গুমের শিকার চৌধুরী আলম: ১৬ বছরের অন্তহীন প্রতীক্ষা ও ইনসাফের প্রত্যাশা

মাহফুজা আলম, অস্ট্রেলিয়া থেকে: আজ ১৬ বছর অতিবাহিত হয়েছে আমাদের প্রাণাধিক প্রিয়জন বাবার “গ্রেফতার” পরবর্তী খুন-গুম হওয়ার বর্নণাতীত যন্ত্রণা নিয়ে ষোলতম বছরটি অতিবাহিত করছি। স্রষ্টার পরে যে মানুষটি কেউ সৎকর্ম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কেউ জীবনবাজী রেখে অসদুপায় অবলম্বন করে শুধু মাত্র লালনপালন করতে গিয়ে- এই দিনে আমাদের সেই বাবাকে আজকের এই দিনে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জের টানতে টেনে-হিঁচড়ে তুলে নিয়ে হিংস্রতার চুড়ান্ত রূপ দেখিয়ে দুনিয়া থেকে উধাও করে দেয়।

ফাঁসির দন্ডে দন্ডিত মানুষটাকেও তার মৃত দেহটা তার আপনজনদের দিয়ে দেয়া হয় শেষকৃত্যের জন্য। অথচ আমরা এতোটাই দূর্ভাগা সন্তান যে এক মুঠ মাটি বাবার কবরে দিতে পারি নাই। আমাদের চোখের সামনে তার মৃত শরীরের কবরটা না থাকলেও মনের গোপনে আজও কিছুটা হতাশা মেশানো অপেক্ষার যন্ত্রণা ঠিকই আছে। আরো কতো রকমের জাগতিক ভোগান্তির শিকার হচ্ছি প্রতিটা দিন তা না হয় নাইবা বললাম।

২০২৪ এর ৫ই আগস্টের পট পরিবর্তনের রাতে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এমন কোনও “আয়নাঘর” আমরা খুঁজে দেখতে বাদ রাখিনি বাবার হাতের কোনও একটা লেখা শব্দ কিংবা সংকেত পাবার আশায়।

দেশে এখন যে সরকার ক্ষমতায় আছে আমাদের বাবা এই দলটির চরম দূঃসময়ে জীবনবাজী রেখে আন্দোলন সংগঠিত করতে গিয়ে দশটি নিবর্তন মূলক রাজনৈতিক সাজানো মিথ্যা মামলা উনাকে ২৭ মাস কারাভোগ করতে হয়। তখনকার নেপথ্যে সেনা সমর্থিত সরকার “দুদক” কে ব্যবহার করে আমাদের পরিবারে সাবালক বেশিরভাগ সদস্যকে ন্যাক্কারজনক মিথ্যা মামলা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে। বিগত পনের বছরতো কথাই বলতে পারিনি, বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশের মার খেয়েছি গোটা পরিবার।

আজকের বাংলাদেশে বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন স্বাভাবিক ভাবেই এই দলের এই সরকারের প্রধান জনাব তারেক রহমান গত ষোল বছরে সকল গুম খুনের ন্যায্য বিচারের দাবী দ্রুত বাস্তবায়ন করবেন। গত ৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সভাপতিত্বে এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার” নামক সংগঠনের সভাপতি দৈনিক দিনকাল পত্রিকার সম্পাদক রুমনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ভিকটিম পরিবারের উপস্থিত সদস্যদের পক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন “মায়ের ডাক” এর সংগঠক গুম হওয়া বিএনপি কর্মী সাজিদুল ইসলাম সুমনের ছোটবোন সানজিদা ইসলাম তুলি, প্রথম গুমের শিকার কমিশনার, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য চৌধুরী আলমের বড় ছেলে এবং মামলার বাদী মোঃ আবু সাঈদ চৌধুরী সহ ত্রিশ জন গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের উপস্থিতিতে সরকারের কাছে কয়েক দফা দাবীনামা প্রদান করা হয়। সরকার পক্ষের উপস্থিত প্রতিমন্ত্রী আগামী তিন মাসের মধ্যে দাবী গুলার বেশিরভাগের বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তার বক্তব্য প্রদান করেন।

বিগত আওয়ামীলীগের দুশ্সান আমলের প্রথম গুমের সফল শিকার হওয়া ব্যক্তি চৌধুরি আলম আমার বাবা। আমি তার ছোট মেয়ে মাহ্ফুজা, বাবা নিখোঁজ হওয়ার ১৬ বছর পরেও এখনো  বাবা ফেরার অপেক্ষা করে আছি। কিন্তু চরম বাস্তবতার শিকার আমার পরিবার ও আমি এখন পর্যন্ত জানতে পারিনি কি ঘটেছে আমার বাবার ভাগ্যে, কেন আজও নিখোঁজ তিনি।

২০১০ সালের ২৫ জুন উনাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয় দিয়ে এক দল সাদা পোশাকধারী  বলপ্রয়োগে জোরপূর্বক  বাবাকে তুলে নিয়ে যায় সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাইনি। আমার বাবা রাজনীতি করতেন,উনি বি এন পি দলের একজন নেতা ছিলেন এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের পূর্ব ৫৬ বতর্মান ২০ নং ওয়ার্ডের পরপর  টানা ৩ বার কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তার জন্য। মূলত সেটা ছিলো তাকে গুম করার প্রধান কারণ তৎকালীন আওয়ামী  সরকারের।

তারপর থেকে বহু জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও বহু পত্রিকায় তার ব্যাপারে লেখালেখি হয়েছে কিন্তু তার কোনো হদিস মেলেনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কে হারিয়ে আমরা একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ি। আমাদের মৌলিক অধিকার গুলো  ক্ষুন্ন  হয়ে আছে আজ অবধি।

এখন ২০২৬ সাল, বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে, বি এন পি জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে। আমার বি এন পি সরকারের কাছে আকুল আবেদন, অকুণ্ঠ স্বরে বলতে চাই, আমি আমার বাবার গুমের বিচার চাই, যারা এই অপরাধের সাথে জড়িত তাদেরকে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেফতার ও  আইনের আওতায় সবোর্চ্চ শাস্তির সম্মুখীন হওয়া দেখতে চাই। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ সহ পৃথিবীর সব প্রান্তে থাকা বাঙালি যেনো দেখতে পায় যে, এই সোনার বাংলায় এখন ইনসাফ হয় আমার মত গুমের শিকার হওয়া পরিবারগুলো ন্যায়সঙ্গত  বিচার পায়।

আমাদের আপনজন হারানোর কান্না আর তাদের না ফেরার নির্মম সত্য যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা আমার মতো গুম পরিবার গুলোর মতো বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের এমন করুণ পরিণতি না হয়।  গুমের বিরুদ্ধে  সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বিধান রেখে বলিষ্ঠ ধারায় শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করা হোক, এই জোড় দাবী জানাচ্ছি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *