সুপ্রভাত সিডনি প্রতিবেদন: অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে প্রথম বাংলাদেশী ডেপুটি মেয়র হওয়ার গৌরব অর্জন করে ইব্রাহিম খলিল মাসুদ পুরো জাতির মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
ইব্রাহিম খলিল মাসুদ সিডনির একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত কমিউনিটি নেতা। অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় তিন দশক ধরে তিনি সমাজসেবা, বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতি, ব্যবসার উন্নয়ন এবং জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর থেকেই মাসুদ কমিউনিটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর জীবনের শুরুর দিনগুলো থেকেই তিনি উল্লেখযোগ্য সময় ও শ্রম দিয়েছেন। বিশেষ করে নতুন দেশে নিজেদের জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা যারা করছেন, এমন সদ্য আগত অভিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তাঁর সমাজসেবার পরিধি বহুমুখী। বছরের পর বছর ধরে তিনি নতুন দেশে বসতি স্থাপনের নানা সমস্যা মোকাবিলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ খোঁজা, আবাসনের ব্যবস্থা, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ এবং অপরিচিত নিয়মকানুন ও সেবাব্যবস্থা বুঝতে মানুষকে সহায়তা করেছেন। বাস্তব প্রয়োজনের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানসিকতা তাঁকে কমিউনিটিতে ব্যাপক পরিচিতি ও সম্মান এনে দিয়েছে।
মাসুদ পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান, বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য ও সময়নিষ্ঠ মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাঁর অন্যতম বড় গুণ হলো, মানুষ সহজেই তাঁর কাছে যেতে পারেন। সাংস্কৃতিক পটভূমি, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে তিনি সবাইকে হাসিমুখে স্বাগত জানান। তিনি একজন ধৈর্যশীল শ্রোতাও; সাহায্যের জন্য তাঁর কাছে আসা মানুষের উদ্বেগ ও সমস্যাগুলো বুঝতে সময় দেন।
কমিউনিটি সংগঠনগুলোতে নেতৃত্ব
নিউ সাউথ ওয়েলসের বিভিন্ন কমিউনিটি, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়িক ও বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে মাসুদ তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন।
বিভিন্ন সময়ে তিনি সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন, অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স, অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম, বাংলাদেশ–অস্ট্রেলিয়া ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিল (বিএটিআইসি) এবং বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন অব নিউ সাউথ ওয়েলসসহ বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি রোটারি ও লায়ন্স ক্লাবের মতো সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন, যা সমাজসেবা ও নাগরিক দায়িত্বের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি মেলা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করার নানা উদ্যোগ আয়োজন ও সমর্থনের মাধ্যমে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এসব উদ্যোগ ঐক্য, অন্তর্ভুক্তি ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতিকে এগিয়ে নিয়েছে।
এসব দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি অসংখ্য কমিউনিটি অনুষ্ঠান আয়োজন ও সহযোগিতা করেছেন, সংগঠনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করেছেন, ব্যবসায়ী ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ উৎসাহিত করেছেন এবং বাংলাদেশি–অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৃহত্তর অস্ট্রেলীয় সমাজের সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে কাজ করেছেন।
তাঁর নেতৃত্বের দর্শনের কেন্দ্রে সব সময়ই রয়েছে সেবা, কমিউনিটির মানুষের পাশে থাকা, তাঁদের উদ্বেগের কথা শোনা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য কাজ করা।
কমিউনিটি নেতৃত্ব
কমিউনিটির সঙ্গে মাসুদের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততায় এমন অনেক গুণের প্রতিফলন দেখা যায়, যা অস্ট্রেলিয়ার একজন কার্যকর বহুসাংস্কৃতিক কমিউনিটি নেতার কাছে প্রত্যাশিত। এর মধ্যে রয়েছে:
সততা ও বিশ্বস্ততা: সৎভাবে কাজ করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে কমিউনিটির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব
সাংস্কৃতিক পটভূমি, ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, লিঙ্গ, বয়স কিংবা আর্থসামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সবাইকে স্বাগত জানানো ও সম্মান করা।
অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা
গণতন্ত্র, সমতা, স্বাধীনতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আইনের শাসনের প্রতি সমর্থন।
বহুসাংস্কৃতিক বোঝাপড়া
অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজকে বোঝা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে কাজ করা।
কার্যকর যোগাযোগ
মনোযোগ দিয়ে সকলের কথা শোনা এবং কমিউনিটি সংগঠন, সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যোগাযোগ করা।
সহমর্মিতা ও সহজে কাছে যাওয়ার সুযোগ
মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা এবং ব্যক্তি ও পরিবারের সমস্যাগুলো বোঝা, বিশেষ করে যাঁরা মনে করেন, তাঁদের কথা কেউ শুনছে না।
কমিউনিটির ঐক্য
বিভাজনকে উৎসাহিত না করে মানুষকে একত্রিত করা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলা।
সেবামুখী নেতৃত্ব
কমিউনিটির প্রয়োজন এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে মানুষের জীবন কীভাবে উন্নত করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া।
অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে কথা বলা: কাউন্সিল, সরকার, প্রতিষ্ঠান ও সেবাদানকারী সংস্থার কাছে কমিউনিটির উদ্বেগ ও দাবিদাওয়া তুলে ধরা।
জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা
সিদ্ধান্তের দায় নেওয়া, খোলামেলা পরিবেশ উৎসাহিত করা এবং গঠনমূলক মতামত গ্রহণ করা।
সহযোগিতা ও যোগাযোগের সম্পর্ক গড়ে তোলা
কমিউনিটি সংগঠন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকার, পুলিশ, বিদ্যালয়, দাতব্য সংস্থা ও অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা।
বিরোধ নিষ্পত্তি
মতবিরোধের ক্ষেত্রে শান্ত, শ্রদ্ধাশীল ও ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা।
ন্যায্য ও স্বাধীন কমিউনিটি প্রতিনিধিত্ব
ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে কমিউনিটির স্বার্থকে পৃথক রাখা।
দূরদৃষ্টি ও কৌশলগত চিন্তাভাবনা
বিচ্ছিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের বাইরেও শিক্ষা, যুব উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক সংহতি, কল্যাণ ও কমিউনিটির অংশগ্রহণের মতো দীর্ঘমেয়াদি অগ্রাধিকারের দিকে নজর দেওয়া।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলা
তরুণ ও উদীয়মান কমিউনিটি নেতাদের অংশগ্রহণ, অবদান রাখা এবং দায়িত্ব গ্রহণে উৎসাহিত করা।
শিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়ন
মাসুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ায়ও পড়াশোনা চালিয়ে যান। তিনি সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং নিউ সাউথ ওয়েলসে আরও পড়াশোনা ও পেশাগত কোর্স সম্পন্ন করেন। তাঁর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষকতা সহায়তা, আর্থিক পরিকল্পনা, মর্টগেজ ব্রোকিং এবং অন্যান্য ডিপ্লোমাও।