শরীফ ওসমান হাদি কেন বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে জড়িত?

মোহাম্মদ আলম ফরিদ: একটা আধুনিক রাষ্ট্র টিকে থাকে কয়েকটি মৌলিক স্তম্ভের উপর—আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মিডিয়া। এই স্তম্ভগুলোর পারস্পরিক ভারসাম্যই একটি রাষ্ট্রকে “রাষ্ট্র” করে তোলে। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে টানা শাসন করা এবং বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোটবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে পরিকল্পিতভাবে এই সব স্তম্ভ একে একে ভেঙে ফেলা হয়।

আইন বিভাগ আর জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেনি; বরং ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে সেটিকে একদলীয় আনুগত্যের যন্ত্রে পরিণত করা হয়। বিচার বিভাগ স্বাধীনতার বদলে ক্ষমতাসীনদের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়—বিশেষ করে ২০১৪–২০২৪ সময়কালে রাজনৈতিক মামলা, গুম, ক্রসফায়ার ও দমননীতিকে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে। প্রশাসন ও আমলাতন্ত্র জনগণের সেবা ছেড়ে একটি পরিবার ও গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার বাহিনীতে রূপ নেয়। প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কাঠামো—বিশেষ করে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই—রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বদলে দলীয় ও বিদেশি এজেন্ডার অংশ হয়ে পড়ে। আর মিডিয়া—যাদের কাজ ছিল সত্য বলা—তারা ২০১৪ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হয় ফ্যাসিবাদের প্রচার মেশিনে।

ফলে বাংলাদেশে আর কোনো প্রতিষ্ঠান তার নিজস্বতা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারেনি। ২০১৮ সালের পর রাষ্ট্র কার্যত পরিচালিত হতো একজনের ইচ্ছা, খেয়াল ও প্রতিহিংসা থেকে। বলা যায়, নির্বাচনের নামে প্রহসনের আড়ালে বাংলাদেশে একটি ফ্যাসিস্ট রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছিল। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভারত তার নগ্ন ও বিকৃত আধিপত্যবাদী মানসিকতা থেকে বাংলাদেশকে কার্যত নিজের পায়ের নিচে রাখতে সক্ষম হয়—রাজনীতি, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি স্তরে। ২০১০-এর দশকের শেষ ভাগে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে “ম্যানেজড স্টেট”-এ পরিণত হয়।

এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণআন্দোলন সংঘটিত হয়। ছাত্র, তরুণ, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ জনগণের এই আন্দোলন দ্রুতই একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এর ফলশ্রুতিতে ২০২৪ সালের আগস্টে ফ্যাসিস্ট শক্তির দুটি কাঠামোর একটির পতন ঘটে—সরকারের দৃশ্যমান কাঠামো। রাতারাতি ক্ষমতার চেহারা বদলায়, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।

কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত ক্ষমতার একটি প্রশাসনিক হস্তান্তর; পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত বিপ্লব নয়।

কারণ ফ্যাসিবাদের আসল শক্তি নিহিত ছিল তার অন্তকাঠামোতে। সচিবালয়ের আমলারা—যারা বছরের পর বছর (বিশেষ করে ২০১৪–২০২৪) ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে—তারা প্রায় সবাই বহাল তবিয়তে থেকে যায়। বেসামরিক প্রশাসনের চরিত্র বদলায়নি। সেনাবাহিনী ও সামরিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে ডিজিএফআই—যা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে—সেখানেও দৃশ্যমান কোনো সংস্কার দেখা যায়নি। পুলিশ বাহিনী রয়ে যায় সেই পুরনো ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশ। বিচার বিভাগ এখনও মূলত আওয়ামী আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত কাঠামোর মধ্যেই বন্দী। সেনাবাহিনীর প্রধান প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে এখনো বিগত হাসিনা সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে। আর মিডিয়া—প্রায় সব বড় প্রতিষ্ঠান—২০২৪ সালের পরও ফ্যাসিস্ট বয়ানকে নরম করে, ঘুরিয়ে, আড়াল করে উপস্থাপন করছে।

তাহলে প্রশ্ন উঠে—এই বিপ্লবের পর আমরা আসলে কী পেলাম? মুখ বদল, নাকি ব্যবস্থার পরিবর্তন?

এই জায়গাতেই শরীফ ওসমান হাদির শাহাদাত বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে এসে পড়ে।

শুক্রবার দুপুরে (হত্যাকাণ্ডের দিন ১২ ডিসেম্বর ২০২৫), নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতা হাদিকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক থেকে গুলি করে তার মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতার ফলও নয়। এটি ছিল একটি ঠান্ডা মাথার, পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। প্রশ্ন হলো—এই হত্যামিশনে খুনিদের কে বা কারা সহায়তা করেছে? ঘটনার এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও রাষ্ট্র এখনো সেই প্রশ্নের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারেনি।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই একটি নির্দিষ্ট মহল আগাম আমাদের “জানিয়ে” দিতে থাকে—খুনিরা কীভাবে গুলি করে ভারতে পালিয়ে গেছে। অথচ সেই সময় দেশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবির পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলেনি। আজ ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়—খুনি নাকি দেশের ভেতরেই আছে। আবার বলা হয়, “খুনিরা ভারতে পালিয়েছে”—এই বয়ান নাকি একটি ফাঁদ, যা প্রকৃত খুনিদের পালানোর সুযোগ করে দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয়েছিল।

এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যই প্রমাণ করে—২০২৪ সালের পরেও রাষ্ট্রের তদন্ত ব্যবস্থা কতটা দুর্বল, বিভক্ত ও প্রভাবাধীন।

হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ মৃত্যুবরণ করেন। তার জানাজার নামাজে আমার অনুমানে ১৮ থেকে ২৫ লাখ মানুষের সমাগম হয়। এই বিশাল জনসমুদ্র কেবল শোক নয়—এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক ঘোষণাপত্র। এটি প্রমাণ করে, শহীদ হাদির রেখে যাওয়া বয়ান—

“জান দেবো, তবু জুলাই দেবো না”—আজ জনমানুষের অন্তরের ভাষা।

এই প্রেক্ষাপটেই কয়েকটি প্রশ্ন রেখে লেখা শেষ করতে চাই—

একঃ ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের একজন সক্রিয় যোদ্ধাকে খুনিরা কেন টার্গেট করল? সে কাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল?

দুইঃ ভারতীয় নম্বর থেকে বারবার হত্যার হুমকি পাওয়া সত্ত্বেও দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে কেন কোনো কার্যকর তথ্য ছিল না—নাকি তথ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ রাখা হয়েছিল?

তিনঃ কাদের সহযোগিতায় খুনিরা পালানোর সুযোগ পেয়েছে? এবং কে এই খুনিকে শত কোটি টাকা দিয়েছে (ব্যাংক লেনদেনের তথ্য – ডিবি)?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *