১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধ, ভারতের ভূমিকায় বিতর্ক ও ‘লাভ’এক বিশ্লেষণ

১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত যে সুবিধা ও কৌশলগত লাভ অর্জন করেছে, তা প্রায়শই সরলভাবে “ভারতই সবচেয়ে বেশি লাভবান” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে ইতিহাস এবং কূটনীতি বোঝার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ভারত এই সংঘাতের মাধ্যমে কিছু স্পষ্ট সুবিধা পেয়েছিল যা ভূ-রাজনৈতিক, কৌশলগত, মানবিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের আকারে প্রকাশ পেয়েছে। তবে এই লাভের সঙ্গে জড়িত ব্যয় ও ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য ছিল।

পটভূমি: সংঘর্ষ ও হালের অবস্থা

মার্চ ১৯৭১-এ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর “অপারেশন সার্চলাইট” পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা চালালে লক্ষ লক্ষ বাঙালি ভারতের পূর্ব রাজ্যগুলোতে আশ্রয় নেন। এই বিশাল মানবিক সঙ্কট ভারতকে সরাসরি সংঘাতের দিকে নিয়ে আসে। ডিসেম্বরেই ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী পরাস্ত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই প্রক্রিয়ায় ভারত তার কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার সুযোগ পায়।

ভারতের লাভ: কোন কোন দিকগুলোতে সুবিধা এসেছে

ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব

১৯৭১-এর সংঘাতের পর ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিশালী অঞ্চলীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের প্রভাব ক্ষীণ হওয়ার ফলে ভারত তার কূটনৈতিক দখল ও অঞ্চলে প্রভাব বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

নিরাপত্তা ও সীমান্তগত সুবিধা

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে পূর্ব সীমান্তে ভারতের নিরাপত্তা অনেকাংশে নিশ্চিত হয়। পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি ও সীমান্ত অস্থিতিশীলতা কমে যাওয়ায় ভারত কৌশলগতভাবে নিরাপদ অবস্থান অর্জন করে। তবে নতুন সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও ভারতকে নিতে হয়।

মানবিক ও নৈতিক কৃতিত্ব (Diplomatic capital)

ভারত আন্তর্জাতিকভাবে “মানবতাবাদী হোস্ট” এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এটি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্রে।

ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ

স্বাধীন বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে ভারত অগ্রণী ভূমিকা নেয়। পরবর্তীতে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সিঞ্চন প্রকল্পে ভারতের প্রভাব ও অংশীদারিত্ব বাড়ে। তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জটিল ও ওঠানামা করেছে।

বিতর্ক ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

“ভারত সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে” এ ধরনের দাবিকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়। গবেষণামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ভারত কৌশলগত ও কূটনৈতিক কিছু সুবিধা অর্জন করলেও ঝুঁকিও বহন করতে হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতের স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঝুঁকিপূর্ণ ও নৃশংস একটি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা চালায়। আমাদের দেশের নিরীহ মানুষদের তারা আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় পরীক্ষামূলক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভারতের কূটকৌশলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিঃসন্দেহে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহত্তম অর্জন। কিন্তু সেই ইতিহাসের অন্তরালে রয়েছে এমন কিছু বিতর্কিত অধ্যায়, যা আজও আলোচনার দাবি রাখে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতের কূটকৌশল ও আঞ্চলিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে আমাদের ছোট্ট দেশটি পরিণত হয়েছিল এক করুণ রাজনৈতিক বলির পাঁঠায়। পাকিস্তান ও ভারতের দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার মাঝে পড়ে বাংলাদেশ একরকম অনিচ্ছাকৃতভাবেই জড়িয়ে পড়ে তাদের ভূরাজনৈতিক খেলায়, যার ফলশ্রুতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় ভারত নিজেই।

মুক্তিযুদ্ধের সহায়তার নামে ভারত একদিকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে নিজের অবস্থান মজবুত করে, অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চালায় নানা কর্মকৌশল, যার অনেক দিকই আজও ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ে চাপা পড়ে আছে।

যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ঘটে এক রহস্যজনক ঘটনা: মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীর হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা হয় ভারতীয় বাহিনীর হাতে। ধারণা করা হয়, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানীর উপস্থিতি ঠেকাতেই এই নৃশংস পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে পাকিস্তানি সেনারা বাধ্য হয় সরাসরি ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে, মুক্তিবাহিনীর কাছে নয়, যা স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়।

এতেই শেষ নয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশ ত্যাগের আগে ব্যাপক লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম নিজেদের দখলে নেয় তারা। বহু শিল্পকারখানা ধ্বংস করে ফেলা হয়, এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোয় যুক্ত হয় নতুন ক্ষতের রেখা।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের নামে সহায়তার হাত বাড়ালেও ভারত এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক, সব দিক থেকেই। আর বাংলাদেশ, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেলেও, দীর্ঘমেয়াদে হয়ে পড়ল দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারতের প্রভাব বিস্তারের এক পরীক্ষাগার।

উপসংহার

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ভারতের কৌশলগত শক্তি ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়িয়েছে। তবে এটি ছিল ব্যালান্সড লাভ মানবিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির সঙ্গে। আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অবদান ছিল না। দলের অধিকাংশ নেতা–কর্মী যুদ্ধের সময় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে মদ -জুয়া – নারী নিয়ে অবস্থান করলেও কেউ মাঠে সরাসরি যুদ্ধ করেননি। শেখ মুজিব স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানে পরিবারসহ সুরক্ষিত অবস্থায় ভাতা খেয়ে দিনাতিপাত কর ছিলেন এবং যুদ্ধের অগ্রগতির বিষয়ে তেমন অবগত ছিলেন না।

এছাড়া , যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেশে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হলে তিনি দেশে ফিরেন, ফেরার পথে ইংল্যান্ডে যাত্রা বিরতিতে সেখ মুজিব শুনতে পান , দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং নিলজ্জ  আওয়ামী লীগের বহু নেতা–কর্মীও ভারত থেকে ফিরে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেন।

সূত্রাবলী

  1. Encyclopedia Britannica, 1971 Bangladesh Liberation War
  2. Sriram’s IAS, “1971: India’s Strategic Gains”
  3. RJPN Research Journal, “Border Security and India’s Strategic Position”
  4. Oxford University Press (OUP Academic), “Diplomatic Capital of India, 1971”
  5. AP News Archive, “India-Bangladesh Post-War Relations”
  6. The Lezen Blog, “Economic Impact of Refugee Influx, 1971”
  7. Indian Defence Review, “Military Costs and Losses, India 1971”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *