728 x 90

বাংলাদেশঃ ভারতের নিরাপত্তা বলয় 

  ড. মোঃ নুরুল আমিন:  আন্তর্জাতিক সম্পর্কে দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক কখনোই বন্ধুত্বের হয়না। একটি দেশের সাথে আরেকটি দেশের সম্পর্ক হয় দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের ভিত্তিতে, যেখানে উভয় দেশই কোন না কোনভাবে উপকৃত হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ এর মধ্যকার সম্পর্ক যতই বন্ধু কিংবা স্বামী -স্ত্রী বলা হোক না কেন , আসলে এই সম্পর্ক কখনই বন্ধুত্বের হতে পারেনি ।

 

ড. মোঃ নুরুল আমিন:  আন্তর্জাতিক সম্পর্কে দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক কখনোই বন্ধুত্বের হয়না। একটি দেশের সাথে আরেকটি দেশের সম্পর্ক হয় দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের ভিত্তিতে, যেখানে উভয় দেশই কোন না কোনভাবে উপকৃত হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ এর মধ্যকার সম্পর্ক যতই বন্ধু কিংবা স্বামী -স্ত্রী বলা হোক না কেন , আসলে এই সম্পর্ক কখনই বন্ধুত্বের হতে পারেনি । সম্পর্ক হতে পারে দ্বি পাক্ষিক স্বার্থের ভিত্তিতে যেটা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অসম। প্রতিটি চুক্তিতেই ভারত সুবিধা নিয়েছে কিন্তু বাংলাদেশকে সুবিধা দেয়নি। ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতায় সহায়তা করার যে গল্প বলা হয় সেটাও ভারতের স্বার্থের মধ্যে ছিলো। এসব বিষয়ে আমার পুর্বের লেখা “ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না তে অনেক কিছুই লিখেছি। তারই ধারাবাহিকতায় আজ ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে তাদের যে নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করেছে সে বিষয়ে লিখার প্রচেষ্টা করবো। ভারত তাদের এই নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করা বা পাকিস্থানকে ভেঙ্গে ফেলে দুর্বল করে ভারতের নিরাপত্তা জোরদার করাই ছিলো ভারতের দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা। পাকিস্তানের বিমাতা সুলভ আচরণের প্রতিবাদে  বাংলাদেশের তৎকালীন সাড়ে ৭ কোটি মানুষ যদি স্বাধীনতা না চাইত,  তবে শুধুমাত্র সামরিক শক্তির জোরে ভারত পাকিস্তানকে ভাঙ্গতে পারতো না। অথচ বাংলাদেশ  যতবার করে ভারতীয় ভূমিকাকে স্মরণ করে, ভারত কিন্তু একবারও বাংলাদেশের জনগণের অবদান স্বীকার করেনা। বরং ভারত তাদের সিনেমাতেও ’৭১ সালের যুদ্ধকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ না বলে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করে। 

ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিকেন নেক হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন। ভারতের মুল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পুর্বাঞ্চলীয় ৭ টি রাজ্য যেমনঃ আসাম, মেজোরাম, ত্রিপুরা নাগাল্যান্ড, মুনিপুর ইত্যাদি যুক্ত হয়েছে একটি সরু স্থলভাগ দিয়ে। এই স্থলভাগ হচ্ছে শিলিগুড়ি করিডোর। শিলিগুড়ি করিডোরের অপর নাম চিকেন নেক। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগরতলা বা নাগাল্যান্ড, মিজোরাম অথবা আগরতলা থেকে কলকাতা যাতায়াত করতে হয় তাহলে তাদের একমাত্র পথ হলো শিলিগুড়ি করিডোর।  ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত পশ্চিমবঙ্গের এই করিডোরটি হচ্ছে ভারতের একটি লাইফ লাইন। শিলিগুড়ি করিডোরের পশ্চিমে নেপাল, পূর্বে ভুটান এবং উত্তরে সিকিম অবস্থিত। এই শিলিগুড়ি করিডোরের পাশেই রয়েছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর চুম্বিভ্যালী। চুম্বিভ্যালী পার হয়ে এই শিলিগুড়ি করিডোর দখল করলে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।  গণচীন ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে এই ঘটনাটি ঘটিয়েছিলো। চুম্বিভ্যালী পার হয়ে তারা চিকেন নেক দখল করে আসামের তেজপুর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলো। আজও  চীন চাইছে, এই করিডোরটি ভেঙে দিতে। ভারতও সদা সতর্ক এই করিডোর রক্ষায়। ভারত দ্বিগুণ নিরাপত্তা বাড়িয়েছে এই লক্ষ্যে। কৌশলগতভাবে ভারত এই অঞ্চলে বাগডোগরা ও হাসিমারায় দুটি বিমানঘাঁটি তৈরি করেছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, করিডোরের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেয়া। তাই বরাবরই, ভারত চিকেন নেকের আশেপাশে চীনের প্রভাব ভয়ের চোখে দেখে। সেজন্যই যখনই চীনের সহায়তায় বাংলাদেশ  তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগুতে যায় তখনই ভারত বাধা দেয়। কারণ ভারত চায়না যে চীন এই চিকেন নেকের কাছাকাছি থাকুক।  

এছাড়াও, ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময় ভারতের এই ৭ টি রাজ্যও আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে মুক্ত হতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। তাই ভবিষ্যতে এই ৭ টি রাজ্য স্বাধীনতা আন্দোলন করতে পারে- এই ভীতি ভারতের বরাবরই আছে। আর ৭ টি রাজ্যকে স্বাধীন করতে সেই চিকেন নেক অনেক গুরুত্বপুর্ন। কোনভাবে যদি চিকেন নেককে বিচ্ছিন্ন করা যায় তবে ভারত মুল ভূখণ্ড থেকে সামরিক সরঞ্জাম এই ৭ টি রাজ্যে পরিবহন ব্যহত হবে। এছাড়া আকাশ পথেও অন্য দেশের আকাশসীমা লঙগণ করে যুদ্ধবিমান নেয়া সম্ভব হবেনা। ভারত এরকম গুরুত্বপুর্ন একটি করিডরের একদিকে শক্তিশালী শত্রু চীন অন্যদিকে শক্তিশালী পাকিস্তান বা তার অংশ পুর্বপাকিস্তানকে রেখে নিরাপদে নিশ্বাস নিতে পারেনি। ভারতের তাই একটি পরিকল্পনা হলো নিজেদের চিকেন নেকের পাশের জঞ্জাল পরিষ্কার করা। সেই অর্থে পাকিস্তানকে ভেঙ্গে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করা। পরবর্তিতে বাংলাদেশকে ভারতের একটি স্যাটেলাইট রাষ্ট্রতে পরিণত করা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রানজিট নিয়ে ভারতের সেই সাতটি রাজ্যের সাথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা জোরদার করা। একইসাথে খনিজ সমৃদ্ধ ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে সহজে এক্সেস নেয়া।  এজন্য মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ দফা চুক্তিতে এরকমই গোলামির শর্ত দেয়া হয়েছিল (আগের লেখায় দ্রষ্টব্য)। চাউর আছে যে তাজ উদ্দিন আহমেদ সেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। তাছাড়া ১৯৬২ সালে চীন ও ভারত সীমান্তে যে যুদ্ধ হয়, ভারত চেয়েছিল পাকিস্থান যেন সেই যুদ্ধে ভারতকে সহায়তা করে। কিন্তু পাকিস্তান সেই যুদ্ধে ভারতকে সাহায্য করেনি।  তদুপরি ১৯৬৫  সালে পাক-ভারত সীমান্তে যে যুদ্ধ হয়েছিলো সেখানে পুর্ব পাকিস্তানের সেনাদের একটি বীরত্বপুর্ন ভূমিকা ছিলো। তাই পুর্ব পাকিস্তানের মতো এমন একটি শক্তিশালী বাহিনীকে চিকেন নেকের পাশে রাখা ভারতের জন্য একটি ঝুকিপুর্ন ছিলো। তদুপরি পুর্ব পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করে পাকিস্তানের সেনাশক্তিকে দুর্বল করা।  এসব নিরাপত্তা কৌশল বিবেচনায়  রেখেই ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে  আগ্রহী ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল “হাজার সাল কা বদলা লিয়া “ । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের  এই শক্তি প্রদর্শনের আরো একটি কারণ ছিলো যে  পুর্বাঞ্চলের ৭ টি রাজ্যকে একটি বার্তা দেয়া যে ভারতীয় সেনাবাহিনী অনেক সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী যাতে তারা স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বপ্ন দেখা থেকে দূরে থাকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও তথা ভারতের বীরত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও দেশটির  ৭ টি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার স্বাধীন হবার বিরাট বিপদ থেকে যায়। এই সাতটি রাজ্যের মধ্যে ত্রিপুরা ছাড়া অবশিষ্ট ছয়টি রাজ্য সশস্ত্র স্বাধীনতা তথা বিচ্ছিন্ন তৎপরতায় প্রচন্ড অশান্ত ছিল। এদের মধ্যে আসামের বিচ্ছিনতা বাদী সংগঠন “উলফা”র নাম উল্লেখযোগ্য। এসব সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভারতীয় বাহিনী যখন তাড়া করতো তখন বাংলাদেশসহ ভারতের আরো ছোট ছোট দু’একটি সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র তাদেরকে সেল্টার দিত। উলফার অন্যতম শীর্ষ নেতা অনুপ চেটিয়া বাংলাদেশে বন্দি ছিলো।  ভারত তাদের নিরাপত্তার কারণেই চায়যে বাংলাদেশ যাতে এসব আন্দোলনকারীদের আশ্রয় না দেয়। বেশ কয়েক বছর আগে, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক হয়ছিলো। অনেকই মনে করেন এই অস্ত্রের চালান আসামের যুদ্ধের জন্য আনা হচ্ছিল। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সেই অস্ত্র মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগের অনেককেই সাজা দেন। তাই ভারত চায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে এমনই  একটি তাবেদারি সরকার রাখা যাতে ভারতে এসব স্বার্থ উদ্ধার হয়। পাঠক অনেকই জানেন যে, নারায়ণগঞ্জে র‍্যাবকে ব্যবহার করে যে সাত খুন সংগঠিত হয় সেই মামলার অন্যতম আসামি নুর হোসেন ভারতে পালিয়ে গিয়ে গ্রেফতার হয় । ভারত বাংলাদেশের সাথে বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমের সেই নুর হোসেনকে বাংলাদেশে ফেরত দেয়। বিনিময়ে বাংলাদেশ উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতে ফেরত পাঠায়। একটু লক্ষ্য করুন! একজন স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতার বিনিময়ে বাংলাদেশ ফেরত নিলো একজন সাত খুনের আসামি! কী এক অসম বিনিময়য়! আওয়ামীলীগ সরকার ভারতকে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিরাট একটি অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন দমনে সহায়তা করে। এভাবে বাংলাদেশ ভারতের স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষায় একের পর এক যে অবদান রাখে সেটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কথায় ভারতের জীবনেও ভোলার কথা নয়।  

ভারতের জন্য যেমন সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চিকেন নেক গুরুত্বপুর্ন বাংলাদেশের জন্যও ফেনী নদী তেমনি গুরুত্বপুর্ন। বাংলাদেশের প্রধান শিল্প নগরী এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রাম এই ফেনী নদী দিয়েই বিচ্ছিন্ন। এই বৃহত্তর চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যান্য অংশের সাথে সংযুক্ত করেছে বর্তমানে ফেনী নদীর উপর নির্মিত কয়েকটি সেতু। কিন্তু ১৯৭১ সালে এই ফেনী নদীর উপর একমাত্র সেতু ছিলো শুভপুর সেতু।  ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন মহসড়কের ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর এলাকায় ফেনী নদীর উপর এ সেতুর অবস্থান।  ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই সেতুটির ভূমিকা ছিলো অনেক। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বাঙালি অফিসার ও সেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে অবাঙালি সেনা অফিসারদের বন্দী করে ফেললে বাঙালি সেনাদের হাতে চট্টগ্রাম নগর কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।  কিন্তু শঙ্কা থেকে যায় যে, কুমিল্লায় বা ঢাকায় থাকা পাকিস্তানি সেনারা সড়ক পথে চট্টগ্রামে গিয়ে আক্রমণ চালাতে পারে।  তাই শুভপুর সেতু ধ্বংস করার নিমিত্তে এবং পাকিস্তানী বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজের ফেনী প্রান্তে ১০ম পিয়ারে মাইন বিস্ফোরণের মাধ্যমে ব্রিজের স্লাব কিয়দাংশ ধ্বংসের মাধ্যমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে  পাকিস্তানি বাহিনী  ঢাকা কিংবা কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে দ্রুত প্রবেশ করতে পারেনি । মুক্তিযুদ্ধে শুভপুর সেতু এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো যে শুভপুর সেতুতে যদি পাকিস্তানি বাহিনী বাধা না পেত তবে তারা নিরাপদেই চট্টগ্রামের দখল নিয়ে ভয়াবহ গণহত্যা চালাত। ফলে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা সম্ভব হতো না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সামরিক কৌশলগত দিক এমন একটি গুরুত্বপুর্ন নদীকে ভারতের ব্যবহার উপযোগী করে দিয়েছে বাংলাদেশ। সেই সাথে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুবিধার্তে ফেনী নদীর উপর নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু। সেতুর একপ্রান্তে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরুম শহর, অন্যপ্রান্তে বাংলাদেশের রামগড় । এই সেতু চট্টগ্রাম বন্দরে সহজ অ্যাকসেসের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যপক উন্নতি করবে। কিন্তু বাণিজ্যের চেয়েও বাংলাদেশের নিরাপত্তার কতটুকু ঝুঁকি আছে সেটা আগের লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এই ফেনী অববাহিকার যে  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী (বিএসএমএসএন) নামের এই অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা হচ্ছে সেখানেও ভারতীয় কোম্পানিকে স্থান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে (সমকাল, ২ এপ্রিল ২০২২ঃবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী (বিএসএমএসএন) নামের এই অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা হচ্ছে সেখানেও ভারতীয় কোম্পানিকে স্থান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে) ।  আদানি গ্রুপ এখানে সংযোগ সড়ক, প্রশাসনিক ভবন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, টেলিকমিউনিকেশন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ইত্যাদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কার নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অবকাঠামো গড়ে হবে? বিষয়টি চিন্তার। একটু পুরোনো ইতিহাস ঘেঁটে দেখি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে বাণিজ্যিক কুঠি নির্মান করতে চেয়েছিল, ব্যবসা করতে এসেছিলো। কিন্তু পরে এই বাংলা বিহার উড়িষ্যা তথা ভারতবর্ষকে দখল করেছিল এই বাণিজ্যিক কুঠি নির্মানের অন্তরালে! এখানে ভারতীয় কোম্পানি যে সেই বাণিজ্যিক এলাকার অন্তরালে বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্ব নষ্ট করবেনা সেই নিশ্চিয়তা কে দিবে! 

শুধু কি তাই? এই সীতাকুণ্ড থেকে শুরু করে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের উপকূলে ২০টি রাডার সিস্টেম নেটওয়ার্ক স্থাপন করবে ভারত (যুগান্তর ৬ অক্টোবর ২০১৯ঃ বাংলাদেশের উপকূলে ২০টি রাডার বসাবে ভারত)। এই নেটওয়ার্কের নাম দেয়া হয়েছে ‘কোস্টাল সার্ভিলেন্স রাডার সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’। এই নেটওয়ার্ক হবে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ এবং ভারতের নৌবাহিনীর জন্য সহায়ক। এরফলে সমুদ্রপথে যে কোনো সন্ত্রাসী হামলা শনাক্ত করতে ভারতকে সাহায্য করবে। বিষয়টি স্পষ্টযে, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে যেকোনো বহিঃশত্রু যেন ভারতের সেভেন সিস্টারকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারে সেজন্য ভারতের জন্য এই রাডার সিস্টেম অনেক কাজে আসবে। অনেকে মনে করেন ভারত বিশেষকরে সমুদ্রপথে চীনের সামরিক গতিবিধি নজরে রাখার জন্য এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে (বিবিসি বাংলা ৯ অক্টোবর ২০১৯ঃ ভারতের রাডার: নজরদারির লক্ষ্য কি চীন নাকি উপকূলের নিরাপত্তা?)। কিন্তু এই রাডার  ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে ভারতীয় লোকবল। এটা মনিটরিং করা হবে ভারত থেকে। যদি কোন কারিগরি ত্রুটি দেখা যায় তবে ভারতের টেকশিয়ানরাই সরাসরি এসে মেরামত করবে। অর্থাৎ এতসব গোপন নজরদারির মাধ্যমে ভারতের অবশ্যই লাভ হবে কিন্তু বাংলাদেশের লাভ কোথায়! বাংলাদেশ হয়তো জানতেও পারবেনা কি নজরদারি করা হচ্ছে! উল্লেখ্য যে,  রাডার তৈরি এবং স্থাপন করবে ভারতের অখ্যাত একটি কোম্পানিটি, যার নাম “বাহারাত ইলেকট্রনিকস লিমিটেড” যেটি  ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা “র”-এর দ্বারা পরিচালিত বলে জানা গেছে (আমার দেশ ১৪ আগস্ট ২০২২ঃ চুক্তি করে জাতীয় নিরাপত্তা ভারতের কাছে সমর্পণ করেছেন শেখ হাসিনা)। যদিও এই চুক্তিটি গোপনীয় রাখা হয়েছে, তবু আমার দেশ পত্রিকার কাছে এর কপি এসেছে। পাঠক চাইলে এই চুক্তির শর্তগুলো এই লিঙ্ক থেকে দেখতে পারেন <https://amardesh.co.uk/news/details/817> । 

কিন্তু বাংলাদেশের লাভ কোথায়? বাংলাদেশের কি উপকারে আসবে ভারতীয় রাডার? বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর ভারত কিসের নিরাপত্তা কেন্দ্র বসাবেন? বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়ে হুমকি দেখা দিলে তার মোকাবেলা কিভাবে করবে বাংলাদেশ? ভারত কি তখন সহায়তা করবে? পশ্চিমে পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান আর পূর্বে চীন থেকে নিজেদের রক্ষায় এবং ভারত মহাসাগরে চীনের আধিপত্য থেকে বাঁচার জন্য ভারত ২০ টি রাডার বসাবে বাংলাদেশের জলসীমায়। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশ কি তার নিজেদের টেরিটরিতে অন্য একটি দেশকে অবকাঠামো নির্মান করে গোয়েন্দাগিরি এবং নিরাপত্তা নজরদারি করার সুযোগ দেয়? কিন্তু তথাকথিত ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ বা ‘স্বামী-স্ত্রী’ বলেই ভারতকে এই সুযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার! যে ভারত তাদের চিকেন নেকের ভয়ে চীনকে বাংলাদেশের তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প করতে দেয়না অথচ সেই ভারতকে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষন কেন্দ্র বসানোর সুযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ । তাও আবার উদ্দেশ্য হলো চীনকে প্রতিরোধ! এমনকি সামরিক কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন একটি জায়গায়। 

একদিকে বাংলাদেশ চীনের সাথে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সহায়তা নিচ্ছে একের পর এক চীনের ঋণ। অন্যদিকে সেই চীনকে দমনের জন্য ভারতকে সুবিধা করে দিচ্ছে। দিচ্ছে দেশের সম্পদ, ট্রানজিট, রেলওয়ে, বন্দর, পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং জলসীমা সবকিছুই তুলে দিচ্ছে ভারতের হাতে। পুরো বাংলাদেশকে বানিয়ে দেয়া হচ্ছে ভারতের নিরাপত্তা বলয়। কিন্তু চীন কি সেটা মেনে নিবে? তাহলে ভারতের বলয় থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ কি পারবে চীনের বলয়ে যেতে? সেক্ষেত্রে ভারত বা আমেরিকা কি সেটা মেনে নিবে? কারণ আমেরিকাও চায় চীনকে প্রতিরোধ করতে। ভারত-চীনের এই দ্বন্দে আওয়ামীলীগ সরকার বাংলাদেশকে একটি ভুরাজনৈতিক জালে আবদ্ধ করে রেখে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে আমেরিকা, পাকিস্তান, চীন, ভারত একটি কূটনৈতিক যুদ্ধে জড়িয়েছিল। অবশেষে সেটা গড়িয়েছিল একটি স্বাধীনতা সংগ্রামে। ভু-রাজনীতির এই খেলায় বাংলাদেশ সরকার যে দুই নৌকায় পা রেখেছে তার জন্য দেশের নিরাপত্তা কোথায় দন্ডায়মান দেশপ্রেমিক জনগণের ভাবা উচিৎ। ভুরাজনীতির এই কূটনৈতিক যুদ্ধে আবারো যদি কোন যুদ্ধের অবতারণা হয় সেই খেসারত দিতে হবে এই ১৭ কোটি জনগণকেই। পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ কিন্তু ভারত থেকে স্বাধীন হবে কবে? আর ১৭ কোটি জনগণ সত্যিকারের স্বাধীনতা ভোগ করতে হলে ভারত থেকেও স্বাধীন হতে হবে। 

Read More

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ পোস্ট

Advertising