একটি পিতার সন্ধান: আমার পুত্র জোহরান কোথায়?

ইমরানুল ইসলাম:  কিছু কিছু সম্পর্কের জন্ম হয় স্পর্শেরও আগে—ঠিক যেমন আকাশ আর সমুদ্রের সম্পর্ক জন্ম নেয় দিগন্তরেখায়। তারা সত্যিই একে অপরকে ছুঁতে পারে কি না, তা যেন গুরুত্বপূর্ণ নয়; দূর থেকেই একে অপরকে জানার, অনুভব করার এক অনন্ত আকাঙ্ক্ষাই তাদের অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রাখে।

আজ আমি উপলব্ধি করেছি, একটি সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসাও ঠিক তেমনই। এ এমন এক ভালোবাসা, যার পূর্ণতা পেতে স্পর্শের প্রয়োজন হয় না; সন্তানকে কোলে তুলে নেওয়ার আগেই, তার মুখখানি চোখে দেখার আগেই, এমনকি তার প্রথম কান্নার শব্দ শোনারও আগে—একজন পিতার হৃদয়ে তার জন্য জন্ম নেয় গভীর, নিঃশর্ত, পরিপূর্ণ এক ভালোবাসা। সন্তান তখনও হয়তো পৃথিবীর আলো দেখেনি, অথচ পিতার হৃদয়ে সে ইতিমধ্যেই নিজের একটি পৃথিবী তৈরি করে নিয়েছে।

এ বছরের পয়লা ফেব্রুয়ারি, বসন্তের প্রথম নিঃশ্বাসে, ঢাকার আকাশের নিচে জন্ম নিল আমার পুত্র, জোহরান জহিরুল ইসলাম। আর আমি তখন হাজার হাজার মাইল দূরে, মন্ট্রিয়লের এক শীতার্ত সন্ধ্যায় বসে, একজন প্রবাসী বাংলাদেশি; যে দূরে থাকতে থাকতে দেশকে আরও গভীরভাবে ভালোবাসতে শিখেছে, অথচ যার বুকভরা ভালোবাসা কোনোদিন সেই দীর্ঘ দূরত্ব পেরিয়ে নিজের সন্তানকে একবার ছুঁয়ে দেখতে পারেনি।

আজও আমি জোহরানকে কোলে তুলে নিতে পারিনি। জানি না, ছোট্ট শরীরটাকে বুকে জড়িয়ে ধরলে কেমন অনুভূতি হতো; জানি না তার ওজন কত, কান্নার সময় তার কণ্ঠস্বর কেমন শোনায়, কিংবা পরিচিত কোনো মুখের দিকে তাকালে তার চোখে কীভাবে আলো জ্বলে ওঠে। আমি তার প্রথম হাসির পাশে ছিলাম না, তার কান্না থামাতে বুকের কাছে টেনে নিতে পারিনি। তবু আশ্চর্য, এই না-দেখা, না-ছোঁয়া আর হাজার মাইলের দূরত্বও তার প্রতি আমার ভালোবাসাকে এক লহমার জন্য কমাতে পারেনি। বরং প্রতিটি অপেক্ষা, প্রতিটি অপূর্ণতা, প্রতিটি নিঃসঙ্গ রাত সেই ভালোবাসাকে আরও গভীর করেছে।

এরপর বসন্ত গড়িয়ে গ্রীষ্ম এসেছে, গ্রীষ্ম পেরিয়ে নেমেছে বর্ষা। সময় তার নিজের নিয়মে এগিয়ে গেছে, ঋতুরা একে একে বদলেছে। অথচ সেই ঋতুচক্রের মাঝেই এসে দাঁড়িয়েছিল এক নিষ্ঠুর দিন একুশে এপ্রিল। তখনও জোহরানের বয়স তিন মাস পূর্ণ হয়নি। সেদিন আমাদের ঢাকার পারিবারিক বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আমার অজান্তে, আমার অনুমতি ছাড়াই।

সেই একুশে এপ্রিলের পর পৃথিবী থেমে থাকেনি। আকাশের রং বদলেছে, ঋতু বদলেছে তিনবার, ক্যালেন্ডারের পাতা একের পর এক ঝরে গেছে। শুধু আমার প্রতীক্ষাটুকু যেন সেদিনের সেই মুহূর্তেই আটকে আছে। আজও আমি আমার সন্তানকে দেখিনি। আজও তাকে একবার বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বলতে পারিনি “বাবা, আমি আছি।” সবচেয়ে অসহনীয় হলো এই অনিশ্চয়তাআমি নিশ্চিতভাবে জানি না, আমার ছোট্ট জোহরান কোথায় আছে, কেমন আছে, কিংবা সে নিরাপদে আছে কি না। একজন পিতার কাছে সন্তানের দূরত্ব হয়তো মাইল দিয়ে মাপা যায়; কিন্তু তাকে না দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণা কোনো দূরত্বে, কোনো সময়ে, কোনো ভাষায় মাপা যায় না।

এরপর শুরু হলো এক দীর্ঘ, প্রায় নিঃসঙ্গ সন্ধান—এমন এক যাত্রা, যার প্রতিটি ধাপে আমি ভেবেছি, এবার হয়তো একটি দরজা খুলবে; কেউ হয়তো আমার কথাটি শুনবে, আমার সন্তানের খোঁজে একটি হাত বাড়িয়ে দেবে। অথচ প্রতিবারই সেই দরজার ওপাশে পেয়েছি শুধু নীরবতা।

প্রথমে পল্লবী ও হাতিরঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলাম। কোনো সাড়া না পেয়ে লিখলাম ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরে; এরপর পুলিশের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে। শেষ পর্যন্ত সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের আশ্রয় নিয়ে সরাসরি পুলিশ কমিশনারের কাছেও আবেদন জানালাম—সেই অনুচ্ছেদ, যা প্রত্যেক নাগরিককে আইনের আশ্রয় ও সুরক্ষা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। একই আবেদন পাঠিয়েছি দুবার।

প্রতিবার যা ফিরে এসেছে, তাকে প্রত্যাখ্যানও বলতে পারি না। কারণ প্রত্যাখ্যানেরও অন্তত একটি ভাষা থাকে, একটি কণ্ঠস্বর থাকে। আমার কাছে ফিরে এসেছে তার চেয়েও ভারী কিছু—এক গভীর, অবিচল নীরবতা। যেন আমার আবেদনগুলো কোথাও পৌঁছেছে, কিন্তু আমার কথাগুলো পৌঁছায়নি; যেন একজন পিতার আকুতি প্রশাসনের কোনো অদৃশ্য করিডরে গিয়ে হারিয়ে গেছে।

সেই নীরবতার সীমানা পেরিয়ে আমি খুঁজেছি অন্য পথও। লিখেছি অটোয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে, ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, এমনকি কানাডার কনস্যুলার সেবাতেও। কানাডীয় কর্তৃপক্ষ যুক্তিসঙ্গতভাবেই জানিয়েছে, আমার পুত্র বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় এ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার তাদের সীমিত। কুইবেকের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছেও খোঁজ নিয়েছি। সেখান থেকে জেনেছি, আন্তর্জাতিক শিশু অপহরণসংক্রান্ত হেগ কনভেনশনে বাংলাদেশের যোগদানের প্রক্রিয়া এগিয়েছে বটে, কিন্তু তা এখনও সম্পূর্ণ কার্যকর হয়নি। আমার কাছে বিষয়টি যেন এমন—একটি সেতু নির্মিত হচ্ছে, কিন্তু যে মানুষটির এখনই নদী পার হওয়া প্রয়োজন, তার জন্য সেই সেতু দিয়ে এখনও হাঁটার পথ খোলেনি।

এখন প্রস্তুতি নিচ্ছি ঢাকার একজন আইনজীবীকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়ার, যাতে বাংলাদেশে সশরীরে উপস্থিত থেকে যেসব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—পারিবারিক আদালতে আবেদন, প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান বা তল্লাশির নির্দেশ চাওয়া—তিনি আমার পক্ষ থেকে সেগুলো করতে পারেন। একই সঙ্গে লিখেছি বাংলাদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা সংস্থায়—আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্লাস্ট, অপরাজেয়-বাংলাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে। এখনও বিশ্বাস করি, কোথাও না কোথাও এমন একজন মানুষ নিশ্চয়ই আছেন, যিনি হাজার মাইল দূরে আটকে থাকা এক পিতার অসহায়ত্বটুকু বুঝবেন এবং অন্তত তার সন্তানের নিরাপত্তার খবরটি জানতে সাহায্য করবেন।

এই দীর্ঘ সন্ধানের মধ্যে একটি কথাও আমাকে বলতে হচ্ছে—যদিও সেটি স্বাধীনভাবে প্রমাণ করার সামর্থ্য আমার এখনও হয়নি। আমার স্ত্রীর পরিবারের কাছ থেকে আমি এমন তথ্য পেয়েছি যে, আমার পুত্রের কাছে পৌঁছানোর পথের সঙ্গে অর্থের শর্ত জড়িত থাকতে পারে। আমি একে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করছি না, কারও বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগও করছি না। শুধু এটুকুই বলতে চাই—সরকারি ও আইনি সব পথ অনুসরণ করার পাশাপাশি একজন পিতাকে যখন এ আশঙ্কার ভারও বহন করতে হয় যে, নিজের সন্তানের অবস্থান ও নিরাপত্তা জানার জন্যও হয়তো তাকে কোনো মূল্য চোকাতে হবে, তখন সেই অসহায়ত্বের যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবু এই লেখা কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, কোনো জাতির বিরুদ্ধেও অভিযোগ নয়। বাংলাদেশ আজও আমার দেশ। আমি যত দূরেই থাকি না কেন, এই সম্পর্ক বদলে যায় না—যেমন নদী হাজার মাইল বয়ে গেলেও তার উৎসকে অস্বীকার করতে পারে না। যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে এখনও কোনো উত্তর পাইনি, আমি বিশ্বাস করতে চাই, সেখানেও অসংখ্য সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ আছেন, যারা প্রতিদিন নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের জন্য কাজ করছেন।

আমার চাওয়া তাদের কাছে খুব বড় কিছু নয়। বরং একজন পিতার সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে মৌলিক আকুতি—কেউ যেন আমার এই নির্দিষ্ট আবেদনটি একবার দেখেন। কেউ যেন আমার সন্তানের কল্যাণ ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের আবেদনটির জবাব দেন। কেউ অন্তত আমাকে জানিয়ে দেন—আমার সন্তান নিরাপদে আছে।

আর কারও কাছে যদি আমার পুত্রের অবস্থান, নিরাপত্তা বা সুস্থতা সম্পর্কে সামান্যতম কোনো তথ্যও থাকে, অনুরোধ করছি, তিনি যেন এই পত্রিকার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। যেকোনো তথ্য সর্বোচ্চ গোপনীয়তার সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

কিছু সম্পর্কের জন্ম হয় স্পর্শেরও আগে। আর হয়তো সে কারণেই, দূরত্ব কিংবা বিচ্ছেদেও সেই সম্পর্কের মৃত্যু হয় না। দিগন্তরেখায় আকাশ আর সমুদ্র কোনোদিন সত্যিই একে অপরকে ছুঁতে পারে না—তবু তাদের দেখে মনে হয়, অনন্তকাল ধরে তারা পরস্পরের দিকেই এগিয়ে চলেছে।

আমিও তেমনি অপেক্ষা করছি।

একদিন হয়তো আমার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ হবে। একদিন হয়তো প্রথমবারের মতো আমার সন্তানকে কোলে তুলে নেব, তার মুখের দিকে তাকাব, তার কণ্ঠস্বর শুনব। কিন্তু সেই দিনটি আসা পর্যন্ত একজন পিতা হিসেবে আমার একটিই প্রার্থনা—আমি শুধু জানতে চাই, আমার সন্তান কোথায়। আমি শুধু জানতে চাই, সে নিরাপদে আছে।

জোহরান জহিরুল ইসলাম, জন্ম: ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

২১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে তার অবস্থান সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই।

কারও কাছে জোহরানের অবস্থান বা সুস্থতা সম্পর্কে সামান্যতম কোনো তথ্য থাকলে, অনুগ্রহ করে এই পত্রিকার মাধ্যমে suprovat.ceo@gmail.com ঠিকানায় যোগাযোগ করুন। প্রাপ্ত তথ্য গোপন রাখা হবে।

—মন্ট্রিয়ল, কুইবেক, কানাডা

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *