ফিজিতে মানব পাচার ও শ্রম বাণিজ্য: আদম ব্যাপারীদের মিথ্যা ফাঁদ ও প্রবাসীদের রূঢ় বাস্তবতা

আব্দুল্লাহ ইউসুফ শামীম, সিডনি:

ভূমিকা: স্বপ্নের আড়ালে এক নির্মম সত্য ! পড়ন্ত বিকেলের আলো তখন ফিজি দ্বীপপুঞ্জের প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশিতে আছড়ে পড়ছে। পর্যটকদের জন্য যা এক স্বর্গীয় অনুভূতি, সেখানে কর্মরত হাজারো  বাংলাদেশী শ্রমিকের চোখে তা কেবলই এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তার চাদর। চলতি মাসের ১০ জুলাই ২০২৬ আমি নিজেই ফিজি দ্বীপপুঞ্জ থেকে সরাসরি মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া  ফিরেছি। সেখানে গিয়ে সচক্ষে দেখে এসেছি আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের আমাদের ভাইদের কী নির্মম আর অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে।

বিদেশে গিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন মানুষের সহজাত। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে যখন একদল কুচক্রী মহল বা আদম ব্যাপারী দেশের সরল-সোজা মানুষদের প্রতারণার জালে জড়ায়, তখন তা আর কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি থাকে না; তা রূপ নেয় একটি জাতীয় সংকটে। ফিজির মাটিতে পা রেখে সেখানকার বাংলাদেশী শ্রমিক ভাইদের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় যে চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে, তা আজ দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক ও বিদেশ গমনেচ্ছু মানুষের জানা অত্যন্ত জরুরি।

দালালদের প্রথম ও প্রধান মিথ্যা: “ফিজি মানেই অস্ট্রেলিয়া!”

ফিজিতে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে আমার সামনে এসেছে, তা হলো আদম ব্যাপারী ও দালাল চক্রের অবিশ্বাস্য মিথ্যা প্রলোভন। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়েছে, “ফিজি আসলে অস্ট্রেলিয়ারই একটি অংশ বা দ্বীপ। ফিজি যাওয়া আর অস্ট্রেলিয়া যাওয়া একই কথা!” বাস্তবতা কতটা কঠিন ও ভিন্ন, তা ভুক্তভোগীরা ফিজিতে পৌঁছানোর পর টের পাচ্ছেন।

ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সত্য

ভিন্ন রাষ্ট্র: ফিজি কোনোভাবেই অস্ট্রেলিয়ার অংশ নয়। এটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সম্পূর্ণ একটি স্বাধীন, পৃথক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।

ভিন্ন আইন ও সীমানা: রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক কোনো দিক থেকেই অস্ট্রেলিয়ার সাথে ফিজির এমন কোনো চুক্তি নেই যার মাধ্যমে একজন মানুষ চাইলেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করতে পারেন।

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: ফিজি থেকে চাইলেই যে কেউ ইচ্ছে করলেই অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করতে পারে না। অস্ট্রেলিয়ার কঠোর ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী, ফিজি থেকে সেখানে যেতে হলেও সাধারণ নিয়মে অত্যন্ত জটিল ও কঠোর ভিসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

তাই কোনো দালাল বা এজেন্সি যদি আপনাকে আশ্বাস দেয় যে, ফিজিতে কিছুদিন থাকার পর তারা আপনাকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা অন্য কোনো উন্নত দেশে পার করে দেবে, তবে চোখ বন্ধ করে বুঝে নেবেন যে তারা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলছে। আপনি একটি বিশাল আর্থিক ও মানসিক প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছেন।

আদম ব্যাপারী ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

আমাদের দেশেরই কিছু কুলাঙ্গার, যারা টাকার লোভে অন্ধ, তারা সাধারণ মানুষকে এভাবে মিথ্যা কথা বলে ফিজি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই সকল আদম ব্যাপারীর কথার সাথে কাজের কোনো মিল নেই। তারা দেশে বসে যে বেতনের কথা বলে, ফিজিতে নিয়ে যাওয়ার পর তা হয়ে যায় অর্ধেক, কিংবা অনেক সময় মাসের পর মাস কোনো কাজই জোটে না শ্রমিকদের কপালে।অনেকে আবার বেতন পাচ্ছেনা ঠিক মতো।

বৈধ উপায়ে বিদেশ গমন: বিএমইটি স্মার্ট কার্ডের গুরুত্ব

প্রবাসে যাওয়ার আগে নিজেকে সুরক্ষিত করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো আইনি বৈধতা। ফিজিতে অবস্থানরত অনেক শ্রমিকের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তারা সঠিক প্রক্রিয়া না মেনে অননুমোদিত উপায়ে কিংবা ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে শ্রম দিতে গেছেন। এর ফলে তারা সেখানে গিয়ে কোনো আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন না।

কোনো অবস্থাতেই জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) এর স্মার্ট কার্ড অথবা বৈধ ইমিগ্রেশন কার্ড ব্যতীত ফিজিতে যাবেন না।

কেন বৈধ ইমিগ্রেশন কার্ড ও স্মার্ট কার্ড বাধ্যতামূলক?

১. রাষ্ট্রীয় ডাটাবেজ: স্মার্ট কার্ড থাকার অর্থ হলো বাংলাদেশ সরকার জানে আপনি কোন দেশে, কোন কোম্পানির অধীনে কাজ করতে যাচ্ছেন।

২. আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তা: বৈধ ইমিগ্রেশন কার্ড ব্যতীত অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে আসার চেষ্টা করলে, প্রবাসে আপনার কোনো সমস্যা (যেমন: বেতন না পাওয়া, দুর্ঘটনা, বা মালিকপক্ষের নির্যাতন) হলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আপনাকে দ্রুত বা কার্যকর সহায়তা প্রদান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৩. বীমা সুবিধা: বৈধভাবে গেলে প্রবাসীরা সরকারি বিভিন্ন বীমা ও কল্যাণ তহবিলের সুবিধা পান, যা অবৈধ উপায়ে গেলে সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়।

কূটনৈতিক সংকট: ফিজিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুপস্থিতি ও কর্মচারীদের আচরণ

ফিজিতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের দুর্ভোগের আরেকটি বড় কারণ হলো সেখানে বাংলাদেশের কোনো স্থায়ী দূতাবাস বা কনস্যুলার অফিস নেই।

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ফিজির বিষয়গুলো দেখভাল করে। সেখান থেকে দু-একজন কর্মচারী বা কর্মকর্তা নির্দিষ্ট সময় পরপর ফিজিতে যান কনস্যুলার সেবা বা অন্যান্য সার্ভিস দিতে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেখানেও সাধারণ শ্রমিকদের পক্ষ থেকে নানাবিধ অনিয়ম, সেচ্ছাচারিতা এবং চরম খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দূতাবাস কর্মকর্তাদের আচরণ ও অভিযোগের চিত্র

আমাদের দেশের দূতাবাস বা মিশনের কর্মচারীরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রবাসী শ্রমিকদের সাথে খারাপ ও অবমাননাকর ব্যবহার করেন—এই অভিযোগ নতুন কিছু নয়, এটি অত্যন্ত পুরাতন ও দুঃখজনক। ফিজিতে সেবা নিতে যাওয়া শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, তারা যখন নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে যান, তখন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সহানুভূতির বদলে জোটে ধমক ও উদাসীনতা।

সরকারি উচ্চপর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সংস্কার ছাড়া এই আমলাতান্ত্রিক বা বাকশালী মানসিকতার কর্মকর্তাদের আচরণ ঠিক করা অসম্ভব। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, অথচ তাদের সাথেই দেশের প্রতিনিধিরা চাকরের মতো আচরণ করছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একটি মারাত্মক অভিযোগ এবং আগামী দিনের অনুসন্ধান

শুধু খারাপ আচরণই নয়, দূতাবাস কর্মচারীদের একাংশের বিরুদ্ধে আদম ব্যবসার রমরমা বাণিজ্যের সাথে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ যোগসাজশের একটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, কিছু অসাধু কর্মকর্তা দালাল চক্রকে অবৈধভাবে সুবিধা দিচ্ছেন। এই অভিযোগটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। বর্তমানে এটি যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামীতে তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে এ বিষয়ে একটি সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত অনুসন্ধানী আর্টিকেল প্রকাশ করা হবে।

নতুন শ্রমবাজারের সম্ভাবনা ও সরকারের ভূমিকা

দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধরে রাখতে নতুন নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও প্রবাসীবান্ধব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজে সশরীরে ও কূটনৈতিক মাধ্যমে ধরনা দিয়ে শ্রমবাজার প্রশস্ত করার যে নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তা সত্যিই অকল্পনীয় ও প্রশংসার দাবিদার।

তিনি তার রাজনৈতিক মেধা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও দূরদৃষ্টি দিয়ে প্রবাসে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বিশাল এক পরিবর্তনের জোয়ার আনার চেষ্টা করছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া বাজারগুলো যেমন উন্মুক্ত হচ্ছে, তেমনি নতুন নতুন দেশেও বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের করণীয়

প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং এর সুফল তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম মন্ত্রণালয়কে আরও বিশেষ ও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে।

দালাল নির্মূল টাস্কফোর্স: মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দালালদের ধরতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।

সরাসরি সরকারি চুক্তি (G2G): ফিজির মতো দেশগুলোর সাথে সরাসরি সরকারি পর্যায়ে চুক্তি করতে হবে, যাতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা আদম ব্যাপারী সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা টাকা লুটে নিতে না পারে।

দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা: বিদেশের মাটিতে প্রতিটি বাংলাদেশ মিশনের কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসীদের সাথে যেকোনো ধরনের খারাপ আচরণের জন্য তাৎক্ষণিক বরখাস্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নিয়ম চালু করতে হবে।

জরুরি সতর্কবার্তা: এই মুহূর্তে এই মানব পাচারকারী ও প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাদের আইনের আওতায় আনা সময়ের দাবি। কোনো দালাল বা এজেন্ট যদি আপনাকে এমন অবাস্তব প্রলোভন দেখায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে আপনার নিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার (পুলিশ, র‍্যাব বা সিআইডি) কাছে লিখিত অভিযোগ বা রিপোর্ট করুন। এদের এখনই থামানো না গেলে দেশের অজস্র পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।

উপসংহার: সচেতনতাই হোক মূল শক্তি !

ফিজি একটি সুন্দর দেশ হতে পারে, কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগে আপনাকে বাস্তবতার জমিতে পা রাখতে হবে। আদম ব্যাপারীদের ফাঁকা বুলি আর অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ফিজির দ্বীপে বন্দি করার যে নোংরা খেলা চলছে, তা বন্ধ করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন : আপনার কষ্টার্জিত অর্থ এবং আপনার জীবন আপনার নিজের। তাই না জেনে, না বুঝে এবং বৈধ কাগজপত্র (BMET স্মার্ট কার্ড) ছাড়া কোনো দালালের খপ্পরে পড়ে ফিজির উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন না। নিজে সচেতন হোন, অন্যকে সচেতন করুন এবং যেকোনো জালিয়াতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। তবেই আমাদের প্রবাসী ভাইদের জীবন সুরক্ষিত হবে এবং দেশের শ্রমবাজার একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত হবে।

লেখক : ফিজি সফর শেষে সদ্য প্রত্যাবর্তনকারী- ১০ জুলাই ২০২৬

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *