সোস্যাল মিডিয়া প্রভাব ও তরুণ প্রজন্ম: মূল্যবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আমাদের করণীয়

আরিফুর রহমান খাদেম: বর্তমান টেকনোলজির এ যুগে সোস্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা এবং সৃজনশীল প্রকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই মাধ্যমগুলোর কল্যাণে অনেকেই শৈশব ও বাল্যকালের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন। এমনকি অনেকে এই মাধ্যমের মাধ্যমে জীবনসঙ্গীর মতো প্রিয় মানুষকেও খুঁজে পেয়েছেন।  তবে এর ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি অপব্যবহার ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা, চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ এবং মানসিক অবস্থার ওপর এর প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অনেক ক্ষেত্রেই লাইক, ফলোয়ার, মন্তব্য ও শেয়ারের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। এক সময় যেমন প্রতিযোগিতা হত পড়াশুনায় বা খেলাধুলায় কে এগিয়ে, ক্লাসে কার রোল নাম্বার কত ইত্যাদি, এখন অনেকের ক্ষেত্রেই তা নির্ভর করে কার কত ফলোয়ার এর উপর। ফলে বাস্তব জীবনের অর্জনের চেয়ে ভার্চুয়াল স্বীকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দ্রুত পরিচিতি লাভ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আর্থিক সুবিধার আশায় কিছু তরুণ-তরুণী এমন কনটেন্ট তৈরি করছে, যা কখনও কখনও ব্যক্তিগত মর্যাদা, শালীনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। কিছু ক্ষেত্রে উঠতি বয়সী তরুণীরা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, আত্মসম্মান ও নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে বিতর্কিত বা শরীরকেন্দ্রিক আত্মপ্রচারের পথও বেছে নিচ্ছে। নিজের অজান্তেই নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে অসুস্থ প্রতিযোগিতার দৌরে। এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যক্তি ও বাণিজ্যিক স্বার্থগোষ্ঠীগুলো যুব সমাজকে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলার সুযোগ পাচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  অবাস্তব সৌন্দর্যের ধারণা, বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রদর্শন এবং দ্রুত খ্যাতি অর্জনের সংস্কৃতি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যের সাজানো-গোছানো জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তবতার তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে, হীনমন্যতায় ভুগছে এবং আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়ছে। এর ফলে উদ্বেগ, হতাশা, একাকীত্ব এবং আত্মমর্যাদাবোধের সংকট দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার বুলিং, কটূক্তি, অনলাইন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল অনেকের জন্য গভীর মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও শিক্ষাজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কিছু জ্ঞানপাপী বা শিক্ষিত চোর নিজের বিচক্ষণতা এবং কিছু অনলাইন ব্যবহারকারীর দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক দিক হলো এর আসক্তি যা মাদকাসক্তের মতই ভয়াবহ। অনেক কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী দিনে এবং রাতের উল্লেখযোগ্য অংশ মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মে ব্যয় করছে। ফলে তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আন্তরিক সময় কাটানো, পারস্পরিক মতবিনিময় এবং পারিবারিক বন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পড়াশোনায় মনোযোগ ও একাগ্রতা কমে যাওয়ায় শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীল চর্চাগুলোও অনেকের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত হাঁটাচলা, ব্যায়াম ও কায়িক পরিশ্রমের অভাবে মেদবৃদ্ধি, শারীরিক দুর্বলতা, ঘুমের সমস্যা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। দেশের গড় আয়ু কমে যাওয়ার পেছনে এ অস্বাস্থকর জীবনপ্রণালীও অনেকাংশেই দায়ী।

পারিবারিক জীবনেও এদের প্রভাব ক্রমশ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। মানুষের যোগাযোগের সুযোগ বাড়লেও এর অপব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য ও পারিবারিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গোপন যোগাযোগ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ভার্চুয়াল সম্পর্কের কারণে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস, মানসিক দূরত্ব এবং সম্পর্কের সংকট তৈরি করছে। ফলে পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ এবং বিচ্ছেদের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। অনেক দম্পতিও পরকীয়ার মত অপসংস্কৃতি ও অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক সুখী সংসার রাতারাতি ধ্বংস পর্যন্ত হয়ে গেছে। তবে এ ধরনের সমস্যার জন্য সবসময়ই শুধু প্রযুক্তিকে দায়ী করা যায় না; অনেক সময়ই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস, দায়িত্বশীলতা এবং প্রবাস জীবনের ফলে দীর্ঘদিন স্ত্রী বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাবা-মা, নিকটাত্মীয়-স্বজন এবং শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের ওপর শুধু নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও সমস্যার কথা খোলামেলাভাবে প্রকাশ করতে পারে। বাবা-মাকে সন্তানের ডিজিটাল জীবন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ, নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং বাস্তবমুখী জীবনদর্শন গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যাওয়া, যেমন পিকনিক, রেস্টুরেন্ট, থিম পার্ক, চিড়িয়াখানা, জাদুঘর কিংবা ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো যেতে পারে।

অন্যদিকে শিক্ষকদেরও শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা, অনলাইন নিরাপত্তা, সাইবার সচেতনতা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং কার্যক্রম, সচেতনতামূলক সেমিনার, সোস্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের উপর নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং চরিত্র গঠনমূলক উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। এক সময় প্রায় সব স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষা সফর, বনভোজনেরও আয়োজন করা হত। এ সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা সময়ের দাবী। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তাদের ভার্চুয়াল জগতের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতেও সহায়তা করবে।

প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ক্ষতিকর কনটেন্টের ওপর নজর রাখা এবং সাইবার হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, অনলাইন প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় নেতাদেরও ইতিবাচক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিক আচরণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকেও বিস্তারিত অধ্যায় সংযোজন করা যেতে পারে, যাতে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণের ধারণা গড়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আধুনিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা; তাই একে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই। বরং প্রয়োজন এর দায়িত্বশীল ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, পারিবারিক শিক্ষার প্রসার, নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা এবং ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তরুণ প্রজন্মকে অনলাইন জগতের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। অন্যথায় এর নেতিবাচক প্রভাব এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে দীর্ঘস্থায়ীভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

লেখক: শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট, শিক্ষক এবং কনটেন্ট কৃয়েটর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *