২০২৫-২৬ অর্থবছরঃ স্থিতিশীলতার চেষ্টায় চ্যালেঞ্জে ঘেরা এক অর্থনীতি

আয়শা সাথী: বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছর ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক রূপান্তর এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রণীত এ অর্থবছরের বাজেটকে অনেক অর্থনীতিবিদ “স্থিতিশীলতার বাজেট” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ‘বাজেট ২০২৫-২৬: বেশি জোর থাকবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে’  শিরোনামে প্রথম আলোর অর্থনীতি বিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয় সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা (ফখরুল ইসলাম, ১৭ এপ্রিল ২০২৫, ঢাকা)। যদিও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জোড়া ধাক্কায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার এই পথকে করেছে কণ্টকাকীর্ণ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগের বছরের তুলনায় সামান্য কম আকারের বাজেট। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তবায়নযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত ব্যয় কাঠামো নিশ্চিত করতেই বাজেটের আকার ছোট করা হয়। ২জুন ২০২৫ এ “The Business Standard” পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী বাজেটের এই কাটছাঁট রাজস্ব একীভূতকরণ কৌশলের অংশ। এই অর্থবছরে দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও আমদানি নির্ভর পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ সৃষ্টি করে। সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও মিশ্র চিত্র দেখা যায়। সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৫ থেকে ৫.৬ শতাংশ নির্ধারণ করলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্পখাতে ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। তবে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বাজেট ঘোষণার পরবর্তী সময় ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকে সংশোধিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয় যা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট আকারে বাস্তবায়ন শুরু হয়। বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে রাজস্ব আদায়ের চিত্র তুলে ধরে শফিকুল আলম বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের গতি বেড়েছে যার পরিমান ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। প্রেস সচিব আরও বলেন, গত বছরের শেষের দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। বর্তমানে তা কমে ৭ শতাংশের কাছাকাছি এসেছে ( বাংলাদেশ টাইমস, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ঢাকা)।

রাজস্ব আহরণে সরকার তুলনামূলক ইতিবাচক অগ্রগতি দেখিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। যদিও সামগ্রিকভাবে রাজস্ব ঘাটতি এখনও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতেও সংস্কারের আলোচনা ছিল ব্যাপক। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং ডলার সংকট অর্থনীতিকে চাপে রাখলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।

বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও মিশ্র অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। কিছু খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি প্রভাব ফেলেছে। তবুও সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কর সুবিধা ও নীতিগত সহায়তার উদ্যোগ অব্যাহত রাখে। আইএমএফ (IMF) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা ও ঋণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি বহাল রাখা হয়েছে। অনুৎপাদনশীল খাতের খরচ কমিয়ে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা পুনরায় মূল্যায়ন করে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে।

​সরকারের সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতির মূল ফ্রন্টগুলোতে অস্বস্তি কাটেনি। মূল্যস্ফীতির থাবায় সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের উচ্চমূল্য মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলেছে। বাজার সিন্ডিকেট ও সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি দূর করা যায়নি। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার রেশ পুরোপুরি না কাটায় দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় বাধা। ​২০২৫-২৬ অর্থবছরের অর্থনীতি সামাল দেওয়া বর্তমান সরকারের জন্য কেবল একটি রুটিন কাজ নয়, এটি দেশের টিকে থাকার লড়াই। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা রাতারাতি সম্ভব নয়, এটি জনগণ বোঝে। তবে সংস্কারের গতি হতে হবে দৃশ্যমান ও সুনির্দিষ্ট। সরকারকে মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক স্বস্তির মধ্যে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে বাজারে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। সঠিক নেতৃত্ব, দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং সাহসী সংস্কারই পারে বাংলাদেশকে এই অর্থনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত থেকে উদ্ধার করে একটি সমতাভিত্তিক ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছর ছিল বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের “সংকট সামাল দেওয়ার বছর”। একদিকে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাস্তবতায় সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের বিকল্প নেই।

আয়শা সাথী (বরগুনা, বাংলাদেশ)।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *