
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী: একজন আমেরিকান অমুসলিম বিজ্ঞানী মাইকেল এইচ. হার্ট তাঁর বিখ্যাত The 100: A Ranking of the Most Influential Persons in History- গ্রন্থে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকা করেছেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, সেই তালিকার শীর্ষস্থান তিনি দিয়েছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে। বাস্তবিকই তিনি ছিলেন আদর্শের বিশ্বকোষ ও সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ মহামানব। তাঁর মহান চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেওয়া কঠিন। মানবকল্যাণ, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, বিনয়, সাহস ও ভালোবাসার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর জীবনে। তাই মহান আল্লাহ তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী” (সূরা আল-কলম: ৪)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ” (সূরা আল-আহযাব: ২১)। মানবজীবনের নৈতিকতা ও সৌন্দর্যের প্রায় সব মহৎ গুণই তাঁর জীবনে পূর্ণতা পেয়েছিল।
বিনয়ের শক্তিতে জয় করেছিলেন মানুষের হৃদয়
মহানবী (সা.) ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। মদিনার সাধারণ শিশুরাও তাঁর হাত ধরে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারত। তিনি সাহাবিদেরও মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণের শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন, “তোমরা নম্র ব্যবহার করো, কঠোর ব্যবহার করো না। মানুষকে সুসংবাদ দাও এবং তাদের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না” (সহিহ বুখারি: ৫৬৯৪)। একবার এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেললে উপস্থিত লোকেরা তাকে শাসন করতে উদ্যত হন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের বাধা দিয়ে স্থানটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে বললেন এবং শিক্ষা দিলেন, “তোমাদের নম্রতা অবলম্বনকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে; কঠোরতা অবলম্বনকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি” (সহিহ বুখারি: ৫৬৯৮)। কঠোরতার পরিবর্তে ভালোবাসা ও নম্রতাই ছিল মানুষের হৃদয় জয় করার তাঁর অনন্য পদ্ধতি।
প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাই ছিল তাঁর বিজয়ের ভাষা
ক্ষমা ও মহানুভবতা ছিল মহানবীর (সাঃ) সহজাত অভ্যাস। প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি চরম শত্রুকেও ক্ষমা করে দিতেন। মক্কার কাফির, মুশরিকরা হুজুরকে (সাঃ) প্রাণে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছে, অত্যাচারের স্টীম-রোলার চালিয়ে তার উপর। তার পরও তিনি মক্কা বিজয়ের দিনে ঘোষণা করলেন, ‘হে কুরাইশরা! তোমরা আমার কাছ থেকে আজ কেমন ব্যবহার আশা করো?’ তারা বলল, সম্মানিত ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রের মতো! তিনি বললেন, ‘তোমরা চলে যাও! আজ তোমরা মুক্ত!’ বিনা রক্তপাতের এমন বিজয়, আর বিজয়ের পরে সাধারণ ক্ষমার এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবী কি কখনও দেখেছে ? এক ইহুদী বুড়ি তাকে বিষ প্রয়োগ করেছিল, তারপরও তিনি তাকে মাফ করে দিয়েছিলেন।
শ্রেষ্ঠ হয়েও ছিলেন সাধারণ মানুষের মতো সরল
রসুলের ভিতরে (সাঃ) অহঙ্কারের লেশ মাত্র ছিলনা। তিনি সবার আগে মানুষকে সালাম দিতেন এবং বলতেন, যে আগে সালাম দেয় সে অহঙ্কার মুক্ত। কিন্তুু, বর্তমানে আমরা অপরের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকি; দেখি মুখ নড়ে কিনা, কখন সে আমাকে সালাম দেয়, এর পর উত্তর দিব। সৃষ্টির সেরা মানুষ হয়েও তিনি বিলাসিতামুক্ত,অত্যন্ত সাটা-মাটা ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। খেজুরের ছালভর্তি ছাটায়ের উপর শোয়ার কারণে তার পিঠে দাগ পড়ে যেতো। সাহাবারা (রাঃ) ভালো কোনো বিছানার ব্যবস্থা করার আবদার জানালে তার প্রতিউত্তরে তিনি বলতেন, আমি দুনিয়াতে একজন পথচারী ছাড়া আর কিছুই নই। যে পথচারী একটা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে একটু পরে সেটা ছেড়ে চলে যায় (তিরমিজি: ২৩৭৭)। তিনি সাহাবাদের সাথে এমনভাবে মিশে বসতেন যে, কোন আগন্তুক এসে চিনতে পারতো না কে আল্লাহর রসুল। এ কারণে অধিকাংশ সময়ে তারা জিজ্ঞাসা করতো, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে?
লজ্জাশীলতায় ফুটে উঠেছিল চরিত্রের সৌন্দর্য
মহানবী (সা.) ছিলেন অত্যন্ত লজ্জাশীল। তিনি বলেছেন, “যদি তোমার লজ্জা না থাকে, তবে তুমি যা ইচ্ছা তাই করো” (সহিহ বুখারি: ৫৬৯০)। হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) নিজ গৃহে অবস্থানরত কুমারী মেয়েদের চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন (সহিহ বুখারি: ৫৬৮৯)। আজকের সমাজে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার বিস্তার যখন উদ্বেগজনক, তখন মহানবী (সা.)-এর পবিত্র ও লজ্জাশীল জীবন হতে পারে এক উজ্জ্বল পথনির্দেশ।
শিশুদের ভালোবাসায় তিনি ছিলেন অনন্য
মহানবী (সা.) শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত আপন হয়ে মিশতেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন, তিনি একদিন তাঁর ছোট ভাইকে স্নেহভরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আবু উমাইর! তোমার নুগাইর পাখিটি কেমন আছে?” (সহিহ বুখারি: ৫৬৯৯)। হযরত আয়েশা (রা.) ছোটবেলায় পুতুল নিয়ে খেলতেন। তাঁর বান্ধবীরা খেলতে এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের বাধা দিতেন না; বরং তারা পালিয়ে গেলে ডেকে এনে আবার খেলতে দিতেন (সহিহ বুখারি: ৫৭০০)। শিশুদের প্রতি তাঁর এই আন্তরিকতা শেখায়-তাদেরও ভালোবাসা, সময় ও সম্মানের প্রয়োজন।
দানশীলতায় ছিল না ‘না’ বলার অভ্যাস
মহানবী (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, দানশীল ও সাহসী (সহিহ বুখারি: ৫৬০৭)। হযরত জাবির (রা.) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো ‘না’ বলেননি” (সহিহ বুখারি: ৫৬০৮)। তাঁর দানশীলতা শুধু অর্থ-সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি মানুষকে দিতেন ভালোবাসা, সময়, সান্ত্বনা, সাহস ও সহমর্মিতা। তাঁর উদার হৃদয় ছিল মানবতার জন্য এক উন্মুক্ত আশ্রয়।
অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর আনন্দ
দরিদ্র, নিঃস্ব, অসহায় ও এতিমদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর মমতা ছিল সীমাহীন। তিনি সাহাবিদেরও অসহায় মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহযোগিতায় উৎসাহিত করতেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন-বস্ত্রহীনকে বস্ত্র, ক্ষুধার্তকে খাবার এবং পিপাসার্তকে পানি পান করানো মহান সওয়াবের কাজ (আবু দাউদ, তিরমিজি)। এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তির মর্যাদা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “আমি এবং এতিমের অভিভাবক জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি থাকব”-এ কথা বলার সময় তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি মিলিয়ে ইশারা করেছিলেন (সহিহ বুখারি: ৫৫৭৯; তিরমিজি: ১৯১৮)। এতিম, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মমতা ছিল তাঁর মানবিকতার উজ্জ্বল প্রকাশ।
মানবতার কাছে ধর্মের বিভাজন ছিল না
মহানবী (সা.) অমুসলিমদের সঙ্গেও উত্তম আচরণের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একবার এক ইহুদি ব্যক্তি তাঁর মেহমান হয়েছিল। মহানবী (সা.) তাকে যথাসাধ্য আপ্যায়ন করেন এবং রাতে থাকার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু লোকটি তাঁর বিছানায় অপবিত্রতা করে চলে যায়। বিষয়টি জানতে পেরে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিশোধ নেননি; বরং নিজের হাতে সেই স্থান পরিষ্কার করেন। তাঁর আচরণে ফুটে উঠেছিল অসীম ধৈর্য, ক্ষমা ও মানবিকতা। এই ঘটনা আমাদের শেখায়-মানুষের মহত্ত্ব প্রকাশ পায় অন্যের আচরণে নয়; বরং অন্যের আচরণের জবাবে সে কেমন আচরণ করে, তাতে।
যে আদর্শ আজও মানবতাকে পথ দেখায়
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চরিত্র ও আদর্শের আলোচনা কখনো শেষ হওয়ার নয়। তাঁর জীবনে আমরা পেয়েছি বিনয়, ক্ষমা, দয়া, লজ্জাশীলতা, সরলতা, দানশীলতা, শিশুর প্রতি ভালোবাসা, দরিদ্রের প্রতি মমতা এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও সদাচরণ। আজ যখন অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করছে, তখন মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শই হতে পারে মানবতার জন্য শান্তি ও কল্যাণের উজ্জ্বল পথনির্দেশ।
তাই আসুন, সীরাতুন্নবীর এই মাসে তাঁকে শুধু ভালোবাসার দাবি না করে তাঁর মহান চরিত্রকে নিজেদের জীবনে ধারণ করি। তাঁর বিনয় আমাদের আচরণে, ক্ষমা আমাদের হৃদয়ে, দয়া আমাদের সমাজে এবং মানবিকতা আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হোক। মহানবী (সা.)-এর আদর্শ ব্যক্তি থেকে পরিবারে, পরিবার থেকে সমাজে এবং সমাজ থেকে সমগ্র মানবতার মাঝে ছড়িয়ে দিয়েই গড়ে উঠুক একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ।
(লেখক: মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়; মেলবোর্ণ, অস্ট্রেলিয়া)