বাংলাদেশ গড়ার কারিগর: ৭ই নভেম্বর ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’

এম,এ,ইউসুফ শামীম: বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে যে কজন কালজয়ী বীর সন্তান স্বীয় মেধা, সাহসিকতা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম অন্যতম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে তলাহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে আধুনিক ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, সবখানেই তাঁর স্বাক্ষর স্পষ্ট। তিনি কেবল একজন দক্ষ সামরিক অধিনায়কই ছিলেন না, বরং এক সংকটাপন্ন মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে দেশকে একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন।

১৯৭১-এর বীরত্ব ও স্বাধীনতার ঘোষণা

জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বের প্রথম বড় বিকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা দিশেহারা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের নতুন দিশা ও সাহস জুগিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে তিনি ছিলেন সমুখ সমরের অন্যতম বীর সেনানী।

  • জেড ফোর্স গঠন: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক হিসেবে বীরত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
  • বীর উত্তম খেতাব: স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর সাহসিকতা, দক্ষতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্রান্তিকালের বীরত্ব

১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’-এর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের জাতীয় রাজনীতির মূল কাণ্ডারী হিসেবে আবির্ভূত হন। সেই সময়ে দেশ গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নৈরাজ্য ও অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে জিয়াউর রহমান দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে দেশ পরিচালনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি দেশবাসীকে হতাশা থেকে বের করে এনে আশার আলো দেখান এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর এমন এক কালজয়ী দর্শন উপহার দেন, যা ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সব বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে। ৭ই নভেম্বর ও সার্বভৌমত্বের রক্ষেতা জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ও ক্যু-পাল্টা ক্যু দেশীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এমন এক নাজুক মুহূর্তে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের হাল ধরেন।

তিনি সাধারণ সিপাহী ও আপামর জনতার আস্থার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন। ঐতিহাসিকদের মতে, সেদিন জিয়াউর রহমান শক্ত হাতে নেতৃত্ব না দিলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়ে  বিদেশি শক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবে  চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের বলিষ্ঠ পদক্ষেপই সে দিন স্বাধীন বাংলাদেশকে এক গভীর সংকট ও সম্ভাব্  বিদেশি শক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব থেকে রক্ষা করেছিল।

দেশপ্রেম ও আত্মনির্ভরশীলতার অর্থনৈতিক দর্শন

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম কোনো মুখের কথায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ফুটে উঠেছিল তাঁর বাস্তবমুখী কর্মকাণ্ডে। বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার জন্য তিনি ‘খালের রাজনীতি’ ও কৃষি বিপ্লবের ডাক দেন।

১.       উৎপাদনের রাজনীতি: তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের উৎপাদন বাড়াতে হবে। তাই তিনি গ্রামে গ্রামে হেঁটে কৃষকদের সাথে খাল খনন করেন, যাতে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি হয় এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

২.       স্বনির্ভর গ্রাম সরকার: গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তিনি স্থানীয় পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেন।

৩.       জনশক্তি রপ্তানি ও গার্মেন্টস শিল্প: আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) শিল্প—এই দুই খাতের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই।

  1. সার্ক (SAARC) গঠন: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ‘দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা’ বা সার্ক গঠনের প্রস্তাবনা ও প্রাথমিক উদ্যোগ।

বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের মূল শক্তি ছিল তাঁর সততা, কঠোর কর্মনিষ্ঠা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। একদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তিনি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন, যা অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল জনসমর্থন লাভ করে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে সামরিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নমনীয়তার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করান।

ধর্মীয় অনুভূতি ও নৈতিক মূল্যবোধ

শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে একজন অত্যন্ত সৎ, সংযমী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ইসলামিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল।

  • সংবিধানে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস সংযোজন: রাষ্ট্রীয় সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ অন্তর্ভুক্ত করেন এবং মূলনীতিতে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’-এর বিষয়টি নিশ্চিত করেন, যা দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থানকে আরও সুদৃঢ় করে।
  • ওআইসি (OIC)-তে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা: ইসলামী সম্মেলন সংস্থায় (ওআইসি) বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করতে এবং আল-কুদস কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ফিলিস্তিন সহ মুসলিম বিশ্বের সমর্থনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রচারের পাশাপাশি তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যাতে দেশে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষেরাও নিজ নিজ ধর্ম পূর্ণ স্বাধীনতায় ও নিরাপত্তায় পালন করতে পারে।

শাহাদাত ও ঐতিহাসিক জানাজা

১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্ক সার্কিট হাউসে একদল ষড়যন্তকারী (পাশের দেশের) পথভ্রষ্ট সেনাসদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। প্রিয় নেতাকে হারিয়ে সমগ্র বাংলাদেশ স্তব্ধ ও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও অভূতপূর্ব জানাজা

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহ যখন ঢাকায় আনা হয়, তখন পুরো ঢাকা শহর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন।

  • কোটি মানুষের উপস্থিতি: ধারণা করা হয়, তাঁর জানাজায় প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল, যা ছিল তৎকালীন বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও জনবহুল জানাজাসমূহের একটি।
  • জনগণের ভালোবাসা: কোনো রাজনৈতিক চাপ বা বাধ্যতামূলক উপস্থিতি ছাড়াই সারা দেশ থেকে সাধারণ মানুষ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেবল প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে হেঁটে ঢাকায় এসেছিলেন।
  • দেশপ্রেমের প্রতিদান: সুদীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল লাখো মানুষ। এই ঐতিহাসিক জানাজাই প্রমাণ করেছিল যে, সততা, নিষ্ঠা ও খাঁটি দেশপ্রেম দিয়ে জিয়াউর রহমান কীভাবে দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিলেন।

আমার শেষ কথা

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কেবল এক খণ্ড ইতিহাসের নাম নন, বরং তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের এক চিরন্তনী প্রেরণার নাম। রণক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি যে সততা, গতিশীলতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তা আজও অনন্য নজির হয়ে আছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর সময়ের সংক্ষিপ্ততা সত্ত্বেও যে স্থায়ী সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কাজের ভিত্তি তিনি দিয়ে গেছেন, তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশ। তিনি বেঁচে আছেন কোটি বাংলাদেশি মানুষের হৃদয়ে, তাঁর দেশপ্রেম ও কর্মের প্রদীপ্ত শিখা হয়ে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *