ট্রেন্স থেকে ফিরে এসে : -রউফ আরিফ

ধারাবাহিক উপন্যাস

 

১২.

যথাসময়ে রত্নাকে হোটেলের লবিতে হাটতে দেখা গেলো। ফয়সাল আগে থেকেই রিসেপশনে বলে রেখেছিল। রত্না পৌছানোর পর একজন বেয়ারাকে দিয়ে রিসেপশনে পাঠিয়ে দিলো। রিসেপশনে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন তার বয়স পচিশের বেশি হবে না। খুবই হ্যান্ডসাম। পোশাক পরিচ্ছদে যেমন কেতাদুরস্ত, কথাবার্তায় তেমনি চৌকস। রত্নাকে দেখে বলল, ম্যাডামের জন্য কি করতে পারি?

রত্না হেসে বলল, আমি মিস রত্না। আপাতত আপনার পাশে একটু জায়গা দিলেই হবে।

-ও আচ্ছা। আপনিই তাহলে নতুন জয়েন করেছেন?

-হাঁ।

-ভেতরে ঢুকে পড়ুন। আমার পাশে দাঁড়িয়ে যান। আপনাকে কিছুই শিখিয়ে দিতে হবে না। গেষ্টদের তাকিদে নিজেই বুঝে যাবেন কি আপনাকে করতে হবে।

ছেলেটার হাসি খুশি চেহারা আর চৌকস কথাবার্তায় রত্না মুগ্ধ হলো। কাউন্টারে ঢুকে কাধের ব্যাগটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, প্রথমে আপনার নামটা জানা প্রয়োজন।

-ওহ! শিওর। আমি নাদিম।

-নাদিম। থ্যাংকস।

এরপরে আর কেউ কারো বিষয় নিয়ে উৎসুক্য দেখালো না। কাজে লেগে গেলো। হৈচৈ করতে করতে একদল নতুন বোডার এলো। তারা দলে আটজন। এক বৃদ্ধ আরেকজন বৃদ্ধা। দুইজন যুবতি, প্রায় তারই সমবয়সী হবে। দুই কিশোর এবং দুটো বাচ্চা ছেলে।

নাদিম তাদের আগমনে তাড়াতাড়ি টাইয়ের নড ঠিক করল। অভ্যাস বশতঃ চুলের জঙ্গলে চিরুনীর মতো ডান হাতের আঙ্গুল চালালো। মুখে এক-ঝলক মাপা হাসি ছড়িয়ে এমন পোজ নিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়ালো যে তাকে দেখে মনে হলো তিনি হলেন ‘প্রিন্স অফ ওয়েলস’। অতিথিরা এগিয়ে এলে নাদিম হঠাৎ একটু ডাইনে ঘুরে কাউন্টারের নিচ থেকে কিছু তুলে নেবার অছিলায় ঝুকে পড়ল।

অতিথিরা তখন কাউন্টারের সামনে এসে পড়েছে। ফলে রত্নাকেই তাদের ফেস করতে হলো। সে হাসি মুখে বলল, বলুন আমি আপনাদের জন্য কী সেবা করতে পারি।

বৃদ্ধ বেশ রসিকতা মাখা কণ্ঠে বললেন, আপাতত আপনাদের হোটেলে আমাদের থাকবার ব্যবস্থা করে দিলেই বর্তে যাই।

-বলুন ক’টা রুম লাগবে আপনাদের?

-ডবল বেড তিন রুম হলেই হবে।

রত্না নাদিমের দিকে তাকালো। নাদিম প্লিজ হেল্প মি।

ততক্ষণে নাদিম সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাবির রিং থেকে তিনটা চাবি খুলে নিয়ে বেয়ারার হাতে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করল, স্যার কি রুম দেখবেন? না কি একেবারে উপরে উঠে যাবেন?

-না, রুম দেখতে হবে না।

নাদিম রেজিষ্টার টেনে নিয়ে নামধাম লিখে নিয়ে তাদের রুমে পাঠিয়ে দিলো। নাদিমের কাজগুলো রত্না মনোযোগ সহকারে দেখলো। এরপরে এলো দুই বিদেশি ভদ্রলোক। রত্না তাদেরও ফেজ করলো। এবার নাদিমের সহযোগিতার প্রয়োজন হলো না। কিবোর্ড থেকে নিজেই চাবি পেড়ে বেয়ারার হাতে দিলো।

ফয়সাল তার চেম্বার থেকে রত্নার সমস্ত মুভমেন্ট লক্ষ্য করছিল। ফয়সালের চেম্বার দোতালায় এমন পজিশনে যে, সেখানে বসে রিসেপশনের সব কিছু দেখা যায়।

এরপরে সারাটা দুপুর তার কাজের মধ্যে কেটে গেলো। নাদিমের সাথে তার ভাব না জমলেও রত্না আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলো যে, হে ছোকরা, তুমি আমাকে একেবারে নবিশ মনে কোরো না। ইয়ার্কি ফাজলেমি করলেও একটু বুঝে সমঝে কোরো।

সন্ধ্যার একটু আগে রিসেপশনের টেলিফোন বাজলো। ওপাশে ফয়সালের কণ্ঠ, ম্যাডাম আর ডিউটি করতে হবে না। আমার চেম্বারে চলে আসুন।

রত্না ফোন নামিয়ে রেখে বলল, নাদিম ওপরে যেতে হবে। বড়কর্তার ডাক।

নাদিম হেসে বলল, যান না, বড় সাহেব আপনার জন্য চা নিয়ে বসে আছে।

-আপনি জানলেন কী করে?

-এখন টি টাইম। হোটেলের প্রতিটা রুমে চা পৌছাবে। রিসেপশনেও দুই কাপ আসার কথা। সাহেব যখন আপনাকে ডেকেছেন তখন দুই কাপ নয় এক কাপ আসবে।

রত্না আর কথা না বাড়িয়ে কাউন্টার থেকে বের হলো। লবিতে পা রেখেই দেখতে পেলো বেয়ারা এক কাপ চা নিয়ে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে আসছে।

রত্না ফয়সালের চেম্বারে পৌছে গেলো। ফয়সাল তাকে অভ্যার্থনা জানালো, আসুন। চেয়ার দেখিয়ে বলল, বসুন। রত্না কোনো কথা না বলে বসে পড়লো। ফয়সাল মশকরা করে বলল, ভাববেন না সুন্দরীদের নিয়ে চা পান করা আমার অভ্যাস। প্রথমতঃ আপনি বোনের বন্ধু, দ্বিতীয়তঃ আজ প্রথম দিন। তাই ডেকেছি।

ফয়সালের আপনা আপনি সম্বোধনে বুঝে ফেলল এখানে অফিস ডেকোরাম মেনে চলতে হবে। বন্ধুর বোন বলে কোনোরকম বাড়তি সুবিধা পাওয়ার আশা করা যাবে না। কারণ, বাসায় ফয়সাল তার সাথে তুমি আমি করে আলাপ করেছিল, কিন্তু এখানে আপনি আজ্ঞা করছে।

-শুকরিয়া। আপনার এই সহৃদয় আপ্পায়নের জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

-ধন্যবাদ।

চা পান করতে করতে ফয়সাল বলল, হোটেলের চাকরি কিন্তু সবসময় এক গতিতে চলে না। এখানে নানাধরণের উটকো ঝামেলার সৃষ্টি হয়। যেহেতু নানাধরনের লোকের আনাগোনা। একটু চোখ কান খুলে চললে কোনো অসুবিধা হবে না। নিজেকে একটু গুছিয়ে রাখবেন। যেন কেউ ফালতু সুযোগ তৈরি করতে না পারে। আমি যা বলতে চেয়েছি, তা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন?

-কতকটা।

-তারপরও বলি, যদি কোনো সমস্যায় পড়েন দ্বিধা সংকোচ না করে আমাকে জানাবেন।

-সমস্যার কথা যখন তুললেন তখন একটা কথা বলতে চাই। যদি অনুমতি করেন-

-নিঃসংকোচে বলুন।

-না মনে, বলছিলাম কি…

-আপনাকে একটা বাসা ভাড়া করে দিতে হবে এই তো?

-ঠিক তাই। কি করে বুঝলেন?

-হোটেল চালাতে গেলে বিশ জোড়া চোখ লাগে। আর সেই চোখের ফোকাস হতে হয় দুরবীনের মতো শক্তিশালী।

-মনে থাকবে। কিন্তু আমার সমস্যাটা আমার কাছে ছোট নয়। এ ব্যাপারে আমি আপনার কতটা সাহায্য পাবো?

-আপাতত কিছুদিন যেখানে আছেন থাকতে লাগুন। ব্যবস্থা একটা নিশ্চয় হয়ে যাবে।

-ধন্যবাদ। রত্না রিসেপশনে ফিরে এলো। নাদিম একটা খাম ধরিয়ে দিলো। রত্না জিজ্ঞাসা করল, এতে কী আছে?

-ফাইভস্টারের সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য হলেন আপনি। যতদিন এখানে চাকরি করবেন, প্রতিদিন এই চেয়ারে বসে মাপা হাসি আর টিয়াপাখির মতো কয়েকটা শেখানো বুলি আওড়াবেন। তার অনুমতিপত্র।

নাদিমের জবাবে রত্না সকালের তাজা জুঁই ফুলের মতো হাসি উপহার দিয়ে বেরিয়ে গেলো। রাস্তায় নেমে সোজা ইরিনার বাসায় গেলো না। সী-বীচ ধরে হাঁটতে শুরু করলো। হেমন্তের এই পড়ন্ত বিকেলে কক্সবাজারের সমুদ্র কতবার রং বদলালো তার ঠিক নেই। সমুদ্রের এই ঘনঘন রূপবদলের সাথে সাথে রত্নার মনের উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল চিন্তার নানান জলতরঙ্গ। অতীত বর্তমান আর অনাগত ভবিষ্যতের নানান কল্পচিত্র।

জন্মদাতা পিতার বিরুদ্ধে রত্নার যতটা অভিমান, রাগ বা ক্ষোভ নেই, তার চেয়ে শতগুন রাগ, অভিমান, ক্ষোভ জমা হয়েছে আলি আরমানের ওপরে। লঘু পাপে গুরুদন্ড দিয়েছেন তিনি। রত্নার মনে একটাই চিন্তা, আমি যদি তার নিজের মেয়ে হতাম তাহলে তিনি কখনোই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। নিশ্চয় না।

রত্না ভাবে, কেন তিনি এমন করলেন? আমি তো কোনো অন্যায় করেনি।

টোটনের কথায় প্রকাশ পেয়েছে তার সাথে টোটনের কোনো আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। কথাটা একদিক থেকে সে মিথ্যা বলেনি। কারণ, রত্না একতরফা টোটনকে ভালোবেসেছে। যা আজ পর্যন্ত টোটনকে মুখ ফুটে বলেও নি। ফলে, টোটন যা বলেছে, তার দিক থেকে সে ঠিকই বলেছে।

তাহলে বাবা কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন?

যিনি আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে তুলে এনে কন্যা স্নেহে ঘরে ঠাঁই দিলেন। নিজের পরিচয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করলেন! স্নেহ মমতার কোনো ঘাটতি যার মাঝে কোনোদিন দেখিনি। তাহলে?

এই তাহলের জবাব রত্না খুঁজে পাচ্ছে না। রত্নার চিন্তা আর এগোতে পারে না। এখানে এসেই থেমে যায়। নিজের মনের সাথে যুদ্ধে সে এত বেশি নিমগ্ন ছিল যে, কখন জয় কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তা সে খেয়াল করতে পারেনি। তাই জয় যখন আপা বলে তার সামনে এসে দাঁড়ালো, তখন রত্না অনেকটা হোঁচট খাওয়ার মতো থামলো।

-কী ব্যাপার? কী ভাবতে ভাবতে হাটছিলে?

-ও কিছু না। সে জয়ের মুখের পানে অপলক চেয়ে থেকে বলল, তোরা সবাই এমন হয়ে গেলি কেন?

-কেমন হয়ে গেলাম?

-এইরকম মায়া মমতাহীন, দলছাড়া?

-প্রশ্নটা বাবাকে করলে উত্তরটা বোধহয় তিনি দিতে পারতেন।

-না। বাবাকে কোনো প্রশ্ন করার মানসিকতা এই মুহূর্তে আমার নেই।

-তাকে আমারও ইদানীং কেমন যেন মনে হচ্ছে। তার কোনো কাজ কথা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, কোথায় যেন একটা ছন্দপতন হয়েছে। যার কারণে তিনি স্বাভাবিক নেই। আমাদের চেনা বাবা হারিয়ে গিয়ে বর্তমানের বাবা বেরিয়ে এসেছে।

-ছি! ওভাবে ভাবতে নেই। বাবা তো বাবাই।

-তাহলে তুমি বাড়ি ফিরছ না কেন?

-আমার কথা ছেড়ে দে। আমি তোদের কেউ না। বাবা আমাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছিল। একটা পরগাছা। তোদের গলগ্রহ। আমি থাকলেই বা কী আর না থাকলেই বা কী। সংসারে কোনো ক্ষতি লোকসানের প্রশ্ন নেই।

-এসব তুমি কী বলছ আপা? তোমারও কি বাবার মতো মাথা খারাপ হয়ে গেলো?

-অনেকটা তাই। তোদের ওপরে আমার কোনো অভিযোগ নেই। বাবা আমাকে কী বুঝে এই দন্ড দিয়েছেন তা তিনিই জানেন। বর্তমানে তোরা ছাড়া আমার আপন বলতে কেউ ছিল না। আমার যে অতীত ছিল তাও এখন মৃত। তোরাও আমাকে তাড়িয়ে দিলি। এখন আমার আর কোনো পিছুটান নেই।

এখন থেকে আমার নিয়তির নগ্ন নির্জন হাত আমাকে যেভাবে নিয়ন্ত্রিত করবে আমি সেভাবেই নিয়ন্ত্রিত হবো। চেষ্টা করবো সব রকম বিপদ আপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। আমি চাকরি নিয়েছি। অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই বাবার ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জে আমি বিজয়ী হবো।

-তাহলে তুমি আর ঘরে ফিরবে না?

-যদি মাথা উচু করে কোনোদিন বাবার সামনে দাঁড়াতে পারি, সেদিন গিয়ে দাঁড়াবো। তার আগে নয়।

-তাহলে আমি কী করবো?

-তুই কী করবি মানে?

-তোমার কাছে আমি আসতে পারবো না?

-কেন পারবি না। ভাই বোনের কাছে আসতে পারবে না তো কোথায় যাবে? এখন চল আমাকে একটু বাসায় পৌছে দে। তোর মটর সাইকেল কই?

-আছে। চলো। ওইখানে দোকানের সামনে রেখে এসেছি।

 

সন্ধ্যা সাতটার দিকে টেলিফোনটা এলো। ফয়সাল তখন ডিনারের তদারকি করছিল। ফয়সাল টেলিফোন রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে আলি আরমানের কণ্ঠ ভেসে এলো।

-হ্যালো, চাচা। আমি ফয়সাল বলছি।

-ফয়সাল, রত্না এসেছিল?

-জ্বি চাচা।

-তারপর! ওর খবর বলো। সারাদিন কী করলো?

-না, ওর মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। সারাদিন রিসেপশনে দাঁড়িয়ে কাজ করলো। বোঝাই গেলো না, আজই ওর চাকরির প্রথমদিন। বরং মনে হলো, অনেকদিন থেকে সে এই কাজে দক্ষ।

-আই সি। আলি আরমানের কণ্ঠে কিছুটা চিন্তার আভাস পাওয়া গেলো। ঠিক আছে। ওর দিকে একটু কড়া নজর রেখো। খারাপ কিছু দেখলে টাইম টু টাইম আমাকে রিপোর্ট করো বুঝলে? হাজার হলেও ওর সাথে আমার মান সম্মান জড়িয়ে আছে তো।

-ওসব নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমার কাছে যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ আমার দৃষ্টির বাইরে কিছু ঘটবে না।

চলবে…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *