আসিফ খন্দকার: ৬১০ খ্রিস্টাব্দ।মক্কার অবস্থা তখন মানবেতর। হিংস্র প্রাণী থেকে মানুষ কে আলাদা করে যে মনুষ্যত্ব তা বিলুপ্তপ্রায়। এই সময়ে একজন কিশোর ছিলেন যিনি ছিলেন সবার থেকে ভিন্ন।তিনি আশেপাশের এত অবিচার, বৈষম্য দেখে বিচলিত থাকতেন। বয়স যখন চল্লিশ, তখন তিনি এই বিচলিত মন কে শান্ত করতে সত্যের সন্ধানে হেরা পর্বতের এক গুহায় ধ্যানমগ্ন হলেন। আশাকরি সবাই বুঝতে পারছেন কার কথা বলছি।জ্বি,বলছি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর কথা। বিশ্বের সেরা একশো মানুষের তালিকা (মাইকেল এইচ হার্ট এর তৈরি) তে উনি প্রথমেই রয়েছেন। ইসলামের অনুসারী রা জানেন এবং মানেন তিনিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। মুল লেখায় ফিরি।হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নবিজী প্রথম যে গায়েবি শব্দটির মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেটি ছিল—‘ইকরা’ (পড়ো)। রসুলের কাছে আসা প্রথম ঐশী নির্দেশটি কোনো যুদ্ধের ছিল না, ছিল জ্ঞানের।কুরআনের প্রথম যে আয়াত টি নাজিল হয়েছিল তা ছিল ‘পড়ো তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন’।কুরআনের সেই প্রথম শিক্ষা পরবর্তীতে পাল্টে দিয়েছিল পুরো পৃথিবীর ইতিহাস।
অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব যে ‘স্বর্ণযুগ’ পার করেছিল, তার ভিত্তি ছিল এই জ্ঞানতৃষ্ণা।খলিফা হারুন-আল-রশিদ বুঝতে পেরেছিলেন জ্ঞানার্জনই এগিয়ে যাবার একমাত্র স্থায়ী উপায়।সেই এগিয়ে যাবার প্রত্যয়ে গড়ে উঠেছিল ‘বায়তুল হিকমাহ’। তৎকালীন বিশ্বে যত জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শনের বই ছিল সব রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাগদাদে আনা হয়েছিলো।করা হয়েছিলো অনুবাদ।গণিতবিদ আল-খোয়ারিজম এর কথা এখন ক’জন জানে?অথচ ফেসবুক থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবকিছুর পেছনে থাকা অ্যালগারিদমে উনার অবদান অসীম।বীজগণিতের জনক তাঁকেই বলা হয়।গণিতেই কি সীমাবদ্ধ ছিল জ্ঞানচর্চা? মোটেও না।রসায়নে জাবির ইবনে হাইয়্যান,চিকিৎসায় ইবনে সিনার অবদান কে অস্বীকার করা সম্ভব? না।তবে দু:খের বিষয় হাদিস গ্রন্থের সংকলনকারী দের এখন যেভাবে মনে রাখা হয়েছে তার একভাগও আল-কিন্দি কে মনে রাখা হয়নি। আল- কিন্দি ছিলেন ‘আরবদের দার্শনিক’ নামে পরিচিত। তিনি গ্রিক দর্শনকে ইসলামি চিন্তাধারার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।তিনি গণিত, চিকিৎসা এবং সংগীততত্ত্ব নিয়ে অসংখ্য বই লিখেছেন। আল-বিরুণী ছিলেন পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মাপা প্রথম ব্যাক্তিদের একজন।ভারততত্ত্বের জনক বলা হয় তাঁকে। তিনি ভারত ভ্রমণ করে এখানকার সংস্কৃতি, ধর্ম ও বিজ্ঞানের ওপর বিস্তারিত লিখেছিলেন তাঁর বই ‘কিতাব আল-হিন্দ’ এ। কবিতায় অমর গ্রন্থ ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’ লিখেছিলেন ওমর খৈয়াম। এমন আরও অসংখ্য জ্ঞানের নিদর্শন পাওয়া যাবে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে।বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’ কেবল একটি পাঠাগার ছিল না, সেটি ছিল মুক্তচিন্তার কেন্দ্র। যেখানে মুসলিম, খ্রিস্টান, ও ইহুদি পণ্ডিতেরা একসাথে বসে কাজ করতেন।মানবসভ্যতার অগ্রগতি তে মধ্যপ্রাচ্যের যে ভূমিকা এর সবই ছিল সেই উদার ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ফসল। একসঙ্গে বিজ্ঞান,দর্শনের চর্চা ছিল কায়রো থেকে স্পেনের কর্ডোবা পর্যন্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজ সেই জ্ঞানের সাধনা কোথায়? ইউরোপ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত তখন বিশ্বের অপরপ্রান্তে জ্ঞানের বিকাশ ঘটিয়েছেন যারা, তাঁদের অনুসারীদের বিজ্ঞানে নোবেলজয়ীর সংখ্যা হাতেগোনা কেন? অথচ দেড় কোটি জনসংখ্যার ইহুদি সম্প্রদায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্বে শীর্ষে। কেন এই ব্যবধান?উত্তরটা লুকিয়ে আছে নবীজীর (সা.) সেই সতর্কবাণীতেই: “তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না।” অতীতে অনেক জাতি কেবল এই উগ্রতা আর বাড়াবাড়ির কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমার লড়াইটা ঠিক এখানেই। আমি কোনোভাবেই ধর্মের বা ইসলামের বিপক্ষে নই। বরং আমি সেই উগ্রবাদী রাজনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে, যা শান্তির ধর্মকে ঘৃণা আর বিভাজনের হাতিয়ার বানিয়েছে। আমি সেই ‘ধর্মান্ধতার’ বিরুদ্ধে, যা মানুষকে খিলাফতের কাল্পনিক স্বপ্ন দেখায় কিন্তু একটি ‘বায়তুল হিকমাহ’ গড়ার উদ্যোগ নেয় না। তারা এখন নিজেদের জাতিগত পরিচয় দেয় ধর্ম দিয়ে অথচ যখন ধর্মই জাতির পরিচয়ের মাধ্যম ছিল তখন তাদেরই ধর্ম কিভাবে নিজেদের এত উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল সেই পথ তারা অনুসরণ করে না।আমার জাতিগত পরিচয় বাংলাদেশি, ধর্মীয় পরিচয় মুসলিম। অথচ দুটোকেই এখন বিশ্ব দরবারে বাঁকা চোখে দেখা হয়। এর প্রধান দায় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের।এরা মানুষের মগজধোলাই করে জাতিগত পরিচয় টাকে মুসলিম বানিয়ে যেভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন থেকে মানুষ কে বিমুখ রেখেছে তেমনইভাবে ইসলাম ধর্মেরও সৌন্দর্য নষ্ট করেছে।
এই বাংলায় ইসলামের প্রচার বখতিয়ার খিলজির তরবারি দিয়ে নয়, বরং সুফি-সাধকদের ভালোবাসা আর শান্তির বাণী দিয়ে হয়েছিল। তাঁরা এ দেশের সব মতের সব স্তরের মানুষকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন বলেই এই মাটি ইসলামের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে।অথচ আজ এই ধর্মই ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে ব্যবহার হচ্ছে।ব্যবহৃত হচ্ছে সহিংসতা, জাতীয়তাবোধ ধ্বংসে।ধর্মকে যখন গ্লোবালাইজেশন, ডিপ্লোম্যাসি, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দাঁড় করানো হয়,তখন আমি না বাংলাদেশি হিসেবে চুপ থাকতে পারি,না মুসলিম হিসেবে। যারা লিঙ্গ বৈষম্য করে, ভিন্নমতের প্রতি সহিংস,যারা জ্ঞান, শান্তি,অস্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তারা আর আমি এক ইসলামের অনুসারী না।আমার ইসলাম জ্ঞানের, আমার ইসলাম শান্তির। আমি উগ্রবাদের বিপক্ষে। কারণ আমার ধর্মই আমাকে শিখিয়েছে জ্ঞানের অন্বেষণ। জ্ঞানের চর্চা শুরু করলে দুটো বিষয় স্পষ্ট হবে।
১. ধর্ম দিয়ে জাতি না।
ইসলামি জাতি, হিন্দু জাতি ইত্যাদি বলে কিছু নেই। জাতিগত পরিচয় দেশ দিয়ে। নিজের দেশের ভিন্নধর্মীর যেকোনো সফলতা গর্বের। অন্য দেশের একই ধর্মের অনুসারী কারো বিরাট কোনো অর্জনেও গর্বের কিছু নেই। একটি দেশ একটা ভূ-খণ্ড। ভূ-খণ্ডের ধর্ম হয় না।
২. ধর্ম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটা ব্যাক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে।সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সরাসরি ধর্মের হস্তক্ষেপ বিপজ্জনক।ব্যক্তি কে ধর্ম বুঝতে হবে, মানতে হবে, নিজের ধর্মের প্রতিনিধি হয়ে বিশ্বের সামনে দাঁড়াতে চাইলে সেই ধর্মের স্বর্ণযুগের পথ অবলম্বন করে জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শনের চর্চা করতে হবে। হিংসার না। গাজওয়াতুল হিন্দ দিবাস্বপ্ন। তবে ভারতের আই-আইটি বা ইসরোর মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভব। নিজের, নিজের দেশের উন্নতি করতে পারলেই ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করা যাবে। বাংলাদেশের মুসলিম যুবক অমুক সৃষ্টি করেছে তমুক এমন সংবাদ শিরোনাম পরিবর্তন আনতে পারবে। পাহাড় খুঁড়ে ইউরেনিয়াম তুলে ভারতে ছুড়ে মারতে চাওয়া টাইপের শিরোনাম নিয়ে যাবে তলানিতে।দেশকেও,ধর্মকেও।
পরিশেষে বলবো, আমি ধর্মকে ব্যক্তিপর্যায়ে চর্চা, শ্রদ্ধা, অনুসরণ কোনোটিরই বিপক্ষে নই।তবে আমার লেখক সত্তা আর ব্যক্তিসত্তা আলাদা। লেখকের জায়গা থেকে আমি ধর্মের বর্তমান পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করি,করবো।কারণ এটাই সময়োপযোগী।বাংলাদেশী এবং একজন মুসলিম হিসেবে দেশ ও ইসলামের কল্যাণে এখন এটাই করণীয়। এতে আপাতত মানুষ ভুল বুঝবে।
এবং অনেক অসুবিধাও মোকাবিলা করতে হবে। কারণ উগ্রবাদীদের মতে তাদের সঙ্গে যোগদান বা সহমত প্রকাশ না করলে কেও ধার্মিক হতে পারে না। মুক্তচিন্তক,প্রগতিশীল,সংশয়বাদী, নাস্তিক, ধর্ম বিদ্বেষী এই পাঁচটি যে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় তা কট্টর ধর্ম ব্যব্যসায়ীরা সাধারণ মানুষের সামনে আসতেই দেয়নি।তাদের কাছে সবাই নাস্তিক অথবা ইসলাম বিদ্বেষী।আমি যদিও এসবে বিচলিত নই।আমার নিজেকে মুসলিম প্রমাণ করে সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থন পাবার প্রয়োজন নেই। কারণ আমার ইসলাম ‘ইকরা’র।