অস্ট্রেলিয়ার বন্ডাই বিচ মুক্ত জীবনের এক জীবন্ত প্রতীক

মঈন উদ্দিন সরকার সুমন: ২০২৬ সালের আট জানুয়ারি বন্ডাই বিচে (Bondi Beach) পা রাখার দিনটাকে আমি আজও মনে করি এক টুকরো জীবন্ত ছবির মতো।  সেদিন নীল আকাশ, সোনালি বালু আর প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউ সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি শুধু একটি সৈকতে নয়, ইতিহাসের বুকে দাঁড়িয়ে আছি। তথ্যমতে এই বালুকাবেলা  একসময় অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ইওরা জনগোষ্ঠী বসবাস করত। তারা সমুদ্রকে মা বলে ডাকত, আর পাথরে পাথরে রেখে গেছে তাদের জীবনের চিহ্ন।

“বন্ডাই” নামটাও এসেছে সেই আদিবাসী ভাষা থেকেই যার মানে প্রায় ঢেউয়ের শব্দ বা সমুদ্রের গর্জন। আজ শত শত বছর পর আমি দাঁড়িয়ে সেই একই ঢেউয়ের শব্দ শুনছি, শুধু মানুষ বদলেছে, সময় বদলেছে। এক সময় নাকি এই বিচ ছিল ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গা। কিন্তু ১৮৮২ সালে এটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপর ট্রাম চলাচল শুরু হলে শহরের মানুষ দলে দলে এখানে আসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে বন্ডাই হয়ে ওঠে সিডনির প্রাণ। ১৯০৭ সালে এখানেই গড়ে ওঠে বিশ্বের প্রথম সার্ফ লাইফসেভিং ক্লাব। সমুদ্রে ডুবে যাওয়া মানুষকে বাঁচানোর জন্য যে স্বেচ্ছাসেবী দল, তার সূচনা এই বন্ডাই বিচ থেকেই।

এই ঢেউয়ের মাঝেই জন্ম নিয়েছে মানবতার এক সাহসী ইতিহাস।  বন্ডাই শুধু পর্যটনের জায়গা নয়, এটা অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতির এক অংশ। সার্ফারদের ছুটে চলা, জগিং করা মানুষ, পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক সবাই যেন একই গল্পের চরিত্র। তবে বন্ডাইয়ের ইতিহাসে শুধু আনন্দের পাতাই নেই, কিছু বেদনাও আছে। ১৩ এপ্রিল ২০২৪ বন্ডাই এলাকার কাছেই Bondi Junction শপিং সেন্টারে একটি মর্মান্তিক হামলার ঘটনা ঘটে। একজন হামলাকারী Westfield Bondi Junction-এ ছুরি নিয়ে ঢুকে পড়ে।  কোনো   উদ্দেশ্য ছাড়াই দ্রুত অনেকের ওপর হামলা চালাতে থাকেন হামলাকারী। তিনি দোকানদার ও ক্রেতাদের উপর ছুরি চালান। সেদিন ৬ জন লোক মারা যান এবং কমপক্ষে ১২ জন আহত হন, আহতদের মধ্যে এক নবজাতক শিশুও ছিল। ছুরিওয়ালা হামলাকারীকে গুলি করে মারেন পুলিশ। ঐ সময় পুরো অস্ট্রেলিয়া স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনার পর বন্ডাই ও আশপাশের এলাকাজুড়ে মানুষ ফুল রেখে, মোমবাতি জ্বালিয়ে নিহতদের স্মরণ করে।

সম্প্রতি ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে আরেকটি ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। বন্ডাই বিচের Archer Park-এ একটি Hanukkah by the Sea নামে হানুকা উৎসবের সময় একটি গোলাগুলি নিক্ষেপের হামলা ঘটে। এতে কমপক্ষে ১৫ জন নিহত এবং বহু লোক আহত হয়   এটি অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ ৩০ বছরের ভয়াবহতম সহিংস হামলা হিসেবে বিবেচিত।

আমি যখন এই বিচে হাঁটছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল ঢেউয়ের শব্দের ভেতরেও যেন এক ধরনের নীরব শোক লুকিয়ে আছে। সেই মুহূর্তে বুঝলাম বন্ডাই বিচ শুধু আনন্দের নয়, মানুষের আবেগ, কান্না আর সংহতিরও জায়গা। বিপদের পর মানুষ আবার এক হয়ে দাঁড়ায়, জীবনকে নতুন করে শুরু করে।  বন্ডাই বিচ শুধু নীল জলরাশি নয়। এটা ইতিহাসের গল্প, আদিবাসী মানুষের স্মৃতি, সার্ফ লাইফসেভারদের সাহস, আর সাম্প্রতিক সময়ের এক বেদনাবিধুর অধ্যায় সব মিলিয়ে জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। বন্ডাই বিচের সমুদ্র তীরে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, ঢেউ আসে আর যায়, কিন্তু মানুষের গল্প থেকে যায়। আর আমি সেই গল্পের এক ক্ষুদ্র সাক্ষী হয়ে ফিরেছি।

লেখক: সভাপতি বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *