প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিরাপত্তা: সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি!

আব্দুল্লাহ ইউসুফ শামীম : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আনন্দের চেয়ে বেদনার স্মৃতিই বেশি বহন করে। আমরা রাষ্ট্রনায়ক হারিয়েছি, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেখেছি এবং নিরাপত্তার সামান্য দুর্বলতা কীভাবে জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তার নির্মম শিক্ষা পেয়েছি । তাই দেশের  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি তাঁর গাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগকে একটি সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে সতর্কবার্তা, নিরাপত্তাব্যবস্থার পরীক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আত্মসমালোচনার মুহূর্ত।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। বেশ কিছু দিন আগে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে এক যুবক মঞ্চে উঠে তাঁর সঙ্গে সেলফি তোলার চেষ্টা করে, যার জন্য তিনি একেবারেই অপ্রস্তুত ছিলেন। যদিও পরবর্তীতে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে সরিয়ে দেয়, তবে একজন আততায়ীর জন্য ওই সংক্ষিপ্ত সময়টুকুই মারাত্মক ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট ছিল। নিরাপত্তার এই স্পষ্ট গাফিলতির পর আদৌ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায়।

সম্প্রতি ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় তাঁর গাড়িবহরের নিরাপত্তাবলয় ভাঙার চেষ্টার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে এবং আদালত তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন। মামলাটি তদন্তাধীন; তাই অভিযুক্ত ব্যক্তির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু ঘটনাটি যে গুরুতর নিরাপত্তা-দুর্বলতার প্রশ্ন তুলেছে, তা অস্বীকার করার উপায়ও নেই। বাংলাদেশ সরকারি প্রেস, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা

উদ্বেগ কেন এত গভীর?

একজন প্রধানমন্ত্রী শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রের নির্বাহী নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর নিরাপত্তার সঙ্গে সরকারের ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সাধারণ মানুষের আস্থা সরাসরি জড়িত। ফলে তাঁর নিরাপত্তায় কোনো ফাঁক দেখা দিলে সেটিকে ব্যক্তিগত ঝুঁকি হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেখলে চলবে না, এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।যে কোনো গণতান্ত্রিক বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রাথমিক দায়িত্বগুলোর একটি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শীর্ষনেতাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সামান্যতম বিচ্যুতিও বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে এনেছে।

বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং দীর্ঘদিনের সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকতে পারেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, উগ্রবাদী গোষ্ঠী, অপরাধী চক্র, ব্যক্তিগত প্রতিশোধপরায়ণ ব্যক্তি কিংবা বিদেশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ, ঝুঁকির উৎস একাধিক হতে পারে। সন্দেহকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে, যেকোন ছোট বড় সন্দেহকে যাচাই করা চাই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতো একজন জনপ্রিয় নেতা সাধারণ মানুষের কাছে যেতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। তারেক রহমান দীর্ঘদিন রাজনীতিতে থাকার কারণে মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশার কেন্দ্রেও রয়েছেন। কিন্তু জনসম্পৃক্ততা এবং নিরাপত্তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য না থাকলে তাঁর স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মানুষের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি না করেও আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সুসমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। বিগত দিনে সুদূর ইংল্যান্ডে বসেও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বেশিরভাগ মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।

নিরাপত্তাবলয় ভেদ কী নির্দেশ করে?

একটি নিরাপত্তাবলয় কয়েকটি সমন্বিত স্তরের ওপর নির্ভর করে। কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি যদি সেই বলয়ের ভেতরে ঢুকে যান, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—তাঁকে প্রথম স্তরেই শনাক্ত করা গেল না কেন? দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগ ঠিক ছিল কি না? আগাম ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি? অনুষ্ঠানস্থল, যাত্রাপথ এবং মানুষের চলাচল যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল কি?

একবারের ঘটনা হতে পারে মানবিক ভুল বা আকস্মিক বিশৃঙ্খলা। কিন্তু একই ধরনের অনুপ্রবেশ বারবার ঘটলে তা পদ্ধতিগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তখন শুধু ঘটনাস্থলে থাকা নিচের পর্যায়ের কয়েকজন সদস্যকে শাস্তি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়। পরিকল্পনা, নেতৃত্ব, গোয়েন্দা তথ্য, দায়িত্ব বণ্টন, যোগাযোগ এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ,পুরো ব্যবস্থাটির স্বাধীন পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এ ধরনের ঘটনার পর পূর্ণাঙ্গ “আফটার-অ্যাকশন রিভিউ” হওয়া জরুরি। কোথায় ফাঁক ছিল, কার কী দায়িত্ব ছিল, আগে কোনো সতর্কসংকেত পাওয়া গিয়েছিল কি না এবং একই ভুল ঠেকাতে কী পরিবর্তন দরকার, এসব লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। তদন্তের ফলও জাতীয় নিরাপত্তার সীমা বিবেচনা করে যতটা সম্ভব জনগণকে জানানো উচিত। গোপনীয়তার প্রয়োজন আছে, ভক্তদের কাছে কিন্তু জবাবদিহির প্রয়োজনও কম নয়।

বিগত ২০ বছরের ক্যারিয়ার পর্যালোচনা কেন প্রয়োজন?

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নিয়োজিত প্রত্যেক সদস্যের পেশাগত ইতিহাস নিয়মিত যাচাই করা যুক্তিসংগত। গত ২০ বছরে তাঁদের দায়িত্ব, পদায়ন, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড, অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বার্থের সংঘাত, বিদেশি যোগাযোগ এবং সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহারের ইতিহাস পেশাদারভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

তবে এই প্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা গণছাঁটাইয়ে পরিণত না হয়। অতীতে কোনো সরকারের অধীনে চাকরি করা কিংবা আইনসম্মত ব্যবসায়িক যোগাযোগ থাকাই অপরাধের প্রমাণ নয়। একজনের দোষ আরেকজনের কাঁধে চড়িয়ে আসল মাস্টারমাইন্ড যাতে নিজেকে লুকাতে না পারে, আবার গুরুতর অসদাচরণ বা সন্দেহজনক যোগাযোগ থাকলে রাজনৈতিক পরিচয়ের অজুহাতে তা উপেক্ষা করাও চলবে না। প্রমাণ, আচরণ, যোগ্যতা, আনুগত্য এবং পেশাগত সততার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের মতো কেবল একটি “তালিকা” তৈরি করে মানুষকে দলীয় পরিচয়ে সন্দেহভাজন ঘোষণা করলে নিরাপত্তা বাড়বে না; বরং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভয়, বিভাজন এবং অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। প্রয়োজন নিরপেক্ষ নিরাপত্তা যাচাই, নিয়মিত পুনর্মূল্যায়ন এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া। বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে; অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন; প্রমাণিত ঝুঁকি থাকলে তাঁকে সংবেদনশীল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

নিরাপত্তা তিন গুণ নয়, সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে

শুধু বেশি পুলিশ, বেশি গাড়ি কিংবা বৃহৎ বাহিনী মোতায়েন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সংখ্যার পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষতা, প্রযুক্তি, সমন্বয় ও সতর্কতার সংস্কৃতি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে একটি স্বাধীন, উচ্চপর্যায়ের ঝুঁকি মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।

দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের পুনঃযাচাই, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপদ ব্যবস্থা, অনুষ্ঠানভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং জরুরি পরিস্থিতির মহড়া জোরদার করতে হবে। একই ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন একই সংবেদনশীল দায়িত্বে না রেখে পরিকল্পিতভাবে দায়িত্ব পরিবর্তন করাও প্রয়োজন। নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য যেন রাজনৈতিক কার্যালয়, ব্যক্তিগত সহকারী ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার মধ্যে অস্পষ্টভাবে ছড়িয়ে না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি প্রবেশের অনুমতি কার আছে, অস্থায়ী কর্মী ও অতিথিদের পরিচয় কীভাবে যাচাই হয় এবং হঠাৎ কর্মসূচি বদলালে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো কত দ্রুত তথ্য পায়, এসব ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা দরকার। নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট কৌশল অবশ্যই গোপন রাখতে হবে, কারণ অতিরিক্ত প্রকাশও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রবাসীদের উদ্বেগও রাষ্ট্রকে শুনতে হবে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন। আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগকে নিছক আবেগ বলে উপেক্ষা করা উচিত নয়। আমরা ইতিহাসে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছি; সাম্প্রতিক রাজনীতিতেও ব্যক্তিস্বার্থে আপনজনকে উপেক্ষা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন এবং দেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ প্রত্যক্ষ করেছি। এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আরও সচেতন, ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক হতে হবে।

বাংলাদেশ আর কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, রক্তাক্ত ক্ষমতার পরিবর্তন করতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতার (যদি হয়ে থাকে) বিচার জনগণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় করবে। কিন্তু তাঁর জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের আপসহীন দায়িত্ব।

বিপদ ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত কমিটি, শোকবার্তা ও দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা কোনো জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না। তাই এখনই নিরাপত্তা কাঠামোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা, দায়িত্বশীল সদস্যদের পুনঃযাচাই এবং চিহ্নিত দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন। আমাদের দাবি প্রতিহিংসা নয়—প্রতিরোধ; দলীয় শুদ্ধি অভিযান নয়, পেশাগত জবাবদিহি; গুজব নয়—নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য।

আমরা মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সব দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বিপদ থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁকে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার শক্তি দিন। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে : দোয়ার পাশাপাশি সতর্কতা, দক্ষতা এবং দায়িত্ব পালনও অপরিহার্য। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে, বিপদ ঘটার আগেই স্মার্ট পরিকল্পনা নিতে হবে , এখনই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *