মোহাম্মদ আলম ফরিদ: অস্ট্রেলিয়া নিজেকে বহুসাংস্কৃতিক ও বহুধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে। এই রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভের ভেতরে মুসলমান সম্প্রদায় একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে স্পর্শকাতর অবস্থানে অবস্থান করছে। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৮ লক্ষ ১৩ হাজার মুসলমান বসবাস করে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩.২ শতাংশ। এই জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি তরুণ-তরুণী ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সের মধ্যে। ফলে মুসলমানদের ভবিষ্যৎ প্রশ্নটি কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, আইন, নীতি, ক্ষমতা এবং নাগরিক অবস্থানের প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—অস্ট্রেলিয়ার মুসলমানরা কি নিজেদেরকে একটি চাপে থাকা, বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে উপস্থাপন করবে, নাকি তারা নৈতিকভাবে স্বতন্ত্র কিন্তু সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে মুসলমানরা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে কীভাবে বিবেচিত হবে।
ইতিহাস এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ায় মুসলমান উপস্থিতি কোনো নতুন ঘটনা নয়। ইউরোপীয় বসতি স্থাপনের বহু আগে উত্তর অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে ইন্দোনেশিয়ার মাকাসার মুসলিম ব্যবসায়ীদের সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলমানদের আনা হয় উট বাহক বা “ক্যামেলিয়ার” হিসেবে। তারা মরুভূমি ও দুর্গম অঞ্চলে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই ইসলামী শিক্ষা, দাওয়াত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার অভাবে তাদের মুসলিম পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়—শুধু অবদান বা উপস্থিতি যথেষ্ট নয়; পরিচয় টিকিয়ে রাখতে হলে জ্ঞান, শিক্ষা ও নৈতিক ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।
আজকের অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম সমাজ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে শিক্ষা ও নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে, অন্যদিকে বৈষম্য, সন্দেহ ও নীতিগত চাপ আরও সূক্ষ্ম রূপ নিচ্ছে। বহু মুসলিম তরুণ উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে তারা অদৃশ্য বাধা, সামাজিক দূরত্ব এবং আত্মপরিচয়ের সংকটের মুখে পড়ে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ বলছে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মুসলমানরা প্রায়ই নেতিবাচক মন্তব্য ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, যা তাদের নাগরিক আস্থাকে দুর্বল করে।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত এন্টিসেমিটিজম ও হেইট স্পিচ সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় যে বিতর্ক অব্যাহত আছে, তা মুসলিম সমাজে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে বাস্তবতা হলো—এ ধরনের আইন ও নীতিমালা ভবিষ্যতে আরও আসতে পারে, শুধু এই দেশে নয়, পশ্চিমা বিশ্বজুড়েই। তাই প্রশ্নটি কোনো একটি নির্দিষ্ট আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীতি, ভাষা ও ক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বোঝা এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুত হওয়ার প্রশ্ন। বাহ্যিকভাবে এগুলো ঘৃণা দমনের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, আমরা ইতিহাস থেকে জানি, অনেক সময় আইন ন্যায়ের ভাষায় আসে, কিন্তু প্রয়োগে তা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য চাপের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাসে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাগুলো প্রায়ই আইন, সভ্যতা ও নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে কিছু জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আজ সেই ভাষা আরও পরিশীলিত ও আইনি রূপ নিয়েছে। তাই মুসলমানদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—প্রতিক্রিয়াশীল আতঙ্কে না গিয়ে, বাস্তববাদী ও দূরদর্শী প্রস্তুতির পথে এগোনো।
এই প্রক্রিয়াকে একটি ক্ষমতাভিত্তিক ন্যারেটিভ চক্র হিসেবে বোঝা যায়: প্রথমে মুসলমানদের বিশ্বাস ও রাজনৈতিক উদ্বেগকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়; এরপর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ে; সেই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াকে আবার চরমপন্থার আলামত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়; এর ফলে সমাজে ভয় তৈরি হয়; এবং শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের একাংশ নীরবতা ও আত্ম-সেন্সরশিপে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই নীরবতাই শেষ পর্যন্ত নিপীড়নকে স্থায়ী করে তোলে।
এই বাস্তবতায় মুসলমানরা যদি নিজেদেরকে কেবল “নিপীড়িত সংখ্যালঘু” পরিচয়ে আবদ্ধ রাখে, তাহলে তারা অনিচ্ছাকৃতভাবেই এই চক্রকে শক্তিশালী করে। কারণ নিপীড়নের কথা সত্য হলেও, সেটিকে একমাত্র পরিচয় বানালে সমাজ মুসলমানদের আর নৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখে না—বরং একটি “ম্যানেজ করার মতো সমস্যা” হিসেবে দেখতে শুরু করে। এটি একটি সম্ভাব্য প্রবণতা, যা সব ক্ষেত্রে বা সব রাষ্ট্রে সমানভাবে প্রযোজ্য—এমন দাবি এখানে করা হচ্ছে না।
এর বিপরীতে প্রয়োজন একটি ভিন্ন পথ—নির্মাণের পথ। মুসলমানদের আরও গভীরভাবে দাওয়াতের কাজে যুক্ত হওয়া দরকার, তবে সেটি শুধু কথার দাওয়াত নয়; বরং চরিত্র, আচরণ ও সামাজিক অবদানের মাধ্যমে দাওয়াত। তাবলীগের মূল শক্তি এখানেই—রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, বরং নৈতিক অনুশীলনে। একজন মুসলমান যখন সমাজে সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচিত হয়, তখন তার উপস্থিতিই একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী দাওয়াত হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে পেশাভিত্তিক উৎকর্ষ। চিকিৎসা, শিক্ষা, আইন, প্রকৌশল, প্রশাসন, মিডিয়া—এসব ক্ষেত্রে মুসলমানদের শক্ত অবস্থান কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির বিষয় নয়; এটি ন্যারেটিভের মালিকানা অর্জনের প্রশ্ন। যে সমাজ তার আইন ব্যাখ্যা করে, সংবাদ তৈরি করে এবং জ্ঞান উৎপাদন করে—সে সমাজই ঠিক করে কে হুমকি, আর কে সম্পদ।
উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণায় বিনিয়োগ তাই বিলাসিতা নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মরক্ষার উপায়। আবেগ সহজে অপরাধে পরিণত হয়, কিন্তু সুসংগঠিত চিন্তা আইনকে প্রশ্ন করতে পারে, নীতি প্রভাবিত করতে পারে।
ইসলামী ফাইন্যান্সও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু সুদবিহীন লেনদেন নয়; এটি অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সূচনা। যে কমিউনিটি নিজের অর্থ নিজের নীতিতে পরিচালনা করতে পারে, তাকে সহজে ভয় দেখানো বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
এই প্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা। ইসলামিক স্কুল, মক্তব এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ধর্মীয় জ্ঞান দেওয়ার স্থান নয়; এগুলো নাগরিক সচেতনতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও সমসাময়িক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্র। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ইসলামিক স্কুল ও মক্তব ইতিমধ্যেই তরুণদের আত্মবিশ্বাসী মুসলিম এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইসলামিক স্টাডিজ ও মুসলিম ছাত্র সংগঠনগুলো “অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম” পরিচয়কে একটি ইতিবাচক কাঠামো দিচ্ছে—যেখানে ইসলাম ও নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়।
এখানে হোম স্কুলিং ও ইসলামী শিক্ষার আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বড় শহরগুলোতে চালু থাকা হোম স্কুলিং প্রোগ্রামগুলো পরিবারকে সন্তানের নৈতিক ও মানসিক গঠনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ দেয়। একইভাবে ইসলামী স্কুলগুলোকে যদি সাধারণ মানুষের আয়ের সীমার মধ্যে আনা যায়, তাহলে ইসলামী শিক্ষা এলিট সুবিধা না হয়ে একটি সামগ্রিক কমিউনিটি বিনিয়োগে পরিণত হবে।
কমিউনিটি পর্যায়ে সিডনির Me Academy, Darul Tarbiyya Lakemba, Campbelltown Maktab, Daar ibn Abbas, Dar Aisha প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলো এই রূপান্তরের বাস্তব উদাহরণ। এসব প্রতিষ্ঠানে কুরআন শিক্ষা, আখলাক, নেতৃত্ব ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ একসাথে শেখানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দারুল উলুম পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, যা ভবিষ্যতে আলেম ও চিন্তাশীল নেতৃত্ব তৈরি করবে।
এই প্রেক্ষাপটে মক্তব শিক্ষা, ইসলামিক জ্ঞানচর্চা ও সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল নয়—বরং মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থানের শর্ত। ইতিহাসের ক্যামেলিয়ার মুসলমানদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আজকের প্রজন্ম যদি জ্ঞান, নৈতিকতা ও আইনি সচেতনতা একসাথে ধারণ করতে পারে, তবে তারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎই নয়, অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজকেও সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবে।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মুসলমানদের পিছিয়ে থাকার বাস্তবতা কোনো একক কারণে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে রয়েছে ইতিহাসের শিক্ষা, বর্তমান বৈষম্য, আইনি ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকত্বের প্রশ্ন। যদি এন্টিসেমিটিজম ও হেইট স্পিচ বিতর্কগুলো যথাযথ সীমারেখা ছাড়া কার্যকর হয়, তবে এটি মুসলমানদের জন্য একটি নীরব কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী নিপীড়নের যন্ত্রে পরিণত হতে পারে—যা ঔপনিবেশিক যুগের বর্ণবাদী নীতির আধুনিক সংস্করণ।
সুতরাং, আইন আসবে, নীতিমালা বদলাবে, সরকার পরিবর্তিত হবে। কিন্তু যে কমিউনিটি নৈতিকভাবে দৃঢ়, শিক্ষাগতভাবে সচেতন, জ্ঞানগতভাবে প্রস্তুত এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল—তাকে ইতিহাস দীর্ঘমেয়াদে প্রান্তিক করে রাখতে পারেনি। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করতে হলে মুসলমানদের জন্য এই বাস্তবতাগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।
প্রশ্ন একটাই: আমরা কি কেবল প্রতিক্রিয়ার ভাষায় আটকে থাকব, নাকি নির্মাণের মাধ্যমে আমাদের নাগরিক অবস্থান সংজ্ঞায়িত করব? এই সিদ্ধান্তই ঠিক করবে—ভবিষ্যতে মুসলমানরা নজরদারির বিষয় হবে, না কি সমাজের সম্মানিত ও দায়িত্বশীল অংশীদার