এস. রানা: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বিতর্কটা অস্বস্তিকর, কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয়। কথাটা সরাসরি বলি—যদি সত্যিই এমন হয় যে বহু হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণখেলাপি, অর্থপাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো গোষ্ঠীকে আবার ব্যবসায় ফিরতে দেওয়া হচ্ছে, এবং এর যুক্তি দাঁড় করানো হয়—“তারা অন্য পাচারকারীদের তথ্য দেবে”—তাহলে বিষয়টা কেবল দুর্বল যুক্তি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির এক গভীর সংকটের লক্ষণ।
প্রথমেই একটা মৌলিক প্রশ্ন তোলা দরকার। তথ্য দেওয়া কি অপরাধকে মুছে দেয়? না। কোনো সভ্য আইনি কাঠামোয় তা হয় না। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি তদন্তে সহযোগিতা করতে পারেন—এটা স্বীকৃত। কিন্তু সেই সহযোগিতা তাকে নির্দোষ বানায় না, কিংবা তাকে আবার সেই আর্থিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে বসানোর লাইসেন্স দেয় না, যেটিকে ঘিরেই অভিযোগ। এখানে একটা বিপজ্জনক বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে—সহযোগিতা আর দায়মুক্তি এক জিনিস নয়।
আরও স্পষ্ট করে বলি। যদি কেউ সত্যিই অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রের কাজ কী? সেই তথ্য আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়া, প্রমাণ যাচাই করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা, এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু এর বদলে যদি তাকে আবার ব্যবসায়িক ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটা তদন্ত নয়—এটা আপস।
এখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, সিআইডি, কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স—এতগুলো সংস্থা কেন আছে? আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ উদ্ধারের জন্য পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি, বিদেশি গোয়েন্দা সহযোগিতা—এসব কিসের জন্য? যদি শেষ পর্যন্ত “অভিযুক্তই তথ্যদাতা” হয়ে ওঠে, তাহলে রাষ্ট্রের নিজস্ব তদন্ত কাঠামোর কার্যকারিতা কোথায় দাঁড়ায়?
সমস্যাটা এখানেই থামে না। অর্থনৈতিক দিক থেকে এর প্রভাব আরও গভীর। ব্যাংকিং খাতে আস্থার বিষয়টা একবার নষ্ট হলে সেটা ফিরিয়ে আনা কঠিন। সাধারণ আমানতকারী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেখবে—তাদের জন্য নিয়ম কঠোর, কিন্তু বড় খেলোয়াড়দের জন্য দরজা খোলা। তখন প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক হয়ে যায়—এই ব্যবস্থায় সৎ থাকার মূল্য কী?
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটা বড় ঝুঁকি—নৈতিক ঝুঁকি বা moral hazard। যদি বারবার দেখা যায় যে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, এবং শেষে কোনো না কোনোভাবে আবার ফিরে আসা সম্ভব—তাহলে এটা আর ব্যতিক্রম থাকে না, এটা একটা প্যাটার্ন হয়ে যায়। তখন দুর্নীতি ঝুঁকি নয়, কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক দিকটা আরও স্পর্শকাতর। সাধারণ মানুষ যখন দেখে—একজন ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা কিস্তি দিতে না পারলে চাপের মুখে পড়ে, কিন্তু বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি আলোচনার টেবিলে বসে—তখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ভেঙে যায়। তখন “এই দেশ এমনই”—এই বাক্যটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অথচ এই স্বাভাবিকীকরণটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ একবার যদি অন্যায়কে নিয়ম হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তখন পরিবর্তনের দাবিটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
কেউ কেউ বলতে পারেন—বাস্তবতা মেনে নিতে হবে, বড় অর্থ উদ্ধারের জন্য কখনো কখনো আপস করতে হয়। কথাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও plea bargain বা সমঝোতার উদাহরণ আছে। কিন্তু সেখানেও কিছু সীমারেখা থাকে—স্বচ্ছতা থাকতে হবে, বিচারিক তত্ত্বাবধান থাকতে হবে, সম্পদ ফেরত আসতে হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—অপরাধের দায় স্বীকার ও শাস্তির প্রক্রিয়া থাকতে হবে। এর কোনোটাই এড়িয়ে গিয়ে যদি “ফিরে আসার” পথ তৈরি হয়, তাহলে সেটা সমাধান নয়—এটা সমস্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
সবশেষে প্রশ্নটা খুব সরল, কিন্তু অস্বস্তিকর। রাষ্ট্র কি সত্যিই অপরাধ দমন করতে চায়, নাকি শুধু সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করতে চায়? যদি প্রথমটা হয়, তাহলে আইন সবার জন্য সমান হতে হবে—নাম, প্রভাব, বা অর্থের পরিমাণ দেখে নয়। আর যদি দ্বিতীয়টা হয়, তাহলে এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো যুক্তিই যথেষ্ট হবে না।
বাংলাদেশের মানুষ হয়তো অনেক কিছু সহ্য করে। কিন্তু একটা বিষয় তারা খুব ভালো বোঝে—ন্যায়বিচার আর আপস এক জিনিস নয়। এবং যখন এই দুটোর সীমারেখা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠবেই—রাষ্ট্র আসলে কার পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে?