সুপ্রভাত সিডনি : সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন আইন পাস হয়েছে ‘হেট ক্রাইম বিল’। এই আইনের মূল কথা হলো, কেউ চাইলেই অন্যের সম্পর্কে বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এমন কিছু বলতে পারবে না যা সমাজে ঘৃণা বা ব্যাপক ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে। ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ফেডারেল পার্লামেন্টে ‘ক্রিমিনাল কোড অ্যামেন্ডমেন্ট (হেট ক্রাইমস) বিল ২০২৫ (Cth)’ বা ‘ফৌজদারি দণ্ডবিধি সংশোধনী (ঘৃণ্য অপরাধ) বিল ২০২৫’ আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়।
বিতর্ক ও গুঞ্জন :
এই আইনের প্রয়োগ এবং সম্প্রতি মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ব্যাপক গুঞ্জন ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে তাদের মতামত দিচ্ছেন।
এক পক্ষ ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখছেন:
“এমন একজন গুণী মানুষকে কেন এভাবে অপদস্থ করা হলো? তার অপরাধ কী ছিল? যাকে বিশ্বের কোথাও আটকানো যায়নি, তাকে অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা দেওয়ার পর এবং এ দেশে এসে পৌছানোর পর কেন ভিসা বাতিল করার খবর প্রকাশ হলো? সরকারের এমন সিদ্ধান্ত মানা যায় না।”
অন্যদিকে, আরেকটি পক্ষ কঠোর সমালোচনা করে বলছেন:
“পবিত্র কোরআন বা হাদিসের কোথাও ধর্ম প্রচার করে অর্থ দাবি করার কথা বলা নেই। কিছু অর্থলোভী বক্তা বর্তমানে ইসলামকে ব্যবসায়িক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। কোনো নবী, রাসুল কিংবা সাহাবী কখনো দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে অর্থ ভিক্ষা চাননি। তাহলে এই তথাকথিত মাওলানারা এমন প্রথা কোথায় পেলেন? আল্লাহ যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন। আজহারীকে আগেও ২০২১ সালে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদের দেশে পৌছার আগেই ভিসা বাতিল করেছিলো।”
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া :
অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে এই খবরটি বেশ নেতিবাচকভাবে উঠে এসেছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল লক্ষ্য করার মতো:
ডেইলি মেইল: “অ্যাডলফ হিটলারের প্রশংসা করায় উগ্রপন্থী বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীকে অস্ট্রেলিয়া থেকে বহিষ্কার।”
নিউজ ডট কম: “হিটলারের প্রশংসা এবং ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্য করায় বিতর্কিত ইসলামি বক্তা আজহারীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।”
সেন্ট্রিস্ট নেশন টিভি: “হিটলারের গুণগান গাওয়ার দায়ে আজহারীর ভিসা বাতিল করলো অস্ট্রেলিয়া।”
এমএসএন : “ঘৃণ্য হিটলার-মন্তব্য নিয়ে ডেইলি মেইলের সতর্ক বার্তার পর চরমপন্থী বক্তাকে বহিষ্কার করা হচ্ছে।”
এই রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করলে, এবং বিশেষত, অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং বেশ সাড়া জাগানো চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনগুলোতে নিচের তথ্যগুলো পাওয়া যায়। এই গণমাধ্যমগুলো মিজানুর রহমান আজহারী কর্তৃক জার্মান নাৎসি স্বৈরশাসক এডলফ হিটলারের প্রশংসা করার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি হাইলাইট করেছে।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, “একজন উগ্রপন্থী ইসলামি বক্তা, যিনি অ্যাডলফ হিটলারকে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ‘ঐশ্বরিক শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রশংসা করেছিলেন, তাকে তার জাতীয় প্রচার অভিযানের মাঝপথেই অস্ট্রেলিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।“
ডেইলি মেইল প্রথম মিজানুর রহমান আজহারীর এই খবরটি প্রকাশ করে। অনলাইনে তার প্রায় ১ কোটি অনুসারী রয়েছে এবং তিনি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
এই বাংলাদেশি বক্তা ইস্টার উৎসবকালীন ছুটির সময়টিতে তার ‘লেগাসি অফ ফেইথ’ সিরিজের অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া সফর করছিলেন, যার মধ্যে ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি এবং ক্যানবেরায় তার কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল। জানা গেছে যে, গত মঙ্গলবার আজহারীর ভিসা বাতিল করা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি বহিষ্কারের অপেক্ষায় আছেন।
এর আগে চরমপন্থী এবং ঘৃণামূলক বক্তব্যের দায়ে অভিযুক্ত করে আজহারীকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় তার নিজ দেশ বাংলাদেশেও জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার লিবারেল পার্টির সিনেটর জোনাথন ডুনিয়াম বুধবার জানান যে, আজহারীর আগমন সম্পর্কে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তিনি এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যরা সতর্কবার্তা পেয়ে এ বিষয়ে জানতে পেরেছেন। তিনি বুধবার সংসদে এক বক্তব্যে বলেন, “আমি জানি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য ‘অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ’ সহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছ থেকে বার্তা পেয়েছেন।”
অভিযোগ রয়েছে যে প্রায় দশ বা বারো বছর আগে এক বক্তৃতায় আজহারী বিভিন্ন ইহুদি-বিদ্বেষী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন, যেখানে তিনি হলোকাস্টের পরোক্ষ প্রশংসা করেন, ইহুদিদের অমানুষ হিসেবে চিত্রিত করেন এবং তার শ্রোতাদের তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান। আজহারী হিটলারকে ইহুদিদের জন্য ‘ঐশ্বরিক শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন, “ইহুদিরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী।” তিনি তাদের একটি ‘বিষাক্ত কলঙ্ক’ হিসেবেও অভিহিত করেন। এ বক্তব্যে তিনি আরও দাবি করেন যে, এইডসসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার জন্য ইহুদিরাই দায়ী এবং তারাই এই রোগটি আবিষ্কার করেছে।
ইউটিউবে সার্চ করে তার মূল বক্তব্যটি পাওয়া যায়নি তবে সেই বক্তব্যের সমালোচনা করে বানানো ভিডিওতে যুক্ত অংশ পর্যালোচনা করে দেখা যায় বহু বছর আগের সেই বক্তব্যে তিনি সরাসরি বা পরিস্কার শব্দ ব্যবহার করে হিটলারের প্রশংসা করেননি। কিন্তু তিনি ইহুদিদের সম্পর্কে ঢালাওভাবে বেশ কিছু বক্তব্য দিয়েছেন এবং তাদেরকে হিটলার কিভাবে “শায়েস্তা করেছিলো” সেই বর্ণনা দিয়েছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ায় তার এই সফর সোমবার রাতে ব্রিসবেন থেকে শুরু হয়েছিল এবং ৩ এপ্রিল মেলবোর্ন, ৪ এপ্রিল সিডনি এবং ৬ এপ্রিল ক্যানবেরায় অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল।
সিনেটর ডুনিয়াম তার ব্ক্তব্যে বলেন, আলবানিজ সরকার আজহারীকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ায় তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, কারণ আজহারীর উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ড এবং ঘৃণা উসকে দেওয়ার আন্তর্জাতিক রেকর্ড সুপরিচিত। তিনি সংসদকে বলেন, “এই সরকার আজহারীকে ভিসা দিলেও বিশ্বের অনেক জায়গায় তার বিরুদ্ধে বর্ণগত ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে এবং তা প্রমাণিতও হয়েছে।”
তিনি যুক্তরাজ্যের উদাহরণ টেনে বলেন, ২০২১ সালে হিন্দু-বিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানোর আশঙ্কায় আজহারীর প্রবেশের অনুমতি বাতিল করা হয়েছিল। ডুনিয়াম আরও জানান যে, উগ্রবাদ এবং জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকির কারণে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষও এই বক্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। তিনি বলেন, “তার নিজ দেশ বাংলাদেশে সরকার তাকে উগ্র মতাদর্শ প্রচার এবং চরমপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। তার সমাবেশের বিভক্তিমূলক প্রকৃতি এবং ঘৃণার কারণে পুলিশকে তার বক্তব্যের বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।”
ডুনিয়ামের মতে, আজহারীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ঘৃণামূলক বক্তব্যের একটি ধারাবাহিক নিদর্শন। তিনি বলেন, “এখানে ইহুদি-বিদ্বেষী ঘৃণামূলক বক্তব্য, হিন্দু ধর্মকে অবমাননা এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে দানবীয়ভাবে উপস্থাপনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।”
এতসব তথ্য জনসমক্ষে থাকা সত্ত্বেও সরকার আজহারীকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে বলে ডুনিয়াম উল্লেখ করেন।
‘অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ’ এই সপ্তাহের শুরুতে (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বার্কের কাছে চিঠি লিখে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের দাবি জানায়। সংস্থাটি সতর্ক করেছিল যে, আজহারীর বক্তব্য ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং উগ্রবাদী বয়ানকে বৈধতা দিতে পারে। তারা আজহারীর অতীত কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে, যার মধ্যে ইহুদি-বিদ্বেষী ষড়যন্ত্র এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর উসকানিমূলক আক্রমণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আয়োজকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
কমিউনিটির অনেকেই এই ঘটনার জন্য আয়োজকদের অদূরদর্শিতাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, আয়োজক সংস্থাটি ইসলাম প্রচারের চেয়ে এবং পেশাদারী দক্ষতার সাথে একটি বড় আয়োজন সম্পন্ন করার চাইতে বরং টিকিট বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল। মানুষের আবেগ কাজে লাগিয়ে ‘পুশিং সেল’ বা জোরপূর্বক টিকিট বিক্রির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা প্রবাসীদের একটি বড় অংশই ভালোভাবে নেয়নি। আয়োজকবৃন্দ একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন অথবা সরাসরি ইমিগ্রেশন মন্ত্রী বরাবরেও অনুরোধ জানাতে পারতেন।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, যারা দেশ থেকে শিল্পী বা নর্তকী এনে অনুষ্ঠান করে আর যারা ইসলামের নামে টিকিট কেটে ব্যবসা করে, তাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? দুই পক্ষই মূলত সমাজসেবার আড়ালে নিজেদের পকেট ভারী করছে। প্রকৃত ইসলামপ্রেমীরা এই ধরনের চাঁদাবাজি বা ব্যবসায়িক আয়োজনের পক্ষে নন।
মাওলানা আজহারীর বক্তব্য:
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মিজানুর রহমান আজহারী তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানিয়েছেন যে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর পুরোনো ও বিচ্ছিন্ন কিছু বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়াতে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় আসেননি বরং মুসলিম কমিউনিটির আমন্ত্রণে ধর্মীয় আলোচনার জন্যই এসেছেন।
উপসংহার:
এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিদেশের মাটিতে যেকোনো আয়োজন করার আগে স্থানীয় আইন ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা কতটা জরুরি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক ইসলাম বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন। (আমিন)
সুপ্রভাত সিডনি আইনের শাসনের প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল। আমরা বিশ্বাস করি আইন সবার জন্য সমান; তবুও এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বহিষ্কার বা ডিপোর্টেশনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত।