​গণতন্ত্রের নতুন ট্রোজান হর্স’: সোশ্যাল মিডিয়া ও পপুলিজম

শিমুল চৌধুরী: গ্রিক পুরাণের সেই ট্রোজান হর্সের গল্পটা আমাদের সবারই জানা। ট্রয় নগরীর দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করতে গ্রিকরা এক অভিনব চাল চেলেছিল। বাইরে থেকে একটা বিশাল কাঠের ঘোড়া উপহার হিসেবে রেখে তারা চলে যাওয়ার ভান করে। ট্রয়বাসী ভাবল , এ তো বিজয়ের স্মারক! পরম আনন্দে তারা সেই ঘোড়া টেনে নিয়ে এলো নগরের ভেতর। কিন্তু গভীর রাতে, যখন পুরো নগরী ঘুমে মগ্ন, তখন সেই কাঠের ঘোড়ার পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো গ্রিক সেনারা। ভেতর থেকেই ধ্বংস হয়ে গেল ট্রয়।
​আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে এক অদ্ভুত সমান্তরাল রেখা দেখা যায়। আমাদের আজকের ট্রয় নগরী হলো ‘গণতন্ত্র’, আর তার ভেতরে পরম সমাদরে টেনে আনা আধুনিক ‘ট্রোজান হর্স’ হলো, সোশ্যাল মিডিয়া। আর এই ঘোড়ার পেটে চড়ে রাজত্ব করতে এসেছে একবিংশ শতাব্দীর নতুন পপুলিজম বা জনমোহিনী রাজনীতি।
​আমরা ভেবেছিলাম ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের হাতে ক্ষমতা দিবে, গণতন্ত্রকে আরও উন্মুক্ত করবে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ স্বৈরশাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা আজ সম্পূর্ণ উল্টো। যে প্রযুক্তিকে ভাবা হয়েছিল মুক্তির হাতিয়ার, তা আজ ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষের মগজ ধোলাই আর মেরুকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে।
​প্রথাগত রাজনীতিতে একজন নেতাকে মানুষের কাছে যেতে হতো, বড় বড় জনসভায় দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন বোঝাতে হতো। সেখানে যুক্তির পিঠে যুক্তি থাকত, থাকত নীতিমালার চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু টিকটক, ফেসবুক রিলস কিংবা এক্স (টুইটার) – এর এই যুগে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব বা Attention Span নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একজন গড় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মনোযোগের স্থায়িত্ব এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
​এই সুযোগটাই নিচ্ছেন আধুনিক পপুলিস্ট বা জনমোহিনী নেতারা। জটিল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকট, যেমন মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, কিংবা ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, এসবের সমাধান কখনো এক লাইনে হয় না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম গভীর বিশ্লেষণ পছন্দ করে না; সে পছন্দ করে উত্তেজনা, ক্ষোভ আর চাঞ্চল্য।
​ফলে, জটিল সব সংকটের সমাধান এখন নেমে এসেছে স্রেফ কিছু চটকদার ‘ওয়ান-লাইনার’ বা সস্তা স্লোগানে। “আমরা বর্ডার সিল করে দেব”, “সব চোরদের জেলে ভরব”, কিংবা “জাতিকে আবার গ্রেট বানাব” এই ধরনের অতি-সরলীকৃত ও চটকদার বয়ান সেকেন্ডের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের স্ক্রিনে ছড়িয়ে পড়ছে। পপুলিস্ট নেতারা খুব ভালো করেই জানেন, একটা ১৫ সেকেন্ডের রিল বা ৬০ শব্দের টুইট দিয়ে যতটা সহজে মানুষের আদিম ক্ষোভ ও আবেগকে উস্কে দেওয়া যায়, তিন ঘণ্টার কোনো অর্থনৈতিক বাজেট বা পলিসি নিয়ে আলোচনা করে তা সম্ভব নয়।
​এখানেই জন্ম নিচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ‘সত্য’ বা ‘যুক্তি’র চেয়ে ‘ভাইরাল’ হওয়াটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
​সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইলিং ও ডেটা ড্রিভেন পপুলিজম মানে ​আধুনিক পপুলিজম এখন আর স্রেফ মাঠের বক্তৃতার ওপর নির্ভর করে না; এটি এখন চরমভাবে প্রযুক্তি-নির্ভর এবং ডেটা-চালিত বা Data-driven। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার মতো ডেটা কেলেঙ্কারি বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছিল কীভাবে কোটি কোটি মানুষের ফেসবুক ডেটা চুরি করে তাদের মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল বা Psychological Profiling তৈরি করা হয়েছিল।
​আজকের দিনে পপুলিস্ট দলগুলো মেটা বা গুগলের অ্যাড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ভোটারদের টার্গেট বা Micro-targeting করে। একজন ভোটার চাকরি নিয়ে চিন্তিত, নাকি অভিবাসন নিয়ে ভীত , তা তার ব্রাউজিং হিস্ট্রি এবং লাইক-কমেন্ট দেখেই নিখুঁতভাবে অ্যালগরিদম নির্ধারণ করে ফেলে। এরপর সেই ভোটারের স্ক্রিনে ঠিক সেই ভয় বা ক্ষোভকে উস্কে দেওয়ার মতো কনটেন্ট বা ফেক নিউজ পুশ করা হয়। এটি গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণার ওপর এক বড় আঘাত। কারণ এখানে ভোটাররা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না, বরং তাদের সাবকনশাস মাইন্ড বা অবচেতন মনকে কৃত্রিমভাবে চালিত করা হচ্ছে।
​সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর ‘ইকো চেম্বার’ (Echo Chamber) বা প্রতিধ্বনির ঘর এবং ‘ফিল্টার বাবল’ (Filter Bubble)। ফেসবুক বা টিকটকের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা ব্যবহারকারীকে কেবল তা-ই দেখায় যা সে পছন্দ করে। আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের দিকে সামান্য ঝুঁকে থাকেন, অ্যালগরিদম আপনাকে অনবরত সেই মতেরই চরমপন্থী কনটেন্টগুলো দেখাতে থাকবে।
​এর ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে , সমাজে তীব্রভাবে পোলারাইজড বা মেরুকরণ হয়ে যাচ্ছে। মাঝখানের ধূসর এলাকার বা মধ্যপন্থী আলোচনার কোনো অস্তিত্ব থাকছে না; রাজনীতি রূপ নিচ্ছে স্রেফ ‘আমরা বনাম ওরা’র দ্বন্দ্বে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে, আধুনিক রাজনীতি এখন ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয়ের রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে, যেখানে মানুষ দলীয় নীতি নয়, বরং নিজের গোষ্ঠীগত পরিচয় দিয়ে চালিত হয়।
​আগে রাজনৈতিক বিরোধীরা একে অপরের নীতির সমালোচনা করতেন, কিন্তু আজ সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রল আর্মি, ডিপফেক (Deepfake) প্রযুক্তি এবং বট (Bot) নেটওয়ার্কের কল্যাণে ভিন্নমতাবলম্বীদের স্রেফ ‘ডিহিউম্যানাইজ’ বা অমানুষ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। এর ফলে রাজপথের ভোটের মাঠের চেয়েও ভার্চুয়াল স্ক্রিনের যুদ্ধটা অনেক বেশি নোংরা, কৃত্রিম এবং সহিংস হয়ে উঠছে।
​এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর প্রথাগত রাজনৈতিক দল ও কাঠামোগুলোকে এক অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিয়েছে। আগে তৃণমূল থেকে ধাপে ধাপে, আদর্শিক লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে উঠে এসে একজন নেতা তৈরি হতেন। এখন রাজনীতি অনেকটাই ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন’ বা ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। একজন নেতা কতটা দক্ষ প্রশাসক, তার চেয়ে বড় বিচার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তার সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে ফলোয়ার কত বা তার কেরিয়ারে কতগুলো ‘ভাইরাল মোমেন্ট’ আছে।
​ডিজিটাল পপুলিজমের এই যুগে ‘পোস্ট-ট্রুথ’ (Post-truth) বা সত্য-পরবর্তী রাজনীতির জয়জয়কার, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের চেয়ে আবেগ এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাস জনমত গঠনে বেশি ভূমিকা রাখে। যে নেতারা শান্ত, সংযত এবং গঠনমূলক নীতি নির্ধারণের রাজনীতি করতে চান, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমের যুগে তারা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। কারণ অ্যালগরিদম কেবল তাদেরই অর্গানিক রিচ বা প্রমোট করে, যারা তীব্র বিতর্ক, ঘৃণা, কন্সপিরেসি থিওরি (ষড়যন্ত্র তত্ত্ব) বা উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়াতে পারে। ফলে, সুস্থ ধারার প্রাজ্ঞ রাজনীতিকে হটিয়ে দিয়ে মঞ্চ দখল করছে চড়া গলার উগ্র পারফর্মাররা।
​গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সহনশীলতা, যৌক্তিক বিতর্ক এবং তথ্যের সত্যতা। কিন্তু পপুলিজম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার এই অশুভ আঁতাত সেই ভিত্তিটাকেই ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। নাগরিক হিসেবে আমরা ভাবছি আমরা বিনামূল্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছি। কিন্তু আসলে আমরা আমাদের মনোযোগ, আমাদের আবেগ এবং দিনশেষে আমাদের গণতান্ত্রিক সার্বভৌমত্বটাই তুলে দিচ্ছি এই গ্লোবাল টেক জায়ান্ট ও পপুলিস্ট শাসকদের হাতে।
​সোশ্যাল মিডিয়া নামের এই ট্রোজান হর্সকে যদি আমরা এখনই চিনতে না পারি, যদি সস্তা ওয়ান-লাইনারের পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীর এজেন্ডা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রোপাগান্ডাগুলো ধরতে না পারি, তবে ট্রয় নগরীর মতোই ধসে পড়বে আমাদের বহু কষ্টে অর্জিত বহুত্ববাদী সমাজ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। তথ্য পাওয়ার অধিকার যেন তথ্য দ্বারা অন্ধ ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাওয়ার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় – একুশ শতকের এই মধ্যভাগে এসে এটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি :
শিমুল চৌধুরী একজন বাংলাদেশি লেখক ও নির্মাতা। প্রধানত কথাসাহিত্য নিয়ে কাজ করলেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাময়িকীতে নিয়মিত কলাম লিখছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত প্রাগৈতিহাসিক রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পরম্পরা’। এ ছাড়া তাঁর রচিত ও পরিচালিত বেশ কিছু নাটক এবং তথ্যচিত্র সাম্প্রতিক সময়ে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *