চোখ: আহমদ রাজু

গোপালদাকে এভাবে এই অবস্থায় দেখবো তা কোনদিন কল্পনাও করিনি। তার অভাব ছিল জানতাম, তবে স্বভাব খারাপ তা কখনও শুনিনি। আসলে তার সাথে আমার চেনাজানা যে খুব বেশি তা ঠিক নয়; এক এলাকায় থাকলে যেমন সম্পর্ক হয় ঠিক তেমন। আমি ভবঘুরে ছিলাম আর সে ছিল কর্মমূখী এক সন্তানের জনক; এটাই পার্থক্য। প্রতিদিন দেখা হতো- কথা হতো তেমন নয়; মাঝে মাঝে হতো। একসাথে বসে গল্প করা- চা খাওয়া তেমন হয়ে ওঠেনি কোনদিন। স্থায়ী কাজের বন্দোবস্ত ছিলনা গোপালদার। সংসার চালাতো মোড়ের দোকানদারদের ফুট ফরমায়েশ খেটে। তাতে কোনদিন রোজগার হতো কোনদিন হতো না।

একদিনের কথা আমার চোখের সামনে ভাসে আজও। সেদিন বাজারের দিকে রওনা দিয়েছিলাম জগা মাধবের চায়ের দোকান থেকে এক কাপ চা খেয়ে আডালে যেয়ে সিগারেট ফুকবো বলে। হঠাৎ গোপালদা পেছন থেকে ডাক দেয়, “পুলক বাবু একটু শুনবা।” আমি গোপালদার ডাক শুনে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যাই। সে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে দুইহাত কচলাতে কচলাতে বলল, “আমারে যদি একটু উপকার করতে পুলক বাবু।” আমি তার মুখের দিকে তাকাই। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখের ভাষায় হতাশার প্রলেপ স্পষ্ট। বললাম, “বলোনা গোপালদা কি বলবে?”

“মায়েডার খুব জ্বর। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো কাছে এট্টা পয়সাও নেই। যদি বিশটা টাকা দিতে..”

আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, “সেকি গো! কখন থেকে জ্বর?”

“কাল সন্ধ্যে থেকে।”

“কাল জ্বর হয়েছে আর তুমি এখনও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওনি?”

“তিন মাস বয়স। প্রথম ভাবিছিলাম এমনি হয়তো গা গরম। আপনাআপনি ঠিক হয়ে যাবেনে। বউডা অবশ্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার কথা বলিছিল।”

আমি গোপালদাকে প্রশ্ন করলাম, “যাওনি কেন?”

গোপালদা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “যার দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জুগাড় করতি কষ্ট হয়ে যায় সে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে কি হাতে নিয়ে?”

গোপালদার কথায় আমি থতমত খেয়ে যাই। আসলেইতো গোপালদা ঠিক কথাই বলেছে। তার যেখানে দিনই চলেনা তখন ডাক্তারের টাকা পাবে কোথা থেকে?

আমি নিজেই একজন বেকার মানুষ। পড়াশুনা শেষ করে চাকুরীর ধান্দায় ঘরে মরছি এ অফিস থেকে ও অফিস পর্যন্ত। অন্যকে সহযোগিতা করবো তেমন সাধ্য আমার নেই। বর্তমানে আমার পকেটে সম্বল এগারো টাকা মাত্র। মিথ্যে বলবো না, সেদিন গোপালদাকে দশ টাকার নোটটা দিয়ে এক টাকার নোটটা রেখেছিলাম সিগারেট খাবো বলে। গোপালদা চাহিদা মত টাকা না পেলেও দশ টাকার নোটটা হাতে পেয়ে যে কত খুশি হয়েছিল তা তার চোখ-মুখে ফুটে উঠেছিল। সেই ঘটনার পর আরও কিছুদিন গ্রামে ছিলাম। গোপালদার দারিদ্রতা কলুষিত হয় এমন কথা কখনও কানে আসেনি আমার। পরে চাকুরী নিয়ে শহরে চলে আসার কারণে আর যোগাযোগ হয়নি।

আজ গোপালদাকে চুরির দায়ে গাছের সাথে পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখে মনটা হুঁহুঁ করে কেঁদে ওঠে আমার। মনটা কেন জানি বারবার বলছে, গোপালদা চোর নয়। সে চুরি করতে পারে না।

আমি বড়চাচার বাড়িতে মানুষ। জ্ঞান হবার পর জানতে পারি আমার মা-বাবা দুজনেই এক দুর্ঘটনায় মারা গেছে আমার বয়স যখন এক বছর। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী নিয়ে শহরে আমার বর্তমান ঠিকানা। প্রায় বারো বছর পর গতকাল রাতে আমি চিরচেনা সেই গ্রামে এসেছি। যেখানে কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর- যৌবন। রাতে এলাকার লোকজনের সাথে দেখা করা হয়নি। ভেবেছিলাম সকাল হলেই ঘুরতে বের হবো। দেখা করার মতো দু’একজন বাল্যকালের খেলার সাথী ছাড়া তেমন কেউই নেই।

গোপালদার কথা আমার একদমই মনে ছিল না। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই চাচার বাড়ির আঠারো/উনিশ বছর বয়সের কাজের ছেলেটা এসে বলল, “জানেন পুলক দা, আজ গ্রামে এক বিশেষ ঘটনা ঘটতি চলেচে।” আমি চোখ কচলাতে কচলাতে বললাম, “কি এমন বিশেষ ঘটনা বলোতো?”

ছেলেটা তার কালো কুচকুচে দাঁত বের করে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল, “গ্রামে গরু চোর ধরা পড়েচে। তারে ইসকুলির সামনের আম গাছে বাঁধে রাখা হয়চে। একটু পরেই চেয়ারম্যান নিজে দাঁড়ায়ে থেকে তার চোখ উৎপাটন করাবেন।”

ছেলেটার কথা শুনে আমার চোখের ঘুম উবে যায়। বললাম, “বলিশ কী!”

“হ্যাঁ দাদা, তবে আর বলছি কি। আমি কোনদিন চোখ উৎপাটন দেখিনি; আজই দেখার সৌভাগ্য হবে হে…হে..।”

“এতে হাসির কি হলো?”

“বলেন কি দাদা! গ্রামে অন্য রকম কিছু ঘটতি চলেচে আর আমি হাসপো না। আনন্দেতো আমার নাচতি ইচ্ছে হচ্ছে।”

“বলো কি! একজনের চোখ উৎপাটন করা হবে, আর তুমি আনন্দ পাচ্ছো?”

“একটু ঘর থেকে বের হলিই বুঝবেন, আনন্দ শুধু আমি পাচ্চি না, পাচ্চে পুরো গ্রামের লোক।”

ছেলেটার কথা আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না। তারপরও সত্য মিথ্যা যাচাই করার জন্যে আর কথা না বাড়িয়ে টুথব্রাশের মাথায় পেষ্ট লাগিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে করতে রওনা দিই স্কুল মাঠের দিকে, যেখানে কিছু ঘটতে চলেছে।

স্কুলের সামনের আমগাছ ঘিরে মানুষের জটলা দূর থেকে দেখা যায় স্পষ্ট। ছেলেটার কথায় খুব বেশি পাত্তা না দিলেও তার কথার সাথে সামনের পরিস্থিতির মিল থাকায় অজানা শংকায় উত্তেজিত হয়ে হাঁটার গতি বৃদ্ধি করি। মিনিট তিনেকের মধ্যে পৌঁছে যাই জটলার কাছে। মানুষের ভীড় ঠেলে সামনের আম গাছের নিচে চোখ রাখতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। গোপালদার এ কী অবস্থা! তাকে চুরির দায়ে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে!

উপস্থিত একজনের কাছে জানতে চাইলে সে বলল, “এ সবই চিয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যাবার ফল। গোপাল স্থানীয় এনজিও থেকে দশ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে গতকাল হাট থেকে একটা গরু কিনে বাড়িতে নিয়ে আসে। গরুটাকে সেবাযত্ন করে ক’মাস পরে বিক্রি করলে বেশি কিছু টাকা লাভ হবে এ তার মনের বিশ্বাস। এমনিতে তার দিন আগের মতোই আছে। দিন চলে- চলে না এমন অবস্থা। এখানে যে কয়টা হিন্দু পরিবার ছিল তারা প্রায় সবাই বেশ আগেই জায়গা জমি পানির দরে বিক্রি করে ভারতে চলে গেছে। অবশিষ্ট আছে গোপালসহ দু’একজন। গোপালের তেমন কিছু নেই। থাকার মধ্যে পৈত্রিক চার শতক জমি মাত্র। তার ইচ্ছে হয়নি বাবার জমিটা অন্যের কাছে হস্তান্তর করে ভারতে চলে যেতে। বাকী জীবন সে এখানে থেকে যাবার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

গত রাতে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমানউল্লার মুন্সীর গোয়াল থেকে একটি গরু চুরি হয়েছে। গোপাল গরু কিনে এনেছে শুনে সে চুরির দোষ চাপায় গোপালের ওপর। বিগত নির্বাচনে তার কাজ না করায় গোপালের প্রতি নাখোশ হয়েছিল বর্তমান চেয়ারম্যান। গোপালকে উচিৎ শিক্ষা দেবার জন্যে দিন গুনছিল সে। তাইতো এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি। সন্ধ্যা সাতটার কিছুক্ষণ পর চৌকিদারসহ চেয়ারম্যান তার লোকজন নিয়ে উপস্থিত হয় গোপালের বাড়িতে।

বেড়ায় ঘেরা ছোট্ট একটার ঘর, ছাউনি খড়ের। বেড়ার ফাঁক দিয়ে হ্যারিকেনের আলো এসে পড়েছে বারান্দায়। ঘরের কোনার খুঁটিতে বেঁধে রাখা গরুটার দিকে সে টর্চের আলো ফেলে বলে, “ঐতো আমার গরু।” চেয়ারম্যানের কথায় তার সাথে থাকা লোকজন উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা চিৎকার করে গোপালকে ডাকতে থাকে।

গোপালের মেয়ে মালিনী এবার ক্লাস এইটে উঠেছে। পড়াশুনার প্রতি তার মনোযোগ দেখে বুক ভরে ওঠে গোপালের। হ্যারিকেনের আলোয় মালিনী শব্দ করে পড়ছিল, “চল চল চল উর্ধ্বে গগনে বাজে মাদল………।” গোপাল মালিনীর পাশে বসেছিল। ঘরের বাইরে লোকজনের চিল্লানিতে মালিনীর মুখ থেকে শব্দ বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে গোপাল চাটাইয়ের দরজাটা উঁচু করে একপাশে রেখে বাইরে আসে। কোনকিছু বুঝে ওঠার আগেই দুইজন চৌকিদার এসে মুহূর্তে তার হাতদু’টি বেঁধে ফেলে। ভীতিসন্ত্রস্ত গোপাল চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আমার অপরাধ কি চিয়ারম্যান সাব?”

চেয়ারম্যান উত্তর দেবার আগেই উপস্থিত লোকজনের মধ্য থেকে একজন বলে ওঠে, “ন্যাকা সাজিসনে গোপাল, তোরে আজকে হাতে নাতে ধরিচি। ফসকে যাবি কনে?”

হাতে হ্যারিকেন নিয়ে গোপালের স্ত্রী পূর্ণিতা বাইরে এসে স্বামীর এমন অবস্থা দেখে কি বলবে বুঝতে পারে না। সে চিল্লিয়ে কেঁদে ওঠে। “মালিনীর বাপরে আপনারা বান্দেছেন ক্যান? সে কি এরেছে?”

“তুমার মালিনীর বাপ চিয়ারম্যানের গরু চুরি করে আনেচে।” উত্তর পাড়ার নাটাই খা ফিক করে মাটিতে পানের পিক ফেলে কথাটি বলল।

বিস্মিত পূর্ণিতা। সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, “আপনাগের ভুল হচ্চে। সে হাট থেকে গরুডা কিনে আনেচে।”

মুখ খোলে চেয়ারম্যান। বলল, “আপনারা দেখেন গরু আমার গোয়াল থেকে চুরি হয়েছে আর গোপাল নাকি হাট থেকে কিনেছে!”

গোপাল ঠোঁট কাঁপাতে কাঁপাতে বলল, “আমি দুপুরি ছাতেনতলার হাটেরতে কিনে আনিচি।”

ইতিমধ্যে মালিনী বাইরে এসে তার বাবাকে বাঁধা অবস্থায় দেখে কান্না শুরু করে। তাকে পূর্ণিতা থামাবার চেষ্টা করে। পূর্ণিতা জানে তার স্বামীর কিছু হবেনা। হয়তো চেয়ারম্যান ভুল করছে। এত বছরের সংসার তাদের; আর যাই হোক তার স্বামী চুরি করতে পারে না।

বয়স্ক একজন বলল, “হাটেরতে যে গরুটা কিনিচির তোর সাক্ষী আচে কেউ?”

গোপাল কোন কথা বলে না। সে যেন আস্তে আস্তে পাথর হয়ে যাচ্ছে।

“আচ্ছা তোর ধর সাক্ষী থাকলোই। আমি মানলাম হাটে তুই চোরের কাছেরতে গরুডা কিনিচির। তুইতো জানিস ইডা চিয়ারম্যানের গরু, তালি কিনলি ক্যান?

“আমি চিয়ারম্যানের গরু চিনিনে?” কাতর কণ্ঠে বলল গোপাল।

“ন্যাকা সাজিসনে গুপাল, তুই সব চিনিস; তোর এ অপরাধের বিচার অবেই।” লোকটার কথায় উপস্থিত সবাই সাঁই দেয়, “হ্যাঁ বিচার হতেই অবে।”

গোপালের বাড়িতে হট্টোগোলের শব্দ শুনে আশপাশের বাড়ি থেকে পুরুষ-মহিলারা এসে জড়ো হয়েছে গোপালের উঠানে। তারা কোন কথা বলে না। কোন প্রতিবাদ করেনা। চেয়ারম্যানকে তারা ভাল করেই জানে। তার বিরুদ্ধে কথা বলেছে তো কপালে দুঃখ আছে। যে কারণে তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে গোপালকে মারতে উদ্যত হলে চেয়ারম্যান তাদের থামায়। বলল, “না এখন ওর গায়ে হাত দেবার দরকার নেই। স্কুল মাঠে নিয়ে আম গাছের সাথে বেঁধে রাখা হোক; কাল সকাল হলেই মেরে হাড়গোড় ভেঙে দেওয়া হবে। তারপর যে দুই চোখ দিয়ে দেখে গরু চুরি করেছে সেই দুই চোখ উপড়ে দেওয়া হবে। যাতে সে আর কারো গরু এভাবে চুরি করতে না পারে।”

পূর্ণিতা কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে এসে চেয়ারম্যানের পায়ের কাছে উপুড় হয়ে পড়ে স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চায়। চেয়ারম্যান পূর্ণিতাকে পা দিয়ে দূরে ঠেলে দেয়। পূর্ণিতা ছিটকে পড়ে হাত খানেক দূরে। বলল, “গত নির্বাচনে তুরা যদি আমাকে ভোট দিতিস তাহলে ভেবে দেখতাম ছাড়া যায় কি না। তুরাতো আমাকে ভোট দিসনি। তাহলে ছাড়বো কেন? তুরাতো আর আমার লোক না। তাছাড়া অপরাধীর উপযুক্ত সাজা দেওয়া-ই ইসলামের আদেশ।”

মালিনী তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কেঁদে চলেছে। তার চোখের পানিতে ভিজে একাকার হয়ে যায় গোপালের শরীর। ছোট্ট মেয়েটা জানেনা তার বাবার অপরাধ কি। কেন তাকে এই লোকগুলো ধরে নিয়ে যাবে। গোপাল মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা করে, “কাদিসনে মা; আমার কিচু অবে না। আমি চোর না, আমি চুরি করি নি।”

মালিনী চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, “আমার বাবাতো চুরি করিনি, তালি বাবারে ছেড়ে দেন আপনারা।”

মালিনীর কথায় কর্ণপাত করেনা কেউ। তারা গোপালকে একপ্রকার টেনে হেঁড়ড়ে নিয়ে যায় স্কুল মাঠের দিকে। পূর্ণিতা দৌঁড়ে একবার চেয়ারম্যানের কাছে যায়, আর একবার যাকে সামনে পায় তাকে বলে তার স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে। কেউ তার স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে না।

তিন তিনবার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমানউল্লার মুন্সী। এলাকায় তার প্রভাব প্রতিপত্তির কমতি নেই। তার কথায় বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল না খেলেও ইউনিয়নের অধিকাংশই তার অনুগত-বাধ্য। তার ওপরে কথা বলার সাহস কার আছে! হিন্দু পরিবারগুলো চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অবস্থায় নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ আসলামের কাজ করেছিল তলে তলে। সে পুরস্কার তারা পেয়েছে। এলাকার মায়া ত্যাগ করে ভারতে চলে যেতে হয়েছে নির্বাচনের বছর পেরোতে না পেরোতে।

এখানে কোন কারণে পুলিশ আসলে চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে আসতে হয়। তার কথা “আই এ্যাম লোকাল গভারমেন্ট।” সেই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কাজ না করার ফল কি তা মুখে কিছু না বললেও বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না।

ইতিমধ্যে অতি উৎসাহিত গ্রামবাসীরা জড়ো হয়েছে আমগাছের তলায়। তারা নিরাপদ দূরত্বে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গোপালদার দিকে তাকিয়ে রয়েছে তার শেষ পরিণতি দেখার জন্যে। কেউ কেউ হা হুতাশ করছে লোকটার শেষ পরিণতির কথা ভেবে। মালিনী গোপালদার থেকে প্রায় বিশ হাত দূরে লোকগুলের মধ্যে দাঁড়িয়ে অঝোর ধারায় কেঁদে চলেছে। তার দুই হাত ধরে রেখেছে স্থানীয় দুইজন যুবক।

আমি নির্বাক। মনে হয় কথা বলার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। হাতের ব্রাশটা মনের ভুলে কোথায় ফেলেছি ভাবতে চাচ্ছি না। হঠাৎ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানকার দুইপাশ থেকে লোক সরে ভেতরে যাবার রাস্তা তৈরী করে। সাত/আটজন লোক সাথে নিয়ে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমানউল্লার মুন্সী সেখান দিয়ে বৃত্তের ভেতরে প্রবেশ করে। চারিদিকে একনজর চোখ বুলিয়ে তার জন্যে রাখা চেয়ারে যেয়ে বসে। তার বসা দেখে সবাই নড়ে চড়ে দাঁড়ায়। সবাই অপেক্ষায় আছে চেয়ারম্যানের নির্দেশের। নিরবতা ভেঙে চেয়ারম্যান বলল, “আপনারা ইতিমধ্যে সবকিছু জেনে গেছেন। আমার চুরি যাওয়া গরুসহ গতকাল রাতে গোপালকে হাতে নাতে ধরেছি। আমি জানিনা সে এলাকার আর কার কত ক্ষতি করেছে। আপনারা আমাকে বারবার নির্বাচিত করেন আপনাদের ভাল মন্দ দেখার জন্যে। আমি চেষ্টা করি আপনাদের সে প্রাণের ইচ্ছা পূর্ণ করার। যে কারণে এ এলাকার সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সামান্য একজন গরু চোরের জন্য দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম আমরা নষ্ট হতে দিতে পারিনা। অন্য এলাকার লোকদের আমরা জানাতে চাই অপরাধী সে যে-ই হোক তাকে এই আমান চেয়ারম্যান ছাড় দেয় না। সে গোপালই হোক আর গোলামই হোক। আমি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই গরু চোরকে প্রথমে এক’শ ঘা বেতের বাড়ি দেওয়া হবে। তারপর খেঁজুরের কাটা দিয়ে দুই চোখ উৎপাটন করা হবে। আমি এখনও সেই সিদ্ধান্তে অনড় আছি। আপনারা কি এতে একমত?”

উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে যারা চেয়ারম্যানের খাস লোক তারা সমস্বরে চিল্লিয়ে ওঠে, “হ্যাঁ; অবশ্যই।”

“কামাল উদ্দিন যা, তুই আগে গোপালকে পঞ্চাশ ঘা বেতের বাড়ি দিয়ে আয়।” হাইকোর্টের বিচারকের মতো হুকুম দেয় চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমানউল্লার মুন্সী।

চেয়াম্যানের কথায় কামাল উদ্দিন আগে থেকে জোগাড় করে রাখা মোটা বেতের লাঠি দিয়ে বেঁধে রাখা গোপালদাকে মারতে শুরু করে। “ভগবান বাঁচাও- ভগবান বাঁচাও…..।” গোপালদার আত্মচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী থেকে ভারীতর হয়ে ওঠে। সাথে শুরু হয় তার মেয়ে মালিনীর কান্না। সে নিজেকে মুক্ত করে বাবার কাছে যেতে অনেক চেষ্টা করেও পারে না।

অনেকগুলো খেঁজুরের কাটা এনে চেয়ারম্যানের সামনে মাটিতে রাখা হয়েছে। এক’শ বেতের বাড়ি দেওয়া শেষ হলেই এই খেঁজুর কাটা দিয়ে তার চোখ তোলা করা হবে।

ভীড় ঠেলে ভেতরে যেয়ে পূর্ণিতা কাঁদতে কাঁদতে চেয়ারম্যানের পা জড়িয়ে ধরে তার স্বামীকে ছেড়ে দেবার জন্যে কাকুতি মিনতি করতে থাকে। তার চোখের জলে মন গলেনা চেয়ারম্যানে। সে ইশারা করলে দুইজন লোক পূর্ণিতাকে ধরে বাইরে নিয়ে যায়।

এক’শ বাড়ি দেওয়া শেষ হবার আগেই জ্ঞান হারায় গোপাল দা। সে আর কাঁদে না। তারপরও বাড়ি চলতেই থাকে সাতানব্বই- আটানব্বই- নিরানব্বই-একশ।

আমি কি দেখতে এসেছি, আর কি দেখছি। গল্প-উপন্যাস জীবনে কম পড়িনি। তাতে কিছু কিছু বিভৎস ঘটনার বর্ণনা দেওয়া আছে। তবে এমন ঘটনার মুখোমুখি হবো তা কোনদিন ভাবিনি। মাথা ঘুরতে থাকে আমার, সামনের সবকিছু ঝাপটসা হয়ে আসছে। নিজেকে কোন রকমে সামলে নিই। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে যে ঘটনা ঘটে গেল তা বোধকরি মৃত্যুর পরও মনে থাকবে।

চেয়ারম্যানসহ আরো তিনজন লোক এগিয়ে যায় গোপালদার কাছে। তারা গাছে বাঁধা গোপালদার বাধন খুলে দিলে সে ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। দুইজন শক্ত করে চেপে ধরে। তৃতীয়জন কয়েকটা খেঁজুরের কাটা ঢুকিয়ে দেয় গোপালদার দুই চোখের ভেতর।

বাবার এমন অবস্থা দেখে মালিনী চিৎকার দিয়ে নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে যুবকদের হাত থেকে মুক্ত করে। তারপর এক দৌঁড়ে যেয়ে মাটিতে পড়ে থাকা বাবাকে জড়িয়ে ধরে জ্ঞান হারায়। সেও তার বাবার পাশে পড়ে থাকে মাটিতে।

আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না; একটা অদৃশ্য অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করে। আর দেরি না করে আমি তখনই যশোরে ফিরে আসি। গোপালদার যে ক্ষতি হবার তা হয়ে গিয়েছিল; নতুন করে কিছু হবার নেই। যে কারণে পরে আর কিছু জানতে চেষ্টা করিনি। আমি সেদিন প্রতিবাদ করতে পারিনি। আমি জানি, সেখানে আমার কথার কোন মুল্য দেওয়া হতো না। হাজার হোক সংখ্যালঘু বলেতো একটা কথা আছে। আমিওতো তার বাইরে নই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *