সিলেটের সাহিত্য সংস্কৃতির গৌরবের অতীত: মিলন কান্তি দাস

সিলেট- বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক নগর ও পূণ্যভূমি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ সিলেটকে আলাদাভাবে সম্মান ও সম্মানিত করে। এই সিলেট একই সাথে দুইটি ধর্মের মানুষের পূণ্যস্থান। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকে হযরত শাহজালাল (রহঃ) সিলেট বিজয়ের পর থেকে এই অঞ্চলটি ইসলাম ধর্মের মানুষের কাছে পূণ্যস্থান। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসেন হযরত শাহজালাল’র (রহঃ) মাজার জিয়ারত করতে। মানুষ এখানে এসে যেন তার আত্মার শান্তি খোঁজে পান। তেমনি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ এলাকায় রয়েছে হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিক পুরুষ শ্রী শ্রী চৈতন্য দেবের পিতৃভূমি এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় রয়েছে অদ্ব্রৈত ধাম। এই দুইটি জায়গায় হিন্দু ধর্মের হাজার হাজার মানুষ আসে পূন্য লাভের প্রয়াসে। সূতরাং সিলেটের গুরুত্ব ও তাৎপর্য্য বাংলাদেশের অন্য এলাকাগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রম ও স্বতন্ত্র।

সিলেট যেমন আধ্যাত্মিক জনপদ, তেমনি এর রয়েছে বিশাল পর্যটন অঞ্চল। সমতল, পাহাড় ও হাওড় বেষ্টিত সিলেটের আরও রয়েছে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বিখ্যাত ধামাইল গানের স্রষ্টা গীতিকবি রাধারমন দত্তের জন্মস্থান এই সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরে। ঠিক তেমনিভাবে হাছন রাজা, রাধারমন দত্ত, দুর্বিন শাহ, শিতালং শাহ, শাহ সফিনুর প্রমুখ বাউল গীতিকবির জন্ম এই সিলেটের বিভিন্ন স্থানে। সিলেট অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের ও বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রম্য ও ভ্রমণ লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী। সিলেট অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছেন কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক শাহেদ আলী, কবি দিলওয়ার, অধ্যাপক আসদ্দর আলী, গুরু সদয় দত্ত, অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম, অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক আব্দুল আজিজ প্রমুখ। এরা নিকট অতীতের সাহিত্যিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে আলোকদ্যুতি ছড়িয়েছেন।

বিশ শতকোর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের জীবনের একটি সময় কেটেছে এই সিলেটে। হুমায়ুন আহমেদ জন্মসূত্রে সিলেটের পাশ্ববর্তী নেত্রকোনা জেলার বাসিন্দা হলেও পিতার সরকারি চাকরি সূত্রে সিলেটে করেছেন বসবাস। এই সিলেটকে নিয়ে তার অনেক আবেগ অনুভূতির কথা তিনি তার জীবদ্দশায় বিভিন্ন গ্রন্থে ও পত্র পত্রিকায় লিখে গেছেন।

সিলেট অঞ্চলের সাহিত্য চর্চা অতীত হতে বর্তমার পর্যন্ত অত্যন্ত গৌরবের। সিলেটের সাহিত্যিকদের আমন্ত্রণে এবং সিলেটকে ভালোবেসেই এই সিলেটে এসে পদধুলি দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম দুই কবি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথ সিলেটকে ভালোবেসে “সুন্দর শ্রীভূমি” আখ্যায়িত করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালের ৫ নভেম্বর থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত সিলেটে অবস্থান করেছিলেন। ৭ নভেম্বর তিনি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে সেখানে কলেজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান করেন। সেই দিনের সেই ইতিহাসের স্বাক্ষী ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী; যা তিনি পরবর্তীতে তার জীবন কথায় আলোচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে সিলেটের সর্বস্তরের নাগরিকদের পক্ষ থেকেও সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। রবীন্দ্রনাথের সিলেট আগমন উপলক্ষে গঠিত অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুসলমানদের একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন আঞ্জুমানে ইসলামিয়ার সিলেট জেলার সভাপতি খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া)। অপরদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জীবনকালে মোট দুবার সিলেট সফর করেছিলেন— প্রথমবার ১৯২৬ সালে এবং দ্বিতীয়বার ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দুবারই কাজী নজরুল ইসলাম সিলেটের চৌহাট্টা এলাকার ঐতিহ্যবাহী সিংহবাড়িতে আসেন। রবীন্দ্রনাথও সিংহবাড়ি এসেছিলেন। সূতরাং সিংহবাড়ি এই সিলেটের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে ঐতিহাসিকভাবে সম্পৃক্ত একটি বাড়ি। যে বাড়ির পূর্বপুরুষেরা বংশানুক্রমিকভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির লালন করে আসছেন।

ইতিহাস হতে জানা যায়, নজরুল সিলেটে প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বার বেশি সময় অবস্থান করেছিলেন। দ্বিতীয়বার নজরুল সিলেট এসে প্রায় মাসাধিক সময় অবস্থান করেছিলেন। এ সময় তিনি এমসি কলেজের শিক্ষকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং গান পরিবেশন করেন। ইতিহাস থেকে এই সত্যটা অনুমেয় যে,সিলেট রবীন্দ্র নজরুল যুগের পূর্ব হতেই সাহিত্য চর্চার চারণভূমি। রবীন্দ্র নজরুল ছিলেন পুরো ভারত বর্ষের কবি। এই বাংলার অনেক জেলাতেই তাদের পদধুলি পড়েনি। অথচ তারা সিলেটকে ভালোবেসে সিলেটে এসেছিলেন এবং সিলেটের প্রকৃতিপ্রেমে তার মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং সিলেটের তৎকালীন সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চায় তারা বিমোহিত হয়েছিলেন। আর এটা সিলেটের শুদ্ধ সাহিত্য চর্চার ইতিহাসের একটি প্রামাণিক দলিল হিসেবে আমি মনে করি।

সিলেটের নিজস্ব নাগরী লিপি রয়েছে। এই নাগরী লিপিতেও সাহিত্য চর্চা হয়েছে। এই নাগরীকে অনেকে ভাষা মনে করে থাকেন। তবে নাগরী কোন ভাষা নয়,এটি কেবলই লিপি। ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দিতে নাগরী লিপির প্রচলন ঘটে।

সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ-সংক্ষেপে এই প্রতিষ্ঠানটি কেমুসাস নামে পরিচিত। ১৯৩৬ সালে সিলেটের আম্বরখানায় প্রতিষ্ঠিত এই কেমুসাস শুধু এই সিলেট নয়, সমগ্র উপমহাদেশের মধ্যে একটি ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য প্রতিষ্ঠান। এই কেমুসাস প্রতিষ্ঠার পর হতে অদ্যবধি পর্যন্ত সফলতার সাথে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। কেমুসাসে নিয়মিত থাকে কবি ও বইপ্রেমীদের আনাগোণা। কেমুসাসে প্রতিবছর ১৫ দিন ব্যাপী কেমুসাস বইমেলা হয়। ২০০১ সাল হতে। কেমুসাস থেকে গুণী কবিদের মাঝে কেমুসাস সাহিত্য পদক নিয়মিত তুলে দেওয়া হয়।

সিলেটে বর্তমানে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রয়েছে। এখন সিলেটে রয়েছেন অনেক গুণী কবি, সাহিত্যিক, গীতিকবি ও সংস্কৃতিকর্মী। যাদের অনেকে রয়েছেন, যারা জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবার সক্ষমতা রাখেন। অতীত হতে বর্তমান-সিলেট তার ঐতিহ্যের পথেই হাটছে-এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সিলেটের এই শুভ্রতার ধারা অব্যাহত থাকুক।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *