728 x 90

ক্রসফায়ারের বিপরীতে গুপ্তহত্যাকেই কি বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ?

আহমেদ আফগানী : বাংলাদেশে রাজনীতির কারণে খুন করে ফেলা এখন ডাল-ভাতে পরিণত হয়েছে। ২০০৯ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় এসে আওয়ামী সরকার তাদের ঐতিহ্য অনুসারে গুম খুন শুরু করে। শেখ হাসিনার এই আমলে গুম হওয়া মানুষের সংখ্যা ৬১৪। ক্রসফায়ারে খুন হওয়া মানুষের সংখ্যা ৩৮৭৩। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই সেনাবাহিনীর

আহমেদ আফগানী : বাংলাদেশে রাজনীতির কারণে খুন করে ফেলা এখন ডাল-ভাতে পরিণত হয়েছে। ২০০৯ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় এসে আওয়ামী সরকার তাদের ঐতিহ্য অনুসারে গুম খুন শুরু করে। শেখ হাসিনার এই আমলে গুম হওয়া মানুষের সংখ্যা ৬১৪। ক্রসফায়ারে খুন হওয়া মানুষের সংখ্যা ৩৮৭৩।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাওকে ক্রসফায়ারে হত্যা করে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস। এই ঘটনায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ মুখোমুখি হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে ওসি প্রদীপ গ্রেপ্তার হয় ও সে বিচারের মুখোমুখি হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ক্রসফায়ারের হার অনেক কমে যায়। কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয় নি।

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর পুলিশ ও র‌্যাবের সাত শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ হয়। এর প্রেক্ষিতে ক্রসফায়ার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে হাসিনার গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা বাড়তে থাকে। এর কারণে শেখ হাসিনা আগের মতো ক্রসফায়ার ও গুম খুন চালাতে পারছে না।

মার্কিন ভিসানীতির সুযোগ নিয়ে ২০২৩ সালের ১০ জুন প্রকাশ্যে সমাবেশ করে জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা। এর মাধ্যমে মূলধারার রাজনীতিতে আবারো প্রভাব তৈরি করে জামায়াত। এর ধারাবাহিকতায় জামায়াত আলোচনায় আসে। কিন্তু তারপরও কয়েকমাস সভা-সমাবেশ করার বৈধ অধিকার হাসিল করতে পারেনি জামায়াত। সব শেষে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি না পেয়ে লাখো জনতাকে হাজির করে জামায়াত অনেকটা জোর করে আরামবাগে বিশাল সমাবেশ করে।

আর এতেই ক্ষিপ্ত হয় শেখ হাসিনা সরকার। কিন্তু ভিসানীতির কারণে তার হাত বাঁধা পড়ে আছে। আগের মতো যাচ্ছেতাইভাবে ক্রসফায়ার দেওয়া যাচ্ছে না। গত ১৫ বছরে জামায়াতের ২৪৬ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামীলীগ। এর মধ্যে ক্রসফায়ারের নামে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে ৮৬ জনকে। গুম করেছে জামায়াতের ২৫ জনকে। এর মধ্যে ৫ জন এখনো নিখোঁজ। বাকীদের মধ্যে কয়েকজনকে ফেরত পাওয়া গেছে, অন্যদের লাশ সনাক্ত করা গেছে।

জামায়াত নেতা-কর্মীদের রিমান্ডের নামে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে। জামায়াত নেতাকর্মীদের রিমান্ডের দিন যোগ করলে তা হয় ৯৬৩৬৭ দিন। বছরের হিসেবে তা ২৬৮ বছর! পুলিশের নির্যাতনে পঙ্গু হয়েছেন জামায়াতের ৫২০৪ জন নেতাকর্মী। আওয়ামী লীগ ও পুলিশের আক্রমণে মারাত্মক আহত হয়েছেন (যাদের হাসপাতালে থাকতে হয়েছে) ৭৫১৮৯ জন।

জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ১১০৪৭২ জন নেতা কর্মী। এর মধ্যে নারী রয়েছেন ১৭৬৩ জন। জামায়াতের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে ও জামায়াতের প্রথম সারির প্রায় ১১ নেতাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ চেয়েছিলো দলটিকে বিলুপ্ত করে দিতে। কিন্তু জামায়াত ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশে জানান দিয়েছে তারা হারিয়ে যায় নি বরং আরো সংগঠিত হয়েছে।

পশ্চিমা চাপে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে পুলিশ দিয়ে গুম খুন করতে না পেরে এখন শেখ হাসিনা গুপ্তহত্যার আশ্রয় নিয়েছে। যাতে এই হত্যার দায় সরকারের ওপর না পড়ে। জামায়াত বাংলাদেশের তৃণমূলে শক্তিশালী হওয়ায় তারা রাজধানীর বাইরে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যা শুরু করেছে।

অন্যদিকে সরকারের প্রধান বিরোধী শক্তি বিএনপিও চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দিয়ে টানা অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় বিরোধী শিবিরে ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য আওয়ামী সরকার এক ঘৃণ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা বিরোধীদের গুপ্তহত্যা করছে। এই গুপ্তহত্যার মূল টার্গেট জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা।

২৮ অক্টোবরের পর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত এই ১২ দিনে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণের শিকার হয়েছেন ১২ জন জামায়াত নেতা কর্মী, ১ জন বিএনপি কর্মী। এর মধ্যে ৮ জন মারাত্মক আহত হলেও কোনোরকম প্রাণে বেঁচে যান। ৫ জন মৃত্যুবরণ করেন। ২৯ অক্টোবর রাজশাহীতে এরশাদ আলী দুলাল ও গোলাম কাজেম আলী খুন হন অজ্ঞাত আততায়ী দ্বারা। এরশাদ আলী দুলাল পল্লী চিকিৎসক। গোলাম কাজেম আলী রাজশাহী মেডিকেলের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। দুইজনেই জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।

এই প্রবন্ধটি যখন লিখছিলাম সে দিনই অর্থাৎ ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার ১১ নং ছাতার দিঘি ইউনিয়ন সেক্রেটারি হাফেজ আব্দুর রাজ্জাককে (৬০) জুম্মার নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার পথে কালিগঞ্জ কলেজের পাশে একটি সাদা মাইক্রোবাসে ৭/৮ জন সন্ত্রাসী উঠিয়ে নিয়ে নন্দীগ্রামের রাস্তায় ভাগবাতন- কল্যাপাড়া রাস্তার পাশে ফেলে নির্মমভাবে পিটিয়ে দুই পা ভেঙ্গে দিয়ে সন্ত্রাসীরা গাড়িতে করে চলে যায়।

৩০ অক্টোবর জামায়াত কর্মী ও শ্রমিক মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় ভোলার অটোচালক শফিকুল ইসলামকেও একই কায়দায় ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। ৩ নভেম্বর নাটোরের যুবদল কর্মী মাসুদ রানাকে সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

৫ নভেম্বর রাত নয়টার দিকে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তিনি জামায়াতের মনোনীত ও নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। জনপ্রিয় এই জামায়াত নেতাকে বটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

হটস্পট নাটোর ও রাজশাহী

নাটোরের নলডাঙ্গায় আরো চারটি অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের আক্রমণের ঘটনা ঘটে। প্রত্যেকটি ঘটনায় ভিকটিম ছিল জামায়াত নেতা। নাটোরে মোট পাঁচজন জামায়াত নেতা ও ১ জন বিএনপি নেতার ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালানো হয়। এর মধ্যে বিএনপি নেতা মাসুদ রানা ইন্তেকাল করেন। মারাত্মকভাবে আহত জামায়াতের ৫ নেতা হলেন, ফজলুর রহমান (নাটোর নলডাঙ্গা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি), আলাউদ্দিন (নলডাঙ্গা নরশৎপুর ওয়ার্ড জামায়াত নেতা), নুরশাদ আলী (নলডাঙ্গার ভট্টপাড়া মসজিদের ইমাম ও জামায়াত কর্মী), মোশাররফ হোসেন (নাটোর নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির) ও হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক (সিংড়া উপজেলার ১১ নং ছাতার দিঘি ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি)

গুপ্তহত্যার সূচনা হয় রাজশাহী থেকে। এরশাদ আলী দুলাল ও গোলাম কাজেম আলীকে খুন করার পর সেখানে আরো দুইজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয় একই স্টাইলে। তাদের একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অন্যজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক মোঃ রাজু আহমেদ।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

ঘটনার শুরু গত ২৯ অক্টোবর। ওইদিন সন্ধ্যার পর পবা উপজেলার কিস্টোগ্রাম বাজারের নিজ চেম্বার থেকে ‘ফিল্মি স্টাইলে’ একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে আনা হয় পল্লিচিকিৎসক এরশাদ আলী দুলালকে। তিনি জামায়াতের কর্মী। রাজশাহীর সিটিহাট এলাকায় নিয়ে তাঁর দুই ঊরুতে ছয়টি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও তদন্ত দল বলছে, সুদক্ষ পেশাদার সন্ত্রাসীর হাতেই দুলাল খুন হন। তাঁকে তুলে নেওয়ার সময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে গেলে গুলি ও ককটেল ছুড়তে ছুড়তে মাইক্রোবাসটি সটকে পড়ে।

ওই ঘটনার তিন ঘণ্টা পর রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজশাহী শহরের বর্ণালীর মোড়ে চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. গোলাম কাজেম আলী আহমদকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডেও ব্যবহার হয় সাদা মাইক্রোবাস। ডা. কাজেম রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শাখা শিবিরের সাবেক সভাপতি।

পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মাইক্রোবাসটির কোনো নম্বর প্লেট ছিল না। এ কারণে সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিওতে রাজশাহী-ঢাকার পথে চলে যেতে দেখলেও তারা চিহ্নিত করতে পারেননি। ৩ নভেম্বর একইভাবে লালপুরের বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদল নেতা মাসুদ রানাকে সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় একটি দল। তারা নির্জন স্থানে নিয়ে মাসুদকে রড দিয়ে পিটিয়ে ডান হাত ও ডান পা ভেঙে দেয়। চাকু দিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত করার পর মৃত ভেবে একটি গর্তে ফেলে চলে যায়।

বেশিরভাগ ঘটনায় সাদা নম্বরহীন মাইক্রোবাসের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। প্রত্যেকটি ঘটনায় কুপিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনায় ভিকটিম বিরোধী রাজনীতির সাথে যুক্ত, বিশেষত জামায়াতের সাথে যুক্ত। নিশ্চিতভাবে বলা যায় কোনো ঘটনায় বিচ্ছিন্ন নয়। এটা পরিষ্কার যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য চলমান আন্দোলনকে ভীত সন্ত্রস্ত করতে হাসিনা সরকার তার সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি গণপ্রেপ্তার ও রিমান্ডের নামে নির্যাতন তো চলছেই।

Read More

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

সর্বশেষ পোস্ট

Advertising