মোহাম্মদ আলম ফরিদ: মানচিত্র কেবল কাগজে আঁকা রেখা নয়। প্রতিটি মানচিত্রের গভীরে লুকিয়ে থাকে কোনো সাম্রাজ্যের অহংকার, কোনো সভ্যতার আত্মপ্রবঞ্চনা, কিংবা কোনো জাতির ভাঙা স্বপ্ন। ইতিহাসে বহু যুদ্ধ শুরু হয়েছে সৈন্যদের পদধ্বনির আগেই—প্রথমে আঁকা হয়েছে কল্পনার ভূখণ্ড, তারপর সেই কল্পনাকে “ঐতিহাসিক অধিকার”, “ঈশ্বরপ্রদত্ত ভূমি” বা “সভ্যতার পুনর্জাগরণ” বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়েছে। নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত “গ্রেটার ইসরাইল” এবং সিন্ধু থেকে লঙ্কা পর্যন্ত “অখণ্ড ভারত”—দুটি আলাদা ভূখণ্ডের দুটি স্বপ্ন, কিন্তু তাদের আত্মা যেন একই আয়নায় গড়া। উভয়ই নির্বাচিত অতীতকে ব্যবহার করে বর্তমানের আধিপত্যকে বৈধতা দিতে চায়। উভয়ই ধর্ম ও সভ্যতার ভাষায় ভূখণ্ডের রাজনীতি সাজায়। আর উভয় ক্ষেত্রেই মুসলমানদের “অন্য”, “বাহিরের মানুষ” কিংবা নিরাপত্তা-হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা স্পষ্ট।
এই মানসিকতা নতুন কিছু নয়। প্রাচীন গ্রিক কাব্যেও এর ছায়া দেখা যায়। হোমারের ইলিয়ড মূলত ট্রয় যুদ্ধের কাহিনি—এক নারীকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সংঘাত ধীরে ধীরে পরিণত হয় সভ্যতার অহংকারের যুদ্ধে। সেখানে সম্মান, প্রতিশোধ, বীরত্ব ও ক্ষমতার মোহ এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত পুরো নগরী আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়। ওডিসি আবার যুদ্ধশেষে ওডিসিউসের দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের গল্প; কিন্তু এর গভীরে আছে আরেক সত্য—যুদ্ধ শেষ হলেও সাম্রাজ্যের মানসিকতা শেষ হয় না। বিজয়ীও শান্তি খুঁজে পায় না; সে ঘুরে বেড়ায় এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে, এক অভিশাপ থেকে আরেক অভিশাপে। আধুনিক বিশ্বেও অনেক রাষ্ট্র যেন সেই ওডিসিউস—যুদ্ধ জিতে ফিরে আসতে চায়, কিন্তু নিজেরই তৈরি ফাঁদে আটকে যায়।
আজকের “গ্রেটার ইসরাইল” ধারণা অনেকটা সেই ট্রয়ের যুদ্ধের মতো। তাওরাতের নির্বাচিত অংশের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা থেকে গড়ে ওঠা এই ধারণা আধুনিক জায়োনিবাদের হাতে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব আল-কুদস ও গোলান দখল করে এই কল্পনাকে নতুন শক্তি দেওয়া হয়। এখন ইসরাইলি ডানপন্থী রাজনীতিতে “সমুদ্র থেকে নদী পর্যন্ত” কেবল স্লোগান নয়; এটি এক ধরনের সভ্যতাগত আধিপত্যের নকশা। কিন্তু এই স্বপ্ন দাঁড়িয়ে আছে গাজার ধ্বংসস্তূপ, পশ্চিম তীরের অবরোধ এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্তের ওপর। ট্রয়ের মতো এখানেও বিজয়ের ভাষা শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের ভাষায় রূপ নিচ্ছে।
হিন্দুত্ববাদী “অখণ্ড ভারত”ও একই ধরনের সভ্যতাগত কল্পনা। বিনায়ক দামোদর সাভারকার, এম.এস. গোলওয়ালকার এবং আরএসএসের রাজনৈতিক দর্শনে ভারতকে একটি “হিন্দু সভ্যতার রাষ্ট্র” হিসেবে কল্পনা করা হয়, যেখানে বর্তমান ভারতের সীমানা যথেষ্ট নয়; বরং পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এমনকি আফগানিস্তানের অংশও এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হয়। এই ধারণা কেবল সাংস্কৃতিক রোমান্টিসিজম নয়; বরং আধুনিক রাষ্ট্রনীতির ভেতরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করা এক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা।
ভারতের ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার পেছনে কয়েকটি গভীর কারণ রয়েছে। প্রথমত, ঔপনিবেশিক আমলের বিভক্ত পরিচয় রাজনীতি স্বাধীনতার পর পুরোপুরি শেষ হয়নি; বরং নতুন রূপে টিকে থাকে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বেকারত্বের চাপ থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তৃতীয়ত, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বজুড়ে উদারনৈতিক রাজনীতির দুর্বলতা এবং পরিচয়ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উত্থান ভারতেও নতুন শক্তি পায়। ফলে “হিন্দু সভ্যতা বিপদের মুখে”—এই ধারণাকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের এক ধরনের স্থায়ী সন্দেহভাজন সম্প্রদায়ে পরিণত করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো বজায় থাকলেও রাষ্ট্রের ভেতরে ধীরে ধীরে একদলীয় আধিপত্য তৈরি হয়। মিডিয়া, শিক্ষা, ইতিহাসচর্চা এবং বিচারব্যবস্থার উপর আদর্শিক প্রভাব বাড়তে থাকে। পশ্চিমবঙ্গেও বহু বিশ্লেষকের মতে, বিজেপির উত্থান কেবল স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং”, পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ এবং সামাজিক অস্থিরতার কৌশলগত ব্যবহারের ফল। একসময় যে বাংলা উপমহাদেশীয় বহুত্ববাদের প্রতীক ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে “সীমান্ত”, “অনুপ্রবেশকারী”, “জনসংখ্যা পরিবর্তন” ইত্যাদি ভাষা রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আর শুধু আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বৃহৎ ভারতের কল্পিত সভ্যতাগত প্রকল্পের অংশে পরিণত হয়।
এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের প্রশ্নে ফিরে তাকানো জরুরি। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডারের হার্টল্যান্ড তত্ত্ব বলেছিল—যে ইউরেশিয়ার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করবে, সে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে। পরে স্পাইকম্যান বলেন, আসল শক্তি উপকূলভূমি বা রিমল্যান্ডে। কিন্তু আধুনিক যুগে তেল ও জ্বালানি এই তত্ত্বগুলোকে নতুন অর্থ দিয়েছে। পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী, ইরাক, ইরান, সৌদি আরব—এসব অঞ্চল শুধু ভূখণ্ড নয়; এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী। ফলে “বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য” হয়ে ওঠে আধুনিক সাম্রাজ্যিক রাজনীতির কেন্দ্র।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বহু নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান টিকে আছে বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, আঞ্চলিক জোট এবং সামরিক আত্মনির্ভরতার কারণে। নিষেধাজ্ঞা তাকে দুর্বল করার পাশাপাশি শক্তও করেছে। ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক “প্রতিরোধ অক্ষ”—সব মিলিয়ে ইরান আর ২০০৩ সালের ইরাক নয়। ফলে বর্তমান ইসরাইল–আমেরিকা বনাম ইরান উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি এক বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার সংকট।
আজ পৃথিবী যেন আবার এক নতুন ট্রয়ের সামনে দাঁড়িয়ে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজার ধ্বংসস্তূপ, কাশ্মীরের দীর্ঘশ্বাস, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, মধ্যপ্রাচ্যের আগুন—সব মিলিয়ে মনে হয় মানবসভ্যতা আবার সেই পুরনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে। হোমারের কাব্যে যেমন অহংকার শেষ পর্যন্ত নগরী ধ্বংস করেছিল, আধুনিক বিশ্বেও সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্নগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই গ্রাস করতে পারে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের দায়িত্ব সাম্রাজ্য গড়া নয়; বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। কুরআন মানুষকে পৃথিবীর খলিফা বলেছে—অর্থাৎ দায়িত্বশীল প্রতিনিধি, দখলদার নয়। তাই মুসলিম উম্মাহর সামনে আজকের চ্যালেঞ্জ হলো কোনো “গ্রেটার” সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখা নয়; বরং এমন এক নৈতিক মানচিত্র কল্পনা করা, যেখানে ফিলিস্তিনের শিশু, কাশ্মীরের তরুণ, রোহিঙ্গা শরণার্থী কিংবা নিপীড়িত সংখ্যালঘুর জীবন সমান মর্যাদা পায়। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ট্যাঙ্কের নয়; ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মানুষের বিবেকের কাছেই ফিরে আসে।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তার সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ কোথায়। ইতিহাস বলে, ছোট রাষ্ট্র তখনই বিপদে পড়ে যখন তারা নিজেদের চারপাশের শক্তির বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ এবং “অখণ্ড ভারত”–কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কল্পনা একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিতে পারে। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন এক পররাষ্ট্রনীতি, যা আবেগ নয়, বরং কৌশলগত ভারসাম্যের উপর দাঁড়াবে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ পাকিস্তান শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় সামরিক শক্তি, যার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, কৌশলগত অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রভাব এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য তাই পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা সংলাপ, সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং নিরাপত্তাভিত্তিক সম্পর্ক জোরদার করা ভবিষ্যতের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে চীন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক রাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা বাড়ানো, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক শক্তিশালী করা বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে বিস্তৃত করবে। কারণ ছোট রাষ্ট্রের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু সেনাবাহিনী নয়; বরং বহুমুখী জোট, কৌশলগত ভারসাম্য এবং নিজের জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে স্পষ্ট সচেতনতা।