
সুপ্রভাত সিডনি রিপোর্ট : ভারতে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবকে “অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে” পর্যবেক্ষণ করছে অস্ট্রেলিয়া, এমনটাই জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মার্ক বাটলার। ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো যখন সীমান্তে সতর্কতা জোরদার করেছে, তখন অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে নজরদারিতে রেখেছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত দুইজনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এই ভাইরাসের কোনো কার্যকর টিকা নেই এবং এতে মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১৯৬ জন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে শনাক্ত ও অনুসরণ করা হয়েছে। পরীক্ষায় তারা সবাই নিগেটিভ এবং কারও মধ্যে কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি। তবুও অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মার্ক বাটলার টুডে অনুষ্ঠানে বলেন, “নিপাহ ভাইরাস খুবই বিরল, কিন্তু একই সঙ্গে এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছে যে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তবে তারপরও আমরা বিষয়টি খুব, খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছি, কারণ এটি অত্যন্ত গুরুতর একটি ভাইরাস।”
নিপাহ ভাইরাস মূলত ফলখেকো বাদুড়ে পাওয়া যায়। সেখান থেকে এটি অন্যান্য প্রাণী, বিশেষ করে শূকর—এবং মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আক্রান্ত হওয়ার চার দিন থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সাধারণত ফ্লু-সদৃশ উপসর্গ দেখা দেয়, যেমন জ্বর, মাথাব্যথা ও বমি। কারও কারও ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কে প্রদাহ দেখা দেয়, যার লক্ষণ হিসেবে বিভ্রান্তি ও আলোতে অতিসংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশে ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানুষের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৪৭ জন, যার মধ্যে ২৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান জেলা চিকিৎসা কর্মকর্তার বরাতে বৃহস্পতিবার জানানো হয়, নিশ্চিত দুই রোগীই স্বাস্থ্যকর্মী। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ রোগী সুস্থতার পথে এবং শিগগিরই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কথা রয়েছে। অপরজন নারী রোগী বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
মার্ক বাটলার বলেন, মানুষ থেকে মানুষে নিপাহ ভাইরাস ছড়ানো তুলনামূলকভাবে কঠিন এবং এটি কোভিড-১৯ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। তিনি বলেন, “এটির সংক্রমণের জন্য খুব ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সংস্পর্শ প্রয়োজন। মূলত মানুষের শরীরের তরলের মাধ্যমেই এটি ছড়ায়।”
তিনি আরও জানান, অস্ট্রেলিয়ায় এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। দেশটিতে আগত অসুস্থ যাত্রীদের জন্য বিদ্যমান স্বাস্থ্য প্রটোকলগুলোকে যথেষ্ট বলে মনে করছে সরকার। তবে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাটলার বলেন, “এই মুহূর্তে প্রটোকল পরিবর্তনের কোনো পরামর্শ আমাদের কাছে নেই। তবে আমরা প্রতিদিনের ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এটি একটি অত্যন্ত বিরল ভাইরাস, কিন্তু আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি খুবই বেশি ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ। তাই আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি, যদিও বর্তমানে বিদ্যমান স্পষ্ট প্রটোকল পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখছি না।”
নবগঠিত অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের এক মুখপাত্র জানান, এসব প্রটোকলের মধ্যে রয়েছে দেশটিতে প্রবেশের সময় অসুস্থতার উপসর্গ পরীক্ষা করা। ভারত দুনিয়াতে একটি অস্বাস্থকর দেশ। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ (Open Defecation) প্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। যদিও দেশটির সরকার ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রবণতা কমাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দাবি করেছে, তবুও এক বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই অভ্যাস কেন গেড়ে বসেছে, তার পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক কারণ। গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে এই প্রবণতার পেছনে শুধু শৌচাগারের অভাবকে দায়ী করা যায় না; বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী প্রথাগত এবং সাংস্কৃতিক বিশ্বাস থেকে এসেছে।প্রাচীন অভ্যাস: প্রাচীনকালে যখন জনসংখ্যার ঘনত্ব কম ছিল এবং খোলা জায়গা ছিল বেশি, তখন উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে অতটা সমস্যা সৃষ্টি করত না। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের সাথে সাথে এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়।
ভারতীয় একজন ডাক্তার বলেন, আজকের দিনে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশ। বিশ্বের ৭৫টি সবচেয়ে দূষিত শহরের মধ্যে ৭০টিই আমাদের দেশে। আর প্রতিটা শ্বাস, চুপচাপ ক্ষতি করছে আমাদের ফুসফুস, হৃদয় এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। আমি একজন পেডিয়াট্রিশিয়ান হিসেবে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত-আজকের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে দূষণ কেন আরও বিপজ্জনক?
তিনি বলেন, “বিদ্যমান ব্যবস্থার আওতায় কোনো অসুস্থ যাত্রী শনাক্ত হলে দ্রুত তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা অঞ্চলের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।” তিনি আরও জানান, “রেফারেন্স-স্তরের জনস্বাস্থ্য পরীক্ষাগারগুলোতে এবং জিলংয়ে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিপেয়ার্ডনেসে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজনীয় পরীক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে।”