সুপ্রভাত সিডনি :সাম্প্রতিক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত আমলের বিশাল বহর ও বিলাসবহুল প্রথার বিপরীতে মিতব্যয়িতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন নজির স্থাপন করেছে তাঁর এই যুক্তরাষ্ট্র সফর।
জাতিসংঘ সফরে কূটনৈতিক সাফল্য ও বিশ্বনেতাদের সাথে বৈঠক
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচ এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত প্রাতরাশ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশ নেন তিনি। পাশাপাশি ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এবং মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূতের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এই সফরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তাঁকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানান। রোহিঙ্গা সংকট সমাধান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাড়াতে এই সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদির নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে একাধিকবার সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাৎক্ষণিকভাবে সেই আমন্ত্রণে দিল্লি যাননি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতি-নির্ভরশীল না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার এই নীতিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের গৌরব
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণী ফোরাম ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দৃশ্যমান নেতৃত্ব ও সম্মান বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের প্রথিতযশা কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পর কোনো বাঙালির এই আন্তর্জাতিক গৌরব অর্জনকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের পেশাদার কূটনীতির একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন।
ব্যয় সংকোচন ও মিতব্যয়ী কূটনীতির নতুন যুগ
বিগত সরকারের আমলে বিলাসবহুল চার্টার্ড ফ্লাইট ও বিশাল বহর নিয়ে বিদেশ সফরের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। সাবেক সরকারের সময় (২০১৯ থেকে মিড-২০২৪) কেবল ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনা বাবদ ২৫০ কোটি টাকা এবং বিদেশ সফরে বিমানের পেছনে ২০০ কোটি টাকার বেশি অপচয় হয়েছিল। ২০১৫ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনে ২২৭ জনের বিশাল বহর নিয়ে যাওয়ার নজিরও রয়েছে।
এর বিপরীতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করতে মন্ত্রী ও কর্মকর্তা মিলিয়ে মাত্র ৩৫ জনের একটি সংক্ষিপ্ত ও কার্যকরী প্রতিনিধি দল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। জনগণের ট্যাক্সের টাকার সঠিক ব্যবহার ও ‘অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন’-এর এই পদক্ষেপকে দেশের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছে।
প্রবাসীদের উচ্ছ্বাস ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর তারেক রহমানকে সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘমঞ্চে এবং যুক্তরাষ্ট্র ভূমিতে দেখতে পেয়ে নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে ম্যানহাটনের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের বাইরে হাজার হাজার প্রবাসী নেতাকর্মী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। কঠোর প্রটোকল ও ব্যস্ততম কূটনৈতিক সূচির মাঝেও তিনি প্রবাসীদের ভালোবাসার সংক্ষিপ্ত জবাব দেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর তাঁর সন্তান তারেক রহমানের এই সফরকে প্রবাসীরা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবারের জাতিসংঘ সফর ও কূটনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীলতা ছাড়াই বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারে এবং থাকবে ইনশাআল্লাহ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ত্রুটিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি, কথা ও কাজের অসামঞ্জস্য এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতার কারণে আজ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের সাথেই তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।
এর পাশাপাশি, বাংলাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং দেশটির ইন্ধনে সেখান থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উসকানি ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে—যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সফল ও মিতব্যয়ী সফর কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বৈদেশিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী কোনো ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে আপনি মনে করেন?