মোহাম্মদ আলম ফরিদ : বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আমেরিকান দার্শনিক নওম চমস্কি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বারবার দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর সহায়তা আসে অনেক সময় বাইরের শত্রু থেকে নয়, বরং ভেতরের সেই সব গোষ্ঠী থেকে যারা আদর্শে নয়, বরং কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতায় বিশ্বাস করে। এরা ক্ষমতার ভাষা, প্রতিষ্ঠান ও বয়ান ব্যবহার করে, কিন্তু ক্ষমতার নৈতিক দায়িত্ব বহন করে না। রাষ্ট্র, দল কিংবা গণতান্ত্রিক কাঠামো—সবই তাদের কাছে কার্যত ব্যবহারের উপযোগী এক একটি মাধ্যম মাত্র। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি পরিচিত ও পুনরাবৃত্ত প্রক্রিয়ার অংশ।
ইতালীয় মার্কসবাদী দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি এই বাস্তবতাকে আরও গভীর তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছেন। গ্রামসির মতে, ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে সামাজিক সম্মতির মাধ্যমে—যাকে তিনি “আধিপত্য” বা hegemony বলেছেন। যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা শাসকগোষ্ঠী আদর্শিক নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই আদর্শিক শূন্যতা পূরণ করে এমন এক শ্রেণি, যারা নিজেরা জনগণের প্রতিনিধি নয়, আবার সরাসরি দমনযন্ত্রের অংশও নয়। গ্রামসি এদেরকে “ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধিজীবী” (traditional intellectuals) বলে চিহ্নিত করেছেন—যারা ক্ষমতার সঙ্গে অভিযোজিত, পরিবর্তনের চেয়ে আত্মরক্ষায় দক্ষ এবং যে কোনো শাসনব্যবস্থার সঙ্গেই মানিয়ে নিতে পারে। তারা ভেতরে থেকেই ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নেয় এবং ধীরে ধীরে সেই কাঠামোকেই দুর্বল করে তোলে।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্লগার ও লেখক পিনাকী ভট্টাচার্যের একটি ভিডিওতে ব্যবহৃত একটি জীববৈজ্ঞানিক উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রকৃতিতে এমন একটি জীবনচক্র আমরা দেখতে পাই যা এই রাজনৈতিক বাস্তবতার নিখুঁত রূপক হতে পারে। Horsehair worm বা Nematomorpha নামের এক ধরনের পরজীবি ঝিঁঝিঁপোকার শরীরে ঢুকে ধীরে ধীরে তার ভেতরটা দখল করে নেয়। ঝিঁঝিঁপোকা নিজে এই পরজীবিকে বেছে নেয় না; সে এমন একটি পোকা খায়, যার শরীরে পরজীবির লার্ভা আগে থেকেই থাকে। এরপর শুরু হয় নীরব দখল। পরজীবিটি শুধু শরীর নয়, ঝিঁঝিঁপোকার আচরণ, এমনকি তার চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও নিউরো-কেমিক্যালের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে। যে প্রাণী স্বভাবতই পানি এড়িয়ে চলে, তাকেই একসময় পানির দিকে হাঁটতে বাধ্য করা হয়। ঝিঁঝিঁপোকা ডুবে মরে, পরজীবি বেরিয়ে আসে—মুক্ত হয়। হোস্টের মৃত্যু, পরজীবির বেঁচে থাকা—এই হলো তার জীবনচক্র। এটি কোনো রূপক কল্পনা নয়; এটি জীববিজ্ঞানে নথিভুক্ত একটি বাস্তব ঘটনা।
গ্রামসির ভাষায়, এ ধরনের পরিস্থিতিকে বলা যায় “জৈব সংকট” বা organic crisis—যখন পুরনো ব্যবস্থা তার নৈতিক ও আদর্শিক বৈধতা হারাতে শুরু করে, কিন্তু নতুন কোনো ব্যবস্থা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয় না। এই মধ্যবর্তী শূন্যতার ভেতরেই জন্ম নেয় এমন সব শক্তি, যারা পরিবর্তনের বাহক নয়, বরং এক কাঠামো থেকে আরেক কাঠামোয় নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে টিকে থাকে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ধরনের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলে এমন উপাদান দেখা গেছে যারা আদর্শগত প্রতিশ্রুতির চেয়ে ক্ষমতার নিকটবর্তী থাকাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। গত পনেরো বছরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংকটের একটি বড় দিক ছিল এমনই সুবিধাভিত্তিক রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ। দলীয় ভাষায় যাদের “হাইব্রিড আওয়ামী লীগার” বলা হয়েছিল—অর্থাৎ যারা মূলত সুবিধার জন্য দলে যোগ দিয়েছিল, আদর্শগত বিশ্বাসের জন্য নয়—তারা ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছিল। আজ এদের অনেকেই আওয়ামী লীগে নেই। রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা নতুন আশ্রয়ের সন্ধান করেছে। কেউ কেউ বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন, কেউ হয়তো অন্য কোথাও। কিন্তু এতে তাদের রাজনৈতিক চরিত্রের মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। হোস্ট বদলেছে, আচরণ বদলায়নি। এই ধরনের সুবিধাবাদী রাজনীতি শুধু একটি দলের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ। যে ব্যক্তিরা একসময় এক দলের ভেতরে থেকে সেই দলকে দুর্বল করেছে, তারা আজ অন্য দলে একই ভূমিকা পালন করার সম্ভাবনা রাখে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হলে, তারা আবার নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করবে—নতুন দল, নতুন ব্যানার, নতুন নৈতিক ভাষা নিয়ে। গ্রামসির ভাষায়, এটিই “নিষ্ক্রিয় বিপ্লব” বা passive revolution—যেখানে পরিবর্তনের ভাষা ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ক্ষমতার মৌল কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক আহমদ ছফা তাঁর “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস” গ্রন্থে এই সুবিধাবাদী রাজনৈতিক-বুদ্ধিজীবী শ্রেণির চরিত্র নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ছফার ভাষায়, এই শ্রেণি “কমিটেড” হওয়ার দাবি করলেও তাদের আসল প্রতিশ্রুতি জনগণের প্রতি নয়, ক্ষমতার প্রতি। তারা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রঙ বদলায়, কিন্তু তাদের মূল চরিত্র অপরিবর্তিত থাকে। গ্রামসির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য, ছফা তা বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা মনে পড়ে। যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় কারাবন্দি ও পরে গৃহবন্দি ছিলেন, সে সময় রাজনৈতিক মিত্রতা ও সমন্বয়ের প্রশ্নটি সামনে এসেছিল। কিছু দল ও গোষ্ঠী প্রতিবাদে সক্রিয় ছিল এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রস্তাবও সামনে এসেছিল। কিন্তু সেই সময়ে গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত সিদ্ধান্তগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল কী হয়েছে, তা এখন ইতিহাসের অংশ। অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ সবসময়ই থাকে।
চমস্কি দেখিয়েছেন, রাজনীতিতে একা টিকে থাকা সম্ভব নয়। গ্রামসি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, “প্রতি-আধিপত্য” বা counter-hegemony গড়ে তুলতে হলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক জোট ও আদর্শিক ঐক্য অপরিহার্য। কিন্তু সব মিত্রতাই সমান নয়। আদর্শভিত্তিক জোট এক জিনিস, আর সুবিধাভিত্তিক জোট সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদি কোনো রাজনৈতিক শক্তি মনে করে যে শুধুমাত্র সুবিধাভোগী উপাদানের ওপর ভর করে, কিংবা সম্ভাব্য আদর্শিক মিত্রদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে, তাহলে ইতিহাস তাদের জন্য সহানুভূতিশীল হবে না।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো—বিএনপি সহ সকল দল—এই পরজীবী চক্র থেকে মুক্ত হওয়ার পথ খুঁজে পাবে কি না। হয়তো এখনো সময় আছে। হয়তো এখনো রাজনৈতিক শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু ইতিহাস খুব সহনশীল শিক্ষক নয়। গ্রামসির বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক: “পুরনো পৃথিবী মরছে, নতুন পৃথিবী জন্ম নিতে দেরি করছে—এই মধ্যবর্তী অন্ধকারেই জন্ম নেয় দানব।”
হোস্ট বদলায়, পরজীবি টিকে থাকে—যতক্ষণ না কোনো রাজনৈতিক শক্তি এই জীবনচক্র ভাঙার নৈতিক সাহস ও কৌশলগত দূরদর্শিতা দেখায়। সেই সাহস দেখাতে হবে সুবিধাবাদী উপাদানকে চিনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে, আদর্শভিত্তিক জোট গড়ার মধ্য দিয়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। নইলে পরজীবির জীবনচক্র চলতেই থাকবে—শুধু হোস্টের নাম বদলাবে।