অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও বিপন্ন ভবিষ্যৎ!

ড.মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস: সুস্থ দেহ ও মন সবার কাঙ্ক্ষিত আরাধনা। জাগতিক  জীবনে সুস্থতার বিকল্প নেই। স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা যে কত বড় আশীর্বাদ, তা কেবল অসুস্থ হলেই হাড়ে হাড়ে অনুভূত হয়। অসুস্থতা শুধু ব্যক্তির জীবনেই প্রভাব ফেলে না; এর ব্যাপ্তি ও ভয়াবহতা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও বিপর্যস্ত করে তোলে।পৃথিবীতে নানা পদের রোগ বালাই আছে।এবং সেসবের চিকিৎসা ও প্রতিকারও ক্রমাগত আবিষ্কৃত হচ্ছে। যা সময়ের শ্রেষ্ঠ  আশীর্বাদ।এখানটায় প্রয়োজন কেবল সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার। যিনি পৃথিবীতে আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তিনি বেঁচে থাকার  রসদ হিসেবে আরোগ্য লাভের ব্যবস্থা ও করেছেন। কোরআনের সূরা শুয়ারার আয়াত ৮০ তে বলা আছে আর আমি যখন অসুস্থ হই তখন তিনি আমাকে সুস্থতা দান করেন। হাদীসে ও এসেছে আল্লাহ এমন কোন রোগ অবতীর্ণ করেননি যার জন্য তিনি আরোগ্যের ব্যবস্থা করেননি।তা থেকে সৃষ্টিকুল আশাবাদী হওয়া ছাড়া কি কোন পথ আছে?চিকিৎসা  বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্যের ফলে  মৃত্যু এবং বার্ধক্য ব্যতীত সব রোগের নিরাময় এখন হাতের নাগালে।১৯২৮ সালে  পেনিসিলিনের যাত্রা এসবে বিস্ময়কর মাইলফলক।প্রাণীজগতে অ্যান্টিবায়োটিকের আগমন শত সহস্র প্রাণকে বিনে চিকিৎসায় মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে নিরাপদ করেছে।অথচ অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে প্রজন্ম আজ ধ্বংসের কিনারায়।এসব কেন হচ্ছে? এসবের জন্য আমরাই কি দায়ী? আশীর্বাদ কে অভিশাপে রুপান্তরিত করণে দায়ে কি অনুতপ্ত হবোনা? এখনই সময় এসবে সুমতি ফেরানোর?  নতুবা অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ব যুগের দশা আমাদের জন্য অপেক্ষমান!

অ্যান্টিবায়োটিক এবং সুপারবাগ সময়ের আলোচিত প্রপঞ্চ।জীবনরক্ষাকারী ঔষধ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটি পৃথিবী ব্যাপী বিস্তৃত। এ ঔষধ মূলত অনুজীবের বিরুদ্ধে কার্যকর। তবে ভাইরাস জনিত সমস্যার জন্য নয়।অথচ এসব আমলে না নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক মুড়িমুড়কির মতো ব্যবহারের ফলে প্রজন্মের মাঝে আশংকা  তৈরি হচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত প্রটোকল রয়েছে।যা ধাপে ধাপে  অনুসরণ করা লাগে। এদেশে খোদ চিকিৎসক থেকে শুরু করে  সর্বসাধারণ কেন জানি এখানটায় বেশ উদাসীন? এসবের  ভয়াবহতা  এবং পরিণামের দিক না বিবেচনায় এনে সাধারণ সংক্রমনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সংবেদনশীল সর্বশেষ রিজার্ভ  গ্রুপের ব্যবহার করতে দেখা যায়।অ্যাকসেস, ওয়াচ এবং রিজার্ভ এসব ধাপ অনুসরণের মাঝেই চিকিৎসার প্রটোকল আগানোর কথা রয়েছে। নীতিমালার অস্পষ্টতা ঔষধের সহজলভ্যতা এসব  অযাচিত সুযোগে  সুপারবাগ  ও রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়ে থাকে। এর জন্য ঔষধ নয়, ব্যবহার সক্ষমতার জ্ঞানের অভাবে ই মূলত দায়ী। যা অ্যান্টিবায়োটিক বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা  অর্জন করে। একদা সংক্রমণ যত সহজে নিরাময় হতো সময়ের পরিক্রমায় সে ঔষধ আর কাজ করছে না।ফলে সংক্রমণ জটিল ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। যা আগামীর মহাসংকেত! এমনকি যারা কখনো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেননি, তারাও রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারেন।! কেন এমন পরিণাম?

অ্যান্টিবায়োটিক আর আগের মত কাজ করছেনা। সুপারবাগের প্রভাবে এর কার্যকারিতা হারাচ্ছে। মানুষ থেকে মানুষে,খাদ্য ও প্রাণীর মাধ্যমে এবং পরিবেশের প্রভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী  দেখা যায় প্রায় ১.২৭ মিলিয়ন মানুষ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল (এএমআর) রেজিস্টেন্স জনিত কারণে মারা গিয়েছে।রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে আমাদের দেশে আইসিইউতে ভর্তি প্রতি দশজনের চারজনের ই বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছেনা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স সার্ভেইলেন্স রিপোর্ট ২০২৫ বলছে  সুপারবাগ জীবনরক্ষাকারী ঔষধের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।এসব কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? আমরা কি আবার  সনাতন যুগে ফিরে যাচ্ছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আশাংকা ২০৫০ সাল নাগাদ সুপারবাগের প্রভাবে প্রতি  বছর  এককোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।আধুনিকতার উৎকর্ষতা  লগনে এ কেমন রসিকতা! বাংলাদেশে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার  ইউনিট ১লা জানুয়ারি’২৬ থেকে ৩০এপ্রিল’২৬ পর্যন্ত গুরুতর অসুস্থ ৪৯ জন শিশুর নমুনা বিশ্লেষণে দেখতে পায় অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা ৯৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।এটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা। অ্যান্টিবায়োটিক ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারালে অস্ত্রোপচার, ক্যানসার চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন কিংবা সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।যা আগামীর সংকটে অশনিবার্তা বহন করছে!

রোগ মুক্ত সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে যেখানটায় অ্যান্টিবায়োটিক  এক সময় আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করতো,তা আজ বিপদসংকেত!সুপারবাগের কবলে অনেক অ্যান্টিবায়োটিক ই কাজ করছেনা।।জীবন বাচাতে এসবের  বড্ড প্রয়োজন।  এসবের পিছনে নানা অনুষংগ ক্রিয়াশীল। কেন বিস্ময়কর সৃষ্টি অভিশাপে রূপ নিচ্ছে? এসবের পিছনে নানা অনুষঙ্গ ক্রিয়াশীল ।অতি মুনাফালোভী ঔষধ কোম্পানির প্রলোভন, চিকিৎসকের উপঢৌকনের লোভ, প্রেসক্রিপশন ছাড়া  অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি, কোর্স অসম্পূর্ণ রেখে চিকিৎসার সমাপ্তি, প্রায়শই ভাইরাসজনীত জটিলতায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ,পশুপালন,  গবাদিপশু এবং শাকসবজিতে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি ই বলে দেয় আমরা কোন পথে হাঁটছি? যেখানটা এসবে সহায়ক হিসেবে সৃজনকৃত অ্যান্টিবায়োটিকের শরনাপন্ন হওয়ার সুযোগ আছে। আদা, রসুন, কাঁচা হলুদ, জলপাই পাতার নির্যাস, তুলসী, পেয়াজ,দারুচিনি এবং আপেল সিডার  ভিনেগার ও ভিক্টোরিয়াজনিত উপসর্গে দারুণ কার্যকরী। অথচ এসবে বেমালুম উদাসীন!

অ্যান্টিবায়োটিক সুপারবাগ বিস্তৃতিতে আমাদের জবাবদিহিতার সংকট,মানবিকতাবোধের অভাব, উচ্চ মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষা,অসততা,দায়বোধের ঘাটতি, সাংস্কৃতিক দীনতা এবং  নীতি নৈতিকতার উপাদান গুলো বেশ সক্রিয়ভাবে সামনে চলে আসে।বহুলাংশে এসবের পিছনে  আমাদের দায় ই বেশী! আর কত সুপারবাগ তৈরি হলে আমাদের সম্বিত ফিরবে?

সংকট সংশয় থাকবে, এবং এর  মাঝেই উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের সুপারবাগ জনিত সংকটের দায় আমাদের সবার। একে জিইয়ে রাখলে প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সামান্য আক্রান্ততেই মৃত্যু ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক সুপারবাগের প্রভাব সর্বগ্রাসী। এ যাত্রায় প্রয়োজন মানসিকতার বদল, সচেতনতা সৃষ্টি,আইন মেনে ব্যবহার, ফার্মেসীতে  প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঔষধ বিক্রিতে শাস্তির ব্যবস্থা, সরকারের নজরদারি বাড়ানো,চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত  নিজ থেকে অ্যান্টিবায়োটিকগ্রহণ না করা, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুসরণ করা। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং লেখনির মাধ্যমে মানুষকে প্রেষিত করা যেতে পারে। এসবের ভয়াবহতা এবং করনীয় প্রচার এবং প্রসারে গণমাধ্যমের ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

আর দেরি নয় এখন ই সময় জেগে ওঠার। নিজে বাঁচুন এবং প্রজন্মকে রোগমুক্ত সুস্থ নাগরিক হিসেবে গড়তে  এসবে মনোযোগী হওয়ার  বিকল্প নেই। সুপারবাগ এখন আর কল্পনা নয় এক নিগুঢ় বাস্তবতা! প্রাত্যহিক চলাফেরায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সীমিত করা খুব প্রয়োজন। বিশেষত শিশু খাদ্য, গবাদি পশুর শরীর,হাঁস-মুরগি,  শাকসবজি অ্যান্টিবায়োটিক সুপারভাগের প্রভাব থেকে  বাঁচানো না যায় তাহলে আগামীতে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়বে। বিশ্বব্যাপী মহামারী দেখা দিবে। মানব প্রজন্ম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। আমরা  আর আদিম জামানায় ফিরতে চাইনা। সুন্দর এবং সুস্থ জীবন ই আমাদের প্রত্যাশা। এসবে সমাজ রাষ্ট্র ব্যক্তি পরিবার সবারই মনোযোগী হওয়া সময়ের দাবি। এবং কার্যকরী পদক্ষেপই দেখাবে আলোর পথ।

 

লেখক : ড.মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস, অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Email: alioakkas@gmail.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *