স্বাধীনতা, বিজয় এবং আগামীর বাংলাদেশ: জনি সিদ্দিক 

প্রাক কথা:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল কেবল একটি ভূখণ্ডগত মুক্তির সংগ্রাম নয়; বরং এটি ছিল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, অর্থনৈতিক সমতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যিক উত্থান। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত চূড়ান্ত বিজয় সেই দীর্ঘ ও রক্তস্নাত সংগ্রামের সফল পরিণতি। ডিসেম্বর মাস তাই আমাদের জাতীয় জীবনে শুধু গৌরবের মাস নয়, এটি হলো আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় রক্ষার চিরন্তন প্রেরণার উৎস।

স্বাধীনতার মূল চেতনা ও আজকের প্রাপ্তি:

মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল—“অন্যায়ের বিরুদ্ধে অটল অবিচল থাকা। কোন অবস্থাতেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। সবাই একতাবদ্ধভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা।” এই চেতনাতেই জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ। বিজয়ের পর জাতির লক্ষ্য ছিল এই মূলনীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র তৈরি করা। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসে আমাদের প্রাপ্তির ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি। পোশাক শিল্প, জনশক্তি রপ্তানি, কৃষি উৎপাদন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। শিক্ষার হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সফলতাসহ অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়। শেখ মুজিবের হাত ধরে শুরু হয়ে পরবর্তীতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সক্রিয় অংশগ্রহণে সোনার বাংলার স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ পাচ্ছে মেগা প্রকল্প এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে। কিন্তু এই প্রাপ্তির উল্টো পিঠে কিছু অপূর্ণতা ও চ্যালেঞ্জ এখনও প্রকট। দুর্নীতি এখনো সমাজের গভীরে প্রোথিত। ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়ছে। কর্মসংস্থানের অভাব তরুণ প্রজন্মকে হতাশ করছে। রাজনৈতিক বিভাজন জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করছে। পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নতুন চ্যালেঞ্জও আমাদের সামনে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণতন্ত্র ও ন্যায় ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার প্রায়শই দুর্বল হয়ে পড়ে যখন আমরা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, সুশাসনের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, ফলে বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই বৈষম্যগুলো দূর করতে না পারলে স্বাধীনতার পরিপূর্ণ স্বাদ পাওয়া অসম্ভব। সমাজের প্রতিটি স্তরে বৈষম্য বিদ্যমান।

আগামীর বাংলাদেশ: স্বপ্ন ও পরিকল্পনা:

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য আমাদের স্বপ্ন—একটি আদর্শ ও ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতি মুক্ত, সকল প্রকার চাঁদাবাজি মুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধ এবং স্মার্ট বাংলাদেশ। এই স্বপ্ন পূরণের পথে, বিজয় দিবস আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করতে শেখায়:

১. টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য হ্রাস:

আগামীতে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং পরবর্তীতে উন্নত দেশে পরিণত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন শিল্পায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি এবং যাকাত ভিত্তিক ইসলামী অর্থনীতি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই উন্নয়নের সুফল সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা, বেকারত্ব দূর করা এবং তরুণদের জন্য উদ্ভাবনী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা আগামীর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান সকল প্রকার বৈষম্য দূর করতে হবে।

২. গণতন্ত্র ও সুশাসনের প্রতিষ্ঠা:

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা করা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থাকা অপরিহার্য। এখানে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাক-স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে। তবে বাকস্বাধীনতা মানে এই নয় যে— যার যা খুশি তাই বলবে যা খুশি তাই করবে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, যা একটি উন্নত জাতির মেরুদণ্ড। আর এই স্বচ্ছ জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন করা বাংলাদেশের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ও দুরূহ কাজ। এই সমাজে প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে রয়েছে। আমাদের এই দুর্নীতিকে সর্বাগ্রে রুখতে হবে।

৩. নৈতিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ:

শুধুমাত্র অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে জাতি উন্নত হতে পারে না। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নাগরিকদের হতে হবে নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক আদর্শে শিক্ষিত করতে হবে, যাতে তারা সাম্প্রদায়িকতা ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থাকে। দেশের প্রতিটি কাজে সততা ও নিষ্ঠা নিশ্চিত করাই হবে বিজয়ের চেতনার সার্থক প্রতিফলন। বর্তমানে দেশে যে হানাহানি হিংসার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা আমাদের ভুলে যেতে হবে, দূর করে দিতে হবে। পাশাপাশি অবশ্যই সবাইকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে যেন সবাই যার যার বিবেকবোধ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে। যে জাতির নৈতিক শিক্ষা যত সমৃদ্ধ সে জাতি চারিত্রিক দিক দিয়ে তত উন্নত, তত সমৃদ্ধ।

উপসংহার:

ডিসেম্বর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা মহান আল্লাহর দান, তবে এটি আমাদের রক্ত দিয়ে কেনা শ্রেষ্ঠ সম্পদ। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের এই চেতনাকে ভবিষ্যতের পথের পাথেয় করে নিয়ে, সকল প্রতিকূলতা জয় করে আমরা অবশ্যই ন্যায় ও আদর্শভিত্তিক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে পারব। একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য দলমত নির্বিশেষে সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হোক আজকের বিজয়ের দিনের অঙ্গীকার।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *