন্তর্জাতিক আইন ও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন। রাশিয়া এই ঘটনাকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে ওয়াশিংটনের কাছে অবিলম্বে পরিস্থিতি স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিলও জোর দিয়ে বলেছেন—সংবিধান অনুযায়ী মাদুরোই বৈধ প্রেসিডেন্ট; তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

আজ একটি প্রশ্ন পুরো বিশ্বকে নাড়া দিচ্ছে—আজ যদি ভেনেজুয়েলা এই আগ্রাসনের শিকার হয়, কাল কি আমার বা আপনার দেশ হবে না? শক্তিধর রাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্তে যদি আন্তর্জাতিক আইন ভেঙে ফেলা যায়, তবে ছোট ও মধ্যম রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখনই আমাদের অগ্রমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয় স্পষ্ট। সমমনা রাষ্ট্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে কার্যকর জোট (Alliance) গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো দেশ একতরফাভাবে সামরিক আগ্রাসন চালাতে না পারে। কূটনীতি, সংলাপ এবং আইনের শাসন—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বৈশ্বিক শান্তি রক্ষা সম্ভব।

সবশেষে, কড়া ভাষায় বলতে হয়—ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ অবৈধ, অন্যায় ও মানবতার বিরুদ্ধে। আমরা এই আগ্রাসনের তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই—এমন ঘটনা যেন আর কখনো না ঘটে। বিশ্ব আজ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: একবিংশ শতাব্দীতে আগ্রাসন নয়, মানবতা চায় শান্তি; যুদ্ধ নয়, ন্যায়ভিত্তিক ও আইনসম্মত বিশ্বব্যবস্থা।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *