অস্ট্রেলিয়ার প্রথম জনগোষ্ঠীকে কি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে?

মোহাম্মদ আলম ফরিদ: প্রায় বিশ বছর আগে কমিউনিটি সেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় আমার ইন্টার্নশিপ ছিল সিডনীর রেডফার্ন এলাকার একটি আদিবাসী যুবকেন্দ্রে। সেখানে স্থানীয় কিছু তরুণের সঙ্গে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ছাত্রজীবনে এর আগে সমাজকর্মে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি ইন্টার্নশিপ করেছি। তাই শুরুতে ভেবেছিলাম এটিও অন্য অভিজ্ঞতার মতোই হবে।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

যাদের সঙ্গে কাজ করার কথা ছিল, তারা প্রায় কেউই আমার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ছিল না। আমি উপস্থিত থাকতাম, পর্যবেক্ষণ করতাম, অপেক্ষা করতাম—কিন্তু সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল না। কয়েকদিন ধরে সাইটে যাওয়া–আসাই যেন আমার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। একজন প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে তখন এটি আমার জন্য হতাশাজনক এবং কিছুটা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা ছিল। মনে হয়েছিল আমি ব্যর্থ হয়েছি।

পরে ধীরে ধীরে মনে হতে শুরু করে—সমস্যাটি হয়তো শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতা ছিল না। বহু মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠান, বাইরের মানুষ কিংবা “সহায়তা” শব্দটির সঙ্গেও একটি দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে থাকতে পারে। বিশ্বাস সব সময় উপস্থিতির মাধ্যমে তৈরি হয় না; কখনো কখনো ইতিহাস, অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে।

আজ এত বছর পর অস্ট্রেলিয়ার প্রথম জনগোষ্ঠী, তাদের ইতিহাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায়বিচার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতার কথা আবার মনে পড়ে। হয়তো তখন আমি খুব বেশি কিছু করতে পারিনি; কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছিল—কোনো সম্প্রদায়কে বোঝার আগে তাদের জন্য কথা বলার চেয়ে তাদের অভিজ্ঞতা শোনা বেশি জরুরি।

সেই অভিজ্ঞতার বহু বছর পর বুঝতে পারি—কোনো সমাজকে বোঝার প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের নয়; এটি ইতিহাস, ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।

যে কোনো সভ্যতার প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয় শুধু তার প্রযুক্তিগত উন্নতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা সামরিক শক্তি দিয়ে নয়; বরং দেখা হয় সেই সমাজ তার দুর্বল, প্রান্তিক ও ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। একটি জাতির নৈতিক অবস্থান বোঝা যায়—সে তার অতীতের ভুলগুলো কতটা স্বীকার করতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা ন্যায়ভিত্তিক পথ তৈরি করতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া আজ বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ। কিন্তু এই আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাসের গভীরে রয়েছে একটি প্রাচীন সভ্যতার গল্প—যে সভ্যতা ইউরোপীয় আগমনের বহু হাজার বছর আগে এই ভূখণ্ডে বিকশিত হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং টরেস প্রণালীর দ্বীপবাসী জনগোষ্ঠী পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ধারাবাহিক জীবিত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক গবেষণা অনুযায়ী, তারা প্রায় ৬৫ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে।

তাদের কাছে ভূমি শুধুমাত্র বসবাসের স্থান নয়; ভূমি তাদের পরিচয়, আধ্যাত্মিকতা, ইতিহাস ও অস্তিত্বের অংশ। আধুনিক পাশ্চাত্য ধারণায় জমি অনেক সময় সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু আদিবাসী বিশ্বদৃষ্টিতে “দেশ” কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়—এটি একটি জীবন্ত সম্পর্ক। পাহাড়, নদী, প্রাণী, উদ্ভিদ, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি পবিত্র আমানত।

এই ভূমি-কেন্দ্রিক সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধের ধারণা শুধু আধুনিক মানবাধিকার চিন্তার বিষয় নয়; বিভিন্ন ধর্মীয় ও নৈতিক ঐতিহ্যেও এর প্রতিধ্বনি দেখা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ইসলামে পৃথিবীকে মানুষের ব্যক্তিগত ভোগের বস্তু নয়, বরং আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখা হয়। মানুষকে পৃথিবীর খলিফা বা রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভূমির প্রতি দায়িত্ব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব এবং প্রকৃতির প্রতি সম্মান—এই মূল্যবোধ বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ পেলেও এর মধ্যে একটি গভীর মানবিক মিল রয়েছে।

কিন্তু ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের পর এই প্রাচীন সংস্কৃতি এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়। ১৭৮৮ সালে ব্রিটিশ বসতি স্থাপনের পর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনব্যবস্থা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। ভূমি হারানো, সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, রোগব্যাধির বিস্তার এবং সামাজিক কাঠামোর ভাঙন তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হলো “স্টোলেন জেনারেশন (পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন প্রজন্ম)”–এর ইতিহাস। বহু আদিবাসী শিশুকে সরকারি নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তাদের অনেককে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক পরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি প্রজন্মের ক্ষতি করেনি; এটি বহু পরিবারের মধ্যে প্রজন্মান্তরের বেদনা, অবিশ্বাস এবং মানসিক আঘাত সৃষ্টি করেছে।

আজও অনেক আদি অস্ট্রেলীয় মনে করেন যে তাদের ইতিহাস যথেষ্টভাবে স্বীকৃতি পায়নি এবং তাদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান এবং বিচার ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্য তাদের অসন্তুষ্টির অন্যতম কারণ।

বিশেষ করে কারাব্যবস্থায় তাদের অতিরিক্ত উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। সাম্প্রতিক মানবাধিকার মূল্যায়নগুলো দেখায়—অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার অল্প অংশ হওয়া সত্ত্বেও কারাগারে তাদের উপস্থিতির হার অনেক বেশি; তরুণদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার হারও এখনও উদ্বেগজনকভাবে বেশি।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার মানবাধিকার কমিশনের সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিবেদন ২০২৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে—সমস্যা শুধু সামাজিক সেবা বা অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি নয়; সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে কাঠামোগত। বহু নীতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছাড়া তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের জীবনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাদের পূর্ণ অংশীদারত্ব ছাড়াই।

প্রতিবেদনটি কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আনে।

প্রথমত, প্রতীকী স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। শুধু ইতিহাস স্বীকার করা বা আনুষ্ঠানিক ভাষণ দিয়ে পরিবর্তন আসে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আত্মনিয়ন্ত্রণের ধারণা। অর্থাৎ যে জনগোষ্ঠীর জন্য নীতি তৈরি হবে, সেই জনগোষ্ঠীর মানুষদেরই উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণে নেতৃত্ব দিতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু সুরক্ষা, ভূমি ও সংস্কৃতির প্রশ্নে স্থানীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয়ত, সত্য বলা ও পুনর্মিলন। প্রতিবেদনটি অতীতকে ভুলে যাওয়ার নয়; বরং ইতিহাসকে সৎভাবে স্বীকার করার আহ্বান জানায়। কারণ অস্বীকার খুব কম ক্ষেত্রেই ক্ষত সারায়—স্বীকৃতি ও সংলাপ দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক আস্থা তৈরি করতে পারে।

চতুর্থত, জবাবদিহিতা। উন্নয়নের লক্ষ্য ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পরিমাপযোগ্য ফলাফল দাবি করতে হবে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও বিচার ব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।

তবে এই সংকট শুধু একটি জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়; এটি আধুনিক সভ্যতার একটি বৃহত্তর প্রশ্নও তুলে ধরে। উন্নয়ন কি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নাকি মানুষের মর্যাদা, সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাও তার অংশ?

এই প্রশ্নের সঙ্গে ইসলামের ন্যায়বিচারের ধারণার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামে ‘আদল’ শুধু আদালতের বিষয় নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। মানবিক মর্যাদা (কারামাহ), পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ (শূরা), দুর্বলদের অধিকার রক্ষা এবং জবাবদিহিতা—এসব মূল্যবোধ একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত্তি।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায়—উন্নয়ন মানে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।

এখন প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশি সম্প্রদায় এই যাত্রায় কী ভূমিকা রাখতে পারে?

প্রথম কাজ হলো জ্ঞান অর্জন। আমাদের অনেকেই বাংলাদেশ থেকে এসে আদিবাসী ইতিহাস, উপনিবেশের প্রভাব এবং তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সীমিত ধারণা নিয়ে বসবাস শুরু করি। তাই বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক সংগঠন ও মসজিদের মাধ্যমে এই ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সংলাপ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্থানীয় আদিবাসী সংগঠনের সঙ্গে সহযোগিতা এবং পুনর্মিলন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা আদিবাসী মালিকানাধীন ব্যবসাকে সমর্থন করতে পারেন, পেশাগত সহযোগিতা তৈরি করতে পারেন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন।

চতুর্থত, মুসলিম সম্প্রদায় ইসলামের ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বের শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও ভাষা, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে অন্য একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা বোঝার জন্য আমাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও একটি সেতু হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ তখনই সত্যিকার অর্থে উজ্জ্বল হবে, যখন এই দেশের প্রাচীনতম সংস্কৃতি এবং আধুনিক বহুসাংস্কৃতিক সমাজ একে অপরের সঙ্গে সম্মানের ভিত্তিতে পথ চলবে।

ন্যায়বিচার কোনো একটি সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ সুবিধা নয়; এটি একটি সভ্যতার নৈতিক পরীক্ষা। আমরা কি শুধু তখনই ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকব যখন তা আমাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে, নাকি ন্যায়বিচারকে মূল্য দেব কারণ সেটিই মানবতার দাবি?

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত ও সম্মানভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে তখনই, যখন ইতিহাসের ক্ষতকে স্বীকার করে, বর্তমানের বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করে এবং ভবিষ্যতের জন্য পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করা হবে।

মোহাম্মদ আলম ফরিদ, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *