আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের জন্মকথা

সুমন বিপ্লব: ১৯৪৭ সালে চেতনার সূত্রপাত থেকে পিচ ঢালা রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দুর্গম বন্ধুর পথ পেরিয়ে তবেই ১৯৫৬ সালে এসে বাঙালি পায় মায়ের ভাষার রাষ্ট্রীয় অধিকার। বঙ্গসন্তানের সেই রক্তদান বিষয় নয়; নয় কেবল বাঙালির জন্য, বরং বিশ্বের সকল মানবজাতির মাতৃভাষার অধিকারের জন্য এ আন্দোলন উৎসর্গিত। সেই স্বীকৃতিই মিলল অবশেষে জাতিসংঘ কর্তৃক বাঙালির মহান একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার মাধ্যমে। এ স্বীকৃতি কেবল বাঙালিরই প্রাপ্য। কেননা ভাষার জন্য কেবল বাঙালিকেই শাসকের অস্ত্রের আঘাতে রক্ত দিতে হয়েছে, প্রাণ দিতে হয়েছে। কিন্তু কিভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেল? সেও এক নাতিদীর্ঘ যাত্রার পরিনাম।

বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষপাদ। সবকিছুর পুরোধা ছিলেন রফিক (রফিকুল ইসলাম) নামের কানাডা নিবাসী এক বাঙালি। তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক অমিত শক্তির স্ফূরণ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন পাকিস্তানী শাসকের  করতল থেকে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য। একাত্তরের এই মুক্তিযোদ্ধাই একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিণত করার সম্মুখযোদ্ধা। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪৪ ধারা ভেঙে এক রফিক পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে অমর করেছিলেন। এর ৪৬ বছর পরে আরেক রফিক সুদূর কানাডায় বসে দুঃসাহসী কাজ করে একুশে ফেব্রুয়ারিকে সারা বিশ্বের কাছে অমর করে তুললেন।

১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি রফিক জাতিসংঘের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি কফি আনান কে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে রফিক ১৯৫২ সালে ভাষা শহীদদের অবদানের কথা উল্লেখ করে কফি আনান কে প্রস্তাব করেন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে যেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সে সময় এ চিঠিটি সেক্রেটারি জেনারেলের প্রধান তথ্য কর্মচারী হিসেবে কর্মরত হাসান ফেরদৌসের (যিনি একজন সাহিত্যিক হিসেবেও পরিচিত) নজরে আসে। তখন ফেরদৌস ১৯৯৮ সালের ২০ জানুয়ারি রফিককে অনুরোধ করেন তিনি জন্য জাতিসংঘের ওপর কোনো এক সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে একই ধরনের প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করেন।

সেই পরামর্শ মোতাবেক রফিক তাঁর সহযোদ্ধা আব্দুস সালামকে সাথে নিয়ে ‘এ গ্রুপ অফ মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান। সেও আর এক বিস্ময়। কেননা সালাম নামের বায়ান্নর এক শহীদ অমর হয়ে আছেন বাঙালির হৃদয়ে। যাইহোক, সংগঠনে একজন ইংরেজি ভাষী, একজন জার্মানভাষী, একজন ক্যান্টোনিজভাষী, একজন কাচ্চীভাষী সদস্য ছিলেন। তারা আবারও কফি আনানকে ‘এ গ্রুপ অক মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অফ দা ওয়ার্ল্ড’- এর পক্ষ থেকে একটি চিঠি লেখেন, এবং চিঠির একটি কপি ইউএনও এর কানাডিয়ান অ্যাম্বাসেডর এর কাছেও প্রেরণ করেন।

এর মধ্যে এক বছর পার হয়ে যায়। হাসান ফেরদৌস ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে রফিক ও সালামকে পরামর্শ দেন ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের জোশেফ পডের সাথে দেখা করতে। তারা জোশেফের সাথে দেখা করলে তিনি তাদের ইউনেস্কোর আনা মারিয়ার সাথে সাক্ষাতের পরামর্শ দেন। প্রকৃতপক্ষে আনা মারিয়া নামের এই ভদ্রমহিলাই রফিক-সালামের কাজকে অনেক সহজ করে দেন। আনা মারিয়া রফিক-সালাম এর কথা মন দিয়ে শোনেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে পরামর্শ দেন যে, তাদের প্রস্তাব পাঁচটি সদস্য দেশ কানাডা, ভারত, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড এবং বাংলাদেশ দ্বারা আনীত হবে।

সে সময় এ কার্যক্রমের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রী এম এ সাদেক এবং শিক্ষা সচিব কাজী রকিব উদ্দিন, অধ্যাপক কফিল উদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর সেক্রেটারিয়েটের ডিরেক্টর মশিউর রহমান, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোজাম্মেল আলী, কাউন্সিলর ইকতিয়ার চৌধুরী, ইউনেস্কোর সেক্রেটারি জেনারেলের উপদেষ্টা তোজাম্মেল হক সহ অনেকেই জড়িত হয়ে পড়েন। তারা দিনরাত ধরে পরিশ্রম করেন আরও ২৯ টি দেশকে প্রস্তাবটির স্বপক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য।

অন্যান্য বাংলাদেশী এবং প্রবাসীদের কাছে ব্যাপারটা ততদিন অগোচরেই ছিল। পর্দার অন্তরালে কি দুঃসাহসিক নাটক মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে সে সময়! এই উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এবং কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরের কয়েকটি কেবল ব্যাপারটা জানেন এবং তারা বুকে আশা নিয়ে সে সময় স্বপ্নের জাল বুনে চলেন প্রতিদিন।

১৯৯৯ সালের 9 সেপ্টেম্বর। ইউনেস্কোর প্রস্তাব উত্থাপনের শেষদিন। তখনও প্রস্তাব পৌঁছায়নি। ওদিকে রফিক সালামেরা ব্যাপারটি নিয়ে বিনিদ্র রজনী যাপন করে চলেছেন। টেলিফোনের সামনে বসে আছেন, কখনো বা চোখ রাখছেন ইমেইলে। আসলে প্রস্তাবটিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর বাকি ছিল। প্রধানমন্ত্রী তখন পার্লামেন্টে। পার্লামেন্টের সময়সূচীর পরে সই করতে করতে প্রস্তাব উত্থাপনের সময়সীমা পার হয়ে যাবে। সেটা আর সময়মতো ইউনেস্কো পৌছুবেনা। ফলে সব পরিশ্রম জলে যাবে বোধ হয়।

প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে অনুরোধ করা হলো তিনি যেন প্রস্তাবটি সই করে ফেক্স করে দেন ইউনেস্কোর দপ্তরে। অফিসের সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে ফ্যাক্সবার্তা ইউনেস্কোর অফিসে পৌঁছায়।

১৬ নভেম্বর বহুল প্রত্যাশিত প্রস্তাবটি ইউনেস্কোর সভায় উত্থাপিত হলো না। রফিক-সালামেরা আরো একটি হতাশার দিন পার করলেন। পরদিন ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯; ঐতিহাসিক দিন। প্রস্তাব উত্থাপন করা হলো সবার প্রথমেই। ১৮৮টি দেশ এতে সাথে সাথেই সমর্থন জানালো। কোন দেশে এর বিরোধিতা করল না। এমনকি পাকিস্তানও নয়। সর্বসম্মতিক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গৃহীত হল ইউনেস্কোর সভায়।

এভাবেই বাঙালি একান্ত আপনার একুশে ফেব্রুয়ারি একটি আন্তর্জাতিক দিনে পরিণত হলো। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল উদ্যোক্তা রফিক এবং সালাম। তাদের ত্যাগ, তিতিক্ষা, পরিশ্রম আর স্বপ্নের সার্থক বাস্তবায়ন হলো।

বাঙালির ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্য দেশ সমূহের যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫ তম অধিবেশনে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করার প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫ তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *