
গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল সাইদুলের বাড়ি। বাড়িটা খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার চারপাশে ছিল অদ্ভুত এক নির্জনতা। বাড়ির দক্ষিণ দিকে যতদূর চোখ যায় ততদূর বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, আর সেই ধানক্ষেতের একেবারে শেষ সীমানায় ছিল একটি পুরোনো পুকুর। পুকুরটিকে ঘিরে এত ঘন বাগান ছিল যে বাইরে থেকে তাকালে মনে হতো, পুকুরের চারপাশে যেন প্রকৃতি নিজেই একটা অন্ধকার প্রাচীর তুলে দিয়েছে। পুরোনো আম, জাম, কাঁঠাল, বট, অশ্বত্থ আর শেওড়াগাছের ডালপালা একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে ছিল যে দুপুরের প্রখর রোদও বাগানের মাটিতে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারত না। পুকুরের জল ছিল কালচে ও স্থির; বছরের পর বছর কেউ সেখানে স্নান করত না, কেউ মাছ ধরত না, এমনকি দিনের বেলাতেও গ্রামের মানুষ খুব একটা সেই বাগানের ভেতর যেত না। বয়স্কদের মুখে শোনা যেত, বহু বছর আগে ওই জায়গায় নাকি কোনো এক অজানা কারণে একটি পুরোনো কবরস্থান ছিল, যদিও তার কোনো চিহ্ন আর অবশিষ্ট ছিল না। কেউ কেউ আবার বলত, অমাবস্যার রাতে পুকুরের কালো জলে অদ্ভুত আলো দেখা যায়। এসব কথাকে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিত, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তারাও কখনও রাতের পরে ওই বাগানের দিকে যেত না। সেই বাড়িতেই ভালোবাসার মানুষ হিসেবে সংসার করত সাইদুল ও জেনিফার। তাদের সংসারে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু একে অপরের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল। তারা দুজনেই জানত, পৃথিবীতে তাদের আপন বলতে তেমন কেউ নেই। সাইদুলের মা-বাবা কেউ বেঁচে ছিলেন না, কোনো ভাই-বোনও ছিল না, নিকট আত্মীয় বলতে কার্যত কেউই ছিল না।
জেনিফারের অবস্থাও প্রায় একই রকম। ফলে তাদের সংসার ছিল একে অপরকে ঘিরেই। দিনের শেষে সাইদুল যখন বাড়ি ফিরত, জেনিফারের মুখে হাসি ফুটত; আর জেনিফার কোনো কারণে মন খারাপ করলে সাইদুল তাকে কাছে টেনে নিত। তাদের ভালোবাসার মধ্যে একটা অদ্ভুত নির্ভরতা ছিল, যেন পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক হারিয়ে গেলেও তারা দুজন একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু মানুষ যতই ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখুক, মৃত্যুর সামনে কোনো স্বপ্নেরই ক্ষমতা নেই। এক বর্ষার সন্ধ্যায় সাইদুল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রথমে সামান্য জ্বর বলে মনে হলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর খারাপ হতে লাগল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, শরীর কাঁপছিল, চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে উঠেছিল। জেনিফার সারারাত তার মাথার কাছে বসে ছিল। গভীর রাতে একসময় সাইদুল হঠাৎ পুকুরের দিকের জানালার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে স্থির হয়ে গেল, যেন অন্ধকারের মধ্যে সে এমন কিছু দেখছে যা জেনিফার দেখতে পাচ্ছে না। তার চোখে তখন প্রবল আতঙ্ক। সে বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছিল এবং তার ঠোঁট কাঁপছিল। বাইরে তখন ঘন অন্ধকার, পুকুরের ওপরে কুয়াশার মতো একটা আস্তরণ, আর বাগানের গাছগুলো বাতাস না থাকা সত্ত্বেও অদ্ভুতভাবে দুলছিল।
জেনিফার জানালার দিকে তাকিয়ে কিছু দেখতে না পেলেও সাইদুলের চোখের আতঙ্ক তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ঠিক সেই রাতেই সাইদুল মারা গেল। সাইদুলের মৃত্যুর পর জেনিফারের পৃথিবী যেন মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল। স্বামীকে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা উঠতেই সে কোনোভাবেই রাজি হলো না। তার একমাত্র বিশ্বাস ছিল, সাইদুলকে যদি বাড়ি থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে সে সত্যিই একা হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত বাড়ির দক্ষিণ দিকে, ধানক্ষেতের ধারে, সেই পুরোনো বাগানের মধ্যে পুকুরের কাছেই সাইদুলের কবর খোঁড়া হলো। কবর খোঁড়ার সময় মাটির বেশ কিছুটা নিচে পুরোনো ইট, ভাঙা মাটির পাত্র আর অদ্ভুত কালচে মাটি পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু কেউ সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। সাইদুলকে দাফন করার পর জেনিফার ঘন্টার পর ঘন্টা কবরের পাশে বসে ছিল। সন্ধ্যা নেমে গেলেও সে ওঠেনি। রাত গভীর হওয়ার পরও তাকে কবরের মাটি আঁকড়ে বসে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তার চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সে নড়ছিল না। মনে হচ্ছিল, সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে যার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা আগেও কথা বলেছে, সেই মানুষটি এখন কয়েক হাত মাটির নিচে শুয়ে আছে।
সেই রাত থেকেই বাগানটা যেন আরও অন্ধকার হয়ে উঠল। পুকুরের জলও অস্বাভাবিকভাবে স্থির ছিল। মাঝে মাঝে কবরের আশপাশের ঘাস নড়ে উঠছিল, অথচ বাতাস ছিল না। সাইদুলের মৃত্যুর পর প্রায় দেড় মাস জেনিফার প্রতিদিন কবরের কাছে যেত। কখনও সকালে, কখনও দুপুরে, কখনও সন্ধ্যার পর। সে ঘন্টার পর ঘন্টা কবরের পাশে বসে থাকত, কখনও কাঁদত, কখনও মাটির দিকে তাকিয়ে থাকত, কখনও আবার কবরের মাটি হাত দিয়ে স্পর্শ করত। প্রথমদিকে গ্রামের মানুষ তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কেউ খাবার দিয়ে যেত, কেউ খোঁজ নিত, কেউ বলত সময়ের সঙ্গে সব দুঃখ কমে যাবে। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের আগ্রহ কমতে লাগল। প্রত্যেকের নিজের সংসার ছিল, নিজের সমস্যা ছিল। কয়েক মাসের মধ্যে জেনিফার কার্যত সম্পূর্ণ একা হয়ে গেল। তার কোনো আয় ছিল না, কোনো জমিজমা ছিল না, ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কোনো সম্পদ ছিল না। বাড়িটাও এমন জায়গায় ছিল যে কেউ কিনতে চাইত না। ধীরে ধীরে তার ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জানালাগুলোও প্রায় সবসময় বন্ধ থাকত। বাইরে থেকে কেউ আর তাকে দেখতে পেত না।
দিনের পর দিন তার বাড়ির চুলায় আগুন জ্বলত না। অনেক সময় রাতের অন্ধকারে বাড়ির ভেতর থেকে অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসত, যেন কেউ কাঠের মেঝেতে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে। কখনও গভীর রাতে তার কান্নার শব্দ শোনা যেত, আবার কখনও সেই কান্না হঠাৎ থেমে গিয়ে এক ধরনের অস্বাভাবিক হাসির শব্দ শোনা যেত। সময়ের সঙ্গে জেনিফারের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। একসময় যে মেয়েটি স্বামীর পাশে বসে হাসত, তার মুখে আর কোনো স্বাভাবিকতার চিহ্ন ছিল না। চুলগুলো জট পাকিয়ে কাঁধের ওপর ঝুলে থাকত, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ পড়েছিল, গাল বসে গিয়েছিল, শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। পোশাক ছিল ময়লা ও ছেঁড়া। সে দিনের পর দিন কারও সঙ্গে কথা বলত না। কিন্তু গভীর রাতে তাকে কখনও কখনও একা একা কথা বলতে শোনা যেত। আশপাশের মানুষরা প্রথমে ভেবেছিল, সে হয়তো সাইদুলের সঙ্গে কথা বলছে বলে মনে করছে। কিন্তু পরে তারা লক্ষ্য করল, জেনিফারের কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল যেন সে সত্যিই ঘরে অন্য কারও উপস্থিতি অনুভব করছে। কখনও সে হাসত, কখনও কাঁদত, কখনও হঠাৎ চিৎকার করে উঠত, আবার কখনও দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকত। তার ঘরের ভেতর থেকে মাঝেমধ্যে পচা গন্ধও বেরোতে শুরু করেছিল। কেউ ভেবেছিল হয়তো খাবার পচে গেছে। কিন্তু সেই গন্ধ ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল এবং একসময় এমন তীব্র হয়ে উঠল যে বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ও মানুষ নাক চেপে ধরত।
প্রায় ছয় মাস পর গ্রামের মানুষ প্রথমবার বাগানের মধ্যে অদ্ভুত আলো দেখতে পেল। গভীর রাত তখন। চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা ছিল যে দূরের পুকুরে ব্যাঙের ডাকও পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। সেই সময় বাগানের অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ একটি ক্ষীণ হলুদ আলো জ্বলে উঠল। আলোটি ছিল ঠিক সাইদুলের কবরের পাশে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল কোনো কৃষক হয়তো লণ্ঠন রেখে গেছে। কিন্তু পরপর কয়েক রাত একই সময়ে একই জায়গায় আলো জ্বলতে শুরু করায় গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। দূর থেকে দেখা যেত, আলোটি কখনও স্থির, কখনও ধীরে ধীরে নড়ছে। মনে হতো কেউ লণ্ঠন হাতে কবরের চারপাশে হাঁটছে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, আলোটি কখনও বাড়ির দিক থেকে কবরের দিকে আসত, আবার কিছুক্ষণ পর কবরের দিক থেকে বাড়ির দিকে চলে যেত।
দিনের বেলা জেনিফারকে মাঝে মাঝে সাইদুলের কবরের পাশে বসে থাকতে দেখা যেত বলে সবাই প্রথমে ধরে নিয়েছিল, রাতের বেলাতেও সে-ই কবরের কাছে যায়। কেউ কেউ আবার ভয় পেয়ে বলত, সাইদুলের আত্মা হয়তো ফিরে এসেছে।
একদিন ধান কাটার সময় কয়েকজন কৃষক বাগানের এক প্রান্তে বসে খেতে গিয়ে কবরটির দিকে তাকিয়ে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পেল। কবরের এক পাশের মাটি যেন কেউ খুঁড়ে দিয়েছে। চারপাশের লতাপাতা ছিঁড়ে ছড়িয়ে আছে। মাটির ওপর আঁচড়ের মতো দাগ। প্রথমে সবাই ভেবেছিল কোনো শিয়াল বা বন্য জন্তু কবরের মাটি খুঁড়েছে। কিন্তু একটু ভালো করে দেখার পর সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। কারণ মাটি শুধু ওপর থেকে নড়েনি, কবরের পাশ দিয়ে নিচের দিকে একটা সরু গর্ত তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছিল কেউ নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করছে। গ্রামের মানুষের মধ্যে তখন নতুন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। যদি কোনো জন্তু কবর খুঁড়ে থাকে, তবে মৃতদেহের কী অবস্থা? আর যদি মানুষ খুঁড়ে থাকে, তবে কেন? কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারল না। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন ঠিক করল, রাতে দূর থেকে নজর রাখা হবে।
সেই রাতেই প্রথমবার তারা ছায়ামূর্তিটিকে দেখল। রাত প্রায় দুটো। জেনিফারের বাড়ির দরজা নিঃশব্দে খুলল। অন্ধকারের মধ্যে একটি শুকনো ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল। তার হাতে ছিল একটি পুরোনো লণ্ঠন। লণ্ঠনের হলুদ আলো তার মুখকে সম্পূর্ণ স্পষ্ট করছিল না, বরং মুখটাকে আরও ভয়ংকর করে তুলছিল। ছায়ামূর্তিটি অত্যন্ত ধীরে ধীরে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। তার হাঁটার ভঙ্গি ছিল অস্বাভাবিক। মনে হচ্ছিল, বহুদিন ধরে হাঁটতে ভুলে যাওয়া কোনো মানুষ আবার হাঁটার চেষ্টা করছে। সে সোজা সাইদুলের কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকার পর কবরের পাশের সেই গর্তের কাছে বসে মাটি সরাতে লাগল। তারপর একসময় তার পুরো শরীর গর্তের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। দূর থেকে পাহারা দেওয়া লোকেরা আতঙ্কে জমে গেল। তারা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল। প্রায় বিশ মিনিট পর আবার গর্তের ভেতর থেকে লণ্ঠনের আলো দেখা গেল। ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল এবং বাড়ির দিকে চলে গেল। যাওয়ার সময় তার হাত থেকে কিছু একটা মাটিতে পড়ে গেল। অন্ধকারে বোঝা গেল না সেটা কী।
সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, মাটির ওপর ছোট্ট একটা হাড় পড়ে আছে। এরপর আর কারও সন্দেহ রইল না যে কবরের সঙ্গে কোনো ভয়ংকর ঘটনা জড়িয়ে আছে। এক রাতে পুরো গ্রামের কয়েকজন সাহসী মানুষ বাগানের চারপাশে লুকিয়ে রইল। সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল না। বাতাস ছিল না। পুকুরের জল ছিল একেবারে কালো। রাত যত গভীর হতে লাগল, ততই বাগানের ভেতর থেকে অদ্ভুত শব্দ আসতে লাগল। শুকনো পাতার ওপর যেন কেউ ধীরে ধীরে হাঁটছে। কখনও পুকুরের জলে ছপছপ শব্দ। কখনও গাছের ডাল ভাঙার শব্দ। তারপর ঠিক রাত দুটো নাগাদ জেনিফারের বাড়ির দরজা খুলল। একই ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল। এবার লণ্ঠনের আলো একটু বেশি ছিল। সবাই স্পষ্ট দেখতে পেল—ওটা জেনিফার। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। চোখ দুটো যেন গভীর অন্ধকারে ডুবে আছে। সে ধীরে ধীরে কবরের দিকে এগিয়ে গেল। কবরের পাশে পৌঁছে লণ্ঠনটি মাটিতে রাখল। তারপর মাটি সরিয়ে সেই গর্তটি খুলে ফেলল। কিছুক্ষণ পর সে গর্তের মধ্যে ঢুকে গেল। কেউ একজন সাহস করে টর্চ জ্বালিয়ে গর্তের ভেতরে আলো ফেলল। আলোটা নিচে পৌঁছতেই যে দৃশ্য দেখা গেল, তা উপস্থিত প্রত্যেক মানুষের শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমিয়ে দিল। কবরের ভেতরে জেনিফার বসে ছিল এবং তার সামনে পড়ে ছিল সাইদুলের মৃতদেহ। ছয় মাস মাটির নিচে থাকার পর দেহটি পচে গিয়েছিল। কিন্তু জেনিফারের চোখে সেই দৃশ্যের প্রতি কোনো ভয় বা ঘৃণা ছিল না। বরং তার মুখে ছিল এক ধরনের বিকৃত আনন্দ। সে মৃতদেহের শরীর থেকে মাংস ছিঁড়ে নিজের মুখে তুলছিল। তার ঠোঁট, চিবুক ও গাল রক্তে মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল। তার হাতের আঙুলে লেগে ছিল পচা মাংস।
কবরের চারপাশে এমন দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল যে কয়েকজন মানুষ সঙ্গে সঙ্গে বমি করে ফেলল। কেউ চিৎকার করে উঠতে গিয়েও নিজের মুখ চেপে ধরল। আর সেই মুহূর্তে জেনিফার ধীরে ধীরে মাথা তুলে টর্চের আলোর দিকে তাকাল। তার চোখ দুটোতে এমন এক শূন্যতা ছিল যা কোনো সুস্থ মানুষের চোখে দেখা যায় না। তারপর সে মৃতদেহটিকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে এমনভাবে আঁকড়ে ধরল যেন কেউ তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে এসেছে। গ্রামের মানুষ তখন তাকে কবর থেকে বের করার চেষ্টা করল। কিন্তু জেনিফারের মধ্যে যেন অস্বাভাবিক শক্তি এসে গিয়েছিল। সে হিংস্র পশুর মতো ছুটে পড়ল তাদের ওপর। কাউকে আঁচড়ে দিল, কাউকে কামড়ে দিল, কারও জামা ছিঁড়ে ফেলল, কারও চুলের মুঠি ধরে টানতে লাগল। তার শরীর ছিল কঙ্কালসার, অথচ শক্তি ছিল অস্বাভাবিক। মুখে তখনও লেগে ছিল রক্ত। চুলের মধ্যে কবরের মাটি। ছেঁড়া পোশাকের ভেতর থেকে শুকনো শরীরের হাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে তাকে আর কোনো সাধারণ মানুষ বলে মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিনের ক্ষুধা, নিঃসঙ্গতা, শোক এবং উন্মাদনা তার ভেতরের মানুষটাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে এবং তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে এক ভয়ংকর অমানবিক সত্তা।
অবশেষে পুলিশ এসে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনে। সাইদুলের কবর খুঁড়ে মৃতদেহটি বের করা হলে উপস্থিত সবাই আরও ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি হয়। মৃতদেহের শরীরের অধিকাংশ মাংস নেই। প্রায় নব্বই শতাংশ মাংস জেনিফার খেয়ে ফেলেছিল। কবরের ভেতরের মাটিতে শুকনো রক্তের দাগ, ছেঁড়া কাপড় এবং অসংখ্য নখের আঁচড় দেখা গেল। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল কবরের ভেতরের সেই আঁচড়গুলো। সেগুলো শুধু বাইরের মাটি খোঁড়ার দাগ ছিল না; মনে হচ্ছিল, কেউ যেন কবরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বহুবার মাটির দেয়াল আঁচড়েছে। পুলিশ সাইদুলের দেহ অন্য একটি কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করল এবং জেনিফারকে গ্রেফতার করে হাসপাতালে পাঠানো হলো। চিকিৎসকেরা পরে জানালেন, জেনিফার সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। তার কাছে বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সে প্রায় সবসময়ই বিশ্বাস করত সাইদুল তার কাছেই আছে এবং কেউ তাকে সাইদুলের কাছ থেকে আলাদা করতে চাইছে।
কিন্তু ঘটনাটি এখানেই শেষ হয়নি। জেনিফারকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর কয়েক সপ্তাহ পর এক রাতে হাসপাতালের একজন নার্স অদ্ভুত কিছু দেখতে পেল। জেনিফারের ঘরটি ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানালায় লোহার গ্রিল। দরজার বাইরে পাহারা। অথচ রাতের শেষ প্রহরে নার্স যখন ঘরে ঢুকল, তখন বিছানায় জেনিফার নেই। ঘরের মেঝেতে ছিল ভেজা মাটির দাগ। সেই দাগ বিছানার পাশ থেকে শুরু হয়ে জানালার কাছে গিয়ে থেমেছিল। জানালার বাইরে তাকিয়ে নার্স হাসপাতালের দূরের মাঠের দিকে একটা ক্ষীণ হলুদ আলো দেখতে পেল। আলোটা স্থির ছিল না। মনে হচ্ছিল, কেউ লণ্ঠন হাতে ধীরে ধীরে হাঁটছে। নার্স ভয়ে জানালা বন্ধ করে দিল। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর ঘরের ভেতর থেকেই একটা ক্ষীণ নারীকণ্ঠ ভেসে এল। সেই কণ্ঠ এত কাছে ছিল যে নার্সের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। অথচ ঘরে তখন কেউ ছিল না। সাইদুলের পুরোনো বাড়িটা পরে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে গেল। কেউ আর সেখানে থাকত না। বাগান আরও ঘন হয়ে উঠল, পুকুরের জল আরও কালো হয়ে গেল, কবরের জায়গা ঘাসে ঢেকে গেল। তবু গ্রামের মানুষ অমাবস্যার রাতে এখনও কখনও কখনও সেই বাগানের ভেতর একটা ক্ষীণ হলুদ আলো দেখতে পায়। আলোটা কখনও কবরের কাছে জ্বলে, কখনও পুকুরের ঘাটে, আবার কখনও বাগানের একেবারে গভীরে চলে যায়। আশ্চর্যের বিষয়, আলো দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুকুরের জলে অদ্ভুত ঢেউ উঠতে থাকে, অথচ চারপাশে বাতাস থাকে না। কখনও কখনও গভীর রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা নারীকণ্ঠের হাসিও শোনা যায়। সেই হাসি ধীরে ধীরে কাঁদায় পরিণত হয়, তারপর আবার হাসিতে ফিরে যায়।
গ্রামের বৃদ্ধরা এখন আর ওই জায়গার কাছে যায় না। তারা শুধু জানে, সাইদুলের মৃত্যুর আগের রাতেও যে আলো দেখা গিয়েছিল, মৃত্যুর পর ছয় মাস ধরে যে আলো কবরের পাশে জ্বলেছিল, আর জেনিফারকে কবরের ভেতরে ঢোকার রাতে যে আলো দেখা গিয়েছিল—তিনটি আলো ছিল একই রকম। সবচেয়ে ভয়ংকর রহস্যটি আজও অমীমাংসিত। সাইদুল মৃত্যুর আগে জানালার বাইরে যে আলো দেখেছিল, সেটি আসলে কী ছিল কেউ জানে না। কবরের ভেতরে মৃতদেহের পাশে জেনিফারের সঙ্গে আর কেউ ছিল কি না, সেটাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কারণ যারা সেদিন টর্চের আলো ফেলেছিল, তারা সবাই শুধু জেনিফারকে দেখেছিল। কিন্তু পরদিন কবরের ভেতরের মাটিতে জেনিফারের পায়ের ছাপের পাশাপাশি আরও একটি অদ্ভুত ছাপ পাওয়া গিয়েছিল। সেটি মানুষের পায়ের ছাপের মতো, কিন্তু আকারে অনেক বড় এবং পায়ের আঙুলগুলো অস্বাভাবিকভাবে লম্বা। পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। পরে বৃষ্টি এসে সব চিহ্ন মুছে দিয়েছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, জেনিফার একা ছিল না। তার নিঃসঙ্গতা হয়তো শুধু তাকে পাগল করেনি, বরং বাগানের বহু পুরোনো অন্ধকারের সঙ্গে তাকে এমনভাবে যুক্ত করেছিল, যার শেষ আজও হয়নি।
আজও গভীর রাতে, যখন ধানক্ষেতের ওপর কুয়াশা নামে, পুকুরের জল সম্পূর্ণ স্থির হয়ে যায় এবং গ্রামের শেষ বাড়িগুলোর আলো একে একে নিভে যায়, তখন সেই পরিত্যক্ত বাগানের মধ্যে একটি ক্ষীণ হলুদ আলো জ্বলে ওঠে। প্রথমে আলোটি খুব দূরে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে কবরের কাছে আসে। কখনও মনে হয় কেউ লণ্ঠন হাতে হাঁটছে। কখনও মনে হয় আলোটা বাতাসের মধ্যে ভাসছে। আর মাঝে মাঝে সেই আলোর পেছনে একটা নারীমূর্তি দেখা যায়। তার চুল এলোমেলো, শরীর কঙ্কালসার, পোশাক ছেঁড়া এবং মুখটা অন্ধকারে ঢাকা। সে ধীরে ধীরে কবরের পাশে বসে পড়ে। তারপর মাটির ওপর হাত রেখে অনেকক্ষণ স্থির থাকে। দূর থেকে যারা দেখেছে, তারা বলে, সেই সময় পুকুরের কালো জলে আরেকটা ছায়া দেখা যায়। ছায়াটা নারীমূর্তিটির নয়। সেটা একজন পুরুষের ছায়া। এবং সেই ছায়া ধীরে ধীরে জলের ভেতর থেকে উঠে এসে জেনিফারের পেছনে দাঁড়ায়। তারপর লণ্ঠনের আলোটা নিভে যায়। চারপাশ আবার অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড পর একটা পুরুষকণ্ঠ শোনা যায়। খুব নিচু স্বরে। খুব কাছে থেকে। যেন কবরের মাটির নিচ থেকেই কেউ কথা বলছে। তারপর নারীকণ্ঠে একটা চাপা হাসি ভেসে আসে। আর শেষবারের মতো পুকুরের কালো জলের মধ্যে ক্ষীণ হলুদ আলো জ্বলে ওঠে। সেই আলো আজও নিভে যায়নি। শুধু অপেক্ষা করছে—আরেকজনের জন্য।