
মোহাম্মদ আলম ফরিদ: আমি আমার একজন অগ্রজ বন্ধুপ্রতীম বড় ভাই ও কবি কায়সার ভাইয়ের সাথে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। আলোচনার বিষয় — বাঙালি মুসলমানরা কি আরব্য সংস্কৃতির দাস কি না?
আমাদের মধ্যেকার সেই কথোপকথন তখনও পর্দায় জ্বলজ্বল করছে, স্ক্রল হচ্ছে একটার পর একটা মন্তব্য, যেন কোনো নদীর স্রোতের মতো তর্কের পলি জমছে। ঠিক তখনই আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আব্দু মিয়া স্যার আমার বাসায় এসে উপস্থিত হলেন।
শীতের রাত। কুয়াশা-ভেজা রাত। চারিদিকে কুয়াশা। সাদা কুয়াশার চাদরে মোড়া সুনামগঞ্জ — যেন শহরটাই কোনো এক বিস্মৃত ভোরের স্বপ্ন দেখছে, নিজের রাস্তাঘাট নিজেই ভুলে গেছে। জানালার কাচে কুয়াশা এসে ঠেকেছে এমনভাবে, যেন বাইরের পৃথিবী আর ভেতরের ঘর — দুই-ই একই নিঃশ্বাসে বাঁচছে।
স্যার দরজায় দাঁড়িয়ে, চাদরের ভাঁজ থেকে কুয়াশার এক টুকরো যেন খসে পড়ল ঘরের মেঝেতে, তারপর আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল আলোর সাথে।
— কী নিয়ে এত মগ্ন, ফরিদ? — স্যার জিজ্ঞেস করলেন, আমার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, যেখানে তখনও কায়সার ভাইয়ের শেষ মন্তব্যটা জ্বলছিল।
আমি তাঁকে অবহিত করলাম — বললাম, কায়সার ভাই একটা পোস্টে লিখেছেন, তুরস্ক, ইরান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া কখনো দাস-সুলভ আচরণ দেখায়নি, তারা নিজেদের ভাষাতেই নিজেদের নাম রেখেছে, নিজেদের কৃষ্টিকে বর্জন করেনি — অথচ বাংলাদেশের মুসলিমরাই যেন ধর্মের নামে আরব্য সংস্কৃতির দাসে পরিণত হয়েছে। আমি তার উত্তরে লিখেছিলাম যে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ইসলামী সভ্যতা, আর সেই সভ্যতার ভাষা-প্রতীক-ইতিহাসের উৎস আরব — কুরআন আরবিতে অবতীর্ণ, নবীজি (সা.) আরবের সন্তান। প্রশ্ন হলো, সেই ভিত্তি সরিয়ে রেখে উনিশ শতকের বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে যদি নিজেদের সংজ্ঞায়িত করতে চাই, তাহলে পরিচয় অক্ষুণ্ণ থাকে, নাকি আরও বিভ্রান্ত হয়?
স্যার একটা চেয়ার টেনে বসলেন, কুয়াশা তখনও তাঁর কাঁধ ছেড়ে যায়নি, যেন সেটা তাঁরই ছায়া, তাঁর সাথেই ঘরে ঢুকেছে।
— বসো, ফরিদ। আজ রাতটা লম্বা হবে। কুয়াশা যখন এমন গভীর হয়, তখন কথাও গভীর হতে হয়।
তিনি জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে একটা কুকুর ডাকল, তারপর সেই ডাকও কুয়াশায় মিলিয়ে গেল, যেন শব্দেরও একটা দেহ আছে, আর সেই দেহও এই রাতে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে একে একে।
— তোমার বন্ধু বলছেন এটা কালচারাল ফ্যাসিজম, স্যার বললেন, যেন তিনি নিজেই সেই মন্তব্যটা পড়ে ফেলেছেন কুয়াশার ভেতর দিয়ে। বলছেন, আল্লাহ শুধু আরবদের তৈরি করেননি, আরবি ভাষাও জাতিগতভাবে শ্রেষ্ঠ নয় — এই প্রচার দিয়ে নাকি মগজধোলাই হয়েছে।
— জি স্যার। কিন্তু আমি তো কোথাও এমন দাবি করিনি। কুরআন তো নিজেই মানুষের ভাষা ও জাতিগত বৈচিত্র্যকে আল্লাহর নিদর্শন বলে উল্লেখ করে। এই অভিযোগ আমার বক্তব্যের নয় — এটা আমার বক্তব্যের একটা বিকৃত প্রতিবিম্ব, যেমন কুয়াশার ভেতর একটা গাছকে হঠাৎ দৈত্যের মতো মনে হয়।
স্যার মৃদু হাসলেন। তাঁর হাসিতে কুয়াশাও যেন একটু কেঁপে উঠল।
— তাহলে পার্থক্যটা বলো। আরব সংস্কৃতি, আরব সাম্রাজ্য, আর ইসলামী সভ্যতা — এই তিনটে কি একই জিনিস?
— না স্যার। ইসলামের উৎস আরব উপদ্বীপে, কুরআনের ভাষা আরবি, রাসূল (সা.) আরব — এটা সত্য। কিন্তু ইসলামী সভ্যতা তো গড়ে উঠেছে আরব, পারস্য, তুর্কি, কুর্দি, বারবার, ভারতীয়, মালয়, আফ্রিকান — অসংখ্য জাতির সম্মিলিত অবদানে। কোনো আরব শাসকের অপরাধকে ইসলামের ঘাড়ে চাপানো যেমন ভুল, তেমনি কোনো মুসলিম শাসকের রাজনৈতিক আগ্রাসনকে আরবি ভাষার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানোও যুক্তির দিক থেকে গ্রহণযোগ্য নয়।
স্যার উঠে গিয়ে জানালাটা একটুখানি খুললেন। কুয়াশা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল, যেন সে-ও কথোপকথনে অংশ নিতে চায়।
— সুলতান মাহমুদের প্রসঙ্গটা তো এসেছে, তাই না? বলা হচ্ছে, তিনি বিনা প্ররোচনায় ভারত আক্রমণ করেছিলেন, আর এই মনোবৃত্তিই নাকি আজকের সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতার পূর্বসূরি।
— জি স্যার। কিন্তু সেই ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। প্রশ্ন হলো, সেখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যে আরবি ভাষা বা ইসলামী ঐতিহ্যই তাই প্রত্যাখ্যানযোগ্য — এটা তো জেনেটিক ফ্যালাসি। কোনো ধারণার উৎস বা তার অনুসারীদের অপরাধ সেই ধারণাকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না। কোনো ইংরেজিভাষী রাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ করলে কি ইংরেজি ভাষা দোষী হয়ে যায়? কোনো ইহুদি রাষ্ট্র অন্যায় করলে কি হিব্রু ভাষা দোষী? কোনো বৌদ্ধ-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র নিপীড়ন চালালে কি পালি ভাষা দোষী?
স্যার মাথা নাড়লেন, কুয়াশার ভেতর দিয়ে তাঁর মুখ যেন আধডোবা চাঁদের মতো দেখাচ্ছিল।
— তুরস্ক, ইরান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার উদাহরণটা কী বলে?
— এই দেশগুলোর মুসলমানরাও কিন্তু আরবি ভাষার সঙ্গে ধর্মীয় সম্পর্ক অস্বীকার করেনি, স্যার। তারা নামাজ আরবিতে পড়ে, কুরআন আরবিতে তিলাওয়াত করে, ইসলামী পরিভাষা আরবি থেকেই নেয়, সন্তানের নামের বড় অংশ আরবি উৎস থেকে রাখে। নিজেদের ভাষাও রেখেছে, ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কও রেখেছে। এটা তো “হয় দেশজ সংস্কৃতি, নয়তো আরবি” — এমন কোনো দ্বৈত বাস্তবতা নয়।
কুয়াশা তখন ঘরের মধ্যিখানে একটা স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে গেছে, যেন সে নিজেই একজন নীরব শ্রোতা।
— তাহলে তুমি বলতে চাইছ, বাঙালি মুসলমানকে তার দেশজ সংস্কৃতি বর্জন করতে হবে?
— না স্যার, কখনোই না। প্রশ্নটা হলো — কোন সংস্কৃতি? যে সংস্কৃতি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, মুসলিম সমাজ সেটা বরাবরই ধারণ করেছে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, লোকজ রীতি — এসবের বিপুল অংশ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহন করেছে মুসলমানরাই। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আরবি ভাষা ও ইসলামী ঐতিহ্য থাকবে — এটা তো ইসলামের স্বাভাবিক পরিণতি।
স্যার একটু চুপ করে রইলেন। বাইরে কুয়াশার ভেতর একটা রিকশার ঘণ্টি বেজে উঠল, তারপর সেই শব্দও যেন কুয়াশার শরীরে শুষে নিল রাত।
— আর সৌদি আরবের প্রসঙ্গ? বলা হচ্ছে, খোদ সৌদি আরবও নাকি “ইসলামি ঐতিহ্য” অনুসরণ করে না।
আমি একটু হাসলাম, স্যারের দিকে তাকিয়ে।
— তাহলে তো সেটাই আমার বক্তব্যকে শক্তিশালী করে, স্যার। কোনো রাষ্ট্র ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে, সেই ব্যর্থতা ইসলামের ব্যর্থতা নয়। মুসলিম রাষ্ট্র আর ইসলাম এক জিনিস নয় — যেমন খ্রিস্টান রাষ্ট্র আর খ্রিস্টধর্ম এক নয়।
আব্দু মিয়া স্যার, কায়সার ভাই ও কুয়াশার রাতে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়
মোহাম্মদ আলম ফরিদ : আমি আমার একজন অগ্রজ বন্ধুপ্রতীম বড় ভাই ও কবি কায়সার ভাইয়ের সাথে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। আলোচনার বিষয় — বাঙালি মুসলমানরা কি আরব্য সংস্কৃতির দাস কি না?
আমাদের মধ্যেকার সেই কথোপকথন তখনও পর্দায় জ্বলজ্বল করছে, স্ক্রল হচ্ছে একটার পর একটা মন্তব্য, যেন কোনো নদীর স্রোতের মতো তর্কের পলি জমছে। মনে হলো, ঠিক তখনই আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আব্দু মিয়া স্যার আমার বাসায় এসে উপস্থিত হলেন।
শীতের রাত। কুয়াশা-ভেজা রাত। চারিদিকে কুয়াশা। সাদা কুয়াশার চাদরে মোড়া সুনামগঞ্জ — যেন শহরটাই কোনো এক বিস্মৃত ভোরের স্বপ্ন দেখছে, নিজের রাস্তাঘাট নিজেই ভুলে গেছে। জানালার কাচে কুয়াশা এসে ঠেকেছে এমনভাবে, যেন বাইরের পৃথিবী আর ভেতরের ঘর — দুই-ই একই নিঃশ্বাসে বাঁচছে।
স্যার দরজায় দাঁড়িয়ে, চাদরের ভাঁজ থেকে কুয়াশার এক টুকরো যেন খসে পড়ল ঘরের মেঝেতে, তারপর আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল আলোর সাথে।
— কী নিয়ে এত মগ্ন, ফরিদ? — স্যার জিজ্ঞেস করলেন, আমার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, যেখানে তখনও শেষ মন্তব্যটা জ্বলছিল।
আমি তাঁকে অবহিত করলাম — বললাম, এক ভাই একটা পোস্টে লিখেছেন, তুরস্ক, ইরান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া কখনো দাস-সুলভ আচরণ দেখায়নি, তারা নিজেদের ভাষাতেই নিজেদের নাম রেখেছে, নিজেদের কৃষ্টিকে বর্জন করেনি — অথচ বাংলাদেশের মুসলিমরাই যেন ধর্মের নামে আরব্য সংস্কৃতির দাসে পরিণত হয়েছে। আমি তার উত্তরে লিখেছিলাম যে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ইসলামী সভ্যতা, আর সেই সভ্যতার ভাষা-প্রতীক-ইতিহাসের উৎস আরবি — কুরআন আরবিতে অবতীর্ণ, নবীজি (সা.) আরবের সন্তান। প্রশ্ন হলো, সেই ভিত্তি সরিয়ে রেখে উনিশ শতকের বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে যদি নিজেদের সংজ্ঞায়িত করতে চাই, তাহলে পরিচয় অক্ষুণ্ণ থাকে, নাকি আরও বিভ্রান্ত হয়?
স্যার একটা চেয়ার টেনে বসলেন, কুয়াশা তখনও তাঁর কাঁধ ছেড়ে যায়নি, যেন সেটা তাঁরই ছায়া, তাঁর সাথেই ঘরে ঢুকেছে।
— বসো, ফরিদ। আজ রাতটা লম্বা হবে। কুয়াশা যখন এমন গভীর হয়, তখন কথাও গভীর হতে হয়।
তিনি জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে একটা কুকুর ডাকল, তারপর সেই ডাকও কুয়াশায় মিলিয়ে গেল, যেন শব্দেরও একটা দেহ আছে, আর সেই দেহও এই রাতে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে একে একে।
— তোমার আরেক বন্ধু বলছেন এটা কালচারাল ফ্যাসিজম, স্যার বললেন, যেন তিনি নিজেই সেই মন্তব্যটা পড়ে ফেলেছেন কুয়াশার ভেতর দিয়ে। বলছেন, আল্লাহ শুধু আরবদের তৈরি করেননি, আরবি ভাষাও জাতিগতভাবে শ্রেষ্ঠ নয় — এই প্রচার দিয়ে নাকি মগজধোলাই হয়েছে।
— জি স্যার। কিন্তু আমি তো কোথাও এমন দাবি করিনি। কুরআন তো নিজেই মানুষের ভাষা ও জাতিগত বৈচিত্র্যকে আল্লাহর নিদর্শন বলে উল্লেখ করে। এই অভিযোগ আমার বক্তব্যের নয় — এটা আমার বক্তব্যের একটা বিকৃত প্রতিবিম্ব, যেমন কুয়াশার ভেতর একটা গাছকে হঠাৎ দৈত্যের মতো মনে হয়।
স্যার মৃদু হাসলেন। তাঁর হাসিতে কুয়াশাও যেন একটু কেঁপে উঠল।
— তাহলে পার্থক্যটা বলো। আরব সংস্কৃতি, আরব সাম্রাজ্য, আর ইসলামী সভ্যতা — এই তিনটে কি একই জিনিস?
— না স্যার। ইসলামের উৎস আরব উপদ্বীপে, কুরআনের ভাষা আরবি, রাসূল (সা.) আরব — এটা সত্য। কিন্তু ইসলামী সভ্যতা তো গড়ে উঠেছে আরব, পারস্য, তুর্কি, কুর্দি, বারবার, ভারতীয়, মালয়, আফ্রিকান — অসংখ্য জাতির সম্মিলিত অবদানে। কোনো আরব শাসকের অপরাধকে ইসলামের ঘাড়ে চাপানো যেমন ভুল, তেমনি কোনো মুসলিম শাসকের রাজনৈতিক আগ্রাসনকে আরবি ভাষার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানোও যুক্তির দিক থেকে গ্রহণযোগ্য নয়।
স্যার উঠে গিয়ে জানালাটা একটুখানি খুললেন। কুয়াশা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল, যেন সে-ও কথোপকথনে অংশ নিতে চায়।
— সুলতান মাহমুদের প্রসঙ্গটা তো এসেছে, তাই না? বলা হচ্ছে, তিনি বিনা প্ররোচনায় ভারত আক্রমণ করেছিলেন, আর এই মনোবৃত্তিই নাকি আজকের সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতার পূর্বসূরি।
— জি স্যার। কিন্তু সেই ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। প্রশ্ন হলো, সেখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যে আরবি ভাষা বা ইসলামী ঐতিহ্যই তাই প্রত্যাখ্যানযোগ্য — এটা তো জেনেটিক ফ্যালাসি। কোনো ধারণার উৎস বা তার অনুসারীদের অপরাধ সেই ধারণাকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না। কোনো ইংরেজিভাষী রাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ করলে কি ইংরেজি ভাষা দোষী হয়ে যায়? কোনো ইহুদি রাষ্ট্র অন্যায় করলে কি হিব্রু ভাষা দোষী? কোনো বৌদ্ধ-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র নিপীড়ন চালালে কি পালি ভাষা দোষী?
স্যার মাথা নাড়লেন, কুয়াশার ভেতর দিয়ে তাঁর মুখ যেন আধডোবা চাঁদের মতো দেখাচ্ছিল।
— তুরস্ক, ইরান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার উদাহরণটা কী বলে?
— এই দেশগুলোর মুসলমানরাও কিন্তু আরবি ভাষার সঙ্গে ধর্মীয় সম্পর্ক অস্বীকার করেনি, স্যার। তারা নামাজ আরবিতে পড়ে, কুরআন আরবিতে তিলাওয়াত করে, ইসলামী পরিভাষা আরবি থেকেই নেয়, সন্তানের নামের বড় অংশ আরবি উৎস থেকে রাখে। নিজেদের ভাষাও রেখেছে, ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কও রেখেছে। এটা তো “হয় দেশজ সংস্কৃতি, নয়তো আরবি” — এমন কোনো দ্বৈত বাস্তবতা নয়।
কুয়াশা তখন ঘরের মধ্যিখানে একটা স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে গেছে, যেন সে নিজেই একজন নীরব শ্রোতা।
— তাহলে তুমি বলতে চাইছ, বাঙালি মুসলমানকে তার দেশজ সংস্কৃতি বর্জন করতে হবে?
— না স্যার, কখনোই না। প্রশ্নটা হলো — কোন সংস্কৃতি? যে সংস্কৃতি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, মুসলিম সমাজ সেটা বরাবরই ধারণ করেছে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, লোকজ রীতি — এসবের বিপুল অংশ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহন করেছে মুসলমানরাই। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আরবি ভাষা ও ইসলামী ঐতিহ্য থাকবে — এটা তো ইসলামের স্বাভাবিক পরিণতি।
স্যার একটু চুপ করে রইলেন। বাইরে কুয়াশার ভেতর একটা রিকশার ঘণ্টি বেজে উঠল, তারপর সেই শব্দও যেন কুয়াশার শরীরে শুষে নিল রাত।
— আর সৌদি আরবের প্রসঙ্গ? বলা হচ্ছে, খোদ সৌদি আরবও নাকি “ইসলামি ঐতিহ্য” অনুসরণ করে না।
আমি একটু হাসলাম, স্যারের দিকে তাকিয়ে।
— তাহলে তো সেটাই আমার বক্তব্যকে শক্তিশালী করে, স্যার। কোনো রাষ্ট্র ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে, সেই ব্যর্থতা ইসলামের ব্যর্থতা নয়। মুসলিম রাষ্ট্র আর ইসলাম এক জিনিস নয় — যেমন খ্রিস্টান রাষ্ট্র আর খ্রিস্টধর্ম এক নয়।
স্যার এবার তাঁর চাদরটা গায়ে আরও ভালো করে জড়িয়ে নিলেন, যেন কুয়াশার শীত এতক্ষণে তাঁকে ছুঁয়ে ফেলেছে।
— ধরো, ফরিদ। তোমার নাম “ফরিদ আহমেদ” থেকে পাল্টে “অনন্য শুভজিৎ” রাখা হলো। কী বদলাবে বলো তো?
— আইনি পরিচয় হয়তো একই থাকবে, স্যার। কিন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পাঠ সম্পূর্ণ বদলে যাবে। মানুষ নাম শুনেই প্রথমে যে পরিচয় নির্মাণ করে, সেটা আর আগের মতো থাকবে না। নাম তো কেবল একটা শব্দ নয় — এটা একটা সভ্যতার স্মৃতি, একটা ভাষার উত্তরাধিকার, একটা বিশ্বাসের সাংস্কৃতিক সংকেত। “ফরিদ” আর “আহমেদ” আরবি ভাষা ও ইসলামী ঐতিহ্যের অংশ; “অনন্য” আর “শুভজিৎ” সংস্কৃত ভাষা ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থের মিল থাকলেও সভ্যতাগত ইঙ্গিত এক নয়।
— একই যুক্তি তাহলে বাঙালি মুসলমানের পরিচয়েও খাটে?
— জি স্যার। নাম, ধর্মীয় পরিভাষা, ইবাদতের ভাষা, ক্যালেন্ডার, অভিবাদন, ইতিহাস, বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার — সবকিছু থেকে আরবি-ইসলামী সূত্রগুলো একে একে সরিয়ে দিলে প্রশ্ন জাগে, তখন তার পরিচয়ের ভিত্তি কোথায় দাঁড়াবে? সে কি তখনও একই সভ্যতাগত পরিচয়ের মানুষ থাকবে, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক কাঠামোয় প্রবেশ করবে? আরবি ভাষা, আরবি নাম, কুরআনের ভাষা, হিজরি ক্যালেন্ডার, সালাম, আযান, দোয়া — সব সরিয়ে দিলে ইসলামী পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রকাশ কী দিয়ে চিহ্নিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু “আরব্য দাসত্ব” বলে অভিযোগ তোলা বাগ্মিতা হতে পারে, কিন্তু যুক্তি নয়।
স্যার তখন উঠে দাঁড়ালেন। জানালার বাইরে কুয়াশা যেন আরও ঘন হয়ে এসেছে, এমনভাবে যে ঘরের আলো আর বাইরের অন্ধকারের মধ্যে কোনো সীমারেখাই আর বোঝা যাচ্ছিল না।
— শোনো ফরিদ, তিনি বললেন, ধীরে, যেন প্রতিটা শব্দ কুয়াশার মধ্য দিয়ে হেঁটে আসছে। মানুষের পরিচয় যেন এক অদৃশ্য সিঁড়ি। নিচের ধাপে থাকে জন্ম, মাটি, ভাষা, সংস্কৃতি; উপরের ধাপে থাকে বিশ্বাস, আত্মা, চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। কেউ যদি নিচের ধাপেই বসে থেকে ঘোষণা করে — “আমি আগে বাঙালি, তারপর মুসলমান” — তাহলে সে সিঁড়ির চূড়ায় উঠতে চায় না, মাঝপথেই থেমে যায়।
আমি চুপ করে শুনছিলাম। কুয়াশা তখন জানালার কার্নিশ বেয়ে ঘরের ভেতর গড়িয়ে পড়ছে, যেন সময়ও তরল হয়ে গেছে।
— বাঙালি হওয়া সুন্দর, স্যার বলে চললেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীনের গান, পদ্মার ঢেউ, বর্ষার গান — এসব বাঙালিত্বেরই অমূল্য সম্পদ। কিন্তু এসব সময়ের দোলায় ক্ষণস্থায়ী। গ্রিকরা, ব্যাবিলনীয়রা, মিশরীয়রা আজ কেবল জাদুঘরের ধূলিমাখা নাম। কিন্তু ইসলাম কোনো জাদুঘরের নাম নয়। ইসলাম মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে, মৃত্যুর পরও পরিচয় বহন করে। কবরের অন্ধকারে ফেরেশতার প্রথম প্রশ্ন হবে না — “তুমি বাঙালি না তুর্কি?” প্রশ্ন হবে — “তোমার রব কে?” সেই মুহূর্তে ভাষা, জাতি বা সংস্কৃতি কেউ সামনে দাঁড় করাতে পারবে না। তখন কেবল ঈমানের উত্তরই মুক্তি দেবে।
কুয়াশা তখন প্রায় স্যারের মুখ ঢেকে ফেলেছে, শুধু তাঁর কণ্ঠস্বরটাই ভেসে আসছিল, যেন কণ্ঠস্বরের নিজস্ব একটা আলো আছে যা কুয়াশাও নেভাতে পারে না।
— যারা বলে “আমি আগে বাঙালি” — তাদের ভেতরে একটা ক্ষত লুকিয়ে থাকে, স্যার। পাকিস্তান আমলে ধর্মের নামে শোষণ, ভণ্ডামি, রাজনৈতিক প্রতারণা তাদের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। তাই তারা জাতিসত্তাকে সামনে এনে বাঁচতে শিখেছিল। তার সাথে যোগ হয়েছিল ভারতীয়দের পাকিস্তান ভাঙানোর পরিকল্পনা যা পক্ষান্তরে বাঙালি মুসলমানদের ভারতীয় দাসখতে পরিণত করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক স্লোগানকে স্থায়ী দর্শনে রূপ দিলে সেটা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। বাঙালিত্ব কবরের মাটির সঙ্গে মিশে যাবে; ইসলাম সেখানে সঙ্গী হয়ে থাকবে।
— এই রোগ কি শুধু বাংলার, স্যার?
— না। আরবরা একদিন বলেছিল, “আমরা আগে আরব।” তুর্কিরা আতাতুর্কের আমলে বলেছিল, “আমরা আগে তুর্ক।” পারসিকরা নিজেদের সভ্যতাকে ইসলামের ওপরে তুলতে চেয়েছিল। সোভিয়েতের প্রভাবে মধ্য এশিয়ার মুসলমানরা দীর্ঘদিন নিজেদের আগে কাজাখ, উজবেক বলে পরিচয় দিয়েছে। ফল কী হলো? ভ্রাতৃত্ব ভেঙে গেল, বিভক্তির আগুন জ্বলে উঠল, মুসলমান মুসলমানকে ভুলে গেল।
— কিন্তু যারা ইসলামকে আগে রেখেছিল?
— তারা ইতিহাসে অমর, ফরিদ। সালাহুদ্দিন আইয়ুবী ছিলেন কুর্দি, কিন্তু তাঁর পরিচয় ছিল মুসলমান — এজন্যই তিনি আজ সমগ্র দুনিয়ার নায়ক। মুহাম্মদ আল-ফাতিহ ছিলেন তুর্কি, কিন্তু তাঁর পরিচয় ছিল মুসলমান — এজন্যই তিনি কনস্টান্টিনোপল জয় করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন।
তারপর স্যার জানালার দিকে ফিরে তাকালেন। কুয়াশা এতক্ষণে ঘরের প্রতিটা কোণ ভরে ফেলেছে, আর তার ভেতর দিয়ে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না — স্যার আসলে আমার সামনে বসে আছেন, নাকি আমারই ভেতরের একটা কণ্ঠস্বর, যে বছরের পর বছর ধরে আমার সাথেই কথা বলে চলেছে।
— সত্য হলো, স্যার বললেন শেষবারের মতো, আমি বাঙালি — এতে কোনো লজ্জা নেই। এই পরিচয়ে আমি আমার ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ধারণ করি। কিন্তু আমি মুসলমান — এটাই আমার আসল পরিচয়, আমার আত্মার পরিচয়, মৃত্যুর পরও টিকে থাকা পরিচয়। বাঙালিত্বকে অস্বীকার করি না, কিন্তু রাখি গৌণ আসনে। মূল সিংহাসনে বসে থাকে ইসলাম।
আমি তাকিয়ে দেখলাম, চেয়ারটা খালি। কুয়াশা তখন জানালা দিয়ে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে, যেভাবে সে এসেছিল ঠিক তেমনই নিঃশব্দে। ফোনের স্ক্রিনে তখনও কায়সার ভাইয়ের মন্তব্যটা জ্বলছে, আর আমার আঙুল থমকে আছে রিপ্লাই বক্সের ওপর।
সুনামগঞ্জের রাত তখন আরও গভীর হয়েছে। আর আমি বসে আছি, একা, অথচ একা নই — কারণ যে জাতি ইসলামকে ভুলে জাতিকে প্রথম আসনে বসায়, তাদের পরিণতি ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া নাম। আর যে জাতি ইসলামকে আগে রাখে, তারা যুগে যুগে আলো ছড়ায়, সভ্যতার স্রষ্টা হয়, মর্যাদার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায়।
(মরহুম জনাব মোঃ আব্দু মিয়া স্যার সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের একজন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, যাকে সুনামগঞ্জের বাতিঘর বলা হয়। আমার শিক্ষক। স্যারের সাথে কথোপকথন কাল্পনিক।)
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী