অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি যখন পরাজিত; সুস্থ বিনোদন,পারিবারিক সম্প্রীতি ও দ্বীনি শিক্ষার বিজয়ে মুখরিত লাকেম্বা মুসল্লার সফল বনভোজন !

সুপ্রভাত সিডনি বিশেষ প্রতিবেদন: শিশু-কিশোরদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ, পরিবারের সদস্যদের উচ্ছ্বাস এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে লাকেম্বা মুসল্লার বার্ষিক বনভোজন। গিল্ডফোর্ডের ক্যাম্পবেল হিল পাইওনিয়ার রিসার্ভের মনোরম পরিবেশে আয়োজিত এই মিলনমেলা ল্যাকেম্বা মুসাল্লাহর নিয়মিত মুসল্লি ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করার সুযোগ করে দেয়। রকমারি খেলাধুলার পাশাপাশি শিশুদের কুরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতা আয়োজনটিতে যোগ করে বিশেষ তাৎপর্য।

সকালের মুখরোচক নাশতার মধ্য দিয়ে দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। আগে থেকে সংরক্ষিত কয়েকটি ছাউনি এবং পাশের খেলার মাঠ ঘিরে সাজানো হয় অনুষ্ঠানস্থল। নারীদের জন্য ছিল পৃথক তাঁবু ও কার্যক্রমের ব্যবস্থা। শিশুদের জাম্পিং ক্যাসল, ফেয়ারি ফ্লস ও পপকর্ন ঘিরে দিনভর ছিল আনন্দের আমেজ।

বয়সভিত্তিক ক্রীড়া আয়োজনে ছিল দৌড়, এক পায়ে দৌড়, বাস্কেটবল, ভলিবল, তীর নিক্ষেপ ও গোলপোস্টে বল মারাসহ নানা প্রতিযোগিতা। নারীদের জন্য বালিশ পাসিং, চেয়ার দৌড় ও বক্সে বল ফেলার মতো আনন্দঘন খেলাও আয়োজন করা হয়।

সুশৃঙ্খল পরিচালনায় নিবেদিত ব্যবস্থাপনা দল

এই সফল আয়োজনের আহ্বায়ক ও সার্বিক সমন্বয়ক ছিলেন আরিফ খান। লাকেম্বা মুসল্লার সবার প্রিয় মুখ ও মধ্যমণি তিনি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর তত্ত্বাবধানে ঈদ পুনর্মিলনী ও বার্ষিক বনভোজনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান সফলভাবে আয়োজিত হয়ে আসছে। দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবে সবার আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছেন। পরিকল্পনা থেকে মাঠের কার্যক্রম পরিচালনা প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীল, সময়, শ্রম ও আন্তরিক সহযোগিতা আয়োজনকে সফল করে তোলে।

প্রধান সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন জহিরুল ইসলাম; তাঁকে সহযোগিতা করেন সাইফুল ইসলাম। কুরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন মাওলানা হিরো আজাদ।

ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেন মাহমুদুর রহমান বাবু, ড. মোর্শেদ আলম, আব্দুল করিম ও তাজুল ইসলাম, এস এম মনিরুজ্জামান, রায়হান বিন মফিদুল(প্রকৌশলী) , নুরুল হক ইমন ও রুহুল আমিন (প্রকৌশলী)।  উপহার ব্যবস্থাপনায় ছিলেন এহসান (প্রকৌশলী)।

নারী ও শিশুদের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয় করেন আব্দুল্লাহ ইউসুফের সহধর্মিণী ও আয়াত ইউসুফ। ফেয়ারি ফ্লস পরিবেশনায় ছিলেন মোমিন মজুমদার ও রাফি; পপকর্নের দায়িত্ব সামলান ছোট রায়হান ও মিরাজ। পুরস্কার বিতরণে বিচারকের সঙ্গে অংশ নেন আব্দুল্লাহ ইউসুফ, মোঃ  আব্দুল লতিফ ও কামাল হোসেন।

কুরআনের প্রতি ভালোবাসা জাগানোর প্রয়াস

বনভোজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিশুদের কুরআন তিলাওয়াত। বয়সভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে তাদের অংশগ্রহণ কুরআন শেখার আগ্রহ ও অনুশীলনের পরিচয় তুলে ধরে।

মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বিচারক জানান, প্রতিটি শিশুর প্রতি ন্যায়সংগত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত যথাসম্ভব নির্ভুল করতে অনেকের তিলাওয়াত একাধিকবার মনোযোগ দিয়ে শোনা হয়েছে। মানবীয় সীমাবদ্ধতার কারণে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল হয়ে থাকলে সে জন্য তিনি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চান।

তিনি আরও গুরুত্ব দেন শিশুদের শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখানো এবং তাদের অন্তরে পবিত্র কুরআনের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার ওপর। বিজয়ী নির্বাচনের পাশাপাশি এই শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যই আয়োজনটিকে অর্থবহ করে তোলে।

ক্রীড়া ও কুরআন তিলাওয়াতের সমন্বিত তালিকা

একই প্রতিযোগীর একাধিক অর্জন একসঙ্গে উল্লেখ করা হলো।

ছেলেদের বিভাগ

গ্রুপ  নাম ক্রীড়া  প্রতিযোগিতার ফলাফল ও কুরআন তিলাওয়াতের উল্লেখ
এ আবদুল্লাহ খেলা ১-এ  প্রথম এবং খেলা ২-এ দ্বিতীয়
এ মুয়াজ খেলা ১-এ  দ্বিতীয়
এ উসমান খেলা ২-এ  প্রথম
এ আরহাম মুহাম্মদ মিনহাজ
এ জারিফ ইসলাম
বি মুহাম্মদ খান খেলা ১-এ  প্রথম
বি জুবায়ের ইসলাম খেলা ১-এ  দ্বিতীয়
বি ফাইয়াজ খেলা ২-এ  প্রথম
বি সাবিত খেলা ২-এ  দ্বিতীয়
বি জাবির
সি ইউসুফ খান খেলা ১ ও খেলা ২—উভয়টিতে প্রথম
সি মুসআব আকরাম খেলা ১-এ দ্বিতীয়
সি উজাইর করিম খেলা ২-এ দ্বিতীয়
সি উমর ইসলাম

মেয়েদের বিভাগ

গ্রুপ  নাম ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ফলাফল ও কুরআন তিলাওয়াতের উল্লেখ
এ নওশিয়া রহমান খেলা ১-এ প্রথম
এ আতিফা খেলা ১-এ দ্বিতীয়
এ মালিহা খেলা ২-এ প্রথম
এ ইসরাত জাহান খেলা ২-এ দ্বিতীয়
বি ফারওয়া হক খেলা ১-এ প্রথম
বি আরশিয়া রহমান খেলা ১-এ দ্বিতীয়
বি হিবা খেলা ২-এ প্রথম
বি আরিয়ানা খেলা ২-এ দ্বিতীয়
বি আকিফা রহমান
সি মারিয়াম তানজিমা খেলা ১-এ প্রথম এবং খেলা ২-এ দ্বিতীয়
সি সাফিয়া মনির খেলা ১-এ দ্বিতীয়
সি জান্নাত জারা খেলা ২-এ প্রথম
সি ইউসাইরা আজাদ

কুরআন তিলাওয়াতের মিনি গ্রুপে বারীরাহ আজাদের নাম উল্লেখ রয়েছে।

পুরুষদের সকার প্রতিযোগিতা

ক্রম প্রথম স্থান দ্বিতীয় স্থান
১ শামীম মুনতাসির
২ জিল্লুর হিরো আজাদ
     

একদিকে ছিল বাহারি ও মুখরোচক দুপুরের খাবার ও মিষ্টি, অন্যদিকে নানা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে প্রতিযোগীরা জিতে নিয়েছে চমৎকার সব মূল্যবান উপহার। শুধু বিজয়ীই নয়, উপস্থিত কাউকেই খালি হাতে ফিরতে হয়নি—সবাইকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল একটি বিশেষ উপহার। এতেই আয়োজকদের দূরদর্শিতা ও সফল নেতৃত্বের পরিচয় ফুটে ওঠে।

যোহরের নামাজ, মধ্যাহ্নভোজ ও পুরস্কার বিতরণ ছিল দিনের কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজয়ীদের আনন্দের পাশাপাশি অন্যদের উৎসাহ ও করতালিতে পুরস্কার বিতরণ পর্ব হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

আয়োজকেরা অংশগ্রহণকারী পরিবার, অতিথি ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। আয়োজনের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বানও জানানো হয়।

প্রবাসে সমৃদ্ধির পাশাপাশি ঈমানের যত্ন নিই

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, উন্নত জীবনের আশায় আমরা অস্ট্রেলিয়ায় এসেছি। আসুন, আমাদের নিয়তকে আরও সুন্দর করি, হালাল জীবিকা অর্জন, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, মানুষের উপকার এবং সন্তানদের দ্বীনের পথে গড়ে তোলাই হোক প্রবাসজীবনের লক্ষ্য।

মসজিদ-মুসল্লার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করি, ঘরে নিয়মিত দ্বীনি তালিমের পরিবেশ গড়ি এবং সন্তানদের কুরআন, নামাজ ও মাসনুন দোয়ার পাশাপাশি উত্তম চরিত্র শেখাই। নারী-পুরুষ সবাই শালীনতা বজায় রাখি এবং নিজেদের ও পরিবারের ঈমান-আমলের যত্ন নিই। সামর্থ্য অনুযায়ী দাওয়াত ও কল্যাণের কাজে সময় দিই।

সুস্থ ও হালাল বিনোদন পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং সমাজে সৌহার্দ্য বাড়ায়। অথচ আজ বিনোদনের নামে অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতির বিস্তার উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ থেকে আসা আমাদের কমিউনিটির কিছু মানুষও এর স্রোতে গা ভাসাচ্ছেন। আধুনিকতা বা স্মার্টনেসের পরিচয় দিতে গিয়ে আমরা যেন শালীনতা, নৈতিকতা ও দ্বীনি মূল্যবোধ বিসর্জন না দিই।

ভালো কাজের আহ্বানের সওয়াব

আপনি কাউকে ভালো কাজের দাওয়াত দিলে এবং সে যদি তা আমল করে, তবে সে যতটুকু সওয়াব পাবে, আপনিও ঠিক ততটুকুই সওয়াব পাবেন। তবে এতে তার সওয়াব থেকে কোনো অংশ কমিয়ে দেওয়া হবে না।

  • হাদিস : রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি হেদায়েত বা ভালো কাজের দিকে আহ্বান করবে, সে তার অনুসারীদের সমান সওয়াব পাবে” -সহীহ মুসলিম।

মন্দ বা অশ্লীল কাজের আহ্বানের গুনাহ

ঠিক একইভাবে, কেউ যদি এমন কোনো কাজের সূচনা করে বা অন্যকে উৎসাহিত করে যা ইসলামে নিষিদ্ধ (যেমন: গান-বাজনা, অশ্লীল সিনেমা, নাটক বা যেকোনো অন্যায় কাজ যা আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) দ্বারা নিষিদ্ধ), তবে যে ব্যক্তি সেই কাজটি করবে তার গুনাহ তো হবেই, পাশাপাশি যিনি এর পথ দেখিয়েছেন বা আহ্বান করেছেন, তার আমলনামায়ও সমপরিমাণ গুনাহ লেখা হবে।

পবিত্র কুরআনে আদ ও সামুদসহ অতীতের বিভিন্ন জাতির অবাধ্যতা ও পরিণতির বিবরণ আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। তবে নির্দিষ্ট কাউকে আল্লাহর ক্রোধের শিকার বলে রায় দেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের সংশোধন করা এবং অন্যকে প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে কল্যাণের পথে আহ্বান করাই আমাদের দায়িত্ব। আসুন, পরিবার ও সমাজে এমন বিনোদনের পরিবেশ গড়ে তুলি, যেখানে আনন্দের সঙ্গে শালীনতা ও আল্লাহর বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাও অটুট থাকে।

তবে আনন্দের আয়োজনেও অশ্লীলতা, হারাম কাজ ও নামাজে অবহেলা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। সন্তানদের শুধু আরবি পড়তে শেখালেই দায়িত্ব শেষ নয়; নিজেদের আচরণেও সততা, দয়া ও তাকওয়ার উদাহরণ রাখতে হবে।

বাড়ি, ব্যবসা বা সম্পদের জন্য সুদের আশ্রয় নেওয়া থেকে বেঁচে থাকি। আল্লাহ তাআলা সুদ পরিত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। হালাল উপার্জনে অল্প থাকলেও তাতেই সন্তুষ্টি ও বরকত খুঁজি। *(সূরা আল-বাকারা: ২৭৮–২৭৯)*

জনপ্রিয়তা বা সংখ্যাধিক্যকে সত্যের একমাত্র মাপকাঠি না বানিয়ে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে চলি। নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছে দ্বীন শিখি এবং মতভেদে শিষ্টাচার বজায় রাখি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে এবং বিভক্ত না হতে নির্দেশ দিয়েছেন। *(সূরা আলে ইমরান: ১০৩)

আসুন, দুনিয়ার উন্নতির সঙ্গে আখিরাতের প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দিই। আল্লাহ আমাদের নিয়ত শুদ্ধ করুন, পরিবারকে ফিতনা থেকে রক্ষা করুন এবং ঈমানের ওপর অটল রাখুন। আমিন।

সুস্থ বিনোদন,পারিবারিক বন্ধন এবং দ্বীনি শিক্ষার সুন্দর সমন্বয়ে লাকেম্বা মুসল্লার এই বনভোজন হয়ে থাকে একটি আনন্দময় স্মৃতি। আল্লাহ তাআলা সবার প্রচেষ্টা কবুল করুন, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ় করুন এবং সন্তানদের কুরআনের আলোয় আলোকিত করুন, এই দোয়ায় আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *