কোয়ালা: অনন্য অস্ট্রেলীয় মারসুপিয়াল

সুপ্রভাত সিডনি প্রতিবেদন: ইউক্যালিপটাসের উঁচু ডালের ফাঁকে শরীর গুটিয়ে বসে আছে একটি কোয়ালা। ধূসর লোমে রোদের আভা, গোলাকার কানে বাতাসের স্পর্শ, চোখে ঘুমের আবেশ। অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতির এই পরিচিত দৃশ্য দেখে মনে হয়, পৃথিবীতে বুঝি কোনো তাড়া নেই। অথচ প্রশান্ত ছবিটির আড়ালে চলছে টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম। যে অরণ্য তাকে খাবার, আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেয়, মানুষের কর্মকাণ্ডে সেই অরণ্যই ক্রমে বদলে যাচ্ছে। কোয়ালার গল্প তাই একটি প্রাণীর জীবনকথার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশেরও গল্প।

অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব এই প্রাণী দেশটির বন্যপ্রকৃতির অন্যতম পরিচিত প্রতীক। দেখতে ছোট ভালুকের মতো হওয়ায় অনেকে তাকে ‘কোয়ালা বিয়ার’ বলেন। তবে কোয়ালা ভালুক নয়; এটি মারসুপিয়াল বা থলিবিশিষ্ট স্তন্যপায়ী। এর বৈজ্ঞানিক নাম Phascolarctos cinereus। স্ত্রী কোয়ালার থলিতে অপরিণত শাবক বেড়ে ওঠে। ক্যাঙারুর সঙ্গে একই বৃহৎ প্রাণীগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হলেও কোয়ালার নিকটতম জীবিত আত্মীয় ওমব্যাট। মায়াবী চেহারার পেছনে রয়েছে বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা।

বড় লোমশ কান, চওড়া কালো নাক ও শক্ত নখ কোয়ালাকে সহজেই চিনিয়ে দেয়। গাছে ওঠা এবং ডাল আঁকড়ে থাকার উপযোগী তার দেহ। সামনের থাবায় দুটি বিপরীতমুখী আঙুল থাকায় গাছের কাণ্ড শক্ত করে ধরতে পারে। অঞ্চলভেদে আকার ও পশমে পার্থক্য দেখা যায়। উত্তরের কোয়ালা সাধারণত তুলনামূলক ছোট এবং হালকা রঙের; দক্ষিণের কোয়ালা বড় ও ঘন পশমযুক্ত। প্রকৃতির এই পার্থক্য স্থানীয় আবহাওয়া ও জীবনযাপনের সঙ্গে অভিযোজনের পরিচয় বহন করে।

কুইন্সল্যান্ড, নিউ সাউথ ওয়েলস, ভিক্টোরিয়া ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বনাঞ্চলে কোয়ালার বসবাস। তবে মানচিত্রে বিস্তৃত উপস্থিতি মানেই সর্বত্র নিরাপদ আবাস নয়। উপযুক্ত খাদ্যগাছ, বিশ্রামের আশ্রয় এবং গাছগুলোর মধ্যে চলাচলের সুযোগ থাকা জরুরি। একই এলাকার কোনো বন তার জন্য উপযোগী হতে পারে, পাশের বনটি নাও হতে পারে। ফলে কোয়ালা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু বনভূমির পরিমাণ বিবেচনা করলে চলে না; সেই বনের গুণগত অবস্থাও বুঝতে হয়।

কোয়ালার খাদ্যতালিকার প্রধান অংশ ইউক্যালিপটাসের পাতা। তবে সব প্রজাতির পাতা তার সমান পছন্দ নয়। পাতার আর্দ্রতা, পুষ্টিমান ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য খাদ্য নির্বাচনে ভূমিকা রাখে। কখনো একই প্রজাতির দুটি গাছের মধ্যেও সে পার্থক্য করে। ইউক্যালিপটাসের পাশাপাশি অল্প কিছু সম্পর্কিত গাছের পাতাও খেতে পারে। এই বাছাই করা খাদ্যাভ্যাস বুঝিয়ে দেয়, নির্বিচারে গাছ লাগালেই কোয়ালার আবাস তৈরি হয় না; স্থানীয়ভাবে উপযোগী গাছ নির্বাচন করতে হয়। qld.gov.au

আঁশসমৃদ্ধ ইউক্যালিপটাস পাতায় এমন রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা অনেক প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। কোয়ালার শরীর এই বিশেষ খাদ্যের সঙ্গে অভিযোজিত। অন্ত্রের দীর্ঘ সিকাম অংশে থাকা অণুজীব আঁশ ভাঙতে সাহায্য করে; ক্ষতিকর উপাদান সামলাতেও তার বিশেষ শারীরবৃত্তীয় সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে সীমাবদ্ধতাও আছে। নির্দিষ্ট খাদ্যগাছ হারিয়ে গেলে অন্য খাবারের ওপর সহজে নির্ভর করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। খাদ্যের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই তাকে আবাসস্থলের পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল করে তুলেছে।

কোয়ালার দীর্ঘ ঘুম নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। দিনের অধিকাংশ সময় সে ঘুমিয়ে বা বিশ্রামে কাটায়। এটি আলস্য কিংবা ইউক্যালিপটাস খেয়ে নেশাগ্রস্ত হওয়ার ফল নয়। পাতার খাদ্য থেকে তুলনামূলক কম শক্তি মেলে এবং তা হজমের প্রক্রিয়াও ধীর। তাই শক্তি সঞ্চয় তার বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। মানুষের কর্মব্যস্ততার মাপকাঠিতে কোয়ালার জীবন বিচার করলে ভুল হবে; প্রকৃতির হিসাবে তার ধীরতা কার্যকর অভিযোজন।

পানির ক্ষেত্রেও পাতার ওপর তার নির্ভরতা প্রবল। খাদ্যের আর্দ্রতা থেকে কোয়ালা পানির বড় অংশ পায়। তবে সে কখনো পানি পান করে না—এমন প্রচলিত ধারণা সঠিক নয়। বিশেষ করে তীব্র গরম বা শুষ্ক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন হতে পারে। তাই দীর্ঘ খরা শুধু গাছের ক্ষতি করে না; কোয়ালার খাদ্য ও পানির স্বাভাবিক সরবরাহেও চাপ সৃষ্টি করে। সুস্থ অরণ্যের গুরুত্ব এখানে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কোয়ালার মাতৃত্বের গল্পও বিস্ময়কর। প্রায় এক মাসের গর্ভকাল শেষে জন্ম নেওয়া শাবক অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও অপরিণত থাকে। মায়ের থলিতে আশ্রয় নিয়ে দুধ খেতে খেতে তার বিকাশ ঘটে। প্রায় ছয় মাস পর বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচয় শুরু হয়। এরপর মায়ের পিঠে বা পেটে চড়ে ঘোরে সে। দুধ থেকে পাতার খাদ্যে যাওয়ার সময় মায়ের বিশেষ নরম মলজাত পদার্থ ‘প্যাপ’ গ্রহণ করে শাবক; এর মাধ্যমে উপকারী অণুজীব তার অন্ত্রে পৌঁছায়।

এই সযত্নে বেড়ে ওঠা জীবনের সামনে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি আবাসস্থল হারানো। বসতি সম্প্রসারণ, কৃষিকাজ ও অবকাঠামো নির্মাণে বন খণ্ডিত হলে কোয়ালার নিরাপদ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এক গাছ থেকে অন্য গাছে যেতে মাটিতে নামতে হয় তাকে। তখন যানবাহনের ধাক্কা এবং কুকুরের আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। একটি গাছ কাটা তাই শুধু একটি আশ্রয় সরিয়ে দেওয়া নয়; কখনো সেটি খাদ্য, বিশ্রাম ও প্রজননের এলাকার মধ্যে সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে।

জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও গভীর করছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘ খরা ও দাবানল কোয়ালা এবং তার আবাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০১৯–২০ সালের ‘ব্ল্যাক সামার’ দাবানল সেই বিপদের ভয়াবহতা সামনে এনেছিল। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার করা জরুরি হলেও অরণ্য পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদি কাজ। বেঁচে যাওয়া কোয়ালারও খাবার, নিরাপদ আশ্রয় ও উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। দুর্যোগের ক্ষতি তাই আগুন নিভে যাওয়ার সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।

রোগব্যাধিও উদ্বেগের কারণ। ক্ল্যামাইডিয়া সংক্রমণ কোয়ালার চোখ ও প্রজননতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; গুরুতর অবস্থায় মৃত্যুও ঘটতে পারে। আবাসের চাপের সঙ্গে রোগ যুক্ত হলে একটি জনগোষ্ঠীর টিকে থাকা আরও কঠিন হয়। এজন্য উদ্ধারসেবা ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ দরকার। কোনো এলাকায় আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ কোয়ালা দেখা গেলেই সেখানে ভবিষ্যৎ নিরাপদ ধরে নেওয়া যায় না। সংরক্ষণে ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা অপরিহার্য।

সংকটের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কুইন্সল্যান্ড, নিউ সাউথ ওয়েলস ও অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরির সম্মিলিত কোয়ালা জনগোষ্ঠীকে জাতীয় পরিবেশ আইনে ‘বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এই অবস্থান নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য; গোটা অস্ট্রেলিয়ার সব কোয়ালার পরিস্থিতি এক নয়। অঞ্চলভেদে আবাস, রোগ ও অন্যান্য ঝুঁকির পার্থক্য বুঝে সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। তালিকাভুক্তি সংকটের স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু কার্যকর ফলের জন্য মাঠপর্যায়ে উদ্যোগ প্রয়োজন।

কোয়ালা রক্ষার অর্থ তার সম্পূর্ণ জীবনক্ষেত্রকে নিরাপদ রাখা। খাদ্যগাছ সংরক্ষণ, বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ পুনরুদ্ধার, সড়কে নিরাপদ পারাপার এবং আহত প্রাণীর চিকিৎসা—সব উদ্যোগ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। উন্নয়নের পরিকল্পনাতেও এই চাহিদাগুলো বিবেচনা করা জরুরি। ইউক্যালিপটাসের ডালে ঘুমিয়ে থাকা কোয়ালা নিজের সংকট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। তার হয়ে কথা বলে অরণ্যের অবস্থা। সেই সংকেত বুঝে আজকের সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই আগামী প্রজন্ম প্রকৃতির মধ্যে এই অনন্য প্রাণীর সাক্ষাৎ পাবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *