শক্তিশালী ও যুগোপযোগী প্রজন্ম তৈরিতে বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা কতোটুকু কার্যকর

আয়শা সাথী: শিক্ষা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক পরিবর্তন এবং নৈতিক উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যত উন্নত, সে দেশ তত উন্নত। শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, জাতীয় উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষা একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান উপাদান। Human Capital Theory অনুযায়ী, শিক্ষা মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়। শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটে, গবেষণা বৃদ্ধি পায়, দারিদ্র্য কমে ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। তাই শিক্ষা উন্নয়ন মানেই জাতীয় উন্নয়ন।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কয়েকটি স্তরে বিভক্ত যেগুলো হলো প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষা। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন UNESCO, UNICEF এবং World Bank এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে গেলেও মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো BANBEIS এর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান ব্যর্থতাগুলো অন্বেষণ করলে দেখা যায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোটাই মুখস্থ নির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এর ফলে সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না যার প্রভাব পড়ছে পরবর্তী জীবনে। Bangladesh Bureau of Statistics এর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার বেশি। এর কারণ হলো শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষতা ভিত্তিক নয়। শিক্ষার মানের অবনতি প্রধান কারনগুলো বশ্লেষণ করলে অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক, পুরোনো পাঠ্যক্রম, গবেষণার অভাব, বড় ক্লাস, দুর্বল মূল্যায়ন পদ্ধতি ওকোচিং নির্ভর শিক্ষা হওয়ায় প্রকৃত শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কার্যক্রম সীমিত। এছাড়াও আমাদের শিক্ষায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। বাজেট বিশ্লেষণেও দেখা যায় বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ  বাজেট আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম।

আবার কাঠামোগত দিক থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এখানকার শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, শিক্ষা নীতির সঠিক বাস্তবায়নের অভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব, গবেষণার অভাব ও শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতি কাঠামোগতভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে যা শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট করেছে। উন্নত দেশগুলো যেমন ফিনল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ যেসকল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাংলাদেশ অনুকরণ করছে সেই দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেখানে মুখস্থ শিক্ষা নেই। এসব শিক্ষাব্যবস্থা গবেষণা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর। এসব দেশে রয়েছে  উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বড় বাজেট। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে এসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় পার্থক্য রয়েছে।

শিক্ষা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক

বাংলাদেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার মান, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রমাণ করে শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সমন্বয় নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। শিক্ষার মানের অবনতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং নির্ভরতা, বেকারত্ব বৃদ্ধি, দক্ষতার অভাব—এসব সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর জন্য একটি শক্তিশালী ও যুগোপযোগী শিক্ষা সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা যেতে পারে যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করবে।

শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা বিশ্লেষণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি, পাঠ্যক্রম সংস্কার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সমন্বয়

গবেষণা উন্নয়ন এই সংস্করের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিভিন্ন গবেষণালব্দ জ্ঞান পরযালোচনা করলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে যে সকল বিষয়কে গুরত্ব দেয়া হয়েছে তা হলো – দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু, পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ (আইটি শিক্ষা, গবেষণা শিক্ষা, সমস্যা সমাধান শিক্ষা), কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, এবং একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা ও বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন। উপরোক্ত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় শিক্ষা সংস্কার আইন প্রণয়ন, নতুন পাঠ্যক্রম চালু, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধিকে সুপারিশ করা হয়েছে।

২১শ শতাব্দীর বিশ্বের সাথে তাল রেখে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা ও দক্ষতায়  এগিয়ে নিতে যদি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনই পরিবর্তন করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবে। এখানে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অপরাধ বাড়বে ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেমে যাবে। অতএব, যত দ্রুত সম্ভব প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির সার্বিক দূর্বল দিক অনুসন্ধান করে শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে এসকল সমস্যার সমাধান ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতাভিত্তিক এবং যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে একটি কার্যকর শিক্ষা সংস্কারই পারে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে এবং একটি দক্ষ, শিক্ষিত, নৈতিক ও উন্নত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে।

 

আয়শা সাথী: শিক্ষক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *